খ্রিস্টজন্মেরও সহস্রাধিক বৎসর আগের প্রাচীন পৃথিবীর এক নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এই উপাখ্যানের পটভূমি। বাঁকা চাঁদের মতো সেই ভূখণ্ডের উত্তরে কৃষ্ণসাগর ...... অনন্যস্বাদ এই কাহিনীর পটভূমি যেমন অভিনব, গঠনেও তেমনি মিশেছে পুরাণ, উপকথা, কিংবদন্তী বা লোককল্পনার বিভিন্ন উপাদান। কিন্তু একই সঙ্গে কোথায় যেন সমকালীন ভারত তার যাবতীয় সমস্যা নিয়ে জ্বলন্ত।
আবুল বাশারের জন্ম ১৯৫১ খ্রীস্টাব্দে। ছয় বছর বয়সে সপরিবার গ্রাম তাগ। মুর্শিদাবাদের লালবাগ মহকুমার টেকা গ্রামে বসবাস শুরু। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যের স্নাতক। হিন্দিভাষা-সাহিত্যেরও ডিপ্লোমা। গ্রামের স্কুলে ১০-১২ বছর চাকুরি। কাজ করেছেন সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায়। দারিদ্র্যের চাপ আর সামাজিক বিষমতা ও পীড়ন কৈশোরেই লেখালেখিতে প্ররোচিত। উত্তীর্ণকৈশোরে, ১৯৭১ সালে, প্রথমে কবিতাগ্রন্থের প্রকাশ। নাম : ‘জড় উপড়ানো ডালাপা ভাঙা আর এক ঋতু’। পরবর্তী এক দশক লেখালেখি বন্ধ। জড়িয়ে পড়েন সক্রিয় রাজনীতিতে। বহরমপুরের ‘রৌরব’ পত্রিকাগোষ্ঠীর প্রেরণায় লেখালেখিতে প্রত্যাবর্তন। কবিতা ছেড়ে এবার গল্পে। প্রথম মুদ্রিত গল্প ‘মাটি ছেড়ে যায়’। ‘ফুলবউ’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ১৩৯৪ সালের আনন্দ-পুরস্কার।
প্রাচীন মিশরের পৌরণিক কাহিনির জটিল বাতাবরণে পুরো উপন্যাস। রিবিকা, সায়গন, লোটা এবং হেরা এই উপন্যাসের প্রভাব বিস্তারকারী চরিত্র।
রিবিকা নামের সেবাদাসীটির গোত্রের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। পালিয়ে এসেছে মেয়েটি৷ তাকে উদ্ধার করে ভাড়াটে যোদ্ধা সায়গন। এরপরেই কাহিনি প্যাঁচালো হতে থাকে। মরুভূমির গোত্রে গোত্রে বিবাদ, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। কখনো আধিপত্য নিয়ে। কখনো স্রেফ নারী কিংবা খাদ্য নিয়ে। লোটা চরিত্রটি অন্যের শব বহন করে। সাত চড়ে রা করে না। অথচ রিবিকাকে ভালোবেসে, সেই হত্যা করে রাজা হিতিনকে। লোটা নিজেও হারিয়ে যায়।
ভাষার পার্থক্য, গোত্রের আধিপত্য, ক্ষুধা, প্রেম আর দারিদ্র্যতাকে উপজীব্য করে প্রাচীন মিশরের পৌরণিক বিভিন্ন ঘটনাই 'মরুস্বর্গ'।
লেখক লেখেন পাঠকের জন্য। কিন্তু লেখা পড়ে পাঠক বুঝতে না পারলে ব্যর্থ হন লেখক। 'মরুস্বর্গ' উপন্যাসটির কাহিনি এতবেশি জটিল এবং পরম্পরাহীন যে পড়তে গিয়ে ন্যূনতম আনন্দ পাইনি। বুঝিনি ঘটনার অদল-বদল। হতে পারে 'ফুল বউ'এর লেখক আবুল বাশারের 'মরুস্বর্গ' আমার মতো পাঠকের জন্য নয়। উচ্চমার্গের লোকদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন বইটি। আসলেই উপন্যাসটি উচ্চমাপের পাঠকদের জন্য রচিত। কারণ 'দেশ' পত্রিকায় আবুল বাশারের সাক্ষাৎকারে জানলাম, বইটি এমএ ক্লাসে পাঠ্য।
"ফুলবউ বাদ দিয়ে অন্য একটা উপন্যাসের নাম বলুন, যেটা না পড়লে আবুল বাশার পড়া বৃথা। আবুল বাশারঃ মরুস্বর্গ।" পুরাণ মিশ্রিত উপন্যাসটির প্রতিটি চরিত্র যেন প্রাচীন নগর সভ্যতার বিলুপ্ত ইতিহাস,ধর্মের দ্বন্দ্বের সাক্ষী।ব্যতিক্রম শক্তিশালী লেখনী।