এই বইতে সংকলিত হয়েছে শাহাদুজ্জামানের অনূদিত পাঁচজন প্রখ্যাত লেখকের গল্প। লেখকদের মধ্যে রয়েছেন—
হারুকি মুরাকামি: সাম্প্রতিক জাপানি সাহিত্যের আলচিত লেখক, জন্ম ১৯৪৫। অনূদিত গল্পটি তাঁর গল্পসমগ্র ‘ব্লাইন্ড উইলো, স্লিপিং ওম্যান’ বইয়ের নাম গল্প।
আবেলারদো কাস্তি লো: আর্জেন্টিনার লেখক, জন্ম ১৯৩৫। অনূদিত গল্পটি তাঁর ‘দি আদার ডোর’ বইটি থেকে নেওয়া।
মিলান কুন্ডেরা: চেক লেখক, জন্ম ১৯২৯। বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাস করেন। অনূদিত গল্পটি তাঁর ‘দি লাফেবল লাভস’ বইটিতে অন্তর্ভুক্ত।
ওক্টাভিও পাজ: ম্যাক্সিকান লেখক, জন্ম ১৯১৪। ১৯৯০ সালে নোবেল পুরষ্কার পান। অনূদিত গল্পটি তাঁর ‘ঈগল অর সান’ বইটিতে অন্তর্ভুক্ত।
ওরহান পামুক: তুরস্কের লেখক, জন্ম ১৯৫২। ২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পান। অনূদিত গল্পটি তাঁর ‘আদার কালার: রাইটিংস অন আর্টস, বুকস এন্ড সিটিস’ বইটি থেকে নেয়া।
Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন এবং অন্যান্য অনুবাদ গল্প
বইটিতে সংকলিত হয়েছে শাহাদুজ্জামানের অনূদিত পাঁচজন প্রখ্যাত লেখকের গল্প— জাপানের হারুকি মুরাকামির গল্পসমগ্র "ব্লাইন্ড উইলো, স্লিপিং ওম্যান" বইয়ের নাম গল্প, আর্জেন্টিনার আবেলারদো কাস্তি লো, চেকের মিলান কুন্ডেরা, ম্যাক্সিকোর ওক্টাভিও পাজ এবং তুরস্কের ওরহান পামুকের গল্পগুচ্ছ।
অনুবাদ পড়তে ভালো লাগে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আশাহত হতে হয়, মূল লেখনীর ছন্দ ধরতে বেগ পেতে হয়, লেখার "In between the lines" অনুবাদে হারিয়ে যায়। তবে এই বইটা ভালোই লেগেছে।
যার ছোটগল্পগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়েছি তাকে অনুবাদক হিসেবে যাচাই করতে পড়ে ফেললাম "ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন এবং অন্যান্য অনুবাদ গল্প"।
বইয়ের বেশিরভাগ গল্পই পড়া হয়েছে আগে। যার জন্য বুঝতেও সহজ হয়েছে অনুবাদটা কি সরল নাকি মন্দ! আমার কাছে মনে হয়েছে বেশ ভালো। ক্লিশে ভাবটা নেই। তবে ভালোর তো শেষ নেই, আরেকটু সুইফটনেস থাকলে আরো ভালো হতো!
বলে রাখি-যে ছ'টা গল্প আছে চেষ্টা করবেন সব গল্পগুলোই তার নিজস্ব ভাষায় পড়ার। অনুবাদের কারণে অনেক এলিমেন্টস না চাইতেও বাদ পড়ে যায়।
মোট ৬ টি অনুবাদ গল্প আছে বইটিতে। ওগুলোর মধ্যে একটি গল্প নিয়ে আমি কিছু বলব। গল্পটির নাম "এডোয়ার্ড এবং ঈশ্বর"। লেখক মিলান কুন্ডেরা।
এই গল্পটির সাথে সেই সময়ের (১৯৬০-৭০) রাজনৈতিক আবাহের আছে গভীর সংযোগ। জোসেফ স্ট্যালিনের মৃত্যুর কয়েক বছর পর এই গল্পের সময়কাল। ততদিনে স্ট্যালিনের গুলাগ গনহত্যা পৃথিবীর কাছে প্রকাশিত এবং ঘৃণিত। ফলশ্রুতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোর কমিউনিষ্টদের স্বপ্নে দেখা দিয়েছে জোরালো ফাটল। বাদ যায়নি ইউনিয়নের অংশ দেশ চেকস্লাভাকিয়াও।
এই সময়টায় কমিউনিষ্টদের মাঝে এক অদ্ভুত মনস্তাত্বিক দ্বন্ধ দেখা যায়। সোভিয়ের ইউনিয়নে নাস্তিকতাকে প্রগতিশীলতা এবং ঈশ্বর বিশ্বাসকে ধরা হত পশ্চাৎমুখিতা। স্ট্যালিনের আমলে চার্চের সংখ্যা কয়েকশতে নেমে আসে রাশিয়াতে, যেখানে ১৯১৭ সালে চার্চের সংখ্যা ছিল ৫৪ হাজার। বাদ যায়নি মসজিদ, বিহার, ইহুদি গির্জা। প্রচুর যাজকদের হত্যার করা হয়। ইউনিয়ন দেশগুলোর অবস্থায় খুব ব্যক্তিক্রম হয়নি।
কিন্তু স্যাল্টিনের মৃত্যুর পর ধর্ম বিশ্বাসীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এর পিছনে বহু বছরের সঞ্চিত ঈশ্বরের প্রতি আবেগ ছিল না। বরং কমিউনিষ্ট সরকার দ্বারা নিগৃহীতরা প্রতিবাদের একটি মাধ্যম হিসাবে ধর্ম পালন শুরু করে তারা। আর কমিউনিষ্ট আর ধর্ম পালনকারীদের মধ্যে তখন দীর্ঘ একটা সময় জুড়ে শীতল স্নায়ু যুদ্ধ চলেছিল।
এই গল্পের মূল চরিত্র এডোয়ার্ড নামের একজন কলেজ শিক্ষক। আপাতদৃষ্টিতে এডোয়ার্ডকে নাস্তিক মনে হলেও এই চরিত্রটি অগনিষ্টিক উপাদান অনেক বেশি। এডোয়ার্ড তার ধার্মিক বান্ধবী এলিস এবং কলেজের কমিউনিষ্ট মহিলার ডিরেক্টর মাঝে এই প্রগতিশীলতা বনাম ধর্মের দ্বন্দে আটকে যায়।
এই গল্পের শেষটি ছিল চমকপ্রদ। একইসাথে অনেক কিছুর মিশ্রণ। প্রাথমিক ভাবনায় ধর্মে বিশ্বাসীদের খুশি করে দেবার মত। কিন্তু যখন গভীরভাবে এডোয়ার্ডের জীবনের পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা হয় তখন বোঝা যায় লেখক শুভংকরের ফাঁকিটা কোথায় দিয়েছেন।
এবাদে আরেকটি গল্প বেশ ভাল লেগেছে। তুর্কি লেখক ওরহান পামুকের "জানলা দিয়ে দেখা"। মনে হয়েছে বড় কোন উপন্যাসের মাঝখান থেকে তুলে আনা অংশ। তবুও যেন পূর্ণ।
খুব ভিন্ন স্বাদের জন্য পড়তে পারেন "ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন এবং অন্যান্য" অনুবাদ গল্প গ্রন্থটি। আর বোনাস হিসাবে গল্পের ভূমিকাতে লেখক শাহাদুজ্জামান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছেন বিনম্র একটি খোঁচা।
‘এডোয়ার্ড এবং ঈশ্বর’ গল্পের মতো অসাধারণ গল্প সম্ভবত এই মাস—কিংবা এই বছরে আর পড়িনি। তবে সামগ্রিকভাবে তিন তারকা দেওয়ার কারণ হোলো শাহাদুজ্জামানের অনুবাদ তেমন একটা ভালো লাগেনি (সম্ভবত এক্সপেক্টেন্সি লেভেল বেশি ছিলো। এই দায় অবশ্য অনুবাদকের নয়)
বইয়ের ছয়টি গল্প সম্পূর্ণ ছয় রকম। নাম গল্পটি হারুকি মুরাকামির একটি গল্পের নামানুসারে। গল্পটি অত্যন্ত সাধারণ। আহামরি কিছু লাগেনি। অবশ্য আহামরি লাগতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।
বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র ৯৬। এক বসাতেই পড়তে পারেন। আর ‘এডোয়ার্ড এবং ঈশ্বর’ গল্পটি পড়ার বিশেষ অনুরোধ রইলো।
শাহাদুজ্জামান কোনো এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন যেন ভাষাটা কেবল কাহিনীকে টেনে না নিয়ে যায়, কাহিনীর ওপরেও যেন চিন্তার আরেকটা স্তর থাকে। এজন্যই কি এ বইয়ের ছয়টা গল্প এমন অদ্ভুত ছয় ধাঁচের?
প্রথম গল্পটা পড়ে তেমন কিছুই বোঝা গেল না। মুরাকামি যেহেতু ফালতু মানুষ নন, কাজেই আমি ধরে নিচ্ছি এই গল্পটা মারিয়ানা ট্রেঞ্চের চেয়েও গভীর, অর্থাৎ আমাদের মত সাধারণ খাইট্টা খাওয়া মাইনষের পক্ষে এর মর্মোদ্ধার করা কঠিন। একটা ছেলের কান, বন্ধুর মৃত্যু, গলে যাওয়া চকলেট, অন্ধ উইলো গাছ—সবকিছু মিলিয়ে আসলে কী অর্থ বহন করে? কিংবা, বাসযাত্রীদের পাহাড়ে ওঠার প্রসঙ্গই বা কী বোঝায়?
হয়তো এর কোনো অর্থ করা যাবে। কিন্তু এই নিয়ে সিলভিয়ার খুব সুন্দর একটা কথা আছে—চাইলে তো এভাবে যেকোন কিছু থেকেই যেকোন অর্থ বের করে ফেলা যায়।
দ্বিতীয় গল্পটা অবশ্য ভয়াবহ ছিল। আবেলারদো কাস্তি লো চমৎকার গপ্পো ছাড়েন, বোঝা যাচ্ছে। এতটুকুন একটা গল্পের শেষদিকে এসে আমার নিজেরই প্রেশার বেড়ে যাচ্ছিল।
যদিও তৃতীয়টা পড়ার পর দ্বিতীয়টাকে নিতান্ত পানসে মনে হবে। মিলন কুন্ডেরা পড়ি পড়ি করেও এদ্দিন পড়া হয়নি, ভদ্রলোক যদি সব গল্পই এমন লেখেন, তবে লোকটার প্রতিভা আছে বটে। তাঁর গল্পটায় শেষ পর্যন্ত আসলে কী বার্তা দেয়া হয়েছে সেটা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে হয়তো আসা কঠিন, তবে খুবই চিন্তার উদ্রেককারী একটা আলোচনা করা যায়।
চতুর্থ গল্পটা ওক্টাভিও পাজের। এটাও গভীর, এবং বেশ রূপক-রূপক গলায় কথাগুলো বলা। তবে এই রূপক ঠিক সিলভিয়ার ‘চাইলে তো যেকোন অর্থই করা যায়’ ক্যাটাগরিতে পড়ে বলে মনে হচ্ছে না।
পঞ্চমটা ওরহান পামুকের। এই গল্পটার স্পষ্টতর একটা অর্থ আছে বলে আমার বিশ্বাস। তবে তার চেয়েও সুন্দর লেগেছে এর ঘটনাপ্রবাহ। গল্পের মা একটা বড় সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গল্পটা বলা হয়েছে তার ছোট ছেলের জবানীতে, এবং অদ্ভুত��াবে সেই বাচ্চাটার খেলা নিয়ে সমস্যাই আমাকে বেশি তাড়িত করেছে।
আমি ওরহান পামুকের আরও কিছু লেখা পড়ে ফেলতে আগ্রহী।
শেষ গল্পটা যদি আরিফ লিখতো, আমি বকেটকে একাকার করতাম। কিন্তু সমস্যা হল প্রথমত এটার লেখকের নাম হারুকি মুরাকামি, দ্বিতীয়ত শাহাদুজ্জামান বেছে বেছে এটা অনুবাদ করেছেন, তৃতীয়ত এ বইয়ে সব লেখকের একটা করে গল্প থাকলেও কেবল মুরাকামিই দুবার এসেছেন এ গল্পটা যোগ করার কারণে, এবং চতুর্থত, পুরো বইয়ের শিরোনামও দেয়া হয়েছে এ গল্পটার নামেই—ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন!
ব্যক্তিগতভাবে এই গল্প পড়ার পর নিজেকে ভোগ সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বলে মনে হচ্ছে।
এইসব কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলিতে লিব-জেন থেকে ডাউনলোড করা গাদা-গাদা ছোট গল্পের ইপাব পড়তে পড়তে মনে হয়, ঘরবন্দী এই জীবনে একটু পর্দার আড়াল থেকে আসা বিকেল বেলার হালকা আলো মিশিয়ে কিছুক্ষণ বইয়ের পাতা হাতে নিয়ে একটুখানি উলটাই। অনুবাদ পাঠ কখনওই সুখকর হয়নাই এই জীবনে। মুরাকামির মেলানকোলি, কুনডেরার দর্শন ঐসব বাংলায় পড়তে কেমন লাগে জানিনা। আগে কখনো চেষ্টা করিনাই ভয়ে। তবে অপ্রত্যাশিত ডিজাস্টার এর মুখোমুখি হইতে হয়নাই। মুটামুটি ভাল বলা যায়।
অন্ধ উইলোর ঘন বন পেরিয়ে এক ছেলে পাহাড়ের উপর উঠছে।অন্ধ উইলো ঐ পাহাড় দখল করার পর ঐ ছেলেটিই প্রথম ঐ পাহাড়ে উঠে।কিন্তু ছেলেটা পাহাড়ে উঠবার আগেই মাছিগুলো কি মেয়েটার শরীর খেয়ে ফেলে? সেসব কথা ছাড়লেই বোধ হয় ভালো।আর্নেস্টার মা পেশায় একজন প্রস্টিটিউট।বড় হয়ে যাওয়ার পর আর্নেস্টার তিনজন বন্ধু তার মায়ের রুমে ডুকতেই একজন থেমে গেল,কিন্তু কেন? ভয়ে? লজ্জায়? প্রতিহিংসায়? আর্নেস্টার মা মুখভর্তি উদ্বিগ্নতা নিয়ে কি ই বা বলেছিল তাদের?সেসব আমি জানিনা। প্রথম বর্ষে আমাদের একটা টপিক ছিল এক্সিটেন্স অব গড।আমার মনে এমন কোনো সন্দেহ আজ অব্দি জাগেনি যে ঈশ্বর আদৌ আছে নাকি নেই, তবে ছোটবেলায় ভাবতাম পৃথিবীর প্রথম সত্য কোনটা অথবা ঈশ্বর ই যদি না থাকতেন,পৃথিবীর যদি সৃষ্টি না হতো তাহলে আমি কোথায় থাকতাম বা কি হতো!আমার কথা এখানে বলা অসমীচীন।বিকেলে পাশাপাশি হাঁটার সময় এডওয়ার্ড চেষ্টা করে এলিসের কোমর জড়িয়ে ধরতে।সেদিনও এলিস ওর হাত সরিয়ে দিয়ে মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসা করে- তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? এডওয়ার্ড কি বলবে জানেনা,একজন মানুষ একই সাথে ইশ্বর এবং সমাজতন্ত্র দুটোতেই বিশ্বাস করতে পারে কি না এটা তার জানা নেই।সত্যি বলতে আমিও এ ব্যাপারে জানিনা বললেই চলে। সমাজতন্ত্র এবং ঈশ্বর এসব দুর্বোধ্য ব্যাপার স্যাপার।এ নিয়ে এডওয়ার্ড এবং একজন পরিচালিকা'র বিস্তর কথোপকথন হয় পরবর্তীতে তা যৌনতায় রুপান্তর ঘটে।এক পর্যায়ে পরিচারিকা বলেছিল 'মানুষ পৃথিবীতে তো শুধুমাত্র নিজের জন্য বাঁচে না,বাঁচে আরো অনেক কিছুই জন্য'।আমি ভাবছি বেঁচে থাকার কারণ কি,মাঝেমধ্যে যদিও খোঁজ টোজ করে পাইনা।অবশ্য 'একজন মানুষ যে আর কোনো কিছুকেই গুরুত্বের সাথে নিতে পারেনা তার জীবন অত্যন্ত বেদনার।' গত বছরের জুন মাস থেকে এই কথাটা উপলব্ধি করছি।যাই হোক,ঈশ্বরে বিশ্বাস করবেন কি না আপনাদের ব্যাপার,তবে আমি নিতান্তই বিশ্বাসী মানুষ। ধরেন এই পুরো বিশ্বে আপনি একা,আপনার কোন বন্ধু নাই।সমুদ্রে গিয়ে ঢেউয়ের সাথে বন্ধু পাতলেন।এবার ঢেউকে নিয়ে কিভাবে ট্রেন জার্নি করবেন?ভাবেন তো একই রুমে আপনার এবং ঢেউয়ের বসবাস। এতোক্ষণ আমি যেসব বললাম এসব আদতে শাহাদুজ্জামান অনূদিত ছয়টি গল্প নিয়ে 'ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন এবং অন্যান্য অনুবাদ গল্প' থেকে।প্রথমে যে গল্প এটা মুরাকামি'র গল্প।এই প্রথম মুরাকামি পড়লাম।দ্বিতীয় টা আবেলারদো কান্তি লো লিখিত গল্প।তৃতীয় গল্প মিলান কুন্ডেরার 'এডোয়ার্ড এবং ঈশ্বর',গল্পটা সাদামাটা কিন্তু গভীরতা ততটাই পাকাপোক্ত। ঢেউ নিয়ে যেসব বকবক পড়লেন এটা ওক্টাভিও পাজ নামের একজন ম্যাক্সিক্যান লেখকের গল্প। বাকি দুটো গল্পের গভীরতা আমি টের পাইনি। শাহাদুজ্জামান লিখিত তিনটে বই এই অব্দি পড়া হয়েছে,ক্রাচের কর্ণেল,মামলার সাক্ষী ময়না পাখি,একজন কমলালেবু।এক ক্রাচের কর্ণেল পড়ার পর লেখককে আমি 'প্রিয়' শব্দে যুক্ত করে নিয়েছি।তবে ক্যাঙ্গারু...এটা অন্যরকম একটা বই।বোধ করি দুই শ্রেনীর পাঠক এখানে দৃশ্যমান হবে,ধুর!কি লিখছে আবুল তাবুল এটা বলা পাঠক,২য় শ্রেণীতে থাকবে একেকটা লাইন এবং শব্দের গাঁথুনির মোহগ্রস্ত পাঠক।আমি দ্বিতীয় শ্রেনির অন্তর্ভুক্ত!
প্রতিটা গল্পই একেবারে গেঁথে ফেলেছিল নিজের সাথে । এখন কথা হলো, অনুবাদ গল্প কী শুধুই মূল গল্পকারের কারণে পড়ে থাকি নাকি এর পেছনে খানিকটা হলেও অনুবাদকের মহিমা কাজ করে থাকে । এক্ষেত্রে যে শাহাদুজ্জামানের প্রতি যে দুর্বলতা তা যে কাজ করছে বলতে দ্বিধা নেই । বলাই বাহুল্য, কোন গল্পই আগে মূল ভাষায় পড়া ছিল না । আর শাহাদুজ্জাম্নের মিঠা গদ্যে অনুবাদের কষ লেগে যেহেতু ছিল না তাই উপভোগ করা গেছে বেশ । গল্পগুলো বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে শাহাদুজ্জামানের ব্যক্তিগত রুচিই কাজ করেছে । আমাদের সামনে হাজির করেছে ব্যক্তি লেখক এবং তাদের ইতিহাস-সমাজ বাস্তবতার সাপেক্ষে উঠে আসা নানা স্বাদের গল্প ।
প্রতিটা গল্প ধরে ধরে কিছু কথা লিখতে ইচ্ছা করছে, যদিও ধৈর্য এই মুহূর্তে সাহায্য করছে না । কোন গল্প শ্লেষের, কোন গল্প মনস্তাত্ত্বিক, কোনটা চমকের বা পরাবাস্তব, কোনটা বেশ আক্রান্ত করে, বিব্রত করে দেয়, তবে আটপৌরে যাপিত জীবনের ভাঁজে ভাঁজে মানুষের জীবনে যে জটিলতার চোরাগোপ্তা হামলা আর অস্তিত্বের চোরা স্রোত তা-ই উন্মোচিত হয়েছে ।
এতো চমৎকার বাংলা অনুবাদ যে কতো কতো দিন পড়ি নাই!! এতো স্বচ্ছ,এতো প্রাঞ্জল,এতো সুন্দর!! কিছু কিছু বাংলা অনুবাদ পড়ার পর আসল ইংরেজি বইটা পড়ার ইচ্ছা জাগে,কারণ অনুবাদ সেরকম প্রাঞ্জল হয়। অথচ এই বই পড়লে মনেই হয় না যে আসলে অনুবাদ পড়ছি!! এতোটাই ভালো। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে "Edward and God" ।এটা আজ অবদি পড়া সবচেয়ে প্রিয় ছোটগল্প হয়ে থাকলো। শাহাদুজ্জামানের গল্প চয়ন প্রশংসার দাবি রাখে। আরো আরো ভালো উপন্যাস আর ছোটগল্পের অনুবাদ প্রত্যাশা করছি এই গুণী লেখকের কাছ থেকে।
অক্টাভিও পাজের 'ঢেউয়ের সঙ্গে আমার জীবন' আর মিলান কুন্দেরার 'এডোয়ার্ড এবং ঈশ্বর' এই দুইটা গল্প আমার পার্সোনাল ফেভারিট হয়ে থাকবে অনেকদিন। ওরহান পামুকের 'জানালা দিয়ে দেখা' গল্পটাকে অনেক বেশি পরিচিত আর নিজের মনে হচ্ছিলো। খুব সম্ভবত একইসাথে 'ইস্তাম্বুল' বইটাও পড়ছিলাম বলে।
একেকটা গল্প একেকরকম। এডওয়ার্ডের ঈশ্বর গল্পটা তো দারুণ, কুন্ডেরা সাহেবকে পড়া শুরু করে দিয়েছি। ভদ্রলোক যেন ছবি আঁকেন। সেই ছবির রঙ গুলো সাধারণ, কৌতুহল জাগাবার মতো না। কিন্তু পুরো ছবিটা বীক্ষককে বিক্ষুব্ধ ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি তার সাহিত্যকে মনস্তাত্ত্বিক জনরা বলতে চান না। বরং পারিপার্শ্বিকের ফাঁদে পড়ে ব্যক্তির আচরণ লেখায় তুলে আনেন।
ভালো লেগেছে অক্টাভিও পাজকে, তার 'ঢেউয়ের সাথে আমার জীবন' গল্পকে। গল্পকথকের বান্ধবী সমুদ্রের একটা ঢেউ। সেই ঢেউ আর তার জীবনের গল্প।
শাহাদুজ্জামান ভাষান্তর প্রক্রিয়ায় সচেতনভাবে একটা স্বাতন্ত্র্য আবহ ধরে রাখতে চেয়েছেন। এবং তাঁর প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। ভাষান্তর সহজ, একটানে পড়ে যাওয়া যায় এবং কৃত্রিম মনে হয় না।
সন্ধ্যা রাতে হাফওয়ালে বসে গল্পটা রসিয়ে কসিয়ে বলে ফেলার মতো জিনিস মনে হয় মুরাকামি একদমই লিখেন না। অদ্ভুতুড়ে সব কাণ্ড-খালি চিন্তাকেই ঘোলাটে করে দিয়ে যায়। আবছা ছায়ার মাঝখান থেকে রং বের করে তাই আনতে পারিনি তেমন একটা কখনোই তাকে পড়ে। এবারো হয়নি। বাকি চারটে গল্প দুর্দান্ত বলা চলে। বিশেষত লাফেবল লাভস বইটা পড়ার ভালোরকম ইচ্ছা হচ্ছে।