আহমাদ মোস্তফা কামালের জন্ম মানিকগঞ্জে। তার বাবার নাম মুহাম্মদ আহমাদুল হক এবং মায়ের নাম মেহেরুন্নেসা আহমেদ। পাঁচ ভাই এবং তিন বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। মানিকগঞ্জের পাটগ্রাম অনাথ বন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে এসএসসি, ১৯৮৮ সালে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯২ সালে স্নাতক, ১৯৯৩ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে এম ফিল এবং ২০১০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পেশাগত জীবনের শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি।
লেখালেখির শুরু '৯০ দশকের গোড়া থেকেই। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় মানুষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে, এরপর আরো ছ’টি গল্পগ্রন্থ, ছ’টি উপন্যাস ও চারটি প্রবন্ধগ্রন্থ বেরিয়েছে। তাঁর চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ‘ঘরভরতি মানুষ অথবা নৈঃশব্দ্য’ ২০০৭ সালে লাভ করেছে মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ পুরস্কার, দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অন্ধ জাদুকর’ ভূষিত হয়েছে ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার ২০০৯’-এ, তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ‘কান্নাপর্ব’ ২০১২ সালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে লাভ করেছে ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩’।
'বাইরে সীমাহীন আকাশ, অজস্র নক্ষত্র, প্রেম অথবা মৃত্যু-ডাকছে আমাকে, যাই'।
জীবনের সংজ্ঞা কি? জীবনের শুরু আছে আর শেষ আছে। কিন্তু জীবনের শেষে মানুষ কি জয়ী নাকি পরাজিত এক জীব? একদিন তো সবকিছু ধ্বংসই হয়ে যাবে তাহলে মানুষ এত ছুটে কিসের পেছনে?
সবকিছুই তো একদিন মলিন হয়ে যায়; এমনকি স্মৃতি ম্লান হয়ে যাবে। শোক ভুলে যাবে প্রিয়জন। তাহলে সেই সম্পর্কেই অর্থ কি, যে সম্পর্কে থেকেও একাকীত্বে ভুগে মানুষ? তাহলে এই জীবনের অর্থ কি, যে জীবন থেকেও না থাকার আকুলতায় প্রার্থনা করতে হয় প্রতিনিয়ত?
আহমাদ মোস্তফা কামাল রচিত একলা থাকার গল্পগ্রন্থ পড়লে এমন সব প্রশ্নই মাথায় ঘুরপাক খাবে পাঠকের। এককথায় প্রকাশ করলে চরম বিষণ্ণময় একটা গল্পের বই।
বইয়ের পাতায় পাতায় শব্দের জাল বুনে লেখক পাঠককে টেনে নিয়ে যায় বিষণ্ণতা ঘেরা, নিঃসঙ্গতার চাদরে মুড়ানো, একাকীত্বকে সঙ্গী করে শূন্যতার এক অদ্ভুত ভুবনে। যে ভুবন থেকে বেরিয়ে আসার পরও দীর্ঘ সময় ধরে রয়ে যাবে রেশ, আবেগ আর ভাবাবেশ।
গল্পগ্রন্থে মোট গল্প আছে ১০টি। প্রতিটি গল্পই স্বতন্ত্র। বৈচিত্র্যময় ১০টি গল্পের কয়েকটা বিষয় একেবারেই কমন। শূন্যতা, নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব আর বিষণ্ণতা। আর ঠিক এখানটাতেই সার্থকতা পায় গল্পগ্রন্থের নামকরণ-একলা থাকার গল্প।
লেখনশৈলী বেশ গুছানো আর সাবলীল। একইসাথে প্রাঞ্জল এবং সহজ হওয়ায় নান্দনিকতার একটা রেশ পাওয়া যায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জীবনের গভীর অন্তর্নিহিত কিছু বাক্যের সংযোজন।
তবে ব্যক্তিগতভাবে এত বিষণ্ণতায় কিছুটা বিষণ্ণ হয়েছি। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে খুঁজে পেয়েছি প্রতি গল্পের শুরু থেকে শেষ অবধি বিষণ্ণ পরিবেশ। যদিও কিছু প্রেক্ষাপটে বর্নীল বর্ণচ্ছটা ছিল। তবে অলিগলি ঘুরলেও রাজপথে এসে সেই একই খুঁটির সাথে গল্প বাধা। আর গল্পগুলো একদমই ছিমছাম আর সাদামাটা।
বিশেষ কিছু উক্তি ছাড়া তেমন ভালো কিছু গ্রহণ করতে পারিনি সেগুলো থেকে। যদিও ১০টা গল্পের মধ্যে ৩/৪টা গল্প ভালোই লেগেছে। তবুও সব মিলিয়ে বিষণ্ণ হয়েছি ভীষণ।
উক্তিসমূহ:
'মানুষ কি চিরদিন থাকে? সবাইকেই তো যেতে হয়। মানুষ পৃথিবীতে আসেই চলে যাওয়ার জন্যে। মাঝখানের এই জীবনটাতে সে নিজে অন্যের তৈরি করা মায়ায় জড়ায়, আর অন্যদের জন্যে নিজে কিছু মায়া তৈরি করে। জীবন তো এটুকুই'!
'না থাকার বেদনার চেয়ে পেয়ে হারানোর শূন্যতা অনেক বেশি হাহাকারময়'।
'বাবা না থাকা মানে চিরদিনের জন্যে বাবা বলে ডাকার সুযোগ হারিয়ে ফেলা। বাবা না থাকা মানে সন্তানের হঠাৎ করে অনেকখানি বয়স বেড়ে যাওয়া'।
'মানুষের নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই। তবুও মানুষ কেন ছুটে বেড়ায়? জীবনের জন্য? জীবনের কোন অর্থ কি আছে, যেখানে সবকিছুই বিলীন ও ধ্বংস হয়ে যাবে? মানুষ চূড়ান্ত বিচারে পরাজিত এক জীব'।
'পৃথিবীতে মৃত্যুর মতো সুন্দর কোনোকিছু নেই, আর নিজে সুন্দর বলেই সে যাকে স্পর্শ করে তাকেও সুন্দর করে তোলে'।
'প্রেম এক যৌথতার নাম, এখানে একক সিদ্ধান্তের অবকাশ নেই। এমনকি দুজনের ব্যক্তিগত বিষয়-আশয়ও যৌথভাবে ব্যক্তিগত, সেটা মনেরই হোক আর শরীরেরই হোক'।
'সব শোকই একদিন ম্লান হয়ে যায়, সব স্মৃতিই একদিন ধূসর হয়ে যায়। এমনকি প্রিয়জনের মৃত্যুর শোকও একদিন কাটিয়ে ওঠে মানুষ'।