গল্পগুলো মানবিক আবেগের গল্প, অনুভূতির দোলাচলের গল্প, আঘাত, অপঘাত, নিষ্ঠুরতার গল্প, গল্প ভালোবাসার, মমতার। বিষয় বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে বন্ধুত্ব, স্বার্থপরতা, স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন, প্রেমের সফলতা, ব্যর্থতা। সার্থক ছোটগল্পে কি কখনো দুর্দান্ত কিছু ঘটে? এতো মধ্যবিত্তের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের মতো, বাঁধা জীবনের দোলাচল, তারি মাঝে ঘটে যাওয়া আনন্দ বেদনার কাব্যের নাম-ই তো হচ্ছে ছোট গল্প। কিন্তু তার মধ্যেই কিছু না কিছু থাকে, যা আমাদের একাত্ম করে নেয়৷ স্বপ্নের ডানা মেলে পড়তে পড়তে যদি পাঠকের চোখের কোন ভিজে উঠে আর মনে পড়ে যায় ছোটবেলার হারানো কোন বন্ধুকে সেই কৃতিত্ব তবে বিকেল চড়ুই এর।
গরুর পায়া কিংবা মোজাহেদ মাস্টারের গল্প-তে উঠে এসেছে এক প্রবীণ শিক্ষকের কথা, প্রকৃতি যাকে নিষ্ঠুর খেয়ালে জীবন যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছে। বৈজ্ঞানিক কল্প কাহিনী সমান্তরাল ভবিষ্যৎ, গল্পের মাঝে পাঠককে ধরে রাখার একটা ক্ষমতা আছে, এর এতো ছোট পরিসরে অসাধারণ একটি কল্প কাহিনী এতো নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে লেখক আশা করছি বড় পরিসরে সুযোগ পেলে তিনি অনেক ভালো করবেন।
অনিঃশেষ অপেক্ষা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল জহির রায়হানের জীবনী পড়ছি। ভাষা সৈনিক উপন্যাসিক, যার বড় ভাই সাংবাদিক। ১৯৭১ এর ১৪ই ডিসেম্বরে নিখোঁজ বড় ভাইকে খুঁজতে গিয়ে যে আর ফিরে আসেনি। ১৯৭১ এর পটভূমিতে লেখা এই সুন্দর ছোটগল্পের পরের গল্পটাই হচ্ছে ১৯৫২ কেন্দ্রিক জবানবন্দী। নিঃসন্দেহে শব্দভুকের অন্যতম সেরা ছোটগল্প। ভাষা আন্দোলনে শহীদ অপু-র মা কাগজে কিছু লিখে চলেছেন আর সেই ঘটনা জবানবন্দী হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে সেই কাগজের কণ্ঠে। লিখতে লিখতে একটা কাগজ কে অপুর মা ছিঁড়ে ২১ টুকরা করে ফেললেন আর কাগজটি তার জবানবন্দীতে বলে উঠলো, “আমি প্রচণ্ড আর্তনাদ করে ২১ টুকরো হলাম”, এই আর্তনাদ কি শুধু ছিঁড়ে যাওয়ার, নাকি ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ২১ টুকরো হবার লজ্জার?
বীরাঙ্গনা সন্তানের দুঃখ, কষ্ট আর যন্ত্রণার গল্প নীরব প্রতিশোধ। রক্তক্ষরণ গল্পে উঠে এসেছে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার গল্প, সময়ের চপেটাঘাতে যাকে এখন জীবন চালাতে হয় রিকশা চালিয়ে। ভাষার প্রতি আমাদের অবমাননার গল্প বোবাকান্না, তবে এই গল্পে একটা জায়গায় এসে একটু দৃষ্টিকটু লাগলো, এক জায়গায় বর্ণনায় ছিল, “সে হাটতে হাটতে বসুন্ধরা সিটির সামনে চলে এলো। একটু এগিয়ে গেলেই একটা সিনেমা হল, স্টার সিনেপ্লেক্স”। বসুন্ধরা সিটি আর স্টার সিনেপ্লেক্সের অবস্থান তো এরকম না।
মানবিক আবেগ, অনুভূতি, স্নেহ, মমতার গল্প সেই পিছু ডাক, স্নেহ, তিনি আমাকে চিনলেন না। যুদ্ধ পরবর্তী সময় এবং রাজাকারদের নিয়ে লেখা বিব্রত বিবেক এই বইয়ের আরেকটি অন্যতম সেরা গল্প।
সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা গল্প প্লাবন – অকৃতকার্য সেই ছেলেটি। ম্যাজিক গল্পটির ব্যাপ্তি মাত্র তিন পাতা, ঘটনার কোন ঘনঘটা নেই, কিন্তু মাত্র এই তিন পাতাতেই লেখক তার মুন্সীয়ানা দেখিয়ে দিয়েছেন অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে।
পরিবার কেন্দ্রিক আরেকটি সুন্দর গল্প থুতু, উপন্যাসিক খুব সুন্দর সমাপ্তি টেনেছেন, তবে খটকা, গল্পের বর্ণনায়। এক জায়গায় বলা হল গল্পের বক্তার ছোট দুই ভাইয়ের জন্মের আগে তাদের বাবা কারখানার শ্রমিক ছিল; এরপর কয়েক জায়গায় বলা হল বক্তারা চার ভাই বোন; তারপর বলা হল, বক্তার বড় ভাইয়ের নাম ছুটু, একমাত্র বোনের নাম লিলি। তাহলে বক্তার বড় ভাই একজন, বোন একজন, বক্তা নিজে, ছোট ভাই দুইজন হল কিভাবে? আবার গল্পের একেবারে শেষে এসে বলা আছে, "আমরা পাঁচ ভাই বোন মিলে বিষাক্ত গমের..."
বইয়ের একেবারে শেষ গল্প নীরবে নীরবতা, নীরব ভালোবাসার গল্প। সব মেঘে বৃষ্টি হয় না, সব আবেগের প্রকাশ দৃষ্টি খুঁজে পায় না, সব ভালবাসাই প্রকাশিত নয়, কিছু কিছু অপ্রকাশিত ভালবাসা নীরবেই দুজনার মাঝে রয়ে যায়। সেই অপ্রকাশিত ভালবাসার গল্প নীরবে নীরবতা।