অদ্ভুত, বিষণ্ন এক পরিবারে জন্মেছিলেন সোরেন কিয়ের্কেগার্ড। অনেক ভাই বোন কিংবা স্কুলের সহপাঠীদের মধ্যে থেকেও নিঃসঙ্গ থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। বেঢপ আকৃতি ও কিম্ভূত পোশাকের জন্য সহপাঠীরা প্রায়শই উত্ত্যক্ত করত তাঁকে। ভাল জামা-কাপড় পরে কিংবা গায়ের জোরে যে ওদের মোকাবিলা করবেন, বাবার কড়া শাসন ও শারীরিক অসুস্থতার জন্য সে উপায়ও ছিল না। বাইরের নিষ্ঠুর জগৎ ও বাসার বিষণ্ন পরিবেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে 'অস্তিত্বশীল' থাকার জন্য দুটো মাত্র অস্ত্র ছিল হাতেঃ বোধশক্তি আর কল্পনা। জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য এদেরকেই শানিয়ে নিলেন। ধীরে ধীরে বোধ আরো প্রখর হল, ব্যপ্ত হল কল্পনা। শুধু ছোটবেলায় নয়, সারা জীবন এই হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন সোরেন। নিজের বিষণ্ন পরিবার কিংবা স্কুলের সেই ছেলেরা, বিদগ্ধ সমালোচক কিংবা বিশপ মার্টেন্সন, প্রতিদ্বন্দ্বী যেই হোক তাঁর হাতে বারংবার ঝলসে উঠেছে এরা। পরবর্তীকালে যখন হেগেল প্রমুখের মতো প্রবল প্রতাপান্বিত বুদ্ধিবাদী দার্শনিকদেরকে বা দিনেমার মনোজগতে অনড় আসন গেড়ে বসে থাকা প্রচলিত খ্রিস্টধর্মকে আক্রমণ করেন তখনো সম্বল ছিলো এই বোধশক্তি ও কল্পনা। জ্ঞান, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা নয়, চিরকাল তিনি ব্যক্তিমানুষকে আশ্রয় করেছেন, বাস্তব জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাঁর গুরু সক্রেটিসের মতো নিজ-অস্তিত্ব নিংড়ে সৃষ্টি করেছেন যুগান্তকারী দর্শন- অস্তিত্ববাদ।
চিন্তা করা যাক—বড়সড় একটা পাজল রাখা আছে সামনে। পাজলটা অলরেডি সলভড, যেখানে প্রতিটা টুকটা দারুণভাবে মিলেছে। এভাবে অ্যাবসোলুট মাইন্ড পোট্রে করে—কিভাবে ধারণা, ঘটনা এবং বিশ্বাস একত্রিত করে সামগ্রিক বাস্তবিকতাকে। হেগেলের দৃষ্টিতে আমরা, ব্যাক্তি–মানুষেরা অথবা মানুষের চিন্তাভাবনা এই পাজলের এক একটা অংশ মাত্র। তার এই ভাবনাকে সমালোচনা ক’রে সোরেন কিয়ের্কেগার্ড বলেন ভিন্ন কথা। তার মতে বিশ্বাস হচ্ছে সাবজেক্টিভ, আত্নপ্রকাশমূলক। বিশ্বাসের চূড়ায় আরোহন করা তেমনি এক নিজস্ব যাত্রা যেটা কোন সর্বজনীন তত্ত্বকে ভিত্তি করে নয়। সে যাত্রাপথ অন্বেষণ করতে গিয়ে গড়ন দিয়েছেন ‘অস্তিত্ববাদ’ এর।
এবার অস্তিত্ববাদ নিয়ে লম্বা লাইন টানার আগে দু’টো জিনিস সম্পর্কে ধারণা দেই— ১. বিষয়গত: যা নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত। (নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক) ২. বিষয়ীগত: ব্যাক্তির দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। (ব্যাক্তিগত ও আবেগ তাড়িত)
সোরেন কিয়ের্কেগার্ড হেঁটেছেন অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্নের বিষম এক যাত্রায়। হোঁচট খেয়েছেন বহুবার কিন্তু থেমে যান নি। তার মতে সত্যকে পেতে চাইলে বিষয়ীগত হতে হবে। আর বিষয়ীগত হওয়া মানে অস্তিত্বশীল হওয়া। এক কথায় স্বাধীন হওয়া। ধর্ম, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ইত্যাদির আবরণ সরিয়ে অস্তিত্বকে নগ্ন করা।
হোক সে মুসলিম বা খ্রিষ্টান কিংবা অন্য ধর্মের। পূর্বপুরুষের ছায়াতলে ধারণকৃত ধর্ম কি কেবলই জন্মগত অর্জন নয়? কিয়ের্কেগার্ড তাই বলেছেন অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড়াতে, প্রশ্ন করতে এবং ভাবতে—সেটা কোত্থেকে এসেছে, কেন এসেছে এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে। কেবলমাত্র তখনই ঝাপ দেওয়া যাবে অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে। কারণ অনিশ্চিত এবং নিশ্চয়তার সূক্ষ্ম পর্দার মাঝেই বাস করে বিশ্বাস। যেখানে গেলে ঈশ্বরকে ছোঁয়া যায়।