অন্য এক ভুবনের গল্প বলে বইটি। স্বদেশি আন্দোলনের একজন হয়ে রানী চন্দকে কারাবরণ করতে হয়। কাহিনির সূত্রপাত ১৯৪২ আগস্ট মাসের দিকে। প্রথমদিকে তাঁকে শিউড়ি জেলের জেনানা ফাটকে নেয়া হয়। পরে কিছু বন্দীদের সাথে রাজশাহী জেলে স্হানান্তরিত করা হয়। এই দুই জেলবাসের অভিজ্ঞতাই রানী চন্দ বর্ণনা করেছেন এখানে, বর্ণনার ভঙ্গীটি বেশ নির্লিপ্ত। যা পড়ে বিস্ময় যেমন জাগে, কষ্টে মন আহাও বলে ওঠে সময়ে সময়ে। একদিকে জেল জমাদারনীর মাত্রাছাড়া কর্কশ ব্যবহার, অন্যদিকে জেলসহচরীদের 'মিলেমিশে থাকি মোরা আত্মীয় সম' পরিস্হিতিতে স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী রানীসহ বিহারবাসিনী ভাবী, বাঙ্গালিনী-তেজস্বী মায়া, শান্তি, এলা, মমতা, নন্দিতা, ভবানীরা অন্যান্য সাধারণ অপরাধী থেকে শুরু করে খুনের সাথে জড়িত আসামীদের সাথে কেমন দিব্যি দিন পার করে যান। সময়টা বৃটিশরাজের, উপমহাদেশীয় চাটুকার শ্রেণী নানাভাবে একদিকে যেমন বৃটিশদের তোষামোদে ব্যস্ত, অন্যদিকে সেই শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে জমাট হওয়া ক্ষোভ সময়ে সময়ে বিস্ফোরিত হচ্ছে এখানে, ওখানে। জেলের জীবন নানা বিচিত্র জগতের গল্পে ঠাঁসা। সেখানে ক্ষিদের যন্ত্রণা সইতে না পারা মহাজনের চালের গাড়ি লুট করা হাভাতে মুচি নারীরা যেমন আছে। আছে উদ্ভট গালগল্পে সমৃদ্ধ বিশিষ্ট চাপাবাজ(আমার মতে) রূপজানবিবি, যে কিনা খুনের আসামী এবং তার স্হির বিশ্বাস পাপের মাশুল হিসেবে মুসলমান ঘরে তার পূর্ণজন্ম ঘটেছে। আগের জন্মে ইনি বাহ্মনকন্যাটি ছিলেন। এ বইটি পড়তে গিয়ে যে বিষয়টি আমাকে সবচে' বেশি অবাক করেছে সেটি হচ্ছে সেসময়কার সামাজিক ব্যবস্হায় খুনের বিষয়টিকে 'পিস অফ কেক' হিসেবে নেয়া।
আমাদের অনেকেরই ধারণা আগের দিনের মানুষেরা ব্যাপক শান্তিপূর্ণভাবে জীবন কাটাতেন। সেসময়কার জীবন আজকের মত এতটা জটিলতায় ভরপুর ছিল না। যেকারণে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় তখন মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতাটাও কম ছিল। কিন্তু জেনানা ফাটকে খুনের দায়ে আসা নারীর সংখ্যা এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে যেন। হ্যাঁ এটা ঠিক, এইসব খুনের আসামীদের সবাই সত্যিকারভাবে অপরাধী নন। 'উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে' নেয়া গোলাপরানী, সরলা যেমন আছে, তার পাশাপাশি আছে খুনের বীভৎস কাহিনি অবলীলায় বলে যাওয়া মিছিরন, সৈয়দা, সুরাতন, জামিনা সহ আরো অনেকে। সামাজিক অবক্ষয়ের এইদিকটা নিয়ে সেভাবে কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা জানা নেই। হয়ে থাকলে আজকের অস্হির সময়ের সাথে পুরোনো দিনের সামাজিক অবক্ষয়ের তুলনামূলক রেখাচিত্রে কতটা আকাশ পাতাল তফাৎ সেটা জানার আগ্রহ আছে।
মানুষের মন ভারী অদ্ভুত। মুক্ত জীবনকে যখন বন্দীখানার চার দেয়ালে আটকে ফেলা হয় তখন সে বাইরে রোদ, রূপালী চাঁদ, খোলা প্রান্তরের জন্য কেমন হাহাকার করে। কিন্তু কিছুদিন জেল জীবনে থেকে মনটা সেখানেও কেমন স্হিতু হয়ে যায়। তাই মুক্ত জীবনে ফিরে যাবার সময় পেছনে পড়ে থাকা সামান্য সামান্য জিনিস, একটা পাখির পালক, ছেঁড়া গামছা আর অন্ধকার ঘরের সহবন্দীদের জন্য মন কেমনের বাঁশি বিষন্ন সুর তুলে। বিদায় বেলায় রানীর বুকেও বেজে ওঠে সেরকম সুর। কিন্তু বাস্তবতা তাঁকে জানান দিয়ে যায় "চিহ্ন যত এমনি করেই ধুয়ে মুছে যায়। নয়ত চলে না। এ বেদনা যত সত্য- তত নিষ্ঠুর।" আলাপ, সঞ্চারী এবং অন্তরা এই তিন অধ্যায়ে লেখিত "জেনানা ফাটক" বইটি অন্য এক রানী চন্দের সাথে পরিচয় করায়। ভূরিপ্রসু রানী চন্দের অন্যরূপগুলো দেখবার আগ্রহ জেগে রইল তাঁকে আরো পাঠের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।