আগাথা ক্রিস্টির লেখা রহস্যকাহিনি যতগুলি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে, তেমন বাইবেল ছাড়া আর কোনো বই হয়নি। বাংলা ভাষাও ব্যতিক্রম হয়ে থাকেনি এই বিষয়ে। বিশ্বের যে-কোনো ভাষার রহস্যকাহিনি লেখকদের মধ্যে আগাথা ক্রিস্টি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা ছাড়া আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের জন্য। সেই বৈশিষ্ট্যগুলির সন্ধান পাওয়া যায় আগাথার সাহিত্যকীর্তির বিশদ পর্যালোচনায়। অথচ আগাথা ক্রিস্টির নামক মানুষটির জীবন যথেষ্ট রঙিন এবং রহস্যময় হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে নিয়ে বাংলায় তেমন বড়ো কাজ বা গবেষণা বিশেষ হয়নি। বাংলা সাহিত্যের সেই ঘাটতি পূরণ করা গেল ডেম আগাথার একশো পঁচিশতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত এই বইতে। 'ডাচেস অব ডেথ', 'কুইন অব ক্রাইম' কিংবা বাংলায় রহস্যের রানি বিশেষণে ভূষিত আগাথা ক্রিস্টির বর্ণময় জীবন এবং স্বর্ণময় সাহিত্যকীর্তি ধরা রইল তাঁর জীবনী, রচনাশৈলী, সমালোচনা, আলোচনা, তাঁর সৃষ্ট কিছু বিখ্যাত চরিত্র, ইত্যাদি বিষয়ক আলোচনার মধ্যে।
'দেশ'-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় পোয়ারো'র আবির্ভাবের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে তিনটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে কৌশিক মজুমদারের লেখা অনবদ্য প্রবন্ধ 'স্বতন্ত্র সত্যান্বেষী' পড়ে মনে হল, রহস্যসম্রাজ্ঞীকে নিয়ে আমার নিজের সীমিত জ্ঞানগম্যি একটু ঝেড়ে-পুঁছে নেওয়া দরকার। হাতে তুলে নিলাম এটি— যা বাংলায় আগাথা ক্রিস্টিকে নিয়ে লেখা একমাত্র প্রামাণ্য বই! কী আছে এই বইতে? প্রাক্কথন-এর পর আলোচনাটি বিন্যস্ত হয়েছে এই ক'টি অধ্যায়ে~ ১. ডেম আগাথা (জীবন ও সাহিত্য) ২. ক্রিস্টির সৃষ্টি (রহস্যকাহিনির বৈশিষ্ট্য) ৩. রহস্য, রাইমস এবং শেক্সপিয়র (রচনায় নার্সারি রাইম ও ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রভাব) ৪. আক্রান্ত আগাথা (সমালোচনা ও বিরুদ্ধমত) ৫. আগাথা ক্রিস্টির অন্তর্ধান (নিরুদ্দেশ নিয়ে তত্ত্ব ও মত) ৬. গুঁফো গোয়েন্দা (এরকুল পোয়ারো) ৭. বনগাঁবাসী পিসি (মিস মার্পল) ৮. আরও এক লেখিকা (অ্যারিয়াডনে অলিভার) ৯. গোয়েন্দা দম্পতি (টমি ও টাপেন্স) ১০. দুই হুজুরের গপ্পো (মিস্টার কুইন ও মিস্টার স্যাদারওয়েট) ১১. হৃদয়-বিশারদ গোয়েন্দা (পার্কার পাইন) ১২. রোমান্স, কাব্য ও নাটক (মেরি ওয়েস্টম্যাকট ছদ্মনামে লেখা রচনার আলোচনা) ১৩. বাস্তব যখন কল্পনায় (সাহিত্য-ভাবনায় বাস্তবের প্রভাব) ১৪. বাংলা রহস্য-সাহিত্যে আগাথা ক্রিস্টির প্রভাব ১৫. পরিশিষ্ট (যাবতীয় বইয়ের কালানুক্রমিক তালিকা) শেষে এসেছে নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি। বইটির সম্বন্ধে যা উল্লেখ্য তা হল~ প্রথমত, আলোচনায় বহু লেখার সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকলেও তাতে স্পয়লার থাকেনি। দ্বিতীয়ত, পাঠককে মূল বইগুলো পড়তে উৎসাহিত করা হয়েছে নানাভাবে। তৃতীয়ত, এই বইয়ের প্রতিটি লেখার মধ্যে একটা সরস অথচ সহানুভূতিশীল ভাব আছে। ফলে তথ্যের ভারে ক্লিষ্ট হয়নি বইটি। বরং আড্ডা মারার মতো করে আমরা লেখকের সঙ্গে সরে গেছি এক প্রসঙ্গ থেকে অন্যতে, এক চরিত্রর কাণ্ড ছাড়িয়ে অন্যের কীর্তিতে। বইটি যথেষ্ট তথ্য ও বিশ্লেষণ নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই সুকুমার রায় কথিত নোটবুক (সব লিখেছে এই কেতাবে, দুনিয়ার সব খবর যত...) নয়। বিভিন্ন মাধ্যমে রূপান্তরিত হওয়ার ফলে আগাথা ক্রিস্টির রচনারা যে একেবারে অন্য রূপ ও অর্থ পেয়েছিল— তা নিয়ে এখানে কোনো আলোচনা পাইনি আমরা। ক্রিস্টির সৃষ্টি চরিত্ররা কীভাবে শরদিন্দু'র তত্ত্ব মেনে নিছক রহস্যকাহিনি না হয়ে সমকালীন সংশয় ও সংকটকে নিজের কৃষ্ণসার হৃদয় হিসেবে বহন করেছে, সেই নিয়েও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এখানে হয়নি। এমনকি ক্রিস্টির লেখাগুলো কীভাবে বঙ্গীকৃত হয়েছে— তাদের নিয়েও অত ছোটো একটি অধ্যায়ে মন ভরেনি মোটেই। তবে এই ধরনের আলোচনার পথে যাতে পাঠক নিজে থেকেই আগ্রহী হন, তার জন্য জ্ঞানের দেশলাই কাঠিটি জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছে এই বই। আর কীই বা চাওয়া যায়, বলুন? বাংলায় আগাথা ক্রিস্টি ও তাঁর রচনাকে জানার জন্য এই বই এখনও অদ্বিতীয়। তাই সুযোগ পেলে অবশ্যই পড়ুন।