নারীর রূপরচনার ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যাবে, ভারতীয় নারীর সাজে যত বৈচিত্র্য আছে পৃথিবীর অপর কোন দেশের নারীর পোশাকে তা নেই। প্রাচীনকাল থেকে এদেশের নারী আপন রূপরচনার ক্ষেত্রে এমন অসামান্য নজির স্থাপন করেছিলেন যার সঙ্গে প্যারিসের প্রখ্যাত ডিজাইনার ডিয়রের কোন মতপার্থক্য নেই। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। ভারতের সব নারীই কমবেশি সৌন্দর্য সচেতন। তাঁদের সৌন্দর্যপ্রিয়তাই গৃহকে করে তুলেছে মন্দির, গৃহস্থালির প্রতিটি প্রয়োজনীয় সামগ্রীকে করেছে দৃষ্টিনন্দন। আবরণে-আভরণে নিজেকে সুন্দর করে তোলাও তারই অঙ্গ। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন অনেকসময় নারীদের জীবনে নিয়ে এসেছে সঙ্কট ও অনিশ্চয়তা। তার প্রভাব পড়েছে তাঁদের পোশাক ও প্রসাধনে, অলঙ্কার ও অবগুণ্ঠনে। ভারতীয় নারীর সাজসজ্জার এই বিবর্তনের ইতিহাসটিকেই তুলে ধরেছেন চিত্রা দেন, সঙ্গে আছে বিভিন্ন সময়ের সুসজ্জিতা নারীর অনেকগুলি ছবি।
বাংলাভাষা ও সাহিত্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উপাধি লাভ করে চিত্রা দেব মধ্যযুগের এক অনাবিষ্কৃত মহাভারতের ওপরে গবেষণা করে ডক্টরেট পেয়েছেন। কবিচন্দ্রের মহাভারত, বিষ্ণুপুরী রামায়ণ, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল ও ময়ূরভট্টের ধর্মমঙ্গল সম্পাদনা করেছেন একক ও যৌথভাবে। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর নিরন্তর গবেষণার উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি রয়েছে বিদগ্ধ মহলে। মধ্যযুগীয় সাধারণ মানুষ ও পুঁথিপত্র সম্পর্কে লিখেছেন একটি প্রবন্ধ সংকলন ‘পুঁথিপত্রের আঙিনায় সমাজের আলপনা। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে লেখা তাঁর অপর উল্লেখযোগ্য গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’। অনুবাদ করেছেন প্রেমচন্দের হিন্দী উপন্যাস ‘গোদান’ ও ‘নির্মলা’। বাংলার নারী জাগরণের বিভিন্ন তথ্য সংকলনে ও বৃহত্তর গবেষণা করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার গ্রন্থাগার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রয়াণ : ১ অক্টোবর, ২০১৭।
নিজেদের ঐতিহ্য এবং তার গোড়াটা জানার জন্য এই বই পড়া জরুরি। পোশাক-অলংকার যা নিত্য জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তা কীভাবে এল, কীভাবে পরিবর্তিত হল, কোথায় তার প্রয়োজন এসব জানলে নিজেকে আরো ভালো করে যেমন প্রকাশ করা যায়, তেমনি ব্যক্তিত্ব বিকাশেরও সহায়ক হয়।
আচ্ছা কখনো ভেবে দেখেছেন কী আজ আমাদের যেরূপ সাজসজ্জা, সৃষ্টির আদি লগ্নে এমনই ছিল কিনা!!উত্তর হলো না,মানুষ যেমন বিবর্তনের মাধ্যমে আজ সভ্য মানুষ ঠিক তেমনই সাজ-সজ্জার ও হয়েছে আমূল-পরিবর্তন। আবরণে -আভরণে ভারতীয় নারী, বইটিতে খুব সুন্দর করে চিত্রা দেব, ভারতীয় নারীদের বেশভূষার বিবরণ দিয়েছেন। এত সুন্দর করে লেখিকা আদি ও বর্তমান, নারীর পোশাক ও অলংকারের বর্ণনা দিয়েছেন তা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। ভারতীয় নারীদের পছন্দের পোশাক শাড়ি কিন্ত এক সময় এমন ছিল না।ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন দেশ থেকে শাসক ও লোকজন আসতো তাই তাদের মেয়েদের বেশভূষা ভারতীয় নারীদের প্রসাধন ও পোশাকের অংশ হতে থাকে দিনে দিনে।মোঘল আমলে নূরজাহান পোশাক অঙ্গনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি বিভিন্ন কারুকার্য নিয়ে এসেছিলেন পোশাকে এবং বোতামের আবিষ্কারকর্তী। প্রাচীন কালে সোনার গয়নার বাহার ছিল প্রভাবশালীদের ভিতরে।নিম্ন শ্রেণির মানুষেরা গয়নার ডিজাইন শরীরে উল্কি এঁকে ফুটিয়ে তুলতো,বিহারে এখনো সেটা প্রচলিত। #ছোট একটা বই কিন্তু অনেক তথ্যে পরিপূর্ণ, সময় থাকলে পড়তে পারেন। ভারতীয় উপমহাদেশের নারীরা অন্য সংস্কৃতিরর জিনিস তাদের পোশাক ও অলংকারে প্রবেশ করিয়েছেন ঠিকই কিন্তু যা ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে যায়নি তা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছেন।তাই এত বিবর্তনের পরেও বিয়ের দিনটিতে আমরা শাড়ি পরতে চাই আর পুরাতন হলেও আমাদের সাজসজ্জা কিন্তু পরিবর্তন করে ফেলিনা, হ্যাঁ কিছুটা পরিবর্তন এসেছে ফিউশন ঢুকেছে কিন্তু মূল ধারা একই রয়েছে। 😊😊
চিত্রা দেবের বই আমার এই প্রথম নয়। প্রথম আমি পড়ি অনন্তপুরের আত্মকথা। এই বইটি পড়েই আমি একেবারে ধরাশায়ী।তারপর থেকে যাই পড়ি আমার এক ই অবস্থা। চিত্রা দেবের আবরণে আভরণে ভারতীয় নারী গভীর গবেষণামূলক তথ্যবহুল কথার ছলে লেখা।লেখার মাঝে মাঝে লেখিকার মতামতও আছে।তাই বইটি পড়তে পড়তে কোনো গবেষণামূলক থিসিস্ পড়ছি মনে হয় না। অত্যন্ত প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক কাল অবধি নারীর আবরণ ও আভরণ কি ভাবে সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রভাবিত হয়ে পরিবর্তিত হয়েছে তার সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। ২৬ পাতায় বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন পোশাকের নাম এবং ৩৬ পাতায় অলঙ্কারের নাম পড়লে অবাক হতে হয়। সবকিছু আমাদের স্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবার আগে একজায়গায় লিখে রাখা লেখিকার এক সুচারু প্রচেষ্টা। বইটির ছবিগুলো বইটির আকর্ষন বারিয়েছে।
ভারতীয় নারীর পোশাক ও সাজের বিবর্তনের ইতিহাসনির্ভর তথ্যবহুল বই। প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আপাত আধুনিক কাল পর্যন্ত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের হাত ধরে এ অঞ্চলের নারীর রূপ ও ভূষণ-চর্চায় যে আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবর্তন, তার সাথে জড়িত যে মনস্তাত্বিক বিবর্তন, সেগুলো ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে গল্পের ছলে। এ ধরনের ইতিহাসভিত্তিক বইয়ে লেখকের ব্যক্তিগত মতামত, উপদেশ অবাঞ্ছনীয়। তথ্যসূত্রের ফাঁকে ফাঁকে চিত্রা দেবের ব্যক্তিগত মতাদর্শের উপস্থিতি বইয়ের সাবলীল গতিতে কিছুটা ছন্দপতন ঘটায়। বইটি ছোট কলেবরের। শুরুতে কিছু আগ্রহোদ্দীপক ছবি সংযুক্ত রয়েছে। ছবির সংখ্যা আরো বেশি হলে এবং সব ছবি একত্রে শুরুতে না দিলে লেখার সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে জুড়ে দিলে পাঠকের আরাম হতো, বইটিও আরো তথ্যনিষ্ঠ হতো।