হুমায়ুন খানের সুন্দরবনের মানুষখেকো বইটি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালের নভেম্বর মাসে। পচাব্দী গাজীর জবানিতে বইটি লিখেছেন হুমায়ুন খান। এছাড়া হুমায়ুন খান সে সময় আরো দুটি বই উপহার দেন আমদের পাঠকদেরকে বিশ্বের বিস্ময়-৩ ও বিশ্বের বিস্ময়-৪। পরবর্তিতে লিখেন ইসলামিক সিরিজের ‘হযরত আলীর বাণী’ ও ‘আরবী প্রবাদ’
বইখানা সেই কেজি তে পড়ি যখন,স্কুলে পুরস্কার পেয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে ভেতরে ছবিও ছিল বেশ কয়েক,দেখতাম আর ভয় পেতাম। বাসায় আর বইটা নাই,স্মৃতিতেও ছিলো না,হঠাৎ গুড্রিসএ দেখে মনে পড়লো।
দুবলার চরের মানুষখেকো (যে নরখাদককে পচাব্দী মুখোমুখি মোকাবেলা করেছিলেন এবং নষ্ট বন্দুক হাতে নিয়ে প্রায় মরতে বসেছিলেন), শিঙের গোলখালীর বিভীষিকা (যার আক্রমণে পচাব্দীর বাবা জখম হন ও দাদা মৃত্যুবরণ করেন) এবং তালপাটির বিভীষিকা (নৌকা থেকে গুলি করে চরে গুঁড়ি মেরে বসে থাকা বাঘ শিকার) - এই তিনটি কাহিনী খুবই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তিনটিকেই আমি ৫/৫ দিব।
পচাব্দী গাজীর অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক ভারী। পঞ্চাশের বেশি বাঘ মেরেছেন, যার মাঝে বিশটিই ছিলো নরখাদক। যদিও অহেতুক নির্দোষ বাঘ হত্যার দায় তিনি এড়াতে পারেননা। পাকিস্তান আমলেই এসব অহেতুক হত্যাকান্ড বেশি হয়েছে, তখন বন্যপ্রাণী আইন ছিলোনা। যাই হোক, তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে অদ্ভুত কিছু তথ্য পেলাম, যেমন - বাঘের কান্না বা বিলাপ, বাঘের নাক ডেকে অঘোরে ঘুমানো, সুন্দরবনের মহিলাদের বাঘনখের অলংকার পড়ার অভ্যাস, বাঘের চামড়ার নিচের পুরু চর্বির উপস্থিতি ইত্যাদি। বাঘের ডাকের ভয়াবহ বিবরণ দিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায় - "দুনিয়াতে এর চাইতে ভয়াবহ কোনো ডাক থাকতে পারে না।"
বইটি বর্তমানে প্রিন্ট আউট এবং সেকারণে অত্যন্ত রেয়ার। আবার প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হোক - এটাই প্রত্যাশা।
এই বইটি আমি ২০১৪ এ ক্লাস 9 এ পড়ি তখন স্কুল থেকে সুধীজন পাঠাগার থেকে যাই, তখন এই বইটি গিফট পাই। কিন্তু তখন বই পড়া নিয়ে কোন আগ্রহ ছিল না আমার, তাই আমি তখন বইটি একটুও পড়িনি 😬 যাইহোক বইয়ের কথায় আসি।
মূলত এই বইটি হচ্ছে পচাব্দী গাজী যিনি একজন পেশায় শিকারি ছিলেন। তার শিকারির কিছু ঘটনা এখানে উল্লেখ করেছেন। এখানে মোট সাতটি ঘটনা বলা হয়েছে। সুন্দরবনের নানা রকম দিক, বিশেষ করে মানুষখেকো সম্পর্কে অনেক রকম তথ্য জানা যায়। সুন্দরবনের জেলে, কাঠুরি,দিনমজুরদের জীবন সংগ্রামের কথা এখানে খুব সুন্দরভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। মৃত্যুকে তারা সামনে রেখে জীবন সংগ্রামে প্রতিদিন কাজের সন্ধানে বের হয়। আর সেখানে কত কত মানুষ মানুষখেকোর সামনে পড়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়। কতটা অনিশ্চয়তায় কাটে তাদের জীবন, সেই জীবন সংগ্রামের কথাই এখানে লেখক খুব সুন্দর করে বর্ণনা করেন। এই বইটি মূলত সুন্দরবন কেন্দ্রিক। সুন্দরবন সম্পর্কে অনেক রকম তথ্য অজানা কথা আমরা জানতে পারবো এই বইটি দ্বারা।
হুমায়ুন খান এই ঘটনাগুলিকে লেখক এর অনুমতি নিয়ে কিছুটা সংশোধন করে প্রকাশ করেন।
শিকারকাহিনী মানেই অ্যাডভেঞ্চার আর সাহসিকতার দারুণ এক মিশেল। এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। সুন্দরবনের খ্যাতিমান পচাব্দী গাজীর শিকারের অভিজ্ঞতা বেশ লাগল পড়তে।
সত্যাসত্য মিশ্রিত শিকারকাহিনী অনেক পড়েছি। কিন্তু, পচাব্দী গাজী এই শিকারকাহিনীগুলোর কোনো তুলনা হয় না। আর এ শুধু নিছক শিকারকাহিনী নয়, সুন্দরবনের সন্তানরা অরণ্যকে কীভাবে চেনে, তার বর্ণনা পাওয়া যাবে প্রতি ছত্রে। খুব সাদামাটা ঢঙে বলা ঘটনাগুলো যুগপৎ স্নায়ুক্ষয়ী ও আনন্দদায়ক। সর্বোপরি একজন অসমসাহসী নোনামাটির সন্তানের সরল স্বীকারোক্তি। অনুলেখক হুমায়ুন খানও যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। কোথাও অতিরঞ্জন নেই, কৃত্রিমতা নেই। বইটি এখন দুর্লভ। এর একটা ইপাব সংস্করণ হওয়া জরুরী মনে করি।