১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর বঙ্গদেশের ভূমিস্বত্ব ও উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে। কৃষকদের মধ্যে নিজেদের অধিকারবোধও জাগ্রত হয়। এই অধিকারবোধের ফলে পরবর্তীকালে তেভাগা আন্দোলনসহ অনেক কৃষক সংগ্রামের সূচনা হয়। জমিদারপ্রথারও বিলুপ্তি ঘটে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক বইতে বদরুদ্দীন উমর উপরিউক্ত পটভূমিতে আঠারো শতকের শেষ দশক থেকে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বঙ্গদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। মোগল ভারতের ভূমিব্যবস্থা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি প্রাপ্তির প্রসঙ্গও আলোচিত হয়েছে। এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনায় বইটি অসাধারণ দলিল হিসেবে বিবেচ্য।
Umar received his MA in Philosophy from Dhaka University and his BA Honors degree in PPE (Philosophy, Politics and Economics) from Oxford University. Umar began his academic career as a teacher at Dhaka University on a temporary basis. In 1963, he joined Rajshahi University as the founder-chair of the Political Science department. He also founded the department of Sociology at the same university, but he resigned from his university positions during the hostile times of the then East Pakistan governor Abdul Monem Khan to become increasingly more active and engaged as a full-time leftist political activist and public intellectual to fight for the cause of oppressed peasants and workers in Bangladesh.
As a follower of Marxist-Leninist principles, Umar began writing anti-colonial articles from the 1970s. In the 1960s he wrote three groundbreaking books––Sampradayikata (Communalism, 1966), Sanskritir Sankat (The Crisis of Culture, 1967), and Sanskritik Sampradayikata (Cultural Communalism, 1969)––that theorize the dialectics of the political culture of ‘communalism’ and the question of Bengali nationalism, thus making significant intellectual contributions to the growth of Bengali nationalism itself. In 1969, Umar joined the East Pakistan Communist Party (Marxist-Leninist), and from February 1970 to March 1971, Umar edited the mouthpiece of the East Pakistan Communist Party––Saptahik Ganashakti—which published essays and articles about the problems and prospects of the communist movement in Pakistan. He was president of both Bangladesh Krishak Federation (Bangladesh Peasant Federation) and Bangladesh Lekhak Shibir–the country’s oldest organisation of progressive writers, intellectuals, and cultural activists.
ইংরেজপূর্ব অবিভক্ত বাংলায় সামন্তপ্রথার মতো কড়াকড়ি রাজস্ব আদায় পদ্ধতি ছিল না। মোগল ও নবাবি আমলে জমির মালিক স্বয়ং সম্রাট। বংশানুক্রমে জমিদার হওয়ার পথ ছিল রুদ্ধ। তখন খাজনা দিয়ে কৃষক নিজের জমিতে চাষাবাদ করে খেতে পারতো ; মালিকানা নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে ওঠেনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির হাতে ক্ষমতার যাওয়ার পর সমস্ত ভূমিব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কেননা কম্পানির একমাত্র লক্ষ্য বাড়তি রাজস্ব আদায়। প্রজার বাঁচা-মরা নিয়ে ভাবনা ভেবে কম্পানি সময় নষ্ট করেনি।
মোগল ও নবাবি আমলে ভূমিতে কৃষকের হক থাকলেও কম্পানির যুগে তা রহিত হয়ে যায়। প্রধানত দুইটি কারণে বাংলায় বেশি রাজস্ব আদায় হতো। প্রথমত. চমৎকার সেচব্যবস্থা যা দীর্ঘসময়ের চেষ্টায় গড়ে উঠেছিল এবং দ্বিতীয়ত. জমিনে কৃষকের অধিকার। যত্ন না নিয়ে সেচব্যবস্থা ধ্বংস এবং জমিনে কৃষকের অধিকার কেড়ে নেওয়ায় দীর্ঘদিনের রীতিতে প্রভাব পড়ে।
১৭৭০ সাল তথা ১১৭৬ বঙ্গাব্দের আকালে প্রায় তিন কোটি মানুষ মারা যান। এই দুর্ভিক্ষের জন্য অনাবৃষ্টি ও বন্যা খানিকটা নিশ্চয়ই দায়ী। কিন্তু মূল দায় কম্পানির। ক্ষেতে ফসল হয়নি। খাজনা দেওয়ার সামর্থ্য রায়তের নেই। তবু মওকুফ করা হয়নি খাজনা, ছাড় দেওয়া হয়নি কৃষককে। উপরন্তু ইংরেজের লক্ষ্য তখন আরও বেশি রাজস্ব আদায়। দেশে তখন চালের ব্যাপক ঘাটতি ছিল না। বরং ইংরেজ বেনিয়াদের চাল কিনে মজুদ করে দাম বাড়ানোর কারণেই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। কম্পানির অনেকেই তখন এই খাদ্য মজুদের ব্যাবসা করে লাখপতি হয়েছিলেন। তৎকালীন এক ইংরেজ বেনিয়ার কথা বদরুদ্দীন উমর এভাবে উল্লেখ করেছেন,
'এই জঘন্যতম ব্যবসায় মুনাফা হইল এত শীঘ্র ও এরূপ বিপুল পরিমাণে যে, মুর্শিদাবাদের নবাব-দরবারে নিযুক্ত একজন কপর্দকশূন্য ভদ্রলোক এই ব্যবসা করিয়া দুর্ভিক্ষ শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় ৬০ হাজার পাউন্ড (দেড় লক্ষাধিক টাকা) ইউরোপে পাঠাইয়াছিলেন। ' দুর্ভিক্ষে বাংলার তিনভাগের একভাগ মানুষ প্রাণ হারালেও কম্পানির আয়ে সেই প্রভাব পড়েনি। আকালের আগের বছর রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ কোটি ৫২ লাখ ৪ হাজার ৮শ ৫৬ টাকা। না খেতে পেয়ে তিন কোটি মানুষ মারা যাওয়ার পর কম্পানি রাজস্ব বেড়ে দাঁড়াল ১ কোটি ৫৭ লাখ ২৬ হাজার ৫শ ৭৬ টাকা। খাজনা আদায়ের জন্য কম্পানি কতটা জুলুম করেছিল তা টাকার অঙ্কেকেই প্রকাশ্য।
রাজস্ব আদায়ের জন্য এক বছর, পাঁচ বছর ও দশ বছরের তিনটি পরিকল্পনা ব্রিটিশরা গ্রহণ করেছিল। কোনোটিই কম্পানিকে খুশি রাখার মতো পয়সার জোগান দিতে পারেনি। তখন কর্নওয়ালিশ ভাবলেন রাজস্ব আদায়ের ভার কোনো তৃতীয় পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দিয়ে দিলেই হয়। তাতে কম্পানির কাজ কমে যাবে এবং মুফতে রাজস্ব পকেটে চলে আসবে। এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে কর্নওয়ালিশ বলেছেন,
'আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই (এ দেশের) ভূস্বামীগণকে আমাদের সহযোগী করিয়া লইতে হইবে। যে ভূস্বামী একটি লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিন্ত মনে ও সুখে-শান্তিতে ভোগ করিতে পারে, তাহার মনে তাহার কোনরূপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগিতেই পারে না। '
কর্নওয়ালিশ শতভাগ সঠিক চিন্তা করেছিলেন। এই ভূস্বামীরা সবসময় ব্রিটিশদের অনুগত থেকেছে। শুধু ভূস্বামীদের মনোজগতে ইংরেজবিরোধী কোনো ধরনের বদল আনার কুবুদ্ধি আসেনি এ যেমন সত্য, তেমনি বঙ্কিমবাবুর মতো ইংরেজভক্তগণও 'আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি।' - এই ধারণা কায়মনোবাক্যে বিশ্বাস করেছেন। ইংরেজ বিতাড়নে সমাজের সর্বস্তরের জনগণ কম-বেশি সহায়তা করেছিল। একটি জমিদারশ্রেণি কখনো এগিয়ে আসেনি। এ নিয়ে বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো স্মৃতিচারণ,
'এ কাজে (সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিতে) সরকারী ছোট-বড় কর্মচারীদের মধ্যে, এমনকি পুলিসের কাছেও বরং সাড়া পাওয়া গিয়েছিলো, কিন্তু জমিদার শ্রেণীর মধ্যে সবচেয়ে কম সাড়া পেয়েছি।'
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পূর্বের জমিদার ও পরের জমিদারদের মধ্যকার ব্যবধান আসমান-জমিন। মোগল আর নবাবি আমলের দেশিয় রাজ-রাজরাদের নিজেদের এলাকাতেই বংশপরিচয় বসবাস ছিল। প্রজার সাথে কিছুটা নৈকট্যের সম্পর্ক তাদের রাখতে হতো। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফাঁদে অনেক বড়ো বড়ো জমিদার ও দেশিয় রাজা নিঃস্ব হয়ে যান। তাড়াতাড়ি তাদের জমিদারি কিনে নেয় কম্পানির খেদমত ও বেনিয়াগিরি করে টাকার মালিক হওয়া বাবুগণ। এই বাবুরা বেশির ভাগ নিজস্ব জমিদারিতে থাকতেন না। নব্য জমিদারদের কেন্দ্রভূমি ছিল কলকাতা। তাই রাতারাতি খাজনা আদায় ও জমিদারি তদারক করার জন্য একটি মধ্যস্বত্বভোগীশ্রেণি। বদরুদ্দীন উমর এই পরিস্থিতিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন,
'পুরাতন জমিদারদের পরিবর্তে যারা নতুন জমিদার হলো তারা অধিকাংশই ছিলো শহরবাসী বেনিয়ান, দালাল, ব্যবসায়ী প্রভৃতি। শহরে বসবাস করার ফলে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে নিয়মিতভাবে তারা রাজস্ব আদায় করতে পারতো না। এই খাজনা আদায়ের প্রয়োজনেই তারা সৃষ্টি করে আর এক নতুন মধ্যস্বত্বভোগী। এই নতুন মধ্যস্বত্বভোগীকে সরকারও আইনসঙ্গত বলে স্বীকার করে নিলো এবং তারা জমিদারের মোট প্রাপ্যের ওপর নিজেদের অতিরিক্ত প্রাপ্য কৃষকদের থেকে আদায় করতে গিয়ে তাদেরকে সর্বস্বান্ত করে ধ্বংসের পথে এগিয়ে দিলো।'
আগে কৃষকদের শুধু জমিদারকে খুশি রাখলেই চলতো। নয়াব্যবস্থায় জমিদারকে নির্দিষ্ট খাজনা ব্যতীত আরও বিচিত্র রকমের কর দিতে হতো। সেই করের বোঝাকে অসহনীয় করে তোলার ভূমিকা রাখতো জমিদারি তদারককারি নায়েব ও গোমস্তাশ্রেণি।
আশঙ্কাজনক হারে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। অনেকক্ষণ দেখা যেত যে জমিদার খাজনা আদায় করে, সেই আবার চড়া সুদে কৃষককে ধার দেয়। এই খাজনা ও সুদের দুষ্টচক্রে পতিত হয়ে কত কৃষক সর্বস্বান্ত হয়েছে সেই পরিসংখ্যান হয়তো কেউ রাখেনি।
পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগুরু কৃষক বাঙালি মুসলমান এবং জমিদার-জোতদার ধর্মে হিন্দু। মূলত মুসলমান কৃষকের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ জালিম জমিদারের বিরুদ্ধে। যেখানে ঘটনাক্রমে জমিদার ও মহাজন হিন্দু। এই জমিদার বনাম রায়তের দ্বন্দ্ব কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দ্বৈরথে রূপান্তরিত হয়। অর্থনৈতিক বিরোধ জোগান দেয় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের। লীগে জমিদার কম জোতদার ও কৃষকের সমর্থক বেশি। অপরদিকে কংগ্রেস যতই নিজেকে সর্বভারতের একমাত্র মুখপাত্র দাবি করুক না কেন তারা বাংলায় শোষকের পক্ষে। অবিভক্ত বাংলার বিধানসভায় জমিদারদের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো প্রস্তাবে সায় দেয়নি কংগ্রেস। উল্টো সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধিতা করেছে কৃষকের অধিকারের। বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন,
'জমিদার-জোতদার, মহাজনদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাধান্যের ফলে জোতদার, মহাজন-কৃষক, খাতক শ্রেণী বিরোধকে তারা হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিরোধ হিসেবে উপস্থিত করেছিলো এবং বাঙলাদেশে মুসলমান কৃষকরা মুসলিম লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র সংগঠিত হয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো পাঁচ লক্ষে। '
বর্ণহিন্দুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯২৮ সালে প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনের প্রশ্নে। বিধানসভার ��ংগ্রেসিরা আইনের বিপক্ষে অবস্থান নেন, এমনকি সেই দলে ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তিত্ব।
তেভাগা, আধিয়াসহ অন্যান্য কৃষক আন্দোলন নিয়ে বদরুদ্দীন উমর চমৎকারভাবে লিখেছেন।
জমিদারি প্রশ্নে কংগ্রেস ও লীগের মতানৈক্য থাকলেও দেশভাগের পরে পরিষ্কার হয়ে যায় দল দুইটির চরিত্র একই। কংগ্রেস বাংলায় জমিদারি উচ্ছেদের বিপক্ষে ছিল, এদিকে নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন পূর্ববঙ্গ সরকার বিনা খেসারতে জমিদারির মতো শোষণমূলক ব্যবস্থাকে বিলোপে রাজি ছিল না। লীগের উদারপন্থি আবুল হাশিম-সোহরাওয়ার্দী জোট বিনা খেসারতে জমিদারি বিলোপের দাবি জানায়। কিন্তু তৎকালীন প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী ফজলুর রহমান গড়ে দশগুণ বেশি ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমিদারিপ্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব করেন। সরকারের যুক্তি ছিল জমিদারদের ক্ষতিপূরণে ব্যয় হওয়া একশ কোটি টাকা প্রাক্তন জমিদারগণ পূর্ববঙ্গে শিল্পস্থাপনে ব্যয় করবে! লীগের এই অর্থমন্ত্রী ভুলে গিয়েছিলেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলার গরিব কৃষককে লুণ্ঠনকারী জমিদাররা যথেষ্ট টাকাকড়ি আয় করেছে এবং বেশির ভাগ বাঙালি হিন্দু জমিদার-জোতদার ইতোমধ্যে দেশভাগের কারণে ভারতে চলে গিয়েছিল। তাহলে ক্ষতিপূরণের সেই একশ কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হবে তা সহজেই অনুমেয়।
জমিদারিপ্রথা নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যপূর্ণ এমন লেখা নিঃসন্দেহে দুর্লভ। বদরুদ্দীন উমরের গদ্য গতিময় নয়। তাই একবসায় বইটি পড়া যাবে না। এটুকু অনুযোগ রইল।
হান্টারের 'নিরুপায়' ব্রিটিশ বয়ান (The Indian Musolmans — W. W. Hunter) যেখানে শেষ হয়, উমরের এই বই ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়। ব্রিটিশ বয়ানে হান্টার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে আমলাতন্ত্রকে ঠিক করার একটা প্রক্রিয়া বলেন, যেখানে দুর্নীতিবাজ উর্ধতন মুসলমান কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বের করে সিস্টেমকে শুধরাতে এবং মিতব্যয়ী করার জন্য সেই বন্দোবস্ত করা হয়।
বাস্তবে যেটা হয়, ১৭৯৩ এর কর্ণওয়ালিসের করে যাওয়া এ বন্দোবস্ত ছিল সেই ছুরির মতন যা দুদিকেই কাটে। এই বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলায় রাজস্ব আদায়কারী যে হিন্দু শ্রেণিটি ছিল তাদের জমির উপরে মালিকানা প্রদান করা হয়, অন্যদিকে জমির প্রকৃত মালিক কৃষকেরা হয়ে পড়ে কৃষিশ্রমিক। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মোতাবেক যতক্ষণ পর্যন্ত সংগৃহীত রাজস্বের ৯০% জমিদারেরা (অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট মূল্য ঠিক করা ছিল) ব্রিটিশদের দিবে ততদিন সেই জমি, জমির কৃষকের মালিকানা চলে যায় জমিদারের হাতে। বিভিন্ন যেনতেন খাজনার নাম করে চাঁদা তুলতে তুলতে দরিদ্র কৃষকদের এমন অবস্থা হয় যে নিজেদের বিকাশের, এমনকি চাষের জমির রক্ষণাবেক্ষণের খরচটাও তাদের হাতে থাকে না। জমিদার থেকেই দেনা নিয়ে খাজনা পরিশোধ করে পরবর্তী বছরে সব ফসল জমিদারের কাছেই বিক্রি করে সে দেনা পরিশোধ করেও পুরো দেনা সে পরিশোধ করতে পারে না। উপরন্তু বাংলার এই কৃষকদের অধিকাংশ ছিল মুসলমান — প্রজন্মান্তরে যারা পরিণত হয় ব্রিটিশ এবং জমিদারদের দাসে।
এমনটা করবার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির মধ্যে একটা 'স্থায়ী' বুর্জোয়া শ্রেণি তৈরী — পরবর্তী সময়ে যারা নিজেরাই নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ব্রিটিশদের অনুগত থেকে সাম্রাজ্যবাদী শাসনে সহায়তা করবে। এদিক থেকে ব্রিটিশরা সফল।
আলোচনা দীর্ঘায়িত করবো না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আলোচনার পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলে সংগঠিত দুর্ভিক্ষ, কৃষক বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, কৃষকদের দুর্দশা, সবশেষে পাকিস্তান হওয়ার পরে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক পটভূমি এবং ভোটবাণিজ্য নিয়েও বিশদভাবে তুলে এনেছেন লেখক বদরুদ্দীন উমর।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলতে আমরা যে বিষয়গুলো বুঝি তার ভেতরের বিস্তারিত কাহিনী বা বর্ণনা বর্তমানে পঠিত স্কুল কলেজের বইতে উল্লেখ নেই ।
এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পিছনে কারা জড়িত কে পক্ষে বাক্যে বিপক্ষে এর পিছনে জমিদারি ব্যবস্থার প্রভাব কৃষকদের বিরোধিতা এবং সে সময়ে দুর্ভিক্ষের পিছনে কারণ গুলি তেভাগা আন্দোলন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে বদরুদ্দিন ওমর বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। ভারতবর্ষে রেলপথ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো এদেশের কৃষকদের উৎপাদিত ফসল এবং কাঁচামাল সহজেই রেলপথের মাধ্যমে বন্দরে পৌঁছে দেওয়া যার কারণে রেলপথ স্থাপনের পরে যে সকল দুর্ভিক্ষ হয়েছে সেখানে আগের চেয়ে তিন চার গুণ বেশি লোক মারা যায়।
সে সময় দুর্ভিক্ষের পিছনে বর্তমান সময়ের মতো এসব মজুমদার তখনও ছিল তারা খাদ্যদ্রব্য মজুদ রেখে দাম বাড়িয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতো এবং অবৈধ মুনাফা অর্জন করত । ওই সময় দুর্ভিক্ষের পিছনে তৎকালীন সরকার তথা একে ফজলুল হকের সরকারেরও দায় এড়ানো যায় না তিনি বাংলায় যখন ২৫ লক্ষ টন চাউলের ঘাটতি ছিল তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে বাংলায় চাউলের কোন অভাব নাই ।
বাংলায় চাউলের ঘাটতির সময় তৎকালীন হিন্দু ব্যবসায়ীরা বাংলায় চাউল রপ্তানি করেন নাই । এটা অনেকটা বর্তমানে পেঁয়াজ রপ্তানি সহ অন্যান্য দ্রব্যাতে উপরে ভারতীয় সরকারের যে নিষেধাজ্ঞা সেই ঘটনারই উদয় ।