দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশনা জগতের প্রচলিত কথা যে গল্পের বই বিক্রি হয় কম। খুবই কম। ছোটগল্পে পাঠকের আগ্রহ তেমন নেই। পাঠকের আগ্রহের বই উপন্যাস। আমি ব্যক্তিগতভাবে গল্পকে এত অচ্ছ্যুৎ ভাবতে রাজি না। আমার এই গল্পগ্রন্থে মোট ষোলটি গল্প আছে। তার মধ্যে চারটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে। যেমন ফরাসি, জাপানি, কোরিয়ান, ফিনিস, উর্দু, হিন্দি, মালায়ালাম, রুশ, কন্নড়, মারাঠি ইত্যাদি। দিল্লি এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলনে আমার বেশকিছু গল্প প্রকাশিত হয়েছে। গল্পই দেশের বাইরের পাঠকের কাছে যাবার সুযোগ পেয়েছে। গল্পকে সাহিত্যের ভুবনে যোগাযোগের মাধ্যম বলা যায় অনায়াসে। কারণ গল্পের অনুবাদ শ্রমসাপেক্ষ নয়। সময়ও কম দাবী করে। সুতরাং শিল্প-সাহিত্যের সৃজনশীল যাত্রার গল্পের শক্তিকে আমাদের এই পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। শেষ কথা পাঠকই বলবেন।
Selina Hossain (Bangla: সেলিনা হোসেন) is a famous novelist in Bangladesh. She was honored with Bangla Academy Award in 1980. she was the director of Bangla Academy from 1997 to 2004.
সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৯৪৭) বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি এ অনার্স পাশ করলেন ১৯৬৭ সালে। এম এ পাশ করেন ১৯৬৮ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর গবেষণা সহকারী হিসেবে। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকুরি থেকে অবসর নেন।
গল্প ও উপন্যাসে সিদ্ধহস্ত। এ পর্যন্ত ৭টি গল্প সংকলন, ২০টি উপন্যাস, ৫টি শিশুতোষ গল্প, ৫টি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক (১৯৬৯); বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮০); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১); কমর মুশতরী স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৭); ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮); অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪)। তাঁর গল্প উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মেলে এবং কানাড়ী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
এ বইয়ে মোট ষোলটি ছোটো গল্প আছে। সেলিনা হোসেনের ছোটো গল্প খুব একটা পড়িনি। আমি ওঁর উপন্যাস আর প্রবন্ধ পছন্দ করি। সেই ভালোলাগা থেকেই 'অণূঢ়া পূর্ণিমা'র ই -সংস্করণ সংগ্রহ করা। কিন্তু খুব দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এ বইয়ের শিরোনামটি যতটা চমৎকার লেগেছিল, গল্পগুলো সেভাবে চমৎকৃত করেনি। পাঠক হিসেবে এখানে আমার নিজেরও কিছুটা দায় আছে। নানান কাজ আর একসাথে অনেকগুলো বইয়ের তোড়টা ঠিক মত সামাল দেয়া যায়নি। তবে এতসবের ভেতরেও বইটির বেশ কিছু গল্পে কেমন একটা তাড়াহুড়োর ভাব চোখে লেগেছে(আমার চোখ ভয়াবহ রকমের খ্রাপ)। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্পটার কথা বলবো, যেটি এই বইয়ের প্রথম গল্প 'দু'রকম যুদ্ধ'। এটি আরো পরিণত হতে পারতো। সেলিনা হোসেন অবশ্যই সেরকম লিখবার ক্ষমতা রাখেন। এ বইয়ের কিছু গল্প নানা ভাষায় অনুদূতও হয়েছে। যাইহোক কিছুমিছু গল্প বলে নেয়া যাক এই ফাঁকে......
গল্প নং ১: দু'রকম যুদ্ধ: ______________________ নূরজাহান এ গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্র। যে নিজেকে সোনাভান ভাবতে পছন্দ করে। সেই সোনাভান অর্থাৎ নূরজাহান বাবার আদেশ অমান্য করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যুদ্ধে চলে যায়। নিজাম মাস্টারের ক্যাম্পে ট্রেনিং শেষ করে পাকবাহিনীর ক্যাম্প রেকি করতে গিয়ে ধরা পড়ে সে আর সঙ্গী আবু বকর। দূরের জোয়ান অব আর্ক যেন দেশীয় মিথ ফুঁড়ে নূরজাহানের উপর ভর করে। অসীম সাহসে যে দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে। তার যুদ্ধক্ষেত্র একটি নয় দুটি। একটা তার নিজের শরীর, অন্যটি জন্মভূমির পুণ্যমাটি।
গল্প নং ২ : বাড়ি ফেরা _______________________ খেটে খাওয়া মানুষ আছিরুদ্দীন। পায়ের চোটজনিত আঘাতটিকে সেরকম গুরুত্ব দেবার ফুরসত না পাওয়ায় এক সময় সেটি মারাত্মক আকার নেয়। ব্র্যাক স্কুল পড়ুয়া আঠারো বছর বয়সী বড় মেয়ে মেঘনা বাবাকে নিয়ে থানা সদরে গিলে ডাক্তার তাদের আশঙ্কায় নিশ্চিত বিপদের সীলমোহর দিয়ে দেয়। সামনে অনাগত অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিপন্নবোধ করতে করতে মানুষ আছিরুদ্দীন ছাগল, গরু, কুকুর, বিড়ালে বদলে বদলে যায় আচরণে। তারপরও সে তার অবস্হান নিয়ে আহাজারি করবার জোরটুকু পায় না। গরিবদের আক্কেল খোয়ালে ওটুকুও খোয়া যায় যে! তাই দেখি তেজি, বুদ্ধিমতি মেয়ে মেঘনাও যখন বাসস্টপে চার মাস্তানের দ্বারা ধর্ষিতা হয় তারপর তারও আচরণগত রূপান্তর ঘটে বাবার মত। নিরুপায় মানুষদের জীবনধারণের নিঃশব্দ রূপান্তরের বিষয়টা নিদারুণভাবে ফুটিয়ে তুলতেছেন সেলিনা হোসেন। বাবার ডাকে মেঘনার রূপান্তরিত ব্যা ব্যা, হাম্বা হাম্বা, ঘেউ ঘেউ, মিঁউ মিঁউ। এখানেই গল্পের ইতি ঘটলে চমৎকার হতো।
গল্প নং ৩: পাখি ধরা ________________________
দু'জন সাংবাদিক সহকর্মী ও বাল্যবন্ধু বন্ধু মুহিব তুহিন পাঁচ বছরের শিশু হাতিয়ার ধর্ষণ ঘটনার নেপথ্য সূত্র ধরার জন্য ধনুসার গাঁয়ে আসে। যেখানে ধর্ষণ ঘটে সেই আদালত প্রাঙ্গণে সেসময়ে কর্তব্যরত পুলিশ ছাড়া আর কেউ থাকার কথা না। কিন্তু অপরাধের দোষ চাপে আদালত প্রাঙ্গণের কলা বিক্রেতা তরিকুলের উপর। যার বাস ধনুসার গাঁয়ে। সাংবাদিক কর্মী দু'জনের ধারণামতে এই কুকর্মের হোতা খোদ পুলিশ নিজেই। কারণ আসামী হিসেবে গ্রাম থেকে বেঁধে আনা ক্রন্দনরত লোকটির 'ওই তারিখে আমি গাঁয়ে ছেলাম।' আহাজারি অন্যদের কর্ণগোচর না হলেও এই দু'বন্ধুর তাতে আস্হা জাগে। ওদের ধারণা, ' নিজেদের চামড়া বাঁচাবার জন্য ওকে পুলিশের দরকার।' এই সত্যতা সারেজমিনে যাচাইয়ের জন্য তাদের গ্রামে আসা। ধনুসা গাঁয়ে এসে স্হানীয় কিছু মানুষের সাথে কথা বলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, গ্রামটিতে ফতোয়াবাজ এবং পুলিশ ইচ্ছামত যাকে খুশি বলির পাঠা বানায়, এবং এই অনাচারের মুখে গ্রাম্যমানুষগুলো প্রতিবাদহীন, নির্বিকার। ফলে, পুলিশ নিজের চামড়া বাঁচাতে নিরীহ লোক ধরে, যে কারো ঘরে বা কোনো নারীর চলনে তুষ্ট না থাকলেই ইচ্ছামত ফোতয়া দিয়ে আগুন লাগানো হয়। শিকারী যেমন পাখি শিকার করে, গ্রামে এ দুই নিপীড়ক দ্বারা সেভাবেই মানুষ শিকার চলে, পাখিদের মত।
গল্প নং ৪: বদলে যাওয়া ______________________ ভজহরি, চিশ্চিন্দপুর চা বাগানের ম্যানেজারের বাবুর্চি। যে মনে মনে ফেলে আসা জীবন, মৃতবাবা -মা-ভাই, বিশেষ করে তার রাজকন্যার শোকে অধিকাংশ সময়ই বিষন্ন থাকে। বাগানের শ্রমিকদের আনন্দ উৎসবে বাজতে থাকা ঢোল ওর কানে আসলেও সেটা বুকে সেভাবে বোল ফুটাতে পারে না। বিষন্নতায় এমনই আচ্ছন্ন থাকে সে। চা বাগানের ম্যানেজাবাবু ঢাকা থেকে খবর নিয়ে আসেন দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ আসন্ন। একথা শোনা মাত্র বিষন্নতার পালক খসে যায় ভজহরির মন থেকে। তার বুকে যুদ্ধ নামের অপার আহ্বান ঢোলের আনন্দে বাজতে থাকে। সে আর বিষন্ন থাকে না। মুক্তির জন্য যুদ্ধ, দেশকে স্বাধীন করবার জন্য যুদ্ধে যাবার ব্যাকুলতায় লক্ষ কোটি সাধারণ মানুষের মত নিশ্চিন্দপুরের ভজহরিও বদলে যায়। তার আর কোনো দুঃখই থাকে না।
শিরোনামের গল্প/ অণূঢ়া পূর্ণিমা : সুন্দরবনের দুবলারচরে রাস মেলা দেখতে এসে ছেলেটির সাথে পরিচয় হয় মেয়েটির। যার কথার তীর মেয়েটির ভেতর বাড়িতে আঘাত হানে। মুগ্ধতায় একেবারে যা তা অবস্হা বালিকার! এর আগে সে কোনো পুরুষের এতটা কাছে আসেনি, কথার জাদুতে ভাসেনি। যার ফলে যা হবার তাই হয়, ব্যাপক তোলপাড়ে কন্যা কুপোকাত! মেয়েটির নাম লীলা। বাবা আদর করে ডাকতেন লীলাছন্দ আর মা ডাকেন লীলাময়ী বলে। ছেলেটি পেশায় সাংবাদিক। আর মেয়েটি নিজের 'শরীর বেচে ভগবানের সৃষ্ট জীবের জন্য আহার জোটায়' হৈমন্তীর প্রথম অণূঢ়া পূর্ণিমা রাতে ওরা বড়বেশি কাছে আসে একে অন্যের। মেয়েটির একান্ত চাওয়া পয়সার বিনিময়ে দূরাগত অতিথিরা নয় তার পার্থিব জগতের ভগবান হোক ছেলেটি। সমাজ, সংস্কার, সস্তা ইগো ছেড়ে ছেলেটি কি পারে মেয়েটির চাওয়াকে পাওয়ায় রূপ দিতে? জানতে হলে পড়তে হবে বাহে!