1. গল্প লেখার গল্প 2. কেন লিখি 3. সাহিত্য করার আগে 4. লেখকের সমস্যা 5. নতুন জীবন 6. প্রতিভা 7. উপন্যাসের ধারা 8. নতুন জীবন 9. প্রেস মালিকের ষড়যন্ত্র 10. সাহিত্য সমালোচনা প্রসঙ্গ 11. বক্সা ক্যাম্পে শিল্পী-সাহিত্যিক 12. সাহিত্যিক ও গুণ্ডামি 13. ভারতের মর্মবাণী 14. পাঠকগোষ্ঠীর আলোচনা 15. প্রগতি সাহিত্য 16. বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা
Manik Bandopadhyay (Bengali: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bengali novelist and is considered one of the leading lights of modern Bangla fiction. During a short lifespan of forty-eight years, plagued simultaneously by illness and financial crisis, he produced 36 novels and 177 short-stories. His important works include Padma Nadir Majhi (The Boatman on The River Padma, 1936) and Putul Nacher Itikatha (The Puppet's Tale, 1936), Shahartali (The Suburbia, 1941) and Chatushkone (The Quadrilateral, 1948).
'লেখকের কথা ও বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা' - বইতে লেখক নিজের লেখার উদ্দেশ্য, ধরণ, কারণ ও ভালো-মন্দের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন ।
যেমনঃ 'কেন লিখি' শীর্ষক অধ্যায়ে বলেন- 'লেখা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে যে-সব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলি জানাবার জন্যই লিখি' । লেখার কারণের ব্যক্তিগত যুক্তি ছাড়াও সামাজিক বিচারে লেখার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে বলেন- 'জীবনকে আমি যেভাবে ও যতভাবে উপলব্ধি করেছি অন্যকে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ ভাগ দেয়ার তাগিদে আমি লিখি' বা 'আমার লেখাকে আশ্রয় করে সে কতগুলি মানসিক অভিজ্ঞতা লাভ করে- আমি লিখে পাইয়ে না দিলে বেচারী যা কোনদিন পেতো না' ।
'সাহিত্য করার আগে' নামের আরেকটা অধ্যায়ে লেখকের সাহিত্য-জীবন নিয়ে পরিচর্যা, চর্চা ও প্রস্তুতির কথা নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে আলোচনা করেন । 'সাহিত্য করার আগে কয়েকটা বিষয়ে সকল হবু লেখকের মিল থাকে । যেমন, সাহিত্য সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ, জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা ও জবাব খোঁজার তাগিদ, সাহিত্যে প্রতিফলিত জীবনকে বাস্তব জীবনে খুঁজে নেবার চেষ্টা, নতুন অভিজ্ঞতাকে চিন্তা জগতে সাহিত্যের টেকনিকে ঢেলে সাজা ইত্যাদি-' ।
'কেউ একসাথে বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক হতে চাইলে তাকে দিয়ে বিজ্ঞান বা সাহিত্য কোনটারই বিশেষ উপকার হয় না' এরকম একটা কথা বলেন 'গল্প লেখার গল্প' নামের অধ্যায়ে । আলোচনা করেন বিজ্ঞান কিভাবে লেখা ও লেখার ধরণকে নতুন নতুন নির্দেশনা দেয় সে বিষয়ে । 'এ যুগে বিজ্ঞান বাদ দিয়ে সাহিত্য লেখা অসম্ভব- তাতে শুধু পুরানো কুসংস্কারকেই প্রশ্রয় দেয়া হবে । সাহিত্য বাদ দিয়ে বৈজ্ঞানিক হলে, তিনি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হিংস্র মানুষের হাতে মারণাস্ত্রই তুলে দেবেন- তাঁর আবিষ্কারকে মানুষ মানুষকে ধ্বংশ করার কাজে ব্যবহার করবে । বিজ্ঞান ও সাহিত্যের সম্বন্ধ এযুগের অতি প্রয়োজনীয় যুগধর্ম' ।
'লেখকের সমস্যা' নামের একটা অধ্যায়ে আলোচনা করেন লেখকের আয় বা শ্রমের মজুরির বিষয়টা । ''আর্টস ফর আর্টস সেক' দুর্নীতিটার সঙ্গে অনেকে নীতিকে একাকার করে ফেলেন । মূলনীতিটা মোটেই ফাঁকা আদর্শবাদিতা থেকে আসে না । নিজের সাধ্যমত খাঁটি সাহিত্য সৃষ্টি করতে চাইলে সাহিত্যিককে এই নীতি মানতে হয়' । অর্থাৎ কেবল লেখার জন্য লেখা হলে সেটা একটা ফাঁপা আদর্শবাদিতায় পরিণত হতে পারে । 'লেখক মজুর বা অল্প বেতনের কেরানী নয়, শ্রমটাই তাঁর একমাত্র পণ্য নয়' বা 'যে সমাজে লেখকের শ্রমের মূল্য দেবার ব্যবস্হা নেই, সে সমাজে লেখাকে পেশা করার অর্থ শুধু কলম চালিয়ে লেখার শ্রমটুকু পণ্য করা' তাই বলেন- 'বাস্তবতা ঠিকভাবে বিচার করে প্রয়োগ না করলে নীতির যান্ত্রিক প্রয়োগের আশঙ্কা থাকে' । এই লাইনগুলি এরকম একটা বিস্ময় ও প্রশ্নের উদ্রেগ করে- তাহলে উপায়!?
উপায় মানিক আরেকটা অধ্যায় 'নতুন জীবন' নামক অধ্যায়ে বাতলান- 'যে শ্রেণির পাঠকের জন্য লেখা, রচনাটি যেন সে শ্রেণীর পাঠকেরই উপযোগী হয়' । এই শ্রেণী কিন্তু বিত্ত-ব্যবস্থার শ্রেণী নয় বরং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণী । এই নতুন জীবনে লেখককে তার বুদ্ধিবৃত্তির পাঠক শ্রেণীকে চিনতে বলছেন তাতে তার জীবন ধারণের পন্থাটা সহজ হবে ।
'প্রতিভা' নামের আরেক অধ্যায়ে আত্মমূল্য উপলব্ধি করার একটা ধারণা দেন যা তার অই বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীকে পেতে সাহায্য করে । বলেন- 'প্রতিভা হল দক্ষতা অর্জনের বিশেষ ক্ষমতা' । এ সম্পর্কে তার বক্তব্য স্পষ্ট- 'প্রতিভা সম্পর্কে সাধারণ লোকের- এবং স্বয়ং অনেক প্রতিভাবানদেরও- ধারণা আছে ওটা এক ঈশ্বরদত্ত রহস্যময় জিনিস । প্রতিভাকে এরকম রহস্যময় পদার্থ মনে করার ফলে লেখক-কবিদের এ জিনিসটার ওপর প্রায় একচেটিয়া অধিকার জন্মে থাকে । বড় বৈজ্ঞানিকের 'বৈজ্ঞানিক প্রতিভা' থাকে, কিন্তু একজন বড় কবি নিজেই প্রতিভা । বৈজ্ঞানিকের বেলা প্রতিভার অর্থ বিশেষ ক্ষমতা, কবির বেলায় প্রতিভার অর্থ দুর্বোধ্য একটা গুণ । এর কারণটা অনুমান করা সহজ- লেখক-কবিদের সাধারণ লোক মানুষের পঙক্তি থেকে তফাতে সরিয়ে এক বিশেষ শ্রেণীর রহস্যময় জীব করে রেখেছে । এরকম ধারণা সৃষ্টির জন্য অবশ্য দায়ী লেখক-কবিরাই' । তাহলে লেখক-কবিদের কি করতে বলেন? অন্তর্লোকের সন্ধান, দক্ষতা অর্জনের জন্য পরিশ্রমের গুরুত্ব আলোচনা করে শেষে বলেন- 'সাধারণের কাতারে নেমে আসাটাই তার অসাধারণত্ব'।
এছাড়াও মার্ক্সবাদের ফেনোমেনলজি ও তার প্রায়োগিক জ্ঞান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন । এযুগে মার্ক্সবাদের লেন্স গল্পের কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গিতে যে ব্যাপক পরিবর্তন আনে তার গুরুত্বালোচনা করেন । 'আমার লেখায় যে অনেক ভুল, ভ্রান্তি, মিথ্যা আর অসম্পূর্ণতার ফাঁকি আছে আগেও আমি তা জানতাম । কিন্তু মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় হবার আগে এতটা স্পষ্ট ও আন্তরিকভাবে জানার সাধ্য হয়নি' । মনস্তত্বের জগতে ফ্রয়েডের তত্ব ও সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন এবং মনস্তত্ব যে প্রতিনিয়ত আপগ্রেড হচ্ছে সে বিষয়ে সচেতন হন । 'নিজের কথা' নামের একটা ছোট অধ্যায়ে বলেন- 'জীবনকে জানা আর জীবনকে মায়া করা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে । একটাকে বড় করে অন্যটাকে তুচ্ছ করা জীবনদর্শীর পক্ষে বীভৎস অপরাধ' । অর্থাৎ জ্ঞানার্জন আর আন্তরিক মায়া এর কোনটা ছাড়া সাহিত্য করা রীতিমত অপরাধ বলে মনে করেন!
'উপন্যাসের ধারা' নামের লেখায় বিশ্ব ও বাংলা সাহিত্যে শুরু থেকে উপন্যাসের রকমফের, পরিবর্তন ও বর্তমান (তার সময় পর্যন্ত) নিয়ে চিন্তা করেন । 'অধ্যাত্মবাদের জের এবং ভাববাদ থেকে আত্মরক্ষার খাতিরে যুক্তিবাদের সাহায্যে বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ শুরু করে উপন্যাস লেখা' ।
'সাহিত্য সমালোচনা প্রসঙ্গ' আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার প্রসঙ্গ এই বইয়ে । 'নিজের বই সম্পর্কে কোন সমালোচনার জবাবে লেখকের কিছু বলা সাংঘাতিক অনিয়ম' । অর্থাৎ আপনি যদি সাহিত্যিক হন, আপনার লেখা নিয়ে সমালোচককে কোন ব্যখ্যা, কৈফিয়ত, শুভেচ্ছা বা ধন্যবাদ দেয়ার কোন দরকার নাই । আপনার কাজ লেখা, আপনার ধর্ম পরবর্তী কাজে নিবেশিত থাকা ।
পাদটীকাঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শুরুর দিকে জননী (১৯৩৫), দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫), পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬), পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬), চতুষ্কোণ (১৯৪২) এর মত বেশ কিছু সামাজিক ভাবে সফল উপন্যাস লিখেন । তারপর তার লেখার মাঝপথ থেকে শেষ পর্যন্ত কিছু উপন্যাস নিয়ে কিছু সমালোচকের বক্তব্য ছিল 'ভাষা-বিক্ষিপ্ততা' । কিন্তু তিনি সেসব তখন আমলে না নিয়ে লিখে যান, যার জন্য আমরা ইতিকথার পরের কথা (১৯৫২), হলুদ নদী সবুজ বন (১৯৫৬) এর মত উপন্যাস ও ছোট বকুলপুরের যাত্রী (১৯৪৯) এর মত গল্পগুচ্ছ পাই ।
লেখালেখি সম্পর্কিত কয়েকটি প্রবন্ধ মানিকবাবু জীবদ্দশায় লিখে গেলেও বই আকারে তা তিনি ছাপাতে পারেননি, বরং তার মৃত্যুর পরেই "লেখকের কথা" নামে এই লেখালেখি বিষয়ক প্রবন্ধগুলো বই আকারে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে তার একটি বিতর্কিত দীর্ঘ প্রবন্ধ যা "বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা" নামে পরিচিত তাও সংযুক্ত করে বর্তমান বইটি প্রকাশিত করা হয়। . বইটির ���ুরুতেই আমরা দেখতে পাই তিনি কিভাবে লেখক হয়ে উঠেন বাজি ধরে। যা খুবই চমকপ্রদ ছিলো। মানিক বাবু পুরো বইজুড়ে সাহিত্য বিশেষ করে প্রগতি সাহিত্যে নিয়ে বারংবার সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে তৎকালীন প্রগতি সাহিত্যের যে সকল ভুল ভ্রান্তি এবং অসম্পূর্ণতা তার বোধের সম্মুখে এসে উপনীত হয়েছিলো তা তিনি বিশেষ সুকৌশলে তুলে এনেছেন। যেমন তিনি বলেছেন আমাদের সাহিত্য বিজ্ঞান ভিত্তিক হওয়া উচিত, পুরনো আমলের ধ্যানধারণা নিয়ে সাহিত্য রচনা করলে সেটাতে কুসংস্কারটাই থেকে যায়। তার মতে সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের তাই একটি যোগাযোগ থাকা উচিত। যেমন যে বিজ্ঞানী কখনো সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে পারেনি, সে কখনো মানবতার ডাক শুনতে পায়না, তার থেকে মরণাস্ত্রই আশা করা যায়। তিনি বলেছেন একই সাথে আমাদের সাহিত্যের চরিত্রগুলো একদম উত্তম চরিত্রের নয়তো বদ চরিত্রের হয়ে থাকে, কিন্তু মানুষ কখনো সম্পূর্ণ ভালো খারাপ হয়না। তাই তার মতে সাহিত্য আধুনিকায়ন করতে হলে তাতে স্থান দিতে হবে সত্যিকারের চরিত্র, যাতে দোষ-গুন দুটোই থাকবে। সাহিত্য বিষয়ে বিশেষ করে সাহিত্যের সমালোচনা সম্পর্কে জানতে হলে বইটি পড়া উচিত।