হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর এই বইয়ে তার বৌদ্ধধর্মবিষয়ক কয়েকটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। সূচি: • বৌদ্ধ কাহাকে বলে ও তাহার গুরু কে? • নির্ব্বাণ • নির্ব্বাণ কয় রকম? • কোথা হইতে আসিল? • কোথা হইতে আসিল? (২) • সহজযান • বৌদ্ধ ধর্ম্মের অধঃপাত • বৌদ্ধ ধর্ম্ম কোথায় গেল? • এখনও একটু আছে • উড়িষ্যার জঙ্গলে • জাতক ও অবদান • দলাদলি • মহাসাঙ্ঘিক মত • থেরাবাদ ও মহাসাঙ্ঘিক • মানুষ ও রাজা
Haraprasad Shastri (Bangla: হরপ্রসাদ শাস্ত্রী) was an Indian academic, Sanskrit scholar, archivist and historian of Bangla literature. He is most known for discovering the Charyapada, the earliest known examples of Bangla literature.
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ভারতবর্ষের অজস্র অবদানের মধ্যে সবচেয়ে ওপরেই থাকবে বৌদ্ধধর্ম। কিন্তু সেটির সম্বন্ধে আমার জ্ঞান, এমনকি প্রাথমিক ধারণা, ভারতের আর এক অবদান, অর্থাৎ ‘শূন্য’-র কাছাকাছিই বলা চলে। এই শোচনীয় ‘বৌদ্ধিক’ অবস্থা শোধরানোর চেষ্টায় বেশ কিছু থান ইট মার্কা বই পড়তে গিয়ে ঘরের আলো জ্বালিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম। একটি অতিক্ষুদ্র বই পড়তে গিয়ে মনে হল, তল পাচ্ছি না। শেষে, যে সাধকের চেষ্টায় ‘চর্যাপদ’ পুনুরুদ্ধৃত হয়েছিল, সেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর রচনা-সংগ্রহ-র তৃতীয় খণ্ডে পেয়ে গেলাম যা চাইছিলাম। ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় ১৩২১ থেকে ১৩২৪ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ আজ থেকে শতবর্ষেরও বেশি আগে প্রকাশিত এই নিবন্ধগুলোর গদ্য সাধু হলেও সহজ ও সুললিত। তথ্য ও তত্ত্ব এখানে শিক্ষার্থীর পথে কণ্টকতুল্য অন্তরায়ের পরিবর্তে জলসত্রের ভূমিকা পালন করে। রচয়িতার প্রজ্ঞা প্রভাকরের মতো প্রখর ও প্রবল না হয়ে পূর্ণচন্দ্রের মতো স্নিগ্ধ আলোয় পথ দেখায়। আগেই স্বীকার করি, বাংলাদেশের ‘নবযুগ প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের প্রসঙ্গে আমি এই প্রতিক্রিয়া লিখছি ঠিকই, কিন্তু সেটি দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। তাই বইটিতে মহামহোপাধ্যায়ের বৌদ্ধধর্ম বিষয়ক সবক’টি নিবন্ধ আছে কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু যদি থাকে, তাহলে তাতে যে-যে লেখা থাকা উচিত, তাদের শীর্ষক নিম্নরূপ: ১. বৌদ্ধ কাহাকে বলে ও তাঁহার গুরু কে? ২. নির্বাণ ৩. নির্বাণ কয় রকম? ৪. কোথা হইতে আসিল? ৫. হীনযান ও মহাযান ৬. মহাযান কোথা হইতে আসিল? ৭. সহজযান ৮. বৌদ্ধধর্মের অধঃপাত ৯. বৌদ্ধধর্ম কোথায় গেল? ১০. এখনও একটু আছে ১১. উড়িষ্যার জঙ্গলে ১২. জাতক ও অবদান ১৩. দলাদলি ১৪. মহাসাংঘিক মত ১৫. থেরাবাদ ও মহাসাংঘিক ১৬. মানুষ ও রাজা এই নিবন্ধগুলোতে সেই সময় উপলব্ধ তথ্যের সঙ্গে যুক্তির ব্যবহারে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা করা হয়েছিল। আজ সহজলভ্য ভিন্নতর উপাদানের সাহায্য নিয়ে আমরাও যদি একইভাবে বিশ্লেষণ করি, হয়তো অন্যরকম কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম নিয়ে যদি আপনি এগোতে চান, তাহলে শুধু ভিত্তি নয়, বরং তার সামগ্রিক রূপটি বিষয়ে রেফারেন্স হিসেবেও এই নিবন্ধগুলোর কোনো বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয় না। সর্বোপরি, এই লেখনী কি আজকের কোনো নন-ফিকশন লেখায় পাওয়া যাবে? নিম্নবৎ নমুনা দেখুন: “বুদ্ধদেবকে সৃষ্টির কথা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন, ‘তোমার সে কথায় কাজ কী? তুমি আপন চরকায় তেল দাও। তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? কোথায় যাইবে? এই কথাই ভাবো। আকাশ কোথা হইতে হইল, পৃথিবী কোথা হইতে হইল, তাহা ভাবিয়া তোমার দরকার কী?’ এমন-কি মানুষ কোথা হইতে আসিল, তাহাও তিনি কোথাও স্পষ্ট বলিয়া যান নাই।” যদি বইটি জোগাড় করতে পারেন। অতি-অতি-অতি অবশ্যই পড়ুন।
শাস্ত্রী মহাশয় ‘খুবোই’ জ্ঞানী। বাহুবলীন্দ্র সাহেবের মতই জ্ঞানের সাগর উজাড় করে দিয়েছেন। এই যেমন, হয়তো দুম করে অজাতশত্রুর প্রসঙ্গ টেনে এনে কিছু একটা বলে ফেলবেন—যেন ধরেই নিবেন অজাতশত্রু লোকটাকে জগদ্শুদ্ধ পাঠক চেনে!
সমস্যা হল, পাঠক ***। কাজেই প্লাস পাওয়ারের চশমা-আঁটা গণ্যমান্য ব্যক্তি না হলে এসব প্রবন্ধের অর্থ উদ্ধার করা বড় কঠিন। প্রবন্ধ তো না, রিসার্চ পেপার একেকটা।
আচ্ছা, তাও নাহয় কষ্টমষ্ট করে জানলাম অজাতশত্রুর পরিচয়, হ্যায় কিডা করে। কিন্তু এই যে বইভর্তি সংস্কৃত শ্লোক—এসব ডিকোড করা তো আমার পক্ষে সম্ভব না—কেননা, কে না জানে, পাঠক ***। ফলে হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রাস্তা ছিল না।
তবে কেবল এটুকু বললে হরপ্রসাদ মহাশয়ের ওপর অবিচারই করা হবে। কেননা দুশো পৃষ্ঠার এই বইয়ের অন্তত একশো পৃষ্ঠা সাবলীল ভাষায় লেখা—যেখানে উপলব্ধি করার অনেক কিছুই আছে। তাছাড়া গুভাজু-দেবভাজু আর শূন্যমূর্তির আরাধনার ধারণা থেকে বাংলায় হিন্দু-বৌদ্ধধর্মের মিশ্রণের ব্যাপারটা তিনি যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—সেটা আমার কাছে খুব কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়েছে।
শাস্ত্রী মহাশয়ের গুণ এই যে, তিনি আর দশজনের লেখা থেকে দশটা লাইন ধার করে প্রবন্ধ লিখে ফেলেন না, বরং বাংলায় বৌদ্ধধর্মের অবশেষ খুঁজে বের করতে তিনি নিজেও গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরেছেন, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছেন।
রিসার্চ পেপারের ইনট্রো হিসেবে এই লেখাগুলো দারুণ সুন্দর হলেও, বই হিসেবে না। এবং তার কারণ ঐ একটাই। পাঠক ***।
পরিশিষ্ট: রিভিউটা লেখার পর ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যেটা বই হিসেবে বের করেছিলেন—সেটার নাম আসলে বৌদ্ধধর্ম। এবং ওটা একটা ‘বই’-ই ছিল। সেই বইয়ের পনেরোটা প্রবন্ধের সাথে আরও কয়েকটা জুড়ে দিয়ে এই বই বের করা হয়—আমার ধারণা শাস্ত্রী মহাশয়ের মৃত্যুর পরে।
মূল বইয়ের পনেরোটা প্রবন্ধই দারুণ সুখপাঠ্য। ওগুলোর লেজে ছেড়ে-দে-মা-কেঁদে-বাঁচি-প্রবন্ধ জুড়ে দেয়াতেই সম্ভবত এ বইয়ের এমন নিদারুণ অবস্থা।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে তাহলে দোষ দেয়া যাচ্ছে না—তিনি বই এবং রিসার্চ পেপারের পার্থক্য জানতেন বলেই বোধ হয়।