জন্ম ২০ জনুয়ারি ১৯৬৫, নাটোরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত অবস্থান সকল মহলেই স্বীকৃত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ দেশের প্রধান প্রায় সকল সাহিত্য পুরস্কার।
অপিরিচিত লেখকের বই পড়ার আগে হালকা কনফিউশন কাজ করে। তেমনি কাজ করছিল জাকির তালুকদার এর ছায়া বাস্তব উপন্যাসটি পড়া শুরু করার আগে। কনফিউশন কে হালকা সাইড করে ক্ষীণতনু বইটা সাহস নিয়ে পড়া শুরু করলাম। প্রথম প্যাড়াটা পড়েই একটু নড়ে চড়ে বসলাম। নাহ ইনি হালকা কিছু লিখবেন না। প্রথম প্যাড়াটা তুলে ধরি কি বলেন? লেখক লিখেছেন- “নিখাদ আতঙ্কের মুখোশ পড়া প্রত্যুষ এবাড়ির কেউ আগে কোনদিন দেখেনি। জ্যৈষ্ঠমাসের খাড়া দুপুরের আকাশ-পোড়ানো মাটি-পোড়ানো গা-পোড়ানো গরমের সাথে নিম্নচাপ হবে হবে গুমোট যোগ হলে যেমন সর্বাত্মক শারীরিক মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়, বাড়ি জুড়ে সেরকম দমচাপা আবহাওয়া। আতঙ্ক এমনি সর্বগ্রাসী যে, এমনকি এই ভোরে নামাজ-ঘরের টিনে তারস্বরে কাক ডেকে উঠলে, বেড়ার কিংবা ঘরের দরজায় নেড়িকুত্তার দল খেউ খেউ করে উঠলেও ‘দূর হ’ বলার মতো ইচ্ছা অথবা সাহসটুকু কারো হয়না”।
এক নিঃশ্বাসে (আক্ষরিক অর্থে না, ভাবার্থে) পড়ে ফেললাম বইটা। কাহিনী দারুণ বলবো না। তবে লেখার স্টাইলটা দারুণ। প্রতিটা বাক্য যেন খুব যত্ন করে তৈরি করেছেন লেখক। বাদলের ভাই খালেদ কে হঠাৎ কারা যেন আইনের লোক পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যায় বাড়ি থেকে। কিন্তু পুলিশ বা অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সে দায় স্বীকার করে না। তারা জিডি করতে পুলিশ ষ্টেশনে গিয়ে অনেকক্ষন অপেক্ষা করলেও কোন এক অজানা কারনে তাদের জিডি নেয় না থানা। (তবে লেখক কোন এক অজানা কারনে সেই অজানা কারণটা পরে জানাতে ভুলে গেছেন) তাহলে কি হবে? খালেদ কি গুম হয়ে গেল? এটা নিয়ে বড় ভাই বাদলের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা লেখক তুলে ধরেছেন। পড়ে দেখতে পারেন, মাত্র ৬৩ পৃষ্ঠার একটা ক্ষীণতনু উপন্যাস, লেখনী ভালো লাগবে।
গুম,,,,বাংলাদেশে একটা পরিচিত শব্দ। পৃথিবীর আজব আজব শব্দের সঠিক প্রয়োগ এই দেশের ভেতরে জীবন লাভ করে। গুম হয় না হেন জিনিস আমাদের দেশে নেই। মানুষও এত সস্তা যে তাকেও গুম করে দেওয়া মুখের কথা। বিশেষ করে আমার দেখা, পনের থেকে সতের সালে বেশ কমবেশি সবাই আতঙ্কে থাকত, কে, কখন গুম হবে এই ভয়ে। সাদা পোশাকের আইনের লোকের দৌরাত্ম্য তখন বেশ বেড়ে গেছিল। সবথেকে ভয়ে ছিল সরকার বিরোধী দলের সমর্থকেরা। নির্বাচনের আগে ও পরে এই ভীতিও মহামারী আকারে রূপ নেয় বিশেষ করে বিরোধীদের কাছে বাতাসের সাহায্য খবর আসত যে তোকে আজ তুলে নিয়ে যেতে পারে, সাবধানে থাকিস। মতের বিরোধী হওয়াতে এই গুম,হত্যা,ক্রসফায়ারে তখন দেশের আমার মত সাধারণ মানুষেরা আজও শঙ্কিত।
এখন বুঝি / জানি সরকারের আড়ালেও কিছু মানুষ আছে যাদের স্বার্থে বিন্দুমাত্র ক্ষতি হলে গুম করে দেওয়া আলু পটোলের মতনই সস্তা। কেননা গুমের বিচার হয় না। মামলাও গুম করে দেওয়া হয়,তথ্য, প্রমাণ সব গুম করে দেওয়া হয় বা দেওয়া যায় ফলে অপরাধ করলে যে শাস্তি হবে এই ভয়, অপরাধীদের মনে কাজ করে কম। কিংবা বলা যেতে পারে অপরাধীর অপরাধের সাজাও গুম করে দেওয়া যায়। খবরের কাগজের পাতা উল্টাতে চোখে পড়ে।
যাইহোক,,,,,, থ্রিলার বইয়ের গল্পে টল্পে আমরা গুম হওয়া টওয়া নিয়ে নানান কাহিনী পড়ে রহস্যের দ্বার উন্মোচিত করি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুম হওয়া নিয়ে জাকির তালুকদারের ' ছায়াবাস্তব' উপন্যাসটি ই বোধহয় প্রথম। একটা পরিবারের গল্প এখানে অতি সুন্দর ভাবে জাকির তালুকদার পোট্রের্ট করেছেন। একটা দুর্ঘটনায় পড়লে মানুষ যে অনুভূতি সচেতন হয়ে উঠতে পারে তা এই গল্পে চমৎকারভাবে দেখানো হয়েছে।
সহজ স্বাভাবিক এবং ঝকঝকে তকতকে প্রকৃতির বর্ণনারীতি পড়লে মনে হবে, আরে— এইটা তো একটা সিনেমার পর্দায় দেখানো ছবি। এত বাস্তবতাকে বাস্তবিত করে ফুটে উঠেছে গল্পে।
বইটি পড়ে আমি কিছুক্ষণ থ হয়ে বসে ছিলাম। তারপর কিছু কিছু জায়গায় আবার পড়লাম। তখন যেখানটায় শুরু সেখানটায় আবার শেষ করার যে ব্যাপারটা সেজন্য জাকির তালুকদারকে বেশ প্রসংশা করতে হয়।
বইটি বের হয়েছে - পেন্ডুলাম বুকস - Pendulum Books থেকে।
বাদল সেই নিচুজমি আর গর্তের দিকে এগোতে গিয়ে সশব্দের আবাক মত হওয়ার মতো করে দেখতে পায়, সেই রক্ত আর কাদামাখা ডেডবডির পাশে হাটু গেড়ে বসে আছে তার মা। মা কখন নিঃশব্দে পৌছে গেছে লাশের পাশে! বাদলের মত শাজাহাও থমকায়। তারা দুইজনে এগিয়ে চলে লাশের দিকে। এক, দুই, তিন করে ধাপ গুনতে থাকে বাদল। তার হাঁটুতে জোর নেই। মনে হচ্ছে অন্তত সময় ধরে হাঁটছে লাশের পাশে পৌঁছানোর জন্য। এই পথ শেষ হচ্ছে না কেন? মা কীভাবে চটজলদি পৌঁছে গেল সেখানে? তারপরে মনে হয়, মায়েরা মা বলেই এমনটা পারে। কিন্তু সে ভাই হয়ে পারছে না কেন? শাজাহান বোধ হয় তা অবস্থা বুঝতে পারে। সে বাদলের হাত চেপে ধরে তাকে এগিয়ে নিতে থাকে।
... এইটা কোনো রিভিউ না। অনেক আগের পড়া তাই মনেও নেই।
জাকির তালুকদার তো পরীক্ষিত লেখক। তাঁর গদ্য ভালো হওয়াটাই অনুমেয়। গদ্য ঠিকই ভালো, কিন্তু বইয়ের গল্পটা ঠিক ফুটলো না ফোটার মত করে, তার আগেই ঝরে গেলো। অনবদ্য হওয়ার মত কিছু না লিখে বা সেই চেষ্টায়ও না গিয়ে শুধু লিখতে হবে বলেই লেখা না-কি এটা? মনে হলো তা-ই। বাদল তার ভাইকে যে খুঁজে পাবে না তা তো আমরা জানতাম। তবে অনেক যে খোঁজা হবে সেই বিশদ বর্ণনার একটা আগ্রহ অনেকদূর পর্যন্ত গেলে অন্য অনেক ফিলোসোফি ধরা পড়তে পারত। হলো না।
গুমকে কেন্দ্র করে লেখা৷ যদিও লেখকের মতে বেশ সাহসী একটা লেখা, তবে পড়ে তেমন কিছু মনে হয়নি। খুবই সাদামাটা লেগেছে। অন্তত লেখকের ক্যালিবার অনুযায়ী। আরো বেটার কিছু আশা করেছিলাম।