মোহাম্মদ নজিবর রহমান (১৮৬০-১৯২৩) বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে একজন ঔপন্যাসিক হিসাবে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁকে ঊনবিংশ মতাব্দীর বিকাশোন্মুখ মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি গণ্য করা হয়। তাঁর আনোয়ারা উপন্যাসটি বিষাদসিন্ধুর পর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জগতে ব্যাপক জনপ্রিয় একটি উপন্যাস।
জন্ম, শিক্ষা, জীবিকা তাঁর জন্ম আনুমানিক ১৮৬০ খ্রীস্টাব্দে অবিভক্ত ভারতের বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার চরবেলতৈল গ্রামে। পরিবারের আর্থিক অবস্খা তেমন স্বচ্ছল ছিল না। শাহজাদপুর ছাত্র বৃত্তি বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে ঢাকা নর্মাল স্কুলে ভর্তি হন। এ সময় তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। তবে ছাত্র পড়িয়ে নিজ লেখাপড়ার খরচ যোগাতে থাকেন। এভাবে তিনি নর্মাল (বর্তমান এসএসসি) পাস করেন। এরপর তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্বঅধ্যয়নের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। কর্মজীবন শুরু হয় জলপাইগুড়ির একটি নীলকুঠিতে চাকৃরি গ্রহণের মাধ্যমে। কিছু দিন পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রথমে সিরাজগঞ্জের ভাঙ্গাবাড়ি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি স্খানীয় ডাকঘরের পোস্টমাস্টার পদেও কিছু দিন দায়িত্ব পালন করেন। অকঃপর একই জেলার রায়গঞ্জের সলঙ্গা মাইনর স্কুলের হেড পণ্ডিত হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯১০ খ্রীস্টাব্দে বদলি হয়ে রাজশাহী জুনিয়র মাদ্রাসার বাংলার শিক্ষক পদে যোগ দেন। আমৃত্যু তিনি শিক্ষকতা পেশায়ই ছিলেন।
সমাজ সচেতনতা সে কালের মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের অহৈতুক বৈরী মনোভাব তিনি তীক্ষ্ণভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। অন্য দিকে ১৯০৫ খ্রীস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ তাঁর মনে আলোড়ন তোলে। এ রকম একটি জাতীয় প্রেক্ষাপটে তিনি বিলাতী বর্জন রহস্য নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। এটি তৎকালীন বিদ্বান মহলে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। ১৯০৬ খ্রীস্টাব্দে নওয়াব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকায় মুসলিম লীগের যে অধিবেশন বসে, তিনি তাতে অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। অপর দিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধেও ছিলেন অকুতোভয়। সলঙ্গায় শিক্ষকতা করা কালে স্খানীয় হিন্দু জমিদার গরু জবাই ও গো-মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে এমত ধর্মীয় অথধকারহরণের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জনাতে থাকেন। তাঁর সংগ্রামের ফলে সলঙ্গায় মুসলমানদের গরু জবাইয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তদুপরি শিক্ষা বিস্তারের মহতী কাজে তিনি আজীবন সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৮৯২ খ্রীস্টাব্দে তিনি চরবেলতৈল গ্রামে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন; যা পরবর্ততে পূর্ণাঙ্গ বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
সাহিত্যকর্ম তাঁর রচিত উপন্যাসসমূহ তীক্ষ্ণ সমাজ সচেতনতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। মোহাম্মদ নজিবর রহমান শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি ২০টির মতো উপন্যাস রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : আনোয়ারা; চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমনি; পরিণাম; গরীবের মেয়ে, দুনিয়া আর চাই না; মেহেরউন্নিসা, প্রেমের সমাধি ইত্যাদি। এ ছাড়া বিলাতী বর্জন রহস্য ও সাহিত্য প্রসঙ্গ’ নামে তাঁর দু’টি গদ্য পুস্তিকাও রয়েছে। তাঁর প্রথম রচিত উপন্যাস আনোয়ারা উপন্যাসটি একশত বৎসর পরও জনপ্রিয় ও আলোচিত। গ্রামীণ জীবনের পটভূমিকায় রচিত এ উপন্যাসে সমসাময়িক বাঙালি মুসলমান সমাজের পারিবারিক ও সামাজিক চিত্র উজ্জ্বলভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে। ধর্ম ও সত্যের জয়, অধর্মের পরাজয় এ উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য। এটি আদর্শভিত্তিক একটি অসাধারণ গ্রন্থ হিসাবে পরিগণিত। তাঁর রচনাবলী বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম একটি ভিত্তিপ্রস্তর।
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে মায়ের সাথে নানাবাড়ি যেতাম মাসখানেকের জন্য। নানীর কাঠের আলমারি ঘেঁটে যা পুরনো বই পেতাম সব খতম দিতাম। নাম ধাম অবশ্যই ভুলে গিয়েছি। মায়ের এক চাচাতো ভাই ছিলেন যার কয়েক ট্রাংক ভর্তি বইয়ের প্রতি আমার সেই শৈশবে দুনির্বার আকর্ষণ ছিলো। কোন এক অজানা কারণে উনি আমাকে বই দিতে চাইতেন না, ইন ফ্যাক্ট কাউকেই দিতেন না। আর আমি তো পুঁচকে পাঠিকা ছিলাম। তবে নাছোড়বান্দা আমি মা বা খালামনিকে উকিল হিসেবে নিয়ে যেতাম। তখন রত্ন ভান্ডারে উঁকি দিয়ে পছন্দ মতো বই নেয়ার সুযোগ ঘটতো। যদিও আমার দ্রুত বই শেষ করা উনার পছন্দ ছিলো না। :p
উনার ট্রাংক থেকে পেয়েই এই বই পড়েছিলাম। সাথে "মনোয়ারা", "সালেহা" আর দস্যু বনহুরের প্রচুর বই, যদি আমার বিখ্যাত স্মৃতিশক্তি ধোঁকা না দিয়ে থাকে। তখন যা পড়তাম তাই ভালো লাগতো তাই ৩ তারকা দাগানো। কাহিনী কিছুই মনে নাই।
মামা গত সপ্তাহে মারা গিয়েছেন। উনার মৃত্যু সংবাদ শুনে সবার আগে আমার সেই বই পড়ার জন্য করা সংগ্রামের কথাই মনে পড়েছে। আল্লাহ্ উনাকে ভালো রাখুন।
চিন্তা করতেসিলাম বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক বলতে যা বুঝায় তা তো অল্প কিছু ছাড়া পড়া হয়নি.. একটু অপ্রচলিত কিন্তু বিখ্যাত লেখকের বিখ্যাত বইগুলা পড়ব। নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন। বললেই নাম আসে, 'আনোয়ারা' তার উপর এই বই নিয়ে সিনেমা বানাইসেন স্বয়ং জহির রায়হান। ওক্কে.. তাই সই। কিন্তু 😪 থাউক, রেটিং দিব না, শুধু 'রিড' লিখে দিলাম। মূল কাহিনি অতি অবশ্যই আনোয়ারাকে নিয়ে। বেচারি সৎ মায়ের সংসারে মানুষ। হঠাৎ একদিন ফজরের নামাজের জন্য অজু করতে যেয়ে সুমধুর স্বরে কোরআন শরীফ পড়ার আওয়াজ পায় আর এরপর মোনাজাত। এক মোনাজাত শুনেই নায়িকা কাৎ। নায়কের প্রতি প্রেম,থুক্কু ভক্তির শুরু। নানান ঘটনা দুর্ঘটনার পর নায়ক-নায়িকার বিবাহ। বিয়ের পর তাদের সংসার জীবনে নানান ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হয়েও স্বামীর প্রতি অচলা ভক্তির ফলাফলস্বরূপ সব বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া 🥱 সতী সাধ্বী এই নারীকে নিয়ে জায়গায় জায়গায় ধন্য ধন্য পড়ে যাওয়া, যাদের স্বামীর প্রতি, নামাজ-রোজার প্রতি ভক্তি নেই তাদের আলোর পথে ফিরিয়ে এনে ধন্য ধন্য পাওয়া... যাব্বাবা! স্পয়লার দিলাম নাকি? যা হোক! শুধু স্বামীভক্তিই নয়.. এর পাশাপাশি উঠে এসেছে আরও অনেক বিষয়। হিংসা কিংবা ক্রোধের বশ:বর্তী হয়ে মানুষ যে কতোদূর যেতে পারে, আর তার ফলাফল কখনোই ভাল হতে পারে না। একদিক দিয়ে বইয়ের ভালো দিক যেটা, সেটা হচ্ছে শুধু সরল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই মানুষ বহুদূরের পথ পারি দিতে পারে। আর নেগেটিভ দিক হচ্ছে, দুনিয়ার যতো যায়গায় যতো আজাইরা কাজ ঘটে বা নিন্দা যদি হয়ও সব দায়ভার নেয়ার দায়িত্ব কি মেয়েদের একার নাকি? আর সবচেয়ে ক্রিঞ্জ বিষয় হচ্ছে, কথায় কথায় পদচুম্বন 🥱😴 কে জানে.. এইটাই হয়তো এক সময় মেয়েদের চরিত্র মাপার মাপকাঠি ছিল... নয়তো এই বই এত বিখ্যাত হলো কেন? বাই দ্য ওয়ে, আনোয়ারা বইটা শেষ করে আমি কিন্তু আমার ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে দিয়েছি। চাইলে আপনারাও নিজেদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে পারেন। জানি না, কার কাছে কেমন লাগবে।
কিছু বই থাকে এমন যার নিপুন লেখনী আপনাকে কোনো কিছু মানতে বাধ্য করবে কিন্তু আপনি সেটা মানতে না পারলেও! যেমন এই বই!
১৯০০ সালের দিকের এক সম্ভ্রান্ত ধর্মপরায়ন মুসলিম শিক্ষিত মেয়ে আনোয়ারা। এক ভোরে ওজু করতে গিয়ে হঠাৎ শুনতে পায় এক অদ্ভুত সুন্দর মোনাজাত। মোনাজাত শুনে সে কেমন যেন বিচলিত হয়ে যায়। মনে হয় যেন ভালোবেসে ফেলে ওই না দেখা লোকটাকে। এরপর ভাগ্যক্রমে আল্লাহর অশেষ রহমতেই যেন সেই লোকটার সাথেই বিয়ে হয়। এরপর তার জীবনে বহু ঘাত - প্রতিঘাত আসে.. কিন্তু সে সর্বদাই পতিপ্রেম ও স্বামীর প্রতি বিশ্বাসী থেকে সব মোকাবেলা করে। যদিও কিছু জিনিস আমার কিছুটা ক্রিঞ্জি লেগেছে :3 যেমন স্বামী ঘরে আসলে প্রথমেই পদচুম্বন করে গ্রহন করা :3 এরকম আরো কিছু জিনিস! বাট তাও বইটা খুবই ভালো লেগেছে!
কিংবদন্তিতুল্য বর্ণনামূলক দীর্ঘ উপন্যাস। প্রকাশিত প্রথম সংস্করণে(১৯১৪) আনোয়ারার পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০০। এখনকার পাঠকের মনোযোগ বিবেচনায় মমতাজউদ্দীন ৪টি পর্বে ৪৩টি পরিচ্ছেদ নিয়ে এই ‘অনুপম’ সংস্করণ করেছেন। উপন্যাসটি বাঙালি মুসলমান পারিবারিক জীবনধারা অবলম্বনে একটি সরল ও স্নিগ্ধ কাহিনী। মধুপুর গ্রামের আনোয়ারা ও নুরল এসলামের সংসারজীবনের নানা সংগ্রামকে অবলম্বন করে এই উপন্যাস। মধুপুর গ্রামে যেমন অসংখ্য ভালোমানুষ আছে- যারা স্নেহ, মায়া, মমতা ও পরোপকারের জন্য উদারচিত্ত মানুষ- তেমনি এ জনপদে হিংসা, দ্বেষ ও নীচপ্রবৃত্তিসম্পন্ন মানুষেরও অভাব নেই। এমন পরিবেশে সবার সাথে এক হয়ে থাকতে গেলে নিত্যই কত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয় তা সবার ই জানা। মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের ঘরের কোণে, আঙিনায় কিংবা গোয়ালঘরে যেখানে যা ঘটছে তাঁর নিপুণ চিত্র এঁকেছেন লেখক। স্নেহময়ী দাদী, ব্যক্তিত্বহীন অসহায় পিতা, প্রীতিস্নিগ্ধ সখী সব আছে। মনোরম একটি পরিচিত সংসারের হাসি-কান্না, জয়-পরাজয় অথবা দুর্যোগ ও সংকট এ উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছে। এ উপন্যাসে বাঙালি রমণীর পরিচয়কে বিশেষভাবে আলোকিত করা হয়েছে। নারীর কাছে পিতামাতা যেমন শ্রদ্ধার পাত্র তেমনি স্বামীর জন্য তাঁর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাও অনিবার্য। রমণীর এই ‘সনাতন’ রুপকে লেখক সরল বিশ্বাসে এঁকেছেন। তবে লেখক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বার্তাটি দিতে চেয়েছেন সেটি হলঃ মানুষ সংসাররাজ্যে বিবিধ ঘটনা ও সংঘাতের সম্মুখীন হবে, এতা অনিবার্য। ঘটনা ও সংঘাতের মধ্যে বাস করেও মানুষকে সৎ, পবিত্র আর ধৈর্যশীল হতে হবে। খোদার কাছে অকৃপণ নিবেদন করতে হবে। বিপদের মধ্যেও যেন আত্মবিশ্বাস অটুট থাকে, আনন্দ ও সুখের সময়ও যেন সৃষ্টিকর্তার মহিমার প্রতি শ্রদ্ধা অবিচল থাকে । বইয়ের প্রধান দুই চরিত্র আলাদা নজর কাড়বেই। আমার নিজস্ব একটা অনুমান হল, এই বইয়ের পাঠকের অধিকাংশই ছিলেন নারীরা। লেখক নুরল এসলাম চরিত্রটিকে নানা গুণের সমন্বয়ে এমন ব্যক্তিত্ববান করেছেন সেটাকে ‘স্বপ্নপুরুষ’ বললে ভুল হবে না কিন্তু তাই বলে, নারীদের ছোট করেছেন এতা ভাবলে ভূল হবে। বরং শিক্ষা-দীক্ষা, চিন্তা-চেতনা, বিচক্ষনতা, কর্মগুণ, চারিত্রিক গুণাবলি সব মিলিয়ে এই উপন্যাসের শ্���েষ্ঠ চরিত্রটি একজন নারী। একটা ব্যাপার না বললেই নয়। সংখ্যায় কম হলেও উপন্যাসে হিন্দু চরিত্রগুলোকে মোটাদাগে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু আর সবকিছুর মতোই, কোন সম্প্রদায়ের সবাই খারাপ হতে পারে না। ভালো মন্দ মিলিয়েই মানুষ। এটার পেছনে একটা কারণ হতে পারে লেখকের নিজের ধর্মবিশ্বাস। আরেকটা কারণ প্রেক্ষাপট থেকেই জানা যায়। সেসময়ে অর্থাভাবে লেখক উপন্যাসটি প্রচার করতে পারছিলেন না। পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী জুনিয়র মাদ্রাসার মুসলিম ছাত্রবৃন্দ লেখককে এজন্য ৩০০ টাকা আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন। যেকারণেই হোক, এটা এই উপন্যাসের সীমাবদ্ধতা। তবে, নেতিবাচক মুসলিম চরিত্র-ও এখানে আছে। এর বাইরে বলতে গেলে উপন্যাসটি কাল্ট ক্লাসিক। প্রকাশের পরপরই অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৪৯ সালের মধ্যেই এ গ্রন্থের ২৩তম সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং দেড় লক্ষের বেশি কপি বিক্রি হয়। এ উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কারণ সস্তা বা হালকা আবেদন নয়, বরং উপন্যাসটিতে সততা ও সরলতার সাথে প্রকাশ পাওয়া মুসলিম বাঙালি জীবনের চিত্র। বিশেষত পরিচয় পর্বে লেখক যে মাধুর্য সৃষ্টি করেছেন তা যেকোন শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের সাথে ঠেক্কা দিতে পারে। এ উপন্যাস সম্পর্কে মুহম্মদ আবদুল হাই এর কথা থেকেই তাঁর আচ পাওয়া যায়, ‘মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের নরনারীর এমন টিপিক্যাল চরিত্র নজিবুর রহমানের মতো আজো কেউ চিত্রিত করতে পারেন নি’। বইয়ের ভালো লাগা কয়েকটা অংশঃ - নুরল অসলাম দেখিয়েছিলেন, চাকরিজীবীর শারীরিক ও মানসিক সমুদয় ইন্দ্রিয় সর্বক্ষণ প্রভুর (মানে বস বা মালিক) মনোরঞ্জন সম্পাদনের জন্য নিয়োজিত রাখিতে হয়। এ নিমিত্ত চাকরিকে তিনি অন্তরের সহিত ঘৃণা করিতেন। বিএ পাস করিয়া স্বাধীন ব্যবসায়ের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিবেন, ইহাই তাহার জীবনের স্থির সংকল্প ছিল। - নীচ বংশের কন্যা আনিলে যত দোষ না হয়, নীচ ঘরে মেয়ে বিবাহ দেওয়ায় তাহা অপেক্ষা বেশি দোষ। - পৃথিবী সর্বংসহা হইলেও সুচের ঘা সহ্য করিতে পারে না, আর স্ত্রীলোক পরম ধৈর্যশীলা হইলেও পিতামাতার অযথা নিন্দাবাদ সহ্য করিতে পারে না। - ন্যায়পথে থাকিলে লোকে কী বলিবে, সে ভয় আমি করি না। আমি তো তাহাকে তিরস্কার করি নাই। কেবল তাহার ব্যবহারে দুঃখিত হইয়া উপদেশভাবে কয়েকটি কথা বলিয়াছি মাত্র। - মা মরণকালে আমাকে উপদেশ দিয়াছিলেন, সংসারে যত বিপদে পড়িবে, ততই খোদাকে আকড়াইয়া ধরিবে, বিপদ আপনাপনি ছাড়িয়া যাইবে। - প্রেমময়ী প্রেমের ছলে রেখো দাসে চরণতলে। প্রাণ জুড়িয়ে যায় এমন চমৎকার লেখা। আপনাদেরকেও আমন্ত্রণ জানাই।
- এই যদি হয় একটা বইয়ের ভূমিকা পাতার লেখা। তবে বইটা বর্তমান সমাজের সাথে কতটা খাপ খায় তা একটা প্রশ্নই বটে। 'আনোয়ারা' অবশ্য এসময়কার বই নই৷ বইটার প্রথম ১৯১৪ তে। এতো পুরানো বইয়ে আগ্রহ জাগার দুটো কারণ: ১. 'বিষাদসিন্ধু' এর পর 'আনোয়ারা' ই সেসময়কার কোন মুসলিম সাহিত্যিকের বহুল পঠিত বই। ১৯৬১ এর এক হিসেবে অনুযায়ী সাড়ে ৫ লাখের বেশি কপি বের হয়েছিল বইটির। ঢাকা-কলকাতা মিলিয়ে বেরিয়েছে ৬০+ সংস্করণ। ২. এই বইটি থেকে ১৯৬৭ তে জহির রায়হান বানিয়েছিলেন একটা চলচ্চিত্র।
বইটির রচনাশৈলীতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মীর মশাররফ হোসেনের প্রভাব বেশ দৃশ্যমান। গল্প সংক্রান্তে এক কথায় যা তা হলো ধর্মের কোটিং এ মোড়ানো প্রেমের গল্প। লক্ষণীয় বিষয় সে যুগের হিন্দু লেখকদের লেখায় যেমন মুসলিম চরিত্র মিলতো না, তেমনি 'আনোয়ারা' তে তেমন শক্তিশালী কোন ভিন্ন ধর্মীয় চরিত্র নেই। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট আনোয়ারা। আর তাকে ঘিরেই পুরো উপন্যাস ঘুরপাক খেয়েছে স্রেফ লাটিমের মতো নিজের অক্ষের ওপর।
এই উপন্যাসের সবচে বড় বৈশিষ্ট্য যা বলা হয়; তা হলো তদানীন্তন মুসলিম সমাজকে তুলে ধরা। অবশ্য আমার মনে হয়েছে লেখকের নজর ছিল সমাজের (নাকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের?) চোখে নারীর কেমন হওয়া উচিত তা তুলে ধরা। সে যাক লেখক আনোয়ারা চরিত্রকে বানিয়েছেন সর্বংসহা, কোমনীয়, বুদ্ধিমতি, অনিন্দ্য সুন্দরী মানে যা যা সমাজ চায় তা দিয়ে আর প্রতিনায়ক নায়িকারা ষড়রিপুর বিবিধ দোষে দুষ্ট। লক্ষণীয় বিষয় পুরুষ চরিত্রগুলো প্রায় প্রত্যেকটিই স্ত্রীর বাধ্য।
উপন্যাসের নায়কের শ্রুতিমধুর মোনাজাত শুনে নায়িকা আনোয়ারা, নায়ক নুরুল এসলামের প্রেমে পড়ে। এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বিয়ে; একাধিক এন্টাগোনিস্টের ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে নায়ক-নায়িকার সুখের মিলনের মধ্য দিয়ে সতীত্বের জয় এই উপন্যাসের প্লট। লেখক তাঁর নিজস্ব ধর্মীয় দর্শন লেখায় ধারণ করতে চেয়েছেন৷ তা করতে গিয়ে উপন্যাসের গতিরোধ করেছেন। এক জায়গায় তো একটানা ৪-৫ পৃষ্ঠায় এমন ধর্মীয় দর্শন বর্ণনা করে গিয়েছেন লেখক। শেষতক নায়ক নায়িকার মুখ চুম্বন দিয়ে মিলনাত্মক সমাপ্তি এই উপন্যাসের।
বইটি কালোর্ত্তীণ তো নয়ই; উপন্যাস হিসেবেও কতটা সফল তা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ আছে। গুডরিডসের রেটিং এই ব্যাপারে বেশ ভালো সাক্ষ্য দেয়। তার ওপর লেখকের আবার পদচুম্বন, পদসেবা নিয়ে এক্সট্রা ফ্যান্টাসি। যাক ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এই বছরের পড়া খারাপ বইয়ের তালিকায় অবশেষে 'আনোয়ার' এর নাম যুক্ত করে নিলাম।
অসম্ভব সুন্দর একটা লিখা। সাথে শিক্ষণীয়ও। বর্তমানের বৃদ্ধাশ্রমের এই যুগে এই বইটা হয়তো সবাই পছন্দ করবে না। না করাই স্বাভাবিক। আপন শ্বাশুড়িকেই আমরা মা ভাবতে পারিনা সেখানে সৎ শ্বাশুড়িকে এমনভাবে ভালোবাসা আর প্রাধান্য দেয়া তো আকাশ কুসুম চিন্তা। তবে আমি খুব আনোয়ারা হতে চাই। ওর মতোই ধৈর্যশীলা নারী। যার ইহজীবনের লক্ষ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টি। যার জন্য সে তার স্বামীর প্রতিও খুবই আন্তরিক। অনেকে বল্লো তাদের কাছে ক্রিঞ্জ লেগেছে পদচুম্বনের ব্যপারটি। অথচ আমাদের বুঝতে হবে প্রায় শত বছর আগের বাঙালি মুসলিম নারীর গল্প এটা। পদচুম্বন তো এখনো প্রচলিত। এই বিষয়টাকে সম্মান হিসেবে দেখানো হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে আমি বলবো আপনি যদি খুব আধুনিকা প্রগতিশীল হোন তো এই বই হয়তো আপনার জন্য নয়। কিন্তু মুসলিম নারী যারা পরকাল নিয়ে চিন্তিত তাদের অবশ্যই সাজেস্ট করবো একবার হলেও বইটি পড়ে দেখা। বিয়ের আগেই পড়তে পারলে সবচেয়ে ভালো। প্রি ম্যারেজ কোর্স হয়ে যাবে অনেকটা।
বিষাদ সিন্ধু বইয়ের পরে বাংলা মুসলিম সাহিত্যের সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় বই বলা হয় "আনোয়ারা " বইটিকে। তৎকালীন নব্য গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত মুসলিম পারিবারিক ও আর্থ সামাজিক বিষয়কে নিয়ে লেখা বইটা একটা পরিপূর্ণ রোমান্টিক উপন্যাস। মাতৃহীনা আনোয়ারা নামের অতিশয় রূপবতী এক মেয়েকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে পুরো কাহিনী। সৎ মায়ের সংসারে আপন বলতে দাদী আর কাছের মানুষ বান্ধবী সালিহা। বিয়ের পরে স্বামী সোহাগিনী, কিন্তু ঝামেলা বলতে সৎ শাশুড়ি। এক কথায় বলতে হয় বইটা অতিশয় সুখপাঠ্য।
দারুণ একটি উপন্যাস। সামাজিক প্রেক্ষাপটে রচিত। মুসলিম রীতিনীতিগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে স্থান পেয়েছে। যা বর্তমানের কোনো উপন্যাসে পায় না। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে চারশো পৃষ্ঠায়। আমি যেটা পড়েছি সেটা সংক্ষেপিত ১২০ পৃষ্ঠার।
আনোয়ারা, তার স্বামী নুরল এসলাম, তার দাদী, উকিল আমজাদ হোসেন, তার সই হামিদা ইত্যাদি চরিত্রগুলো নিয়েই উপন্যাসটি রচিত হয়েছে।
-
বই : আনোয়ারা লেখক : মোহাম্মদ নজিবর রহমান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সংস্করণ ১৯৯২ পৃষ্ঠা ১২০ মূল্য ১৫৫৳ ৮ মার্চ ২০২৪
মোহাম্মদ নজিবর রহমানকে কে বা কারা "সাহিত্যরত্ন" উপাধি দিয়েছিল, ভুল করে নাই মনে হল।
লেখকের ভাষায় দখল, উপমার ব্যবহার, কথনরীতি চমৎকার, অনবদ্য।
কিন্তু উপন্যাসের মূলকাহিনী যে ধারায় প্রবাহিত হয়েছে তা অসামান্য মনে হয়নি, সমসাময়িক মীর মোশাররফ হোসেন প্রমুখেরা আরো আরো গভীর জীবনবোধ-মূলক উপন্যাস রচেছেন।
তা সত্ত্বেও এই উপন্যাস বাংলা ধ্রুপদী উপন্যাসের পঞ্চাশের তালিকায় অনায়াসেই স্থান পাবে আমার ধারণা।