বইমেলায় বুকপকেটে একটা ইকোনো কলম নিয়ে ঘুরে বেড়ায় যে যুবক; তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল একদিন। সে আমায় শুনিয়েছিল আফরিনের গল্প। তখন থেকে আমি আফরিনকে জানি। আমি জানি কাসেদকেও। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল তারও আগে; মধ্যরাতে। সিএনজির পেছনে একটা লাশ নিয়ে সে আমার পিছু নিয়েছিল। আমার পিছু নিয়েছিল মনোজও। কারণ তার স্ত্রীকে অনুসরণ করছিল একজন প্রাক্তন। প্রায়শই প্রাক্তনের জুতোর ছাপ পাওয়া যায় তার বাড়ির জানালার ওপাশে, রাস্তায়।
আমায় গল্প শুনিয়েছিল কঙ্কন। ঠাণ্ডা মাথায় যে খুন করেছিল ছয়-ছয়টি মানুষ। না চাইলেও আমাকে হতে হয়েছিল হামিদ উল্ল্যাহ'র অদ্ভুত অসুখের অংশ। নিঃশ্বাস নেওয়ার পর ওই হাওয়া শরীর থেকে বের হতো না তার। আমার চোখের সামনে তিনি বেলুনের মতোন ফুলতে ফুলতে বিস্ফোরিত হোন। অসুখের পাশাপাশি আমাকে চিনতে হয়েছিল একটা বুনোফুলও। আমাকে চিনতে হয়েছিল কুশিয়ারা নদীর পাড়; যেখানে পায়ের আঙুলের ফাঁকে একেক সন্ধ্যায় গজিয়ে উঠে নির্মল সবুজ ঘাস।
আশির দশকে পুরান ঢাকার একটা বদ্ধ বিল্ডিং-এর বাসায় হুটহাট চলে আসা বাবলির গল্প শোনার আগে আমাকে জানতে হয়েছিল ভাগ অংকের পর ভাজ্য ও ভাজকের গতি হয়, ভাগশেষটা কোথায় যায়? যে শুভ্র আড়ালে ঢাকা ছিল তৃষ্ণা, দু'হাতে বেশ যত্ন নিয়ে ওই চাদর সরাতে হয়েছিল আমায়। সরিয়ে আমি দেখতে পেয়েছি আমগাছের ডালে স্কুল মাস্টার ইয়াকুব আলির ঝুলন্ত দেহ। তাকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী। আর দেখতে পেয়েছি, ওই আমগাছজুড়ে চকচক করছে একগাদা স্বর্ণলতা।
আমাকে পুরাণে যেতে হয়নি কখনো। আমি আমার মফস্বলে খুঁজে পেয়েছি পৌরাণিক লিলিথ, মায়ের পিঠ হাতড়ে পেয়েছি একজাড়া ডানা, গভীর রাত্তিরে ঘুম ভেঙে উঠে পেয়েছি অপরিচিত আপনজন আর ভাঙতে চেয়েছি মানবজন্মের প্রকৃত ব্যাকরণ।
অবগুণ্ঠন আমার সকল গল্পের উৎস। অবগুন্ঠনে আপনাদের স্বাগত...
প্রথম গল্প 'আফরিন' পড়ে পাক্কা এক সপ্তাহ এই বই থেকে দুরে থেকেছি। ভেবেছিলাম ২য় গল্পটা যদি আবার ওরকম হয় তাইলে আর বাকি গল্পগুলো পড়ব না। ওতো ইমোশন আসলে আমার ধাতে সয় না। তবুও শেষমেশ সবগুলো গল্প কিভাবে যেন পড়ে ফেলেছি। এবং একটা গল্পকেও অপছন্দের তালিকায় ফেলতে পারিনি।
সবশেষে, ঐ প্রথম গল্প 'আফরিন' ই আমার সবচেয়ে প্রিয়। এরকম একটা গল্প নিয়ে এক সপ্তাহ অনায়াসেই মন খারাপ করে থাকা যায়। এমনকি এক বছরও। যতদিন বইটা আমার চোখের সামনে থাকবে ততদিন 'আফরিন' আমাকে ঐ মন খারাপ করা কষ্টকর অনুভূতি অবিরাম দিতেই থাকবে। তাই বইটা ট্রাঙ্কে তুলে রাখব যেন চোখে না পড়ে।
আফরিন: রোমান্টিক উপন্যাস। অদ্ভুত ধরনের। এ পৃথিবীতে আমরা তাদেরই বেশি কষ্ট দিই যারা আমাদের ভালোবাসে। কিন্তু একবার সে ভালোবাসা হারিয়ে গেলে তার বোঝা বয়ে বেড়ানো যে বেজায় কষ্টের এই গল্পে সেই দৃশ্যই তুলে ধরেছে সুন্দর ভাবে।
অবম: সাইকোলজিক্যাল ঘরাণার উপন্যাস। মূলত সাইকোপ্যাথ এক কিলারের গল্প নিয়ে এই উপন্যাস।
চন্দ্রকূহর: কেমন হবে যদি হঠাৎ পাশের ঘর থেকে কারো হাসির শব্দ আসে আর সেই হাসির প্রতি একসময় নেশা ধরে যায়! কিন্তু সেই হাসি কি আদৌ কোনো মানুষের নাকি অন্য কোনো জগতের! গল্পের শুরু গণিতের শিক্ষক ইয়াসিন স্যারের বাসায় পড়া থেকে। ইয়াসিন স্যারের বাসার দেয়ালে টাঙানো এক নারীর ছবি গল্পকথকের মাথায় গেঁথে যায়, কিন্তু সে ছবি কার এবং কেন এখানে টাঙানো হয়েছে তা নিয়েই এই গল্প!
কুশিয়ারা: মামার দেওয়া আদুরে নাম কুশিয়ারা। কিন্তু কুশিয়ারা যতই বড় হতে থাকল, ততই সে স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে অদ্ভুত আচরণ করতে থাকল, নিষ্পাপ মানুষ, পশু-পাখিকে আঘাত করতে থাকল। একসময় সে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকল আর যখন তার এ বিষয় উপলব্ধি হল তখন বেশ সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে।
সমাস: গল্পের শুরু একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবারের সকালের খুনসুটি দিয়ে কিন্তু ধীরে ধীরে গল্পের মোড় নিতে থাকে এক অন্ধকার দিকে। একটি সুস্থ পরিবার এক সময় ভেঙে যায় শুধুমাত্র লোভ আর অসৎ কর্মের জন্যে। গল্পটি মূলত ট্র্যাজেডি এবং রিভেঞ্জ ঘরাণার মিশ্রণ।
অব্যয়: সমাজের যথারীতি নিয়ম থেকে ভিন্ন একটি মেয়ে তৃষ্ণার সাথে বন্ধুত্ব আর তৃষ্ণার শেষ পরিণতি নিয়ে এই গল্প। গল্পটা বেশ হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশে শুরু হলেও এর শেষ হৃদয়বিদারক!
মন্দন: ট্র্যাজেডি আর রোমান্টিসিজম এর সমন্বয়ে রচিত গল্প এটি।
লিলিথ: মাহমুদ নামের এক যুবকের এক ডিভোর্সি নারী ও তার একমাত্র মেয়ের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে গল্প। বেশ ভালোই।
পুষ্পক: দীর্ঘ ২২ বছরের পর কিশোরের ভাগ্যে নেমে আসে প্রেমের ধারা, আর সবকিছু কেমন যেন ঠিক চলতে থাকে কিন্তু বাঁধ সাধে কিশোরের জীবনে ক্যান্সারের আগমনে। স্তিমিত হয়ে যায় জীবন তার, একদিকে নিজের প্রেমিকার অপেক্ষা অপর দিকে পরগাছা স্বর্ণলতার মতো বাসা বাঁধতে থাকে ক্যান্সার। শেষ পরিণতি কি হলো কেউ জানতে পারলো না।
কল্ক: ইয়াকুব আলী বিদ্যাকুমারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক, কিন্তু তারই বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আজ সে আসামীর কাঠগড়ায় আর তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির। কিন্তু সে আজ এই পরিণতির শিকার তার পিছনে রয়েছে এক গভীর ষড়যন্ত্র। গল্পে অযথা যৌনতা টেনে আনা হয়েছে কিছু জায়গায় এবং ১৮+ গল্প এটি।
বিসর্গ: মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত। একবার কিছু তার মাথায় গেঁথে গেলে তা কিভাবে দিনে দিনে মানুষকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলে তা এই গল্পে বিদ্যমান। গল্পের চরিত্র অহনার ধারণা হতে থাকে কেউ তাকে ফলো করছে এবং এই চিন্তা তার মাথায় সর্বক্ষণের জন্যে গেঁথে যায়। যার জন্যে সে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হতে থাকে। কিন্তু কেউ কি আসলেই তাকে ফলো করছিলো নাকি সে মনে মনে এসব কাহিনী রচনা করছিল তা গল্পের শেষে ডিসক্লোজ করা হয়েছে।
ধ্রুপদ: কেমন হবে যদি হঠাৎ মধ্য রাতে ঘুম ভেঙে যায় আর দেখতে পান কেউ একজন আপনার সামনে নগ্ন অবস্থায় বসে আছে! এমনই কিছু ঘটনা ঘটে মাহমুদের সাথে। আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে থাকে সেই নগ্ন ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, তার নিজের পিতা। কিন্তু তার পিতা তো পাশে ঘুমাচ্ছে, তবে সোফায় বসে থাকা ব্যক্তিটি কে! জানতে হলে পড়তে হবে এই ছোট গল্পটি।
ভূতভৈরবী: ভূতভৈরবী দেখতে অন্য দশটা স্বাভাবিক ফুলের মত হলেও এ ফুল যে কারো জীবন নিয়ে নিতে পারে তা কল্পনাতীত। আর এই ফুলের জন্যে কাউকে নিজের প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে দু’বছর। কিন্তু কেন? কি আছে রহস্যময় এ ফুলে?
অবগুন্ঠন : কেমন হবে যদি কেউ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ছয়টা খুন করে কিন্তু সে নিজেও জানে না কেন করে বেড়ায়! এই গল্পের মূল চরিত্র অর্কের নিজের জবানীতে বলা এই গল্পে দেখা যায় তার মামাতো বোন খুনের মতো এক ভয়ানক পাপে জড়িয়ে পড়েছে আর তার এই খুনের শিকার হচ্ছে নিজের কাছের মানুষ। কিন্তু কেন সে খুনে করে আর কি আনন্দ পায় সে এই খুন করে, আদৌ কি সে সজ্ঞানে এসব হত্যা করে নাকি সে মানসিক ভাবে অসুস্থ এসকল প্রশ্নের খোঁজেই গল্পকথক অর্ক।