রাত্রির তৃতীয় যামে উদ্দিষ্টস্থানে পৌঁছলেন প্রকাশচন্দ্র। এটিও একটি শ্মশান, তবে পরিত্যক্ত। শ্মশানটি কূর্মাকৃতির, সমতল থেকে সামান্য উচ্চভূমিতে অবস্থিত। তার পাশে গহীন অরণ্য৷ দুজনে অবতরণ করলে কোষাটি সেই অরন্যের মধ্যে লুকিয়ে রাখলেন প্রকাশচন্দ্র। তিনি চান না এটি কারও চোখে পড়ুক। বৃন্দা ততক্ষণে শ্মশানভূমির উচ্চস্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে চারিদিক দেখছিল। একটু পর প্রকাশচন্দ্র তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বৃন্দা প্রশ্ন করল, “এ কোথায় এলাম বাজিকর?” প্রকাশচন্দ্র বললেন, “এই স্থানের নাম জাহ্নুগিরি মা। এ বড় পুণ্যস্থান। মাতা জাহ্নবী এখানে দক্ষিণবাহিনী হতে-হতে অকস্মাৎ উত্তরবাহিনী হয়েছেন। এই শ্মশানভূমিও বড় প্রাচীন। চেয়ে দেখো, শ্মশানভূমিটি কূর্মাকৃতির, মা গঙ্গা এই শ্মশানের তিনদিক বেষ্টন করে প্রবাহিত হয়েছেন। তন্ত্রমতে সাধনক্রিয়ার জন্য এর থেকে উত্তম স্থান শুধু এই ভূভাগে কেন, সমগ্র জম্বুদ্বীপে সুদুর্লভ।” বৃন্দা প্রকাশচন্দ্রের চোখে চোখ রেখে দাঁড়াল, “এখানে কোন তন্ত্রক্রিয়া করবে তুমি?” প্রকাশচন্দ্র উত্তর দিতে কিছু সময় নিলেন। তারপর বৃন্দার দুই কাঁধ ধরে বললেন, “দেখো মা, তোমার সঙ্গে যে অকথ্য অত্যাচার হয়েছে সে অতীত। অতীত অপরিবর্তনীয়, তাকে স্ববশে আনা যায় না৷ কিন্তু ভবিষ্যৎ পরিবর্তনশীল, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাকে বশবর্তী করা যায়। তোমার সামনে দুটি পথ আছে। প্রথমত যাতে তুমি সব ভুলে অঙ্গ, গৌড়, অথবা বঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে পারো, সেই ব্যবস্থা করে দিতে পারি, সেই ক্ষমতা আমার আছে। দ্বিতীয়ত, তুমি যাতে তোমার ওপর হওয়া অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে পারো, আমি তোমাকে তার জন্য প্রস্তুত করতে পারি৷ তুমি বলো, কী তোমার ইচ্ছা।” বৃন্দা নির্ণিমেষে চেয়ে রইল প্রকাশচন্দ্রের দিকে, “আর সন্ধ্যাকর?” “সেও পালবংশের উৎসাদনের জন্য কৃতসংকল্প হয়েছে। মহামাত্য যোগদেবও। এবার তোমার ইচ্ছা।” এতদিন, এতদিন পর বৃন্দার চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। দাঁতে দাঁত চিপে সে বলল, “কী করতে হবে বল বাজিকর।” প্রকাশচন্দ্র বললেন, “কাল আশ্বিনী শুক্লপক্ষের প্রতিপদ। কাল থেকে পরবর্তী দশদিন আমি অতি কঠিন তন্ত্রক্রিয়া করব তোমার ওপর৷ তারপর তুমি হয়ে উঠবে এই অত্যাচারী শাসকের অমোঘ মৃত্যুবাণ। তুমি প্রস্তুত?” “হ্যাঁ বাজিকর, আমি প্রস্তুত।”
অভীক সরকারের জন্ম পয়লা জুন, উনিশশো উনআশি সালে। বেড়ে ওঠা প্রাচীন শহর হাওড়ার অলিগলিতে। বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন, মা স্কুল শিক্ষিকা। রয়েছে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। পেশায় সেলসম্যান, কর্মসূত্রে ঘুরেছেন পূর্ব-ভারতের প্রায় সব শহর ও গ্রাম। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাসা বেঁধেছেন হায়দ্রাবাদ, পাটনা, মুম্বাই ইত্যাদি বিভিন্ন শহরে। শখের বই ব্যবসায়ী ও প্রকাশক। লেখালেখির শুরু আন্তর্জালে ও বিভিন্ন ব্লগে। প্রকাশিত বইগুলো হল মার্কেট ভিজিট, তিতিরপাখি ও প্রিন্সেস (সহলেখক অনুষ্টুপ শেঠ), এবং ইনকুইজিশন, খোঁড়া ভৈরবীর মাঠ, চক্রসম্বরের পুঁথি, ইত্যাদি। বিবাহিত। কন্যা সন্তানের পিতা। ভালোবাসেন ইলিশ, ইস্টবেঙ্গল, ইয়ারবন্ধু এবং ইতিহাস।