১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে যে অভ্যুত্থানটি হয়েছিল সেটির নায়ক ছিলেন সিপাহিরা, কিন্তু তার পেছনে সমর্থন ছিল দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের। অভ্যুত্থানটির চরিত্র ছিল বিপ্লবী। কেননা অভ্যুত্থান চেয়েছিল ১৭৫৭-তে ইংরেজ যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাকে মুছে ফেলে দিতে। দেশকে অর্থাৎ দেশের মানুষকে মুক্ত করার একটাই ছিল যথার্থ পক্ষ। কিন্তু রাজনীতির মূলধারা ওই পথে এগোয়নি। তাকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার চেষ্টা হয়েছে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তবু রয়ে গেছে মানুষের চেতনায়। তারই প্রকাশ দেখেছি বিপ্লবী রাজনীতিতে। বাংলাদেশের ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ১৮৫৭-এর যে রাজনীতি তারই নতুনতর প্রকাশ। এ বইয়ের প্রবন্ধগুলােতে মুক্তির জন্য সংগ্রামের ধারা, তার পথে প্রতিবন্ধক এবং আগামীর সম্ভাবনা—এই বিষয়গুলোর কয়েকটি দিকের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।
বইটা আগ্রহের সাথেই পড়া শুরু করসিলাম, প্রথম প্রবন্ধটা পড়ে খানিকটা উত্তেজিতও হয়ে গেসিলাম, কিন্তু শেষ দিক এসে—মানব ভাই যেটাকে বলে—বইটা এক্কাগাড়িতে বেঁধে টেনে নিতে হইসে। চমৎকার একটা শুরুর পর প্রায় সবখানেই ঘুরেফিরে একই কথা, একই যুক্তি।
সিরাজ স্যার সমাজতন্ত্রের প্রতি বায়াজ্ড—এটা নতুন কিছু না, এবং এতে আমার খুব একটা আপত্তিও নাই। ইতিহাস বায়াজ্ড হবে—এটা ধরেই নিসি—ফলে আমাদের দেশের ইতিহাস যদি পড়তেই হয়, কমিউনিস্ট লেখকের চাইতে নিরাপদ আর কী হতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হল, মতাদর্শ সুন্দর হলেও সেটার বিশ্বাসের চরমত্ব (extremism) ভালো কিছু নিয়ে আসে না।
কাজেই ইতিহাসের প্রতিটা দুর্ঘটনার পেছনে পুঁজিবাদের দায় খুঁজে বের করার সাথে বস্তুত ‘এ দায় বিরোধী দলের’ আর ‘এ সরকার দায় এড়াতে পারে না’ উক্তিগুলোর তেমন পার্থক্য নাই।
সেই সাথে হতাশ লাগসে কোথাও-কোথাও যুক্তির দৌর্বল্য দেখে। বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্যার বারবার লিখসেন যে, সিপাহি বিদ্রোহের পর ইংরেজদের মনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের আশঙ্কা হয়, এবং মধ্যবিত্তকে নিজেদের অনুগত বানাবার জন্য তারা কলকাতা-বোম্বাই-মাদ্রাজে তিনটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয় এই বিদ্রোহের তিন বছর আগে, এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৭-র জানুয়ারিতে—বিদ্রোহের চার মাস আগে। কাজেই ইংরেজরা মধ্যবিত্ত অনুগত শ্রেণি লাভের চেষ্টা করলেও, সেটা সিপাহি বিদ্রোহের কমিউনিস্ট ভূতের আশঙ্কা থেকে ছিল না।