১৯৯৬ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন। রাজনৈতিক নেতাদের মতবিরোধ, এরশাদের মুক্তি নিয়ে উত্তেজনা, সেনাপ্রধানের অভ্যুত্থান-প্রচেষ্টাসহ নানা ঘটনা ঘটেছে সে সময়। অন্তরালের সেই ঘটনাপ্রবাহে প্রত্যক্ষ বিবরণ লিখেছেন সে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
Muhammad Habibur Rahman (Bengali: মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান) was a former chief justice of Bangladesh Supreme Court in 1995. He was the chief adviser of the 1996 caretaker government which oversaw the Seventh parliamentary elections in Bangladesh.
He is an author of seventy books in Bengali on law, language, literature, poetry and religion and five books in English, including two books of verse.
২৯৪ পাতার পুরো বইটি বিচারপতি ও ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান 'স্মৃতিকথা' বটে। তবে বিশুদ্ধ স্মৃতিকথা একে বলা যাবে না। তারচেয়ে প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমানের স্মৃতির খণ্ডচিত্র বললে সত্যের কাছাকাছি থাকা যায়। স্মৃতিচারণের পাশাপাশি এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সর্ম্পকে পত্রিকার প্রতিবেদন, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে হাবিবুর রহমানের দেওয়া ভাষণ স্থান পেয়েছে।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একতরফা নির্বাচন করে বিএনপি ক্ষমতা হজম করতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়কের দাবি মেনে পদত্যাগ করতে হয়। সর্বশেষ অবসর নেওয়া প্রধান বিচারপতি হিসেবে উপদেষ্টাদের নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন হাবিবুর রহমান। প্রধান দলগুলোর আস্থা অর্জনই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর এবং উপদেষ্টাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেই পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করেছিলেন তার কিছু কিছু ঘটনা এই বইতে লিখেছেন। তবে লেখার চাইতে না লেখার অংশটাই বেশি। অর্থাৎ পাঠকের জানার বাড়তি আগ্রহ যেদিকে থাকার কথা, সেদিকগুলো পারতপক্ষে স্পর্শ করেনি প্রধান উপদেষ্টার কলম।
তাঁর লেখা পড়ে মনে হয়েছে তিনি আসলে 'যেনতেনভাবে' দায় এড়াতে চেয়েছিলেন। বিএনপি এই নির্বাচনে পরাজিত হয়। 'পুকুরচুরি'র অভিযোগ আনে। এমনকি একপর্যায়ে ফল প্রত্যাখানের সিদ্ধান্তও নাকি নিয়েছিলেন বেগম জিয়া এমনও জানা যায়।
কিছু পয়েন্ট পাঠক হিসেবে আমাকে আকর্ষিত করেছে। যেমন,এদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলাদা মাথাব্যথা থাকে। এই দেশগুলো নিজেদের প্রেশার গ্রুপ হিসেবে দেখাতে তৎপর থাকে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি আর জামাতই শুধু নয় আওয়ামী লীগকেও ধর্ম নিয়ে বিশেষ সচেতন হতে দেখা যায়। শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী বক্তব্যের একপর্যায়ে ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত সময়ে ঘটা ঘটনাসমূহকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান। বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগও ইশতেহারের ঘোষণা করে, তারা বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি নবায়ন করবে না। হাবিবুর রহমান দাবি করেছেন, ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের নির্বাচনী বক্তব্যে 'বিসমিল্লাহ'-এর আধিক্য না থাকলেও এবার তা চোখে পড়ার মতো।
রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও সেনাপ্রধান নাসিমের দ্বন্দ্ব, ক্যু করার চেষ্টার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী লেখক নিজে। এই অংশটি জটিল করে লেখা অথচ কৌতূহলউদ্দীপক।
বিএনপির আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস তার দলকে 'এক্সট্রা' কিছু সুযোগ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন - একথা এই বই পড়তে সহজেই বোঝা যায়। ইয়ে মানে সব আমলেই তো রাষ্ট্রপতি সরকারি দলকর্তৃক নির্বাচিত হন। তাহলে তারাও কী দরকার পড়লে 'এক্সট্রা' সুযোগ সুবিধা করে দিতে চান নিজেদের সাবেক দলকে? লাখ টাকার প্রশ্ন। কিন্তু জানার কোনো উপায় নেই।
পড়তে গিয়ে কিছু বিষয়ে প্রশ্ন জেগেছে। যেমন, আওয়ামীপন্থী জনতার মঞ্চে বেশক'জন আমলার আনাগোনার খবর তখন গণমাধ্যমে চাউর হয়েছিল। একপর্যায়ে আদালতও এসব আমলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল। কিন্তু কেন প্রধান উপদেষ্টা সেইসব আমলাকে নির্বাচনের সল্পকালীন সময়ের জন্যও সরিয়ে দেননি তা পরিষ্কার নয়৷ জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়াই তখন ভোটাররা ভোট দিতে পারতো। তাহলে গণহারে যে জাল ভোট পড়েনি তার নিশ্চয়তা কতটুকু? তিনি নিজেই পত্রিকার কিছু সংবাদ ও মন্তব্য যোগ করেছেন বইতে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ নিয়ে কমবেশি শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে প্রধান উপদেষ্টা যদি যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন তাহলে এই শঙ্কার কথা আসতো কীনা।
একটু স্মৃতিচারণ,নিজের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে পত্রিকার মন্তব্য এবং ভাষণ নিয়েই হাবিবুর রহমানের 'তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ভার'।