“ছেলেটি ছুটছে। ছুটছে সে ঝড়ের বেগে। ছুটতে-ছুটতে একসময় সে হাঁফ ছআড়ল, যাক্, জঙ্গল শুরু হল। পেছন থেকে কানে আসছে বহু কণ্ঠের হল্লা-চিৎকার, ‘ছোট্, ছোট্ ! জঙ্গলের দিকে গেছে।’ সমস্ত চিৎকার ছাপিয়ে একজনের কর্কশ হেঁড়ে গলা শোনা যায়, ‘থামিস নে ! থামিস নে ! সড়কি দিয়ে প্রায় গেঁথে ফেলেছিলাম, একটুর জন্যে ফসকে গেল। নির্ঘাত জখম হয়েছে। ছোট্-জোরে- ছোট্ ! জঙ্গলে গেলে জঙ্গলে গিয়েই ধরব। কোথায় যাবে?... তারপর?... অবিস্মরণীয় নীল বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে রক্তে-দোলা-জাগানো উপন্যাস 'নীল ঘূর্ণি'। ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে বাংলার লক্ষ-লক্ষ কৃষক জীবন বাজি রেখে সংঘবদ্ধ হয়ে হাতিয়ার তুলে নিয়েছিলেন, এ কাহিনি তারই এক অনন্য দলিল। একদিকে সীমাহীন অত্যাচার-নিপীড়ন-শোষণ, অন্যদিকে কাশীনাথ আর ফকিরদাদুর প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতি। দীনেশচন্দ্রের জাদু-লেখনীর মুন্সিয়ানায় দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলে উপন্যাস, রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে রুদ্ধশ্বাস পাঠকের।”
শিক্ষা, এম.এ. (ইংরাজি সাহিত্য) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সংগ্রামী জীবন। তারই প্রতিফলন দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমগ্র সৃষ্টিতেও। কৈশোরে সশস্ত্র স্বাধীনতা-সংগ্রামের পথ ধরে যৌবনে গ্রহণ করেন বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ। পেশাগত ভাবে গ্রহণ করেন প্রকাশন ব্যবসা। প্রথম সাহিত্য স্বীকৃতি ১৯৬২ সালে, ভয়ঙ্করের জীবন-কথা ভূষিত হয় রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় ১৯৬৮ সালে। দীনেশচন্দ্রের সম্পাদনায় প্রকাশিত হল কিশোর ভারতী। উৎসারিত হল এক জাদুকরী লেখনীর ঝরনা। সাড়া পড়ে যায় পাঠকমহলে। ১৯৮৭ সালে দীনেশচন্দ্র সম্মানিত হলেন বিদ্যাসাগর পুরস্কারে। দীর্ঘজীবনে তিনি পেয়েছেন আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মান।
প্রকাশিত গ্রন্থ : দীনেশচন্দ্র রচনাসমগ্র, বিজ্ঞানের দুঃস্বপ্ন, ওদের বাঁচতে দাও, দুরন্ত ঈগল, নীল ঘূর্ণি, কালের জয়ডঙ্কা বাজে, ভাবা সমগ্র ১ ও ২, প্রথম পুরুষ, চিরকালের গল্প, ভয়ঙ্করের জীবন-কথা, মানুষ অমানুষ, ভারত গল্পকথা, ইত্যাদি।
অনবদ্য! নীল চাষের বর্বর সেই ইতিহাসটা কাশীনাথ সর্দার আর ফকিরের মাধ্যমে অসাধারণ ভাবে ফুটে এসেছে। নীল বিদ্রোহ নিয়ে ভাসা ভাসা ধারণা ছিল আগে। সেসময়ের অত্যাচার গুলো সম্পর্কে খুব কম জানতাম। এই বইটা সেই অত্যাচারের মাত্রটা চিনিয়ে দিয়েছে। চরিত্রের গঠন এতোটাই শক্ত যে তাদের প্রিয় চরিত্র হিসেবে গুনে ফেলবেন। কাশীনাথ নামক চরিত্রের উত্থান, সংগ্রাম সবই উঠে এসেছে বইয়ে। বইটা নিয়ে এক আফসোস, কেন আরো বেশি লেখা হলো না এটা। নীল বিদ্রোহ নিয়ে যারা পড়তে চান তাদের জন্য হাইলি রেকোমেন্ডেড বইটা।
নীল বিদ্রোহ সম্পর্কে ভাসা ভাসা ধারনা ছিল, এই বইটা পড়ে আরও স্পস্ট হল ব্যাপারটা। অনবদ্য উপন্যাস, ধরে রাখার মতো লেখনী। একবিন্দুও ক্লান্তি হয়নি পড়তে। ছোট ছোট অক্ষর পাতাজুড়ে, স্বাভাবিক ফন্টে ছাপালে বইয়ের ব্যাপ্তি অনায়াসে ২৫০ পাতা স্পর্শ করতো।
যাই হোক, ইতিহাস নির্ভর হলেও বইটি খাঁটি ফিকশন, তাই ভাল লেগেছে সেভাবেই। আশাকরি শীষ্রই লেখকের দুরন্ত ঈগল বইটাও পড়ে ফেলব।
নীল ঘূর্ণি – ইতিহাসের আবর্তে এক মহাকাব্যিক বিস্ফোরণ
"The past is never dead. It's not even past." — William Faulkner
দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা নীল ঘূর্ণি শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, এটি এক মহাকাব্যিক বিস্ফোরণ, যেখানে ইতিহাসের নির্জন ধ্বনিগুলো বিদ্রোহের ক্রন্দনে পরিণত হয়। উপন্যাসের পটভূমি ১৮৫৯-৬১ সালের নীল বিদ্রোহ, এক অগ্নিসংকেতময় সময়, যখন বাংলার কৃষকসমাজ শোষণের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠেছিল।
চট্টোপাধ্যায় নিছক তথ্যভিত্তিক ইতিহাসের চেয়ে বেশি কিছু উপহার দিয়েছেন—তিনি সৃষ্টি করেছেন একটি জীবন্ত, শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া বাস্তবতা, যেখানে চরিত্রগুলো প্রতিধ্বনিত হয় সময়ের অন্ধকারে।
"I am the master of my fate, I am the captain of my soul." — William Ernest Henley
নীল চাষের অভিশাপ বাংলার কৃষকদের রক্তে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। এই উপন্যাস সেই ক্ষতচিহ্নের একটি বিশদ নথি, যেখানে কৃষকদের যন্ত্রণাকে শুধুমাত্র শোষণের ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের মহাকাব্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। দীনেশচন্দ্র এখানে শুধু ঘটনা বর্ণনা করেননি, তিনি চরিত্রগুলোর মাধ্যমে পাঠককে সেই নীল বিষের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছেন। গদ্যের বুনন অত্যন্ত শক্তিশালী, সংলাপের গভীরতা ও আবেগ বাস্তবিক এবং প্রভাবশালী।
"Freedom is never voluntarily given by the oppressor; it must be demanded by the oppressed." — Martin Luther King Jr.
উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার চরিত্র নির্মাণ। রমেশ, জগদীশ, কৃষ্ণচরণ, কাশীনাথ, নায়েব দানী ঘোষ এবং তাদের মতো বহু চরিত্র যেন ইতিহাসের ক্ষুদ্র প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, কৃষকদের কণ্ঠস্বর এবং তাদের সংকল্প পাঠকের মনে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি তোলে। অত্যাচারী নীলকরদের নির্মমতা এবং কৃষকদের প্রতিরোধ, আশা এবং পরিণতি মিলিয়ে এটি শুধু একটি আন্দোলনের চিত্রই নয়, বরং শোষণ ও সংগ্রামের চিরন্তন দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি।
"History, despite its wrenching pain, Cannot be unlived, but if faced With courage, need not be lived again." — Maya Angelou
দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ করেছেন, তবে তা নিছক তথ্যসমৃদ্ধ দলিল নয়; এটি আবেগ, কষ্ট ও বিপ্লবের অনুরণন। ভাষার অনুপ্রাসময়তা এবং ঘটনার নাটকীয় উপস্থাপনা এই উপন্যাসকে পাঠকের মনে গভীরভাবে প্রোথিত করে। লেখকের কাব্যিক ভাষা এবং অনবদ্য গদ্যশৈলী এটিকে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাসের সীমারেখায় আটকে রাখে না, বরং এটি হয়ে ওঠে এক শিল্পমহাকাব্য।
"Revolutions are the locomotives of history." — Karl Marx
নীল ঘূর্ণি ইতিহাসের পাতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরেছে। এটি শুধু কৃষকদের দুঃখগাথা নয়, এটি সংগ্রামের মশাল। এ উপন্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই সভ্যতার অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। সমাপ্তি যদিও বেদনাবিধুর, তবু তা পাঠককে এক দৃঢ় প্রত্যয়ে ভরিয়ে দেয়—অত্যাচারী যত শক্তিশালীই হোক, প্রতিরোধের আগুন কোনো না কোনোদিন জ্বলবেই।
এটি কেবলই ইতিহাস নয়, এটি হলো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।