আমি নিজে যেহেতু কবিতা লিখি, কবিতার বই বের করি – কেউ কেউ আমাকে বলেছেন আমি কবিতার বইয়ের রিভিউ কেন করি না! আসলেই কেন করি না! আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করি! আমার কাছে মনে হয় কবিতার বই রিভিউ করা অত্যন্ত দুঃসাহসিক একটি কাজ। একেকটি কবিতা যেন একেকটি ছোট গল্প, একেকটি কবিতা যেন একেকটি উপন্যাস। আমি কীভাবে ৬০টি ছোটগল্পকে তিনটি অনুচ্ছেদে ব্যবচ্ছেদ করে ফেলব? কীভাবে আমার মতো ক্ষুদ্র মানব ৬০টি ছোটগল্পের রিভিউ করে ফেলবে এক লহমায়?
তবে কী আমার কেনা এত এত কবিতার বই কেমন লাগল আমি জানাব না অন্য কবিতা-পিয়াসীদের? জানাতেই হয়। তাই ঠিক করলাম আমি আসলে একটি কবিতার হৃদয় খুঁড়ে বের করে আনব আবেগের কেন্দ্রবিন্দুটি, তারপর তাকে ঘিরে সাজাব আমার পংক্তিমালাসমূহ। বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে যে সুর, তাঁকে কেন্দ্র করে কবিকে, তার প্রকাশনাকে ব্যবচ্ছেদ করব। আজ কথা বলব কবি রাকিবুল হায়দারের কবিতার বই ‘আবার কোনো সমুদ্রজন্মে দেখা হবে’ নিয়ে।
কবি রাকিবুল হায়দারকে আমি চিনি ৪ বছর ধরে। এমন একজন মানুষ যাকে আমি যতটা চিনি কবি হিসেবে, তারও বেশী চিনি মানুষ হিসেবে। তাকে নিয়ে নির্মোহ কোন লেখা তৈরি করা সম্ভব না আমার পক্ষে এবং আমি তা চাইওনা। একজন কবি এবং তার ব্যক্তিসত্বা আলাদা নয়। কবি রাকিবুল হায়দার তরুণ কবিদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী কবি-ই কেবল নন, তিনি একজন শক্তিশালী মানুষ। মনে, মননে। বইটির প্রথম ফ্লিপে কবি রাকিবুল হায়দার নিজেকেই নিজে তুলে ধরেছেন। এই লেখাটিকে স্বগোক্তি বলা যায়, তবে আমি বলব একটি শিরোনামহীন কবিতা। কবিতাটির প্রথম লাইন ‘বাড়ি ফেরা হয় না অনেকদিন’। আপনি যদি কবিতাটির আর একটি লাইনও না পড়েন, আপনি অনুভব করবেন কি সুতীব্র এক বাড়ি ফেরার আকাংখা লুকিয়ে আছে কবির হৃদয়ে, অনুভবে। কবিতাটিতে আছে অভিমানের কথা, রাত জেগে ঘুরে বেড়ানোর কথা। শেষের আগের লাইনটি এমন
‘তারপর শৈশব বুকপকেটে জমা করা রঙপেন্সিলের টুকরোগুলো আঙুলের ভাঁজে নিয়ে, ঘরের দেয়ালকে ক্যানভাস ভেবে ইচ্ছেমতো ছেলেমানুষি যতোসব ছবি আঁকাআঁকি।’
এখানেই চাইলে আমি আমার রিভিউ শেষ করে ফেলতে পারতাম, কিন্তু পারি না। শেষ লাইনটি শোনাতে চাই সবাইকে - ‘কবিতার নাম করে আমি এঁকে যাই আমার ফিরে আসার মানচিত্র’।
কবির মধ্যে ঘরে ফেরার এক অব্যক্ত আকুতি শোনা যায় পুরোটা বইজুড়ে, প্রতিটি কবিতার মাঝে লুকিয়ে থাকা শেষ বিকেলের বিষণ্ণ আলোয়। কবি যদি কখনও ঘরে ফেরার মানচিত্র এঁকে ফেলেন, যদি ফিরে যান ঘরে – তবে কি কবিতার সাথে তার যে গাঁটছড়া তা শেষ হয়ে যাবে? জানি না! তবে মনে হয় কবির এই মানচিত্র কখনওই আঁকা শেষ হবে না। আমরা যদি বইয়ের মলাট উল্টে কবিতার মুখ, গ্রীবা, স্তন পেরিয়ে ঊরুসন্ধিতে পৌঁছে থামি, তবে পাব কবিতা ‘আমাদের সংসার’।
‘আমাদের চারদেয়ালের এক সংসার হবে নিলু’, কবিতার প্রথম লাইনটি বলে দেয় আশাবাদী কবি রাকিবুল হায়দার জীবনকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে, প্রতিনিয়ত ধাক্কা খেয়েছেন বাস্তব-অবাস্তবের সীমানারেখায়, ভালোবেসেছেন বেঁচে থাকার পর টিকে থাকা কষ্টটুকুকে। কবি চেয়েছেন প্রেমকে আগলে রাখতে, ভালোবাসতে। কবি চেয়েছেন অনাগত ভবিষ্যতকে নিয়ে সুখে থাকতে।
‘আমাদের চারদেয়ালের এক সংসার হবে নিলু, তোমার-আমার ভালোবাসায় এই পৃথিবীতে ডেকে আনবো, ছোট ছোট আঙুল আর পায়ে ভর করা স্বর্গের কোন বার্তাবাহককে, ঘরময় ছুটোছুটি করবে আমাদের সন্তান, হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে, তুমি ছুটে যাবে, তার ব্যথায় তোমার কান্না পাবে, আমারো বুকে ব্যথা হবে।’
রাকিবুল হায়দারের প্রতিটি কবিতা ছুঁয়ে যায় মধ্যদুপুরে দীর্ঘশ্বাস ফেলা একাকী নাবিককে, জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রান্ত করা মানুষ কিংবা উঠতি তরুণ কিংবা তরুণীর রক্তাক্ত হৃদয়কে। কবি রাকিবুল হায়দারের কবিতার মায়াজাল থেকে তাই মুক্তি মেলে না, পুরো বইটি বারংবার আউড়ে গেলেও।
কবিতার ইতিহাসে প্রেমের কবিতার চাইতে শক্তিশালী কবিতা কখনও হয়নি, প্রেমের কবির চাইতে বড় কবি কেউ হননি আমাদের হৃদয় আসনে, আর হয়ত তাই, রাকিবুল হায়দার হয়ে উঠেছেন তারুণ্যের প্রিয় কবি।
‘প্রচ্ছন্ন আঁধারে ফোঁটা গোলাপ’ কবিতায় তিনি বলেছেন,
‘সরকারী প্রজ্ঞাপন জারি করে, এই শহরে গোলাপ নিষিদ্ধ হবে বলে যে গুজব ছড়িয়েছে, তাতে ভয় পেয়ো না কিছুতেই, আমার হৃদয়ের বারান্দায় রাখা টবে, তোমার জন্য প্রতিদিন একটি করে গোলাপ- আমি খুব গোপনে ফোটাবো।’
প্রেমিক হিসেবে রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুশাসনে আপত্তি, প্রেমের প্রতি আনুগত্য, তারুণ্যের নির্ভীকতার প্রতিচ্ছবি রাকিবুল হায়দারের কবিতার বই ‘আবার কোন সমুদ্রজন্মে দেখা হবে’। সংসারের ভালোবাসার জন্য কাঙাল কবি কি আসলে কখনও দেখা পাবেন তরল ভালোবাসার? যদি পান তবে কি হারিয়ে যাবে তার কাব্যদুতি? কবি কি পারবেন জগৎ-সংসার কাটিয়ে কবিতার মধ্যে ডুবে থাকতে? কবির পঙক্তিমালায় ইথারের ধ্বনির মতো ভেসে ভেসে আসে অনিশ্চয়তা, হতাশার সুর,
‘আমাকে ভালোবাসলে এমনই হবে নিলু, কেউ তোমার ভালোবাসার মানুষের পদমর্যাদা জানতে চাইলে, তুমি তোমার লাল পার্স হাতড়ে খুঁজবে বলবার মতো কোন কাজের নাম। তোমার কিছুতেই মনে পড়বে না, স্বপ্নের কারখানায় আমার নিত্য অফিস করবার কথা।’
বইটিতে বার বার, ঘুরে ফিরে এসেছে কয়েকটি শব্দ – নিলু, পারমিতা, ইতিহাস! পড়বার সময় শব্দগুলো জিভে বিঁধেছে। বিষয়বস্তুতে বৈচিত্রের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তারুণ্যের পরিচয় আক্রমণাত্মকভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে নিয়েছে কবিতার বুক-পিঠ মাঝে মাঝে। সময়ের সাথে পরিমিতিবোধের প্রত্যাশা থাকল। বানান এবং বাক্যগঠনে উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। কবির আগের দুটি বই ‘তুমি আমার শঙ্খ অভিমান’ এবং ‘যুক্তিসঙ্গত কারণেই তুমি আমার’কে ছাড়িয়ে গিয়েছে ‘আবার কোনো সমুদ্রেজন্মে দেখা হবে’ – গুণে এবং মানে! কিন্তু সামনে আর এগুতে চাইলে কবিকে কবিতার সম্পাদনায় অনেক সময় দিতে হবে। বইয়ের প্রকাশনার মান সাদা-মাটা। কবিতার বই হাতে নিলে প্রেম জন্মাতে হয়, প্রতিটি পাতা ওল্টানোর সময় ভালোবাসতে হয়। ঘাসফুল প্রকাশনী কবিতার বই প্রকাশের ক্ষেত্রে সেই মান বজায় রাখতে পেরেছে বলে মনে করি না। প্রচ্ছদ সুন্দর তবে ভেতরের ফ্ল্যাপের লেখাগুলো ফুটে ওঠেনি লাল-কালোর প্রকটতায়।
কবি রাকিবুল হায়দার তার ব্যক্তিসত্বাকে, ব্যক্তিজীবনের টানা-পোড়েনকে উপজীব্য করে লিখতেও তাতে ধ্বনিত হয় সহস্র তরুণের কন্ঠস্বর। কবি সামনের দিনগুলিতে আরও প্রেমের কবিতা উপহার দেবেন, সাথে সাথে সম্পাদনা আর বিষয়বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেবেন এই কামনা থাকল।
দারুণ এই কবিতার বইটি যা ইতিমধ্যে আছে রকমারি বেস্ট সেলার তালিকায়, সংগ্রহ করে নিতে পারেন অনলাইন থেকে।
Rakibul Haider ভাইয়ের প্রথম বই যুক্তি সঙ্গত কারণেই তুমি আমার, দ্বিতীয় বই তুমি আমার শঙ্খ অভিমান এর আজকে পড়লাম আবার কোনো সমুদ্রজন্মে দেখা হবে... ভাইয়ার ছোট ছোট কিংবা ফ্ল্যাশ টাইপের কবিতাগুলা বেশি ভাল লাগছে। আমি খানিক পরেই সেই লাইনগুলোর বই আপলোড দিবো। তবে আকারে বড় কবিতা কেন জানি এবার টানে না... এটা কি উনার বিবাহের প্রতিক্রিয়া নাকি আমার রুচির অবনতি, ভাবনার বিষয়... শুভ কামনা।