যারা স্কুলগামী কিংবা বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েছেন বহুকাল আগে, যারা বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থী কিংবা স্থিত হয়েছেন পেশাগত জীবনে, তাদের সবার অন্তরে গাঁথা রয় স্কুলজীবনের স্মৃতি। কৈশোরের স্মৃতিবহুল স্কুল-দিনের কথা বলবার জন্য সাহিত্য প্রকাশের আহ্বানে সাড়া পাওয়া যায় অভূতপূর্ব। দশজন বিশিষ্টজনের স্মৃতিভাষ্য নিয়ে একে একে প্রকাশ পেয়েছে 'আমার স্কুল' সিরিজের দশটি বই। শিল্পী রফিকুন্ নবী প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন সিরিজের কতক গ্রন্থের। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি যেন আবারও ফিরে গেল আপন স্কুল-জীবনে, লিখে ফেললেন দীর্ঘ স্মৃতিভাষ্য, আঁকলেনও অনন্য সব ছবি। কথা আর ছবি মিলিয়ে নিজের স্কুল জীবনের ভাষ্য এই ব্যতিক্রমী বইটি।
Rafiqun Nabi (Bengali: রফিকুন নবী; also Ranabi) is a Bangladeshi artist and cartoonist. Nabi's most famous creation is Tokai, a character symbolizing the poor street boys of Dhaka who lives on picking things from dustbins or begging and having a knack of telling simple yet painful truths about current political and socio-economic situation of the country. He has written some story in magazine of Prothom Alo the most popular daily newspaper of Bangladesh
নামে স্কুল শব্দটা থাকলেও বইটা মূলত রফিকুন নবীর পুরো শৈশবের গল্প। বাবা নীতিবান দারোগা, তার চাকরির সুবাদে ঘুরতে হয়েছে দেশের সর্বত্র। শেষ পর্যন্ত থিতু হয়েছেন পগোজ স্কুলে। দারোগাবাড়ির সন্তান হওয়ায় সুবিধা পেতেন অনেক। আবার দারিদ্র্যও ছিলো নিত্যসঙ্গী। ছোট ছোট অনেক ঘটনা আছে বইতে। যেমন- শিশুসুলভ বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে বারবার হাত পা ভাঙতেন লেখক। ছিলেন অংকে কাঁচা, সেটাই তার চিত্রশিল্পী হওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে! অংকে ভালো হলেই নাকি ঢুকিয়ে দেওয়া হতো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। সাপে কাটলে ওঝাদের দিয়ে বিষ নামাতে দেখেছেন ( পরে বোঝা গেলো যে আদতে সাপ নয়, অন্য কিছু কামড়েছিলো।) নৌকার তলা ফুটো হয়ে যাওয়ায় তার পরিবার পিনিস বা বজরায় রাত কাটানোর অনেক পর জানতে পারেন যে পিনিসের লোকজনই নৌকা ফুটো করেছিলো, যাতে তারা পিনিসে থাকতে বাধ্য হন। পঞ্চাশের দশকের ঢাকার পরিবেশ, রফিকুন নবীর স্কুলের আদর্শবাদী শিক্ষক ও সার্বিক ইতিবাচক পরিমণ্ডলের কথা পড়তেও ভালো লাগে।
১. এবারের বই মেলায় সাহিত্য প্রকাশের স্টলে যাওয়া পড়েছে বেশ কয়েকবার। তার মাঝে শেষবার সাথে ছিল এক ছোটবোন। বেশ ছোটই। আমার এবং বইপড়ুয়া গ্রুপের আরও অনেকের রিভিউ দেখে দেখে মাহমুদুল হকের জন্য আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করেছে এবং দুই একখানা বই পড়েও ফেলছে ঠিকই কিন্তু বুঝে উঠতে পারে নাই। তার নানা দুর্বোধ্যতা নিয়ে আমাকে প্রশ্নে জর্জরিত করে। যাই হোক, আমি তাকে বলেছি, তাকে আরও কয়েকটি বছর অন্তত পার করতে হবে মাহমুদুল হককে বুঝতে হলে, এখন পড়ে চমক নষ্ট না করাই শ্রেয়। তবে সে সাহিত্য প্রকাশের স্টলে গিয়ে যে কর্নারে মাহমুদুল হক রাখা সেখানেই ঘুরঘুর করে, আমি তাকিয়ে আছি তাই কিনতেও সাহস করে না। তাই কী আর করার। আমি স্বেচ্ছায় ডিস্ট্রাক্টেড হয়ে যাই। সাহিত্য প্রকাশের স্টলের একদিকে ওকে রেখে বাকি তিনদিন ঘুরে দেখতে থাকি।
সেই ঘোরাঘুরির আবিষ্কার হলও 'আমার স্কুল' সিরিজ। সকলের চেনা-জানা দশজন মানুষ তাদের শৈশব স্কুলের স্মৃতি তুলে এনেছেন পাঠকের সামনে। পেপারব্যক বাইন্ডিংয়ে পুরো সিরিজটি অলংকরণ এবং প্রচ্ছদের কাজ করেছেন রনবী, তাঁর নিজের স্কুল নিয়েও একটি বই রয়েছে।
২. আমার বাবার পুরোনো একটা ব্যবসায়ে পত্রিকা অফিসের সাথে বেশ যোগাযোগ করতে হতো। সেই সুবাদে আমার শৈশবে বাসায় পত্রিকা আসতো সাত-আটখানা, সবই সৌজন্য সংখ্যা। তার মাঝে কোনও একটা পত্রিকার, জনকণ্ঠ হবার সম্ভাবনা বেশি, প্রথম পাতায় প্রায়ই উপস্থিত থাকতো টোকাই নামে একটি চরিত্র। মাত্র এক প্যানেলের কার্টুন। তবে টোকাই যে শুধু পত্রিকার পাতায়ই থাকতো তা নয়, আমাদের বাসার গলিতেও তিনজন টোকাই প্রায় ঘুরঘুর করতো। তিনজন তিন সাইজের ছিল। ছোটজনের সাথে রনবীর টোকাইয়ের ছিল আশ্চর্য মিল। তাই আমার ধারণা হয়ে গিয়েছিল জানালা দিয়ে তাকালে যে বিল্ডিংগুলো দেখতে পাই তার মাঝে কোথাও হয়তো থাকেন রনবী।আমার যখন কিছু করার থাকে না তখন আমি রাস্তার আরও অনেক লোকজনদের সাথে টোকাইদের কাজকর্ম দেখি, তিনিও হয়তো দেখেন।
খুব সম্ভবত রনবীর কাল্পনিক প্রতিবেশীত্ব থেকে যে নৈকট্যবোধ জন্মেছিল এতবছর পরেও সেটি কাজ করেছিল দশখানা বই থেকে একখানা বই বাছাই করার সময়।
৩. আমি খুবই বায়াসড ধরণের মানুষ। কিছু বই শুরু করার আগেই মনে মনে তাকে সম্পূর্ণ পছন্দ করে বসি, গুডরিডসীয় ভাষায় পাঁচ তারা পরিমাণ। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি নিতান্তই মস্তিষ্ক খুলে ফ্রিজে রেখে এসে পড়তে বসি না বলে রেটিং সেখান থেকে কখনো সখনো কমে আসে। বইটির নানা বিষয়বস্তুর প্রতি আমার ব্যক্তিগত বায়াস রয়েছে, যেমন- শিশুতোষ বই আমার প্রিয়, শৈশবের স্মৃতিচারণ পড়তে বড় ভাল লাগে, বইতে ছবি থাকলে তো সোনায় সোহাগা, এর উপর আবার রনবীর প্রতি প্রতিবেশী সুলভ নৈকট্যবোধ রয়েছে যার উৎস আবার আমার নিজের শৈশবে প্রথিত। ভাল না লাগার কোনো কারণ দূর-দূরান্তেও দেখা যাচ্ছিল না। সেখান থেকে দুটো তারা কমে যাবার পিছের কারণগুলো বলা দরকারঃ
- বইটির কিছু কিছু বিষয়বস্তু বেশ পুনরাবৃত্তিমূলক। একই কথা বা পটভূমি বারবার বলবার কারণ হয়তো কোন জায়গায় এগুলো একবার করে বলেই কাজ হবে তা লেখক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। - 'আমার স্কুল' শিরোনামের বইটিতে স্কুলের বা স্কুল সংক্রান্ত স্মৃতিচারণের থেকে স্কুল পড়ুয়া বালকের জীবনে ঘটে যাওয়া আরও অন্যান্য ঘটনা অনেক বেশি জায়গা দখল করেছে। স্কুল খুঁজতে খুঁজতে আমার মনে হয়েছে 'আমার শৈশব-কৈশোর' নামক বইয়ের জন্য এই পাণ্ডুলিপিটি বেশি মানানসই হতো। - লেখক অসংখ্যবার বাক্যের শুরুতে 'তো' ব্যবহার করেছেন, কখনও কখনও তা বেজায় বিরক্তির কারণ হয়েছে। লেখক নাহয় নিজের মুদ্রাদোষ লেখায় নিয়ে এসেছিলেন, এডিটরেরা কী করলেন জাতীয় চিন্তা প্রায় প্রতিটি 'তো'র সাথে মাথায় এসেছে। - পুরো সিরিজটির ছবি রনবী এঁকেছেন কিন্তু নিজের বইয়ের ছবি আঁকতে গিয়ে তিনি কার্পণ্য করলেন কেন বুঝি নি। প্রথম দিককার কন্টেন্টের ছবি বেশি, শেষের দিকে কম। কিন্তু বইজুড়ে সমান ভাবে ছবিগুলোকে ডিস্ট্রিবিউট করতে গিয়ে ধীরে ধীরে কন্টেন্ট এবং ছবির সাথে জায়গার দূরত্ব ক্রমাগত বেড়েই চলছিল। ছবিগুলো তখন আনন্দ না দিয়ে মিসপ্লেসিং সংক্রান্ত অস্বস্তির উদ্রেক ঘটাচ্ছিল।
এগুলো কোনটিই হয়তো খুব বড় দোষ না, কিন্তু সবগুলো মিলেমিশে বইটির 'কমপ্যাক্টনেস' বেশ ভাল পরিমাণে নষ্ট করেছে।
তবুও বইয়ের পাতার মাধ্যমে পকেটে জোনাকী নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বালকের শৈশবে খানিকটা ঢুঁ মেরে আসার সুযোগ, যিনি কিনা বড় হয়ে লেখক হননি, সেটা নিতান্তই ফেলনা নয়।