১৯৩২-এ "শনিবারের চিঠি"তে প্রকাশিত হয় নাটক "মানময়ী গার্লস স্কুল", সাড়া জাগায় তখনই। বেকারত্ব, ক্ষুধা এমনকি ম্যালেরিয়ার মতন নানান অসুখের মধ্য দিয়ে এই নাটকের পাত্রপাত্রীদের সুখের বাসনা এতই চিরন্তন বিষয় যে, রূপালি পর্দা বারবার খুঁজে নিয়েছে "মানময়ী গার্লস স্কুলকে", যুগে যুগে। প্রকাশের মাত্র তিন বছরেই, ১৯৩৫ সালে সিনেমায় রূপায়িত হয় নাটকটি, খ্যাতি এনে দেয় কানন দেবীকে। ১৯৫৮ সালের ছবিতে অভিনয় করেন উত্তম কুমার ও অরুন্ধতী দেবী। ১৯৫৫’র তেলুগু ক্লাসিক “মিসাম্মা”ও উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৭-তে মিনা কুমারি অভিনীত "মি. এন্ড মিসেস মেরি" ও "মানময়ী"র গল্প থেকে নেওয়া। এসব ছবির খণ্ডচিত্রের কোলাজও পাওয়া যাবে বইটিতে।
মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ মৈত্র। তাঁর জন্ম ১৮৯৩ সালে, যশোরে। সাংবাদিকতা করতেন, স্বদেশী রাজনীতিও। কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে এম.এ পরীক্ষায় বসা হয়নি রবীন্দ্রনাথের।
নিয়মিত লিখতেন "শনিবারের চিঠি", "আনন্দবাজার" ও "বঙ্গশ্রী"তে। তাঁর লেখার অনুরক্তের তালিকায় পাওয়া যাবে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত সাহিত্যিকে। জানা যায়, "শনিবারের চিঠি"র বিখ্যাত সম্পাদক সজনীকান্ত দাস রবীন্দ্রনাথ মৈত্রকে ঘরে তালা দিয়ে আটকে রেখে একদিনে লিখিয়েছিলেন "মানময়ী গার্লস স্কুল"। এই নাটকটির প্রথম মঞ্চায়নের দুই মাসের মাথায় রংপুরে নিজ নিবাসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান লেখক।
প্রথম নাটকেই সাফল্য পাওয়ায়, রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল আরও নাটক লেখার। "কানামামা" নামে আরেকটি নাটক অসম্পূর্ণ রেখেই তাকে চলে যেতে হয়।
রোমান্টিক কমেডি ঘরনার এই নাটকটির শুরুটা এমন- মানস এবং নীহারিকা দুজনেই বেকার গ্রাজুয়েট, দুজনের-ই চাকরী দরকার। হঠাৎ বেশ লোভনীয় এক চাকরীর বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যেখানে একজন পুরুষ এবং একজন নারী গ্রাজুয়েট শিক্ষক দরকার, মানময়ী গার্লস স্কুলের জন্য, কিন্তু চাকরীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কোনো দম্পতিই যোগ্য বিবেচ্য হবেন। তাই যার যার নিজস্ব বাধ্যবাধকতার কারণে দুজনে সিদ্ধান্ত নেন দম্পতি সেজেই চাকরীটা তারা করবেন। ছোট্ট বই, এর বেশী কিছু বললে পাঠক স্পয়লারের শিকার হবেন, তাই কাহিনী বিষয়ক কথাবার্তা এখানেই শেষ করি।
দুই-একটা বৈশিষ্ট্যের কথা বলা যাক। রচনাকাল ১৯৩২ সাল বিবেচনায় ভাষা বেশ ঝরঝরে। হয়তো সেসময়ে নাটকটির ঝরঝরে চলিত ভাষাই একে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তবে ভাষা কিন্তু শুধু ঝরঝরেই নয়, বেশ নাটকীয়ও। এটা আমার ভাল লেগেছে। তবে কখনো সখনো ভাষা হয়তো অতিরিক্ত নাটকীয়ও হয়ে গেছে।
নাটকটির মূল চরিত্রের একজন নীহারিকা, তার চরিত্রায়নে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ন্যাকামি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। ন্যাকামিতে বিরক্ত হয়েছি। নীহারিকার বিভ্রান্তি, গোলমাল নাটকের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান হলেও এতটা বিভ্রান্তি আমার ভাল লাগে না, তখন তো নাই যখন সেটা অপরিহার্য মেয়েসুলভ বৈশিষ্ট্য রূপে দেখানো হয়।
নাটকটি মূলত রোমান্টিক কমেডি হলেও সে সময়কার সামাজিক অবস্থার কিছু চিত্রও এখানে ফুটে আছে। যেমন ম্যালেরিয়া সমস্যা, ভারতীয় শিক্ষিত সমাজে বেকারত্ব, জমিদারদের খেয়ালীপনা, মেয়েদের স্কুলে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রান্না এবং গান শেখা ইত্যাদি। নাটকটি পড়ার পর আমার প্রাপ্তি নাটকটিতে প্রচ্ছন্নভাবে থাকা সমাজের রূপ খানিকটা দেখে নেয়া।
নাটকটিতে একটা অংশ আছে, যেখানে 'চিংড়িদীঘী পঙ্কোদ্ধার সমিতি' গান গাইতে গাইতে জলাশয় পরিষ্কার করবার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করে যাতে ম্যালেরিয়ার রোগবাহী এনোফেলিস মশা না ছড়াতে পারে। এই অংশটুকুর সাথে নাটকে অন্য কোনো অংশের কোনো সংযোগ নেই। হয়তো লেখক এ বিষয়ে কাজ করতেন বলে এই অংশটুকু জুড়ে দিয়েছেন। বইয়ের শেষে ফ্ল্যাপ লেখা লেখক পরিচিতি পড়তে গিয়ে দেখতে পেলাম লেখক মাত্র ৩৮ বছর বয়সে সেই ম্যালেরিয়াতেই মৃত্যুবরণ করেন। নাটকটা রোমান্টিক কমেডি হলেও লেখকের জীবনটা ট্র্যাজেডি।
বিপিএল এর বইগুলো হাতে নেবার একটা আনন্দ আছে, বইগুলোর প্রকাশনা শৈলী প্রত্যেকবার-ই মুগ্ধ করে। এই বইটি কার্টিজ পেপারে ছাপা, বইটির বাঁধাই পেপারব্যাকে। প্রকাশকের কথা অংশটুকু শুধুই প্রচলিত ভূমিকা নয়, সেখান থেকে জানা যায় মানময়ী গার্লস স্কুল নাটকটি তখন কতটা জনপ্রিয় ছিল। জানা যায় মঞ্চে এবং রুপালী পর্দায় মানময়ীর প্রভাব। এক বাংলাভাষায় মানময়ীকে নিয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে ( ১৯৩৫, ১৯৫৭, ১৯৫৮ সালে) তিনটি চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়েছিল। শুধু বাংলাতে নয়, তামিল এবং তেলেগু ভাষায়ও এ নাটকটির কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছিল চলচ্চিত্র। সেইসব পুরোনো চলচ্চিত্রগুলো থেকে নেয়া বেশ অনেকগুলো স্টিল ছবিও জুড়ে আছে বইটিতে।
যাই হোক, আমি সাধারণত ছিঁড়েখুঁড়ে বইয়ের রিভিউ লিখি না, মোটের উপর আমার অনুভূতির কথাই লিখি। কোনো বই, চলচ্চিত্র, বিষয়বস্তু ইত্যাদির ব্যাপারে আমার অনুভূতি কী, সেটা আমি বেশীরভাগ সময়ে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। কিন্তু 'মানময়ী গার্লস স্কুল' নাটকটির ব্যাপারে সেটা পারছি না। নিশ্চিত হতে না পারাটা খানিকটা ভোগাচ্ছে। তাই খানিকটা ছিঁড়েখুঁড়ে নিজেই বোঝার চেষ্টা করছি আমার কাছে আসলে বইটা কেমন লেগেছে।
ওকে, এই বইটার উপরে কিছুটা পক্ষপাতিত্ব আছে, বইটা বিপিএল প্রকাশনীর, যখন আমি সেখানে কাজ করি সে সময়ে প্রকাশিত, তাই এই বইগুলোর প্রতি একটা অন্যরকম ভালোবাসা কাজ করে। বইটা বহু পুরানো, তাই সহজ সরল গল্প নিয়ে আজকালের ভয়াবহ কমপ্লিকেটেড জীবনকে বিচার করাটা ঠিক উচিৎ হবে না। খুব সুইট গল্প, আর এটা পড়তে গেলেই বুঝতে পাবেন যে আশির দশকের বুড়া বাচ্চা মানে কখনও না কখনও এই সিনেমাটা আপনি ডিডি১ বা কলকাতার কোন বাংলা চ্যানেলে দেখে ফেলেছেন! ব্যস! তখনই আপনার মনে চলে আসবে নস্টালজিয়া, আর তার প্রকোপে আপনি তিন দাগাতে দাগাতেও এক্কেবারে ঝেড়ে পাঁচ দাগিয়ে দিবেন বই এর রেটিং এ!
বইটা ফিল গুড গোত্রের, আদতে পাত্র পাত্রী এখনকার আমার চেয়ে বয়সে ঢের ছোট হলেও তখনকার সামাজিক অবস্থা অনুযায়ী আপনার ওদেরকেই দাদা-দিদি বলতে ইচ্ছা করবে। কিছু হালকা রসিকতাও আছে, ফেমিনিস্ট লেন্স দিয়ে খবরদার বইটা পড়বেন না আর কি! মোদ্দাকথা বইটা খারাপ লাগবে না। আর বিপিএল এর বইয়ের লেখনী সেই আগের মতন রাখাটা আমার বেশ ভালোলেগেছে। সবকিছুর আধুনিকায়ন মেইবি দরকার নাই!