সফুর শেখ তার বাঁ'হাতটি উঁচু করে আকাশের দিকে তাক করেন - সন্ধ্যার ঘোর লাগা আকাশের পূর্বদিক থেকে এক বিশাল পাখি পশ্চিমে উড়ে যাচ্ছে, যেন তার নিঃসঙ্গ ডানা জোড়ার অসীমে ঢাকা পড়েছে আকাশের বিশাল প্রান্তর। পাখিটি এত বড় শরীরের অধিকারী কীভাবে হলো?
'ওই পাখিটারে দেখ কামরুল, কী বিশাল তার গা। আমি খুব ছোটবেলা থেকে ওরে এই মাগরিবের অক্তে পূব থেকে পশ্চিমে উইড়ে যাতি দেখি জানিস? ও চিরদিন একলা, কখনও কোনো সঙ্গী ছিল না ওর।'
বহুদূরে উড়ে যাবার পরেও পাখিটির বিপুলতা কামরুলকে বিস্ময়ে অভিভূত করেছিলো সেদিন। অবাক কন্ঠে সে প্রশ্ন করেছিল, 'মানুষের চেয়েও বড় পাখি তাহলে দুনিয়াতে আছে কাকা?'
বই পড়ার শুরু থেকেই এক ধরণের উপন্যাসের নাম শুনে আসছি। "জীবনধর্মী উপন্যাস"। কিন্তু এর সঠিক সংজ্ঞা কি? এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার আলোকে বলব- জীবনবোধকে লেখক যখন সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেন কিছু অচেনা মানুষের জীবন পরিক্রমার মাধ্যমে সেটিই জীবনধর্মী উপন্যাস। সেদিক বিবেচনায় লেখক সফল। আমি মুগ্ধ। :) খুব কমই ঝুঁকি নেই আমি নতুন লেখকদের বই কেনার ক্ষেত্রে(থ্রিলার সাহিত্য বাদে)। কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা সুবিধার নয় বিশেষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও বইমেলা থেকে বেছে শুনে এবার তিনজন তরুণ লেখকের বই কিনেছি। তার মধ্যে এটা একটা। সিদ্ধান্তটা ভুল ছিলো না। গল্পের শুরু এবং শেষ দুটোই হঠাত করে । চলমান জীবনের এক পর্যায়ে শুরু এবং তার কিছু দিনাতিপাতের পর শেষ। চরিত্রগুলোর পূর্ব বর্ণনা খুব বেশী না থাকলেও এটুকু ক্যনভাসেই লেখক মুন্সিয়ানার ছাপ দেখিয়েছেন নি:সন্দেহে। পড়ার সময় ঘটনাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ভাসছিলো আমার সামনে। লেখকের লেখার হাত অতিশয় ভালো। সামনে আরো চমতকার বই আশা করছি তার কাছ থেকে। অভিনন্দন। :)
সে এক গ্রাম আছে, যে গ্রামের উপর সর্বদা রাজত্ব করে বৃষ্টি। এমনকি করে মাঠের নামকরণও। কোন এক ঝড়ের রাতে জলার মাঠে বসে থাকতে থাকতে আপনার হয়তো বৃষ্টিকে মনে হতে পারে তুখোড় সন্ত্রাস আবার নাও হতে পারে, হয়তো বংশবিস্তারে বেরিয়ে পড়া কই মাছের মতো আপনিও মার্চ করে যেতে পারেন নতুন জলের দিকে। কিন্তু, ঘটনা শুধুই আটকে থাকে না প্রকৃতির মাঝে... ফলে জলার মাঠে কোন এক দুপুরে বাপ-ব্যাটা দোকানের জন্য সওদা করে ফেরার পথে কোন এক এতিম গাছে দেখতে পায় একটি গলা কাটা লাশ। অসুস্থ হয় পুত্র, অসুস্থ হয় পুত্রের বাপ। লাশের পরিচয় পাওয়া যায় না তবে অমাবস্যা রাত ঠিকই পাকড়াও করতে সাহায্য করে একজন খুনিকে... ঘটনা হয় আরও ঘনীভূত। ভিলেজ পলিটিক্স তখন মূলত ডালপালা ছড়াচ্ছিল, আর এইসব থেকে দূরে একজন আপেক্ষিকঅর্থে বোহেমিয়ান ব্যর্থ প্রেমিক তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যাচ্ছিল সুন্দরবনের দিকে আর তাঁর প্রেমিকার ভালো মানুষ স্বামী, নানান ছলাকলার সাহায্যে করতে চাইছিল নয়া বউয়ের মন জয়। ঘটনা এইরূপে ঘটে, বিষাদ আসে স্বাভাবিকভাবে, স্মৃতিচারণই তখন হয়ে ওঠে সুখের একমাত্র উপজীব্য... যেমন এককালে এই গ্রামে পাটকল ছিল, আজ আর নাই... আবার হয়তো খুলবে সামনে ... এই তো আশা, ভবিষ্যতের কাছে, এভাবেই জীবন কাটে। অজ্ঞাত লাশের পরিচয় অজ্ঞাতই থাকে আর নৈঃশব্দ্যের কোলাহলে ক্লান্ত হয় মন।
চিরায়ত উপন্যাস হতে একটা গল্পে যা যা উপকরণ লাগে, এই বইয়ে সেসব উপকরণ আছে পরিমাণমতো, ফলে স্বাদে হয়নি হেরফের বরং, এই পরিবেশ, এই পরিচিতি, এই বিজ্ঞান আমাদের মনে হয় খুব খুব পরিচিত। স্টোরি টেলিং স্পন্টেনিয়াস। গল্প এগিয়েছে এফোর্টলেসভাবে... উপন্যাসিক একটা নাটাই থেকেই ছেড়েছেন অনেকগুলো সুতো... এবং দিন শেষে সবগুলো ঘুড়ি নিয়েই ফিরেছেন ঘরে। তবু কথা থাকে, পাঠক মন হয়তো আরও কিছু চায় ... যেমন এই উপন্যাসের বিস্তার যদি আরও একটু বড় হতো, তবে কী ক্ষতি হতো কোন? কিছু কিছু চরিত্র ক্যামিও রোল থেকে বের হয়ে হয়তো আরও বড় কোন রোল প্লে করতে পারতো। স্টোরি টেলিংয়ে অনভ্যস্ত চোখ হয়তো ধাক্কা খাবে, কেনোনা কন্টিনিউটি ব্রেক করে লেখক বারবার ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে শুরু করেছেন গল্প, তবে কিছুটা মনোযোগ দিলে এই গল্প বলার ধরণের মধ্যেও পাওয়া যাবে শৃঙ্খলা, পাঠকের হয়তো মনে পড়ে যাবে হুয়ান রুলফো কিংবা মিলান কুন্ডেরার স্টোরি টেলিংয়ের কথা।
'কোলাহলে' এনামুল রেজার প্রথম উপন্যাস। এই কথা কোথাও উল্লেখ করা না থাকলে, যে কোন পাঠকের জন্যই এই বাস্তবতা বিশ্বাস করতে হয়তো কষ্ট হবে, কেনোনা উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠক আমি আবিষ্কার করেছি একজন পরিণত লেখককে, যে র্যাট রেইসে নাম লেখাতে নয় বরং এসেছে সত্যিকার অর্থেই ফিকশন তৈরি করতে।
বইটা ভালো ছিল। তবে দুই কারণে মন ভরেনি। প্রথমত ছোট বইতে চরিত্রের আধিক্য। বলতে গেলে কোন চরিত্রই আলাদাভাবে দাগ কাটে না এতে। আর দুই, ময়মনসিংহের ভাষা। প্রথম ৩০ পাতা পড়তে খুব কষ্ট হচ্ছিল। একবার পরিচিত হবার পর আর সমস্যা হয় নাই।
গুরুত্বপূর্ণ না হলেও একটা নাম বিভ্রাট আছে মাঝে। দুই একটা বানান ভুলও দেখলাম। তবে সব মিলিয়ে বেশ ভালো একটা বই।
"এরপর তারা ঝড়ের মাঝে বেরিয়ে যেত । আমের ডাল ভেঙ্গে পড়ছে পথের ক্ষণে ক্ষণে আকাশ ডাকছে গুড়ুরগুড়ু, সুঁই সুঁই বৃষ্টি মাথায় নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছুত তারা । মাইল মাইল লম্বা নদীর হুহু ফাঁকা পাড়, তীরের গাছপালা কাঁপছে আর করছে নাচানাচি । কামরুল ভাই নদীতি নামবা? পাগলে ধরিসে? এন্নে নামলে পানিতি, টাইনে কুথায় নিয়ে চইলে যাবে আমাইগে জানিস? নিলিই তো ভাল ।"
'কোলাহলে'র ফ্ল্যাপের এই অংশটুকু রোমান্টিক একটি কাহিনির দিকে ইঙ্গিত করে । একইসাথে চরিত্রের সংলাপ ও পরিবেশ এর গ্রামীণ পটভূমিতে লেখার কথাও জানান দেয় আমাদের । কিন্তু পাঠ শেষে এই উপন্যাসের কাহিনিকে ঠিক রোমান্টিক বলা যায় না । যদিও কামরুল আর রোকেয়ার মধ্যে প্রেমঘটিত একটা সম্পর্ক ছিল । সেটা কি একপক্ষীয় প্রেম নাকি দ্বিপক্ষীয়? এমন একটা প্রশ্ন যদিওবা থেকে যায় । তারপরেও শেষপর্যন্ত মীমাংসায় পৌঁছুতে পারি না । এছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে আরো কিছু রোমান্টিক চরিত্র আছে । উপন্যাসে সেগুলোর প্রত্যক্ষ কোন আবেদন না থাকলেও রোমান্টিক আবহ তৈরির ক্ষেত্রে এগুলোর পরোক্ষ কিছু অবদান আছে বৈকি ।
পুবপাড়া কে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার, যাতে গ্রামীণ জনজীবনের রূঢ বাস্তবতা, একইসাথে বৈচিত্র্যপূর্ণ সব চরিত্রের গ্রাম্য সরলতার বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ আর একটি অযাচিত হত্যাকান্ডের রহস্য ক্রমশ উম্মোচিত হয়েছে পাঠকের সামনে ।
এই হত্যাকান্ডের রহস্যজট আরো ঘনীভূত হয় যখন চেয়ারম্যান আলাল শেখের শালা মনজু নিখোঁজ হয় । যার সাথে চেয়ারম্যান আলাল শেখ ও মনজুর স্ত্রী হালিমার গোপন সম্পর্কের একটা যোগসূত্র আছে । ঘটনার ঘনঘটার সাথে মানবিক স্খলন আর মানুষের আদিম প্রবণতায় যে বহুমূখী উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল একসময়, একের পর এক ফ্ল্যাশব্যাকের কারণে সেটা অনেকটা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল, আর একইসাথে কাহিনিও তার গতি হারিয়েছিল; পাঠের মাঝে তেমনটাই মনে হয়েছে আমার ।
এই উপন্যাসে কতোরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রের সাথে যে দেখা হয়ছে গল্পের বাঁকে বাঁকে,তার কোন হিসেব নেয়।চরিত্র নির্ভর এই উপন্যাসে সেসব চরিত্রের জীবনচিত্র আলাদা আলাদাভাবে বিকাশের দাবি করলেও এর অন্তিম পরিণতি গল্পের ম���ো হওয়ায় তেমনটা করা সম্ভব হয়নি হয়তো । যার কারণে গলাকাটা লাশের রহস্যজট উপন্যাসের শেষে খুললেও সেসব চরিত্রের যাপিত জীবনের পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাঠ শেষে পাওয়া যায়নি । এক্ষেত্রে লেখকের স্বীকার্যটি গুরুত্বপূর্ণ । ভূমিকাতে যেমনটা তিনি বলেছেন- 'চরিত্রগুলো আরও একটু বিকাশের দাবিদার ছিল,উপন্যাসটির পটভূমি পুবপাড়াও চাইছিল তাকে আরও খানিক পরিষ্কার (ঘোলাটে?) করে তুলিনা কেন?'
গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে গ্রাম্যতাকে লেখক যেভাবে চিত্রিত করেছেন, অর্থাৎ এই উপন্যাসের চরিত্র, ভাষা, সংলাপের ব্যবহার, আবহ ইত্যাদি সবকিছুই এই উপন্যাসকে বিশিষ্টতা দান করেছে । যদিও লেখক চাইলে উপন্যাসের চরিত্রদের জীবনবোধ নির্মাণে আরো বিস্তৃত গল্পকে ধারণ করতে পারতেন । তাঁর গ্রাম্য জীবনবীক্ষণকে, সমাজবীক্ষণকে আরো স্পষ্ট, আরো অর্থবহ এবং আরো তাৎপর্যপূর্ণ করতে পারতেন ।
গ্রাম্য পরিবেশ, সংস্কার-কুসংস্কার, আচার-ব্যবহার আর কাদামাটি মাখানো গেঁও ভাষা কার না ভালো লাগে? আমারতো দারুণ লাগে। এধরণের রচনাগুলো যেন আত্মার কথা বলে। কোলাহলে ঠিক তেমনই একটি উপন্যাস। গ্রাম্য কুসংস্কারের অংশ হিসেবে ভৌতিক পরিবেশ তৈরী করে রহস্যময় খুনকে সামনে আনা হয়। শিরবিহীন সেই ঝুলন্ত লাশ ভয় পাইয়ে দেয় ভূতে বিশ্বাস করা বাবা ছেলেকে। তারপরে একে একে চরিত্রগুলোর আত্মপ্রকাশ। এমনকি গল্পের একেবারে শেষ মুহূর্তেও নতুন চরিত্রের আবির্ভাব। এজন্যই বোধয় গল্পের নাম কোলাহলে। গ্রামীণ মানুষেদের জীবনাচার বর্ণনার মধ্যে দিয়ে মু্ন্ডুহীন লাশ এবং খুনির পরিচয় উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়েছে। অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়েও দুটো মানুষের আলাদা থেকে বাস্তবতার সাফাই গাওয়ার নিষ্ঠুরতার কথা বলা আছে এখানে। লেখক খুব সুন্দর করে ক্যারেক্টার বিল্ড আপ করেছেন। খুব সূক্ষ্মভাবে ভাবনার উপাদান যোগ করেছেন, একে একে রহস্য যোগ করেছেন আবার সমাধান করেছেন। বইটি থ্রিলিং না হলেও মজিয়ে রাখার মতো। আর এমনভাবে শেষ করা হয়েছে যে মনে হবে আরো অনেক কিছু জানা বাকি। এ যেন শেষ হয়েও হলোনা শেষ। ব্যক্তিগত রেটিং : ৭.৫/১০(অনেক বেশি চরিত্র আর ঘনঘন দৃশ্য বদলের জন্য)