মানুষ ভালো থেকে মন্দে এবং মন্দ থেকে ভালোয় রূপান্তরিত হয়। মানুষকে মন্দ করে তার লোভ, অন্য মানুষের প্রতি তার সহানুভূতির অভাব। একজন মানুষের লোভ যখন চরমে পৌছায়, অত্যাচারিত অন্য মানুষেরা তার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়, প্রতিবাদ করে। কালকেতু ও ফুল্লরা মানুষের এমনি লোভ, এমনি অধঃপতন ও এমনি প্রতিবাদের গল্প।
কাব্যের নায়ক নায়িকা কালকেতু ও ফুল্লরা। স্বর্গসুখে পরিতৃপ্ত নন দেবী, তিনি মর্ত্যে মনুষ্যলোকে তার পূজো চান। এমন একজনকে প্রয়োজন যে তার মাহাত্ম্য প্রচার করবে। শুরু হয় ষড়যন্ত্র। শিবের জন্য পূজোর ফুল তোলে নীলাম্বর। সেই ফুলে বিষ পিঁপড়ে ঢুকিয়ে দিয়ে নীলাম্বরের জন্য শিবের অভিশাপ আদায় করে দেবী। মর্ত্যে ব্যাধের ঘরে কালকেতু নামে জন্ম নেয় নীলাম্বর। দেবী কালকেতুকে ধন-সম্পদ দিয়ে নগর পত্তন করতে বলেন। কালকেতু নগর পত্তন করে দেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণে-মঙ্গলে প্রজাদের পালন করে।
কিন্তু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি কখনোই মানুষের জন্য মঙ্গলকর নয়। তাই এ উপন্যাসে আছে একজন ভিন্ন কালকেতুর সম্প্রসারণ। যে ক্ষমতা পেয়েই দেবীর মতো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিজের পূজো চায়। মনে করে এই নগর তার স্বর্গ, এই নগর তার স্বেচ্ছাচারের লীলাক্ষেত্র। এইসব স্বৈরাচারী কালকেতু ও ফুল্লরাদের কোনো কাল নেই, এদের সামনে থেকে মুছে যায় ভৌগোলিক সীমানা। এরা যে কোনো দেশের, যে কোনো কালের। এদের চরিত্র এক। ঐতিহ্যের পুনঃনির্মাণ সেলিনা হোসেন-এর উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য। তিনি অতীতকে দেখেন বর্তমানের দৃষ্টিতে। খুঁজে নেন শিল্পিত উপাদান যা উপন্যাসের মতো শিল্পকে এক থেকে বহুমাত্রায় বিন্যস্ত করে। কালকেতু ও ফুল্লরা উপন্যাসে আছে এই বিস্তৃতি।
Selina Hossain (Bangla: সেলিনা হোসেন) is a famous novelist in Bangladesh. She was honored with Bangla Academy Award in 1980. she was the director of Bangla Academy from 1997 to 2004.
সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৯৪৭) বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি এ অনার্স পাশ করলেন ১৯৬৭ সালে। এম এ পাশ করেন ১৯৬৮ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর গবেষণা সহকারী হিসেবে। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকুরি থেকে অবসর নেন।
গল্প ও উপন্যাসে সিদ্ধহস্ত। এ পর্যন্ত ৭টি গল্প সংকলন, ২০টি উপন্যাস, ৫টি শিশুতোষ গল্প, ৫টি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক (১৯৬৯); বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮০); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১); কমর মুশতরী স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৭); ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮); অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪)। তাঁর গল্প উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মেলে এবং কানাড়ী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
সেলিনা হোসেনের লেখনীতে একটা আলাদা টান আছে। সেই টানের জন্য পড়তে ভালো লাগে। মিথকে উপজীব্য করে লেখা মানব চরিত্রের চিরন্তন এই উপন্যাসে উন্মোচিত হয়েছে মানুষের অর্থ-ক্ষমতার লালসা, মানুষের অধঃপতন।
আমার পড়া সেলিনা হোসেনের লেখা প্রথম বই। ভাল লেগেছে এই জন্যে যে পৌরাণিক চরিত্র কে উপজীব্য করে লেখক রাজনীতি, সমাজ, মানব চরিত্রের অধপাতের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন পুংক্ষানুপুংক্ষভাবে। ক্ষমতালোভী মানুষের পরিনতি ন্যায্যতা পেয়েছে ( well justified ) । সমাজে অবস্থানরত এমন মানুষগুলো বাস্তবতা পেয়েছে, যারা চোখের সামনে থেকেও আড়ালে থেকে যায় আর মানুষের আশা আকাংক্ষাকে ঘুণে ধরার চিত্র ফুটে উঠেছে।
যেটা ভালো লাগেনি সেটা হলো, অতীতের পৌরাণিক চরিত্রকে অবলম্বন করে লেখক বর্তমানে পৌঁছাতে চাইলেও ধারাবাহিকতা কখনো কখনো হারিয়ে যাওয়ায় মনে হয়েছে, খেই হারিয়ে যাচ্ছে, যেমন, কলিংগ নগরীর কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ ঢাকা শহরে লেখক পৌঁছে গেছেন, আবার কখনো বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে... আবার চরিত্র গুলোর বয়স, পেশা এসবও খুব confused করেছে।
সবচাইতে যেই চরিত্রটি আমাকে কৌতুহলী করেছে সেটি হল মজিদ আর মজিদের পারিবারিক সম্পর্কের পতন, উত্থান, পতন! মজিদ চরিত্রটিকে এখানে ভিন্নমাত্রার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তথাপি আমার উদার কিন্তু দুর্বল ব্যক্তিত্ব বলে মনে হয়েছে। একদম শেষের দিকে মজিদের প্রতিক্রিয়া অবশেষে দেখা গেছে এছাড়া সমস্ত উপন্যাস জুড়ে নীরব পর্যবেক্ষনকারী, হতাশ, কিছুই করার নেই কিন্তু কিছু করার জন্য ভেতরে সর্বদা নিশপিশকারী (অথচ অনেক কিছুই করতে পারতো এবং করা উচিত ছিল) এমন একটি চরিত্র।
সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে, পাঠক হিসেবে আমার চিন্তার জগৎ কে বারবার নাড়িয়ে, সমাজের একজন নাগরিক হিসেবে সামাজিক, পারিবারিক সম্পর্ক, রাজনীতি সম্পর্কে ভাবিয়ে তুলতে পারাই লেখকের স্বার্থকতা ছিল বলেই মনে করি।
বইটা পড়তে গিয়ে মনে হলো, পুরনো কোনো লোককাহিনি নয়, যেন আজকের দিনের গল্প। সেলিনা হোসেন 'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যের কালকেতু আর ফুল্লরাকে নিয়ে যে উপন্যাস লিখেছেন, সেটা কেবল ইতিহাস নয়, আমাদের চারপাশের সমাজ-রাজনীতির এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
কালকেতু একজন সাধারণ ব্যাধের ছেলে, দেবীর আশীর্বাদে নগর পত্তন করে। শুরুতে সব ভালোই চলছিল, কিন্তু ক্ষমতা পেয়ে সে নিজেকে দেবতার মতো ভাবতে শুরু করে। ফুল্লরা তার স্ত্রী, যার হাসিতে প্রাণ নেই। সৌন্দর্যচর্চায় ব্যস্ত, কিন্তু ভিতরে ফাঁকা। এই চরিত্রগুলো যেন আমাদের চারপাশের কিছু চেনা মুখ।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল কীভাবে পুরাণের গল্পের ছায়ায় লেখক বর্তমানের রাজনীতি, ক্ষমতার লোভ, সাধারণ মানুষের দুর্দশা তুলে ধরেছেন। মনে হলো এই নগর তো আমাদেরই শহর, এই কালকেতু তো আমাদেরই শাসক।