মেঃ জেঃ ইবরাহিম বর্তমানে পরিচিত রাজনীতিবিদ। দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীতে ছিলেন এই বীরপ্রতীক। সেনাকর্মকর্তা ইবরাহিম তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতিকে লিপিবদ্ধ করেছেন ১১৬ পাতার বইতে।
এই বইয়ের সবচেয়ে ভালো দিক হল জনাবের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের ঘটনাগুলোকে সংক্ষেপে উপস্থাপন। মূলত, ১৯৯৬ সালে জেনারেল নাসিমের 'সেনাঅভ্যুথানের ' সময় যশোরের জিওসি ছিলেন লেখক। তাই সেই টালমাটাল অবস্থা সম্পর্কে তার পটভূমি নিয়ে জানতে যাঁরা আগ্রহী, তাঁদের জন্য সুখবর আছে বইটিতে।
জিয়া এবং এরশাদের শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত ছিলেন জনাব ইবরাহিম। এরশাদের আমলে পার্বত্যচট্টগ্রামে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা ইবরাহিমের জবানিতে শান্তিপ্রক্রিয়ার অজানা দিকের কথা যেমন লিখেছেন তিনি, তেমনি এরশাদের পতনের সময় সেনাবাহিনীর ভেতরকার কথা লিখেছেন। দাবি করেছেন, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়কের ব্যবস্থা মেনে নিতে তৎকালীন সেনাবাহিনী চাপ প্রয়োগ করতে প্রস্তুত ছিল খালেদা জিয়াকে।
সাধারণ লোকের সেনাবাহিনী নিয়ে আগ্রহ (ইতি/নেতি) থাকলেও জানার সুযোগ কম। তাই সুযোগ কিছুটা হলেও পূরণ করবে এই বই। দলাদলি, পক্ষপাতিত্ব যে সব জায়গাতেই থাকে তার আভাস ইবরাহিম বারবার দিয়েছেন।
যিনি সেনাবাহিনীর এত উচ্চপদে ছিলেন তাঁর স্মৃতিকথাতে নিশ্চয়ই পাঠককে চমকে দেয়ার মতো, জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়ার মতো কিছু থাকবে বলে আশা করে বইখান ধরেছিনু। রীতিমত ত্যক্ত করে ছেড়ে দিয়েছেন মেঃ জেঃ সাহেব। সেনাবাহিনীর পদবির ভারিত্বে তাঁর লেখা এত ভারি হয়ে উঠেছে যে, সেনাবহির্ভূত সাধারণ পড়ুয়ার কালঘাম ছুটিয়ে দিতে পারে। আগ্রহী পড়ুয়া নিমিষেই হয়ে উঠতে পারেন সেনাবাহিনীর পদবিবিদ্বেষী!
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব তথ্যগত বির্তক সমাজে ওঠে তার সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়ার প্রত্যাশা বীরপ্রতীক ইবরাহিমের কাছে থাকাটা স্বাভাবিক। যেমনটা ভাবতেই পারি তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিদ্রোহ নিয়ে নিজের অবস্থান ও বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা পরিষ্কার করবেন। অথচ মেঃ জেঃ ইবরাহিম একজন শুদ্ধ পলায়নবাদী । বারবার এড়াতে চেয়েছেন নিজে যা দেখেছেন তা জানানোর দায়িত্ববোধকে।
আসলে এক 'এসকেপিস্টের' জবানি "সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আটাশ বছর"।
অনেক ঘটনার বিবরণ থাকলেও লেখা বেশ এলোমেলো লেগেছে। হয়ত সেনাবাহিনীর পদ গুলোর সাথে খুব একটা পরিচিত নই, তাই বার বার বিভিন্ন পদের সম্বোধন অত্যুক্তি মনে হয়েছে। পদের বিবরণ যুক্ত একটি নির্ঘণ্ট থাকলে বোধ করি আমার মত সাধারণ পাঠকের সুবিধা হত।
সারা বই জুড়ে লেখকের উপস্থিতি ছিল খুব কম, বরং ঘটনার দিকে জোর দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এক ই সাথে আমার মনে হয়েছে, নিরপেক্ষ ভাব বজায় রাখতে যেয়ে বইয়ের লেখার সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়েছে।
তবে, বইটি পাঠ করলে পাঠক ৭১ পরবর্তী ক্যু গুলোর বিস্তারিত বিবরণ না জানলেও, ঘটনা পরম্পরা সম্পর্কে জানতে পারবেন।
১৯৯৬ সালের মে মাসের ১৮-২০ তারিখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এক দুর্যোগময় পরিস্থিতির সৃষ্টির হয়। রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে সেনাবাহিনীর আদেশের পালাক্রম বা চেইন অফ কমান্ড বিঘ্নিত হয় মারাত্মকভাবে। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠলে সৃষ্টি হয় দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় অনিশ্চয়তা এবং অভ্যুত্থান ও প্রতি-অভ্যুত্থান এর সম্ভাবনা। এসবের দোলাচলে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বলির পাঁঠা হতে হয় কিছু সিনিয়র অফিসারকে। কিন্তু কেন? কী ঘটেছিল আসলে পর্দার অন্তরালে? শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি বাসভবনের দূরালাপনি, কার কী ভূমিকা ছিল? এই ঘটনা সম্বন্ধে দেশবাসীকে যতটা সম্ভব অবহিত করার লক্ষ্যে লেখক এই বইয়ের অবতারণা করেছেন, যদিও এটা প্রাথমিকভাবে একটি দৈনিকে প্রকাশিত অনেকগুলো কলামের সংমিশ্রণ।
যে কথা অবশ্যই বলতে হয়, লেখক '৭১ এর সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন এবং ঘটনার সময় তিনি মেজর জেনারেল পদবীতে চাকরি করছিলেন সেনাবাহিনীতে। কাজেই তার বিশ্লেষণ এর একটা গুরুত্ব অবশ্যই আছে।
লেখকের লেখার মুন্সিয়ানা প্রবলভাবে পরিস্ফুটিত হয় এ প্রসঙ্গে যে, তিনি ঘটনার ওপর আলোকপাত করার জন্য এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝানোর জন্য বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে '৯৬ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার অত্যন্ত চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন যাতে করে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ও পরিচালনা প্রক্রিয়া এবং আলোচ্য ঘটনার পূর্বে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা পাঠককে সেনাবাহিনী সম্বন্ধে স্বল্প পরিসরে জানতে সহায়তা করে। লেখক আসলে চেয়েছেন '৯৬ তে ঘটে যাওয়া ঘটনার পশ্চাতে সেনাবাহিনী নিয়ে জনগণের আগ্রহ বা আশঙ্কার ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে।
আর সেই ক্রমেই মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্মলগ্ন থেকে সে পর্যন্ত ঘটে যাওয়া প্রতিটা উল্লেখযোগ্য ঘটনাই বইতে যথার্থ পরিসরে স্থান পেয়েছে। তন্মধ্যে, ১৫ অগাস্ট এর হত্যাকাণ্ড, ২ ও ৭ নভেম্বরের অভ্যত্থান, জিয়ার শাসনামল, এরশাদের শাসনামল, পার্বত্য শান্তি চুক্তি প্রণিধানযোগ্য।
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাবলি আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সম্বন্ধে আমার আগ্রহ অপরিসীম। তাই এই বইটি হাতে নেয়া। পড়া শেষ করার পর বইটিকে আমার কাছে শতভাগই নির্মোহ লেগেছে আর তার আকর্ষণীয় লেখনিতে বইটি পড়তে গিয়ে কখনোই বিরক্তি এসে চেপে ধরেনি। শুধু মনে হয়েছে লেখকের যে স্মৃতিভাণ্ডার তাতে করে আরও ভালো স্পটলাইট , আরও বৃহৎ বিশ্লেষণ পাওয়ার দাবি রাখে আমার মত সাধারণ পাঠক জনতা।