কেমন হত যদি মার্ক, ম্যাথিউ, লুক বা জনের গসপেল বা সুসমাচারের মতো জুডাসও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জোশুয়াকাহিনি লিখে যেতেন? এই ভাবনা থেকেই বেরিয়ে আসে অন্য এক জোশুয়া ইস্স্স্যাজারেথ-এর ছবি; যিনি প্রথাগত যীশাস ক্রাইস্টের থেকে অনেকাংশে আলাদা, সততই আনন্দময় মানুষ, একদিকে ক্ষুরধার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন সমাজসংস্কারক, অন্যদিকে ভাবোন্মাদ মিস্টিক। এপিকধর্মী উপন্যাস ‘জুডাস প্রণীত’-তে ক্রমশই ফুটে উঠতে থাকে টোরাহ্-শাসিত তৎকালীন ইহুদি সমাজ, তার রাজনৈতিক সঙ্কট, পুরোহিততন্ত্র, রাজতন্ত্র ও রোমান আগ্রাসনের মর্মন্তুদ চিত্র। বাইবেলে স্বল্পালোচিত চরিত্রসমূহের বিস্তারের পাশাপাশি জুডাসও ফুটে ওঠেন অন্য এক মাত্রায়, যেখানে তিনি বিশ্বাসঘাতক নন, বরং প্রবল তর্কপ্রিয়, সংশয়ী, অভিমানী যুবক। তবে কি শেষ পর্যন্ত র্যাবাই-অনুগত হওয়ার ফলেই সকলে তাঁকে ভুল বুঝেছিল? সত্যিই কি জোশুয়া ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন? পুনরুত্থান বা রেজারেকশান কি সত্যিই ঘটেছিল সেদিন?
এটি সে অর্থে কোনো পাঠপ্রতিক্রিয়া নয়। বইটি প্রথম বার পড়ার পরে কিছু অনুভূতি, কিছু প্রশ্ন, সেই সব নিয়েই দু'এক কথা লেখা।
বিশ্বাসঘাতক! এই শব্দটি শুনলেই প্রথম যে কয়েকজনের নাম মনে আসে, জুডাস তাদের মধ্যে অন্যতম। আমার সেই দীর্ঘদিনের ধারণা আজ প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
সন্মাত্রানন্দ রচিত 'জুডাস প্রণীত জোশুয়া বিষয়ক সুসমাচার ', ধানসিড়ি থেকে সদ্যপ্রকাশিত এই বইটি পড়ে আশ্চর্য হলাম।
উপন্যাসটি পড়ে মনে হলো এ যেন এক অনন্ত ট্র্যাজেডির আখ্যান। আমাদের অন্তরের আলো-আঁধারির এক দস্তাবেজ। এটি পড়ার পরে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি যে, ‘পাপ’ এবং ‘পুণ্য’ বা ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং ‘আনুগত্য’-এর সীমারেখাটি কতই না অস্পষ্ট। জুডাস যদি সেই ৩২ টি রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে 'বিশ্বাসঘাতকার' কাজ না করতেন, তবে কি জোশুয়ার এই মহান আত্মত্যাগ ও পুনরুত্থান সম্ভব হতো?
জুডাস এই উপন্যাসে বোধহয় সবচেয়ে বড় ত্যাগী! কারণ জোশুয়ার অন্য শিষ্যেরা পেয়েছেন সাধুত্বের সম্মান, আর জুডাস জেনেশুনে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন অনন্তকালের ঘৃণা ও অভিশাপ, শুধুমাত্র জোশুয়ার নিয়তি পূর্ণ করার জন্য!
বইটি পড়ে মনে হচ্ছে , জুডাস কি সত্যিই এক ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক? বোধহয় না! বরং তিনি ইতিহাসের এক নিঃসঙ্গ পথিক, যিনি ঈশ্বরের চিত্রনাট্যে সবচেয়ে কঠিন ভূমিকাটি পালন করেছেন।
মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন তুলেছে এই উপন্যাসটি। বিকল্প এক চিন্তাভাবনার জগৎ বা বিকল্প এক ইতিহাসের সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে জুডাসের আত্মকথনের মধ্যে দিয়ে।