মস্তিস্ক হলো আমাদের সেই অঙ্গ যেখানে বসবাস আমাদের চেতনা, বুদ্ধিমত্তা, আবেগসহ অন্যান্য মানবিক গুণাবলীর। ঘুম হলো এক অপরিহার্য দৈহিক অবস্থা যেখানে আমরা জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় কাটাই। ঘুমের মধ্যে আমরা স্বপ্ন দেখি নানা ঘটনার, জেগে ওঠার পর যা আমাদের ভাবায়, বিস্মিত করে। এই তিনটি বিষয়ই পরস্পর গভীরভাবে যুক্ত; একটিকে বুঝতে গেলে অপরটি চলে আসে। এই তিনটি বিষয় নিয়ে নানা লোকায়ত ভাবনা, সংস্কার ও কৌতুহল রয়েছে। সাম্প্রতিক বিজ্ঞান এইসব রহস্য উদ্ঘাটন কতটুকু করতে পারলো, কতটুকু আলো ফেলতে পারলো? বিজ্ঞানীরা কতটুকু কি বুঝেছেন এপর্যন্ত মস্তিষ্কের, ঘুমের, স্বপ্নের? এসব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা ও সাধারণ পাঠকের জানার আগ্রহের মধ্যকার যে দূরত্ব, তার সেতুবন্ধন এবং কৌতুহলী পাঠককে এই তিনটি সম্পর্কিত বিষয়ের বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্পর্কে পরিচিত করার জন্য এই বইটি। এটি ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ও ফিরোজ আহমেদ সম্পাদিত জ্ঞান ও সভ্যতা গ্রন্থমালার দ্বিতীয় বই।
মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিজ্ঞান লেখক "আরাফাত রহমান" দীর্ঘদিন ধরে লিখেছিলেন মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী 'জিরো টু ইনফিনিটি'তে। ঘুম আর স্বপ্ন মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্বপ্ন-ঘুম-মস্তিষ্ক এই তিনটাই পরস্পরের সাথে আঙ্গাআঙ্গীভাবে জড়িত। একটাকে আলোচনা করতে গেলে আরেকটা লাগে। লেখক শুধু স্বপ্ন নিয়ে কিছু একটা লিখতে চেয়েছিলেন। পরে খেয়াল করলেন স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করতে হলে ঘুমের ক্রিয়াকৌশল আলোচনা করা লাগে। ঘুম আলোচনা করতে হলে মস্তিষ্কের অলিগলি আলোচনা করা লাগে। আবার ঘুমের অবাস্তব ঘটনা (স্বপ্ন) আলোচনা করতে গেলে বাস্তব ঘটনা (চোখের দেখা) আলোচনা করা দরকার। তাই লেখক প্রথমেই সব পরিষ্কার করে নিয়েছিলেন। 'বিজ্ঞান ব্লগ' ও 'জিরো টু ইনফিনিটি'তে অনেকদিন ধরে লেখার ফলে লেখাগুলো একটা বই হবার দাবি জানাচ্ছিল। পরে 'জ্ঞান ও সভ্যতা গ্রন্থমালা' নামে খুব চমৎকার একটি সিরিজের আওতায় সিরিজের ২য় বই হিসেবে এটি প্রকাশিত হয়। এই সিরিজটি যদি তার পথচলা না থামায় তাহলে একদিন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের A Very Short Introduction সিরিজের মতো হয়ে যাবে। এমন পর্যায়ে চলে যাক এটাই প্রত্যাশা।
লেখক যেহেতু মূল বিষয় পরিষ্কার করার জন্য আগেভাগে দরকারি কিছু ভেঙ্গে নিয়েছেন তাই প্রথম দিকে পড়ার ছন্দে সমস্যা হতে পারে। তবে এটা কোনো সমস্যাই না, প্রথম দিকের ছন্দপতন মূলত পরবর্তী সমস্ত পৃষ্ঠার নিরবিচ্ছিন্ন গতির ছন্দ বাড়িয়ে তোলে। বইয়ের ভাষা খুবই চমৎকার হয়েছে। আরাফাত রহমানের লেখা সবসময়ই আমার কাছে ভালো লাগে। তারপরেও নেতিবাচক কিছু বলে নেই। ১. কিছু কিছু স্থানে বাক্য এতটাই বড় হয়ে গিয়েছে যে বিজ্ঞান বইয়ের ক্ষেত্রে খুব জটিল বলে মনে হয়। এমন পরিস্থিতিতে খুব লম্বা বাক্য ভেঙ্গে ছোট ছোট বাক্যে রূপান্তর দরকার। ২. উপযুক্ত স্থানে চিত্রের দরকার ছিল, এখানে এই ব্যাপারে বইটাকে কৃপণ বলেই মনে হলো। কিছু চিত্র আছে অবশ্য, কিন্তু সেগুলো শোভাই শুধু বাড়ায় টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বুঝতে সাহায্য করে না। লেখক নিজে কয়েকটি চিত্র এঁকেছেন, তার জন্য বাড়তি ধন্যবাদ। ৩. কিছু সমস্যা দেখলাম। যেমন how এর বেলায় বানানটা হবে ী দিয়ে 'কীভাবে', ি দিয়ে 'কিভাবে' নয়। তারপর 'নি' প্রত্যয় এর ভুল ব্যবহার হয়েছে। যেমন করি নি, দেয় নি, যায় নি ইত্যাদি। এগুলো মূলত একত্রে হবে, যায়নি, করিনি, দেয়নি।
কাগজের মান ও ছাপা খুবই চমৎকার হয়েছে। এই সিরিজের বই হাতে নিলেই এক ধরনের ভালোলাগা কাজ করে। দামটাও তুলনামূলকভাবে কম। এজন্য প্রকাশককেও ধন্যবাদ। পড়ার সময় বইয়ের ভেতরের পরিবেশটাকে খুবই স্নিগ্ধ মনে হয়েছে। এমন লাগার কারণ বইয়ের চমৎকারিত্ব ও লেখকের ভাষা শৈলী। তার উপর বাংলা ভাষায় মস্তিষ্ক নিয়ে, ঘুম ও স্বপ্ন নিয়ে বই নেই বললেই চলে। একে তো বিষয়ের দিক থেকে দুর্লভ তার উপর লেখকের মুনশিয়ানা, এমন হলে ভালো না লেগে পারে?
এরকম বিষয়ে আগ্রহী সবার জন্য বইটি পড়ার পরামর্শ রইল। হ্যাপি সায়েন্স। :)