ডিউক জনের জন্ম ৩১ জানুয়ারি, ১৯৮৪ সালে। সেবা প্রকাশনীতে প্রথম শুরু হয় ২০১৪ সালে ওয়েস্টার্ন 'সুবর্ণ সমাধি' দিয়ে। এর পর জুল ভার্নের 'দক্ষীনের যাত্রী' আসে ২০১৫ সালে। এর পর তার কাছ থেকে আমরা পেয়েছি উইলিয়াম হাওয়ার্ড, এমিলিও সালগ্যারি, পার্ল এস. বাক, পি. জি ওডহাউস, মিশেল মোরান, মেরাল ওকায়, রবার্ট ই. হাওয়ার্ড সহ অনেক দুর্দান্ত ও বিক্ষাত লেখকদের বইগিুলো। ওয়েস্টার্ন সিরিজের বই ’সূবর্ণ সমাধি’, তিনটি পিশাচ কাহিনী ও হরর কাহিনীর বই, এবং সব শেষে প্রকাশিত হয়েছে মাসুদ রানা সিরিজের সর্বশেষ বই (৪৬৭ তম) ‘শকওয়েভ’, বইটিটে কাজীদার পাশাপাশি সহযোগী লেখক হিসেবে তিনি আছেন।
সুবর্ণ সমাধি বইটার ভাষা খুউব-ই প্রাঞ্জল, হৃদয়গ্রাহী। বুনো পশ্চিমের এতো সুন্দর ছবি দীর্ঘদিনের মধ্যে কোনো ওয়েস্টার্নে পাইনি।
আলভারো, জোহান, রোজমেরি, এলেনা, ফুলার, এদেরকে ভালো লেগেছে। মারিয়াচির চরিত্রটাও ইন্টারেস্টিং। জেসনের চরিত্র বিকশিত হওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি। আর যে জিনিসটা মানতে পারিনি তা হল, ট্যাটাম, মুয়েলার, শর্টি এই সব প্রধান প্রধান ব্যাড গাই নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি করে মরে যাওয়া।
বইটার লেখার স্টাইল সুন্দর হলেও গাঠনিক দুর্বলতা আছে। জোহানের গল্প, এলেনার গল্প, জেরার্ড মিলফোর্ডের গল্প, রোজমেরির গল্প - একটু আরব্য রজনী স্টাইল মনে হল যেন। প্রকৃতির বর্ণনা কাহিনীর থেকে বেশি জায়গা নিয়েছে। বইয়ের শেষের দিকটায় একটু তাড়াহুড়া করা হয়েছে বলে মনে হল।
ওয়েস্টার্ন ভাবটা ফুটিয়ে তুলতে কিছু শব্দ ইংরেজিই রাখতে হয়, বাংলায় ঠিক আসে না। কিন্তু দরকারের বাইরেও অনেক ইংরেজি শব্দ সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে, বাংলা করলেই ভালো শোনাত। আরেকটা খটকা হল, প্যারাগ্রাফ খুব বেশি। প্রত্যেক এক-দেড় বাক্য পরেই নতুন প্যারা, এর অনেক কিছু একই প্যারাগ্রাফে থাকার মত ছিল। এটা কি বইয়ের কলেবর বৃদ্ধির চেষ্টা কিনা বুঝলাম না।
আইরিশ বলতেই সেবার বইয়ে মিলফোর্ড পদবী ব্যবহারের প্রবণতা আছে। এর থেকে বহুলপ্রচলিত আইরিশ লাস্ট নেম কিন্তু কম নয়। যাহোক, এটা তেমন কোনো সমস্যা না, হঠাৎ মনে হওয়ায় উল্লেখ করলাম।
বইটার প্রচ্ছদ যে দারুণ সেটা আগেও বলেছি।
ডিউক জন ওয়েস্টার্ন সিরিজে একজন ওজনদার লেখক হয়ে উঠবেন আশা করা যায়। শুধু ভবিষ্যতে আরও প্লট সমৃদ্ধ কাহিনী নির্বাচন করতে অনুরোধ রইল।
বহুদিন বাদে ওয়েস্টার্নে প্রত্যাবর্তন করেছিলাম এ বইয়ের মাধ্যমে ২০১৪ সালে।
একটু অন্য ধাঁচের কাহিনি। ওয়েস্টার্ন বলতে যেমনটি বোঝায় ঠিক তেমন না বইটির কাহিনি। ধুম ধাড়াক্কা অ্যাকশন নাই, গরু বাছুরের হাম্বা হাম্বা নাই, প্রতিশোধ নাই। সাধারণ এক পরিবারের কাহিনি, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সোনার খোঁজে বের হয় তারা।
অ্যাকশনের ঘনঘটা না থাকলেও ভালোই লেগেছে, একটু ভিন্নতার স্বাদ পাওয়া গেছে লেখকের কাব্যিক স্টাইলের লেখায়। তবে প্রথম বই হিসেবে অল্প কিছু দুর্বলতা থেকেই গেছে। বাক্য গঠন, শব্দ চয়নে আরেকটু যত্নবান হলে বইটার উৎকর্ষতাও আরেকটু বাড়তে পারত।
এই দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠা, টুকটাক বই পড়ার অভ্যাস আছে এমন আরো অনেকের মতই আমার “আউট বই” পড়ার অনেকটুকু জুড়েই সেবা প্রকাশনী। কিশোর পত্রিকা, রহস্য পত্রিকা, তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা, কুয়াশা… সময়ে-অসময়ে সবই গিলেছি গোগ্রাসে। কিন্তু কোন এক না জানা কারণে সেবা প্রকাশনীর এক বিশাল রত্নভান্ডার আমার কাছে এখনো অনাবিষ্কৃত - ওয়েস্টার্ন।
সেই ওয়েস্টার্ন নামক গুপ্তধন খুড়তে গিয়ে প্রথম ধাপ ছিল এই “সূবর্ণ সমাধি”। ব্যাপারটা মজার, বিভিন্ন রিভিউ মারফত জানতে পারলাম এই বইয়ের লেখক যিনি সেই ডিউক জনের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ওয়েস্টার্ন বইও নাকি এটাই! ওয়েস্টার্ন হিসেবে এ বই কেমন সে হিসেব জানিনা, কিন্তু নিঃসন্দেহে এটা “সেবা প্রকাশনীর” বই! বহুদিন পড়ে সেই পুরনো দুরুদুরু বুকের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কোন বই শেষ করলাম। পরেরদিন ভোরে অফিস, আমি মশারির ভেতরে মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে রাত একটা পর্যন্ত বই পড়ছি, কিংবা পুরোদমে অফিস চলছে আমি ল্যাপটপ খুলে ডেস্কের উপরে বই রেখে গল্প শেষ করছি, বা পাশের টেবিলে সুপারভাইজার বসা, ডানে হেড অফ এইচআর! দুরুদুরু বুক না তো কী?
এ গল্প আসলে কার? মা রোজমেরির? তার দু’ছেলে জোহান কিংবা জেসনের? নাকি তাদের বাবা মিস্টার মিলফোর্ডের? হতে পারে এ গল্প এলেনারও, যে দূর্ধর্ষ ভিলেন মারিয়াচির হাত থেকে পালিয়ে এসেছে, তাও যেন তেন পালিয়ে আসা নয়, প্রায় বিয়ের আসর থেকে উঠে এসেছে! নাকি এ গল্প অন্য ভিলেন ট্রায়ো মুয়েলার, শর্টি আর ট্যাটমের? যারা পাওনা টাকার দায়ে রোজমেরির যক্ষের মত আগলে রাখা র্যাঞ্চ দখলের তালে আছে? যদিও ব্যাকফ্ল্যাপ পরলে মনে হবে এ গল্প আসলে ট্রেজার হান্টের, লুকিয়ে থাকা স্বর্ণের গুপ্তধন উদ্ধারের!
বইয়ের তুলনামূলক ছোট কলেবরের কারণেই এত এত সম্ভাবনার কোনটাই পুরোপুরি পাখা মেলে উড়তে পারেনি। বইয়ের গঠনে রয়ে গিয়েছে বেশ কিছু দূর্বলতা, শেষটা করা হয়েছে বড্ড তাড়াহুড়ো করে, এলোমেলো, প্রায় রূপকথার গল্পের মতন করে। কিন্তু এতশত ভাবতে আমার বয়েই গিয়েছে! চমৎকার লেগেছে মাঝেমাঝেই ফ্ল্যাশবাকে গিয়ে টাইমলাইন জাম্প করে বিভিন্ন ক্যারেক্টারের বিল্ড-আপ। ভালো লেগেছে মিস্টার মিলফোর্ড আর রোজমেরির প্রথম দেখা হবার কাহিনী, পুরো যেন টাইটানিক মুভির একটা ছোট্ট পার্ট! ভালো লেগেছে জোহান আর এলেনার প্রেম-প্রেম ভাব। এই বই থেকেই জানতে পেরেছি ক্যালিফোর্নিয়া নাকি একসময় মেক্সিকোর পার্ট ছিল। ছোট্ট একটা গুগল সার্চ জানালো শুধু ক্যালিফোর্নিয়াই নয়, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা, ইউটাহ, নেভাডা, কলোরাডো এসব রাজ্যের বিরাট অংশও নাকি মেক্সিকোতেই ছিল। ১৮৪৮ সালে যে এরা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হয় তা মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করলেও ঠিকঠিক বলে দিতে পারবো। অথচ “পড়ার বইয়ে” যা পড়েছি আর পরীক্ষার খাতায় বমি করেছি সেগুলো? থাক সে আলোচনা।
সবকিছু মিলিয়ে আহামরি কিছু হয়ত নয়, কিন্তু চমৎকার এক পেইজ টার্নার এই সূবর্ণ সমাধি। আর হ্যা, আলাদা করে যদি কিছু বলতে হয় তবে বলতে হবে প্রচ্ছদের কথা। সেবা প্রকাশনীতে করা আমার প্রথম অনলাইন অর্ডারের একটা বই ছিল এটা। যে যাই বলুক, অনলাইনে মানুষ প্রচন্ড প্রভাবিত হয় ছবি দিয়ে। তাই অন্য সব ওয়েস্টার্ন রেখে এটা কার্টে অ্যাড করার পেছনে যে এই বইয়ের প্রচ্ছদের ভূমিকা ছিল তা অস্বীকার করতে পারবো না!
এই বইয়ে পরিপক্কতার যে ঘাটতি , তা ধীরে ধীরে অন্যান্য বই দিয়ে ডিউক দা ঘুচিয়ে দিচ্ছেন । কিন্তু , শুধু অনুবাদ আর রহস্যপত্রিকার লেখা নিয়ে মেতে আছেন কেন ? ওয়েস্টার্ন চাই !
টিপিকাল ওয়েষ্টার্ন জনরা থেকে কিছুটা ভিন্ন। লেখকের প্রথম এ জনরায়। অভিষেক হিসাবে মন্দ বলবো না। গল্প টপ স্কোর না হলেও লেখকের লেখন শৈলী টপ স্কোরেরও উপড় রাখবো। প্রত্যেকটা লাইন, প্যারা, অধ্যায় যেন কোন কাব্য রূপ গদ্য! প্রত্যেকটা সিনারিও যেন ভীষণ জীবন্ত। এতো সুন্দর পারিপার্শ্বিক বর্ণনা আর উপমার ঢংয়ে লেখা, কেমন যেন নেশা নেশা লাগে! মনে হচ্ছিলো আমিও হারিয়ে গেছি সেই সময়টায়। তপ্ত বালুকাবেলা, অথৈ সাগর আর ধাঁধাময় কোনো এক অচেনা জঙ্গলে। সবুজের অরণ্য যেন শ্বাপদ সংকুল পথ। ধুরু ধুরু বুকে কেবল বাঁচার আকুতি।
সবশেষ মন ভালো করে দেয���া এক লু হাওয়া অনুভূতি। ভালো। সব মিলিয়ে ভালোর ক্যাটাগরিতে থাকবে বইটা। সুন্দর নাম, সুন্দর প্রচ্ছদ, সহজের কেড়ে নিয়েছিলো পাঠকমন। লেখক হিসাবে নামটাও ভরসার। নির্দ্বিধায় তুলে নেয়ার মতো 'সুবর্ণ সমাধি।'