জনপ্রিয় গোয়েন্দাপীঠ সিরিজের অবস্থান কাল্পনিক ডিটেকটিভ ফিকশনের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে। বাস্তবের বিবিধ অপরাধ-কাহিনি এবং তার তদন্তপথের নানা চড়াই-উতরাইয়ের নেপথ্যকথা এই সিরিজকে করে তুলেছে জীবন এবং সময়ের এক বিশ্বস্ত দলিল। থ্রিলারধর্মী উপস্থাপনা এবং স্বাদু গদ্যের মিশেলে যা হয়ে উঠেছে আরও আকর্ষক। সিরিজের নবতম নিবেদন, ‘আরও একবার গোয়েন্দাপীঠ’-ও ব্যতিক্রম নয়। অভিজ্ঞ আইপিএস অফিসার সুপ্রতিম সরকারের নির্মেদ লেখনীতে এই বইয়ে উঠে এসেছে সাতটি রোমহর্ষক মামলার টানটান আখ্যান। মালদার কালিয়াচকে অকল্পনীয় পদ্ধতিতে একই পরিবারের চারজনকে খুনের রুদ্ধশ্বাস কাহিনির পাশাপাশিই স্থান পেয়েছে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে কাঙ্ক্ষিত নারীর প্রেমিককে নৃশংসতম খুনের ইতিবৃত্ত। বছর দেড়েক আগে ফরাক্কায় এক নাবালিকার খুন এবং গণধর্ষণের ঘটনায় কীভাবে নজিরবিহীন দ্রুততায় অপরাধীদের শাস্তি সুনিশ্চিত করেছিল রাজ্য পুলিশ, তার প্রামাণ্য ধারাবিবরণী লিপিবদ্ধ হয়েছে ‘Police Procedural’ গোত্রভুক্ত এই বইয়ে।
‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদে পড়ে সাইবার-জালিয়াতদের কাছে সর্বস্ব খোওয়ানো মানুষের সংখ্যাটা সাম্প্রতিক অতীতে ক্রমবর্ধমান। রানাঘাটের একটি মামলায় কীভাবে এই জালিয়াতির শিকার হয়েছিলেন এক বৃদ্ধ সহনাগরিক, এবং কোন পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ন’জন জালিয়াতকে গ্রেফতার করে তাদের শাস্তিবিধান করেছিল পুলিশ, এ বইয়ে রয়েছে তার সবিস্তার ঘটনাক্রম।
ছয়টি বাস্তব কাহিনি ছাড়াও এ বইকে সমৃদ্ধ করেছে কল্পনার গোয়েন্দা আর বাস্তবের গোয়েন্দাদের তফাত নিয়ে একটি সুখপাঠ্য নিবন্ধ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত যে নিবন্ধে লেখক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তুলে ধরেছেন অপ্রিয় সারসত্য: ডিটেকটিভ ফিকশনে শখের গোয়েন্দা হলেন Artist, আর পুলিশ Artisan মাত্র।
সুপ্রতিম সরকারের জন্ম কলকাতায়, ৩০ মে ১৯৭১। আশৈশব কৃতী ছাত্র। ছাত্রজীবন কেটেছে সেন্ট লরেন্স হাই স্কুলে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণির স্নাতক। আনন্দবাজার পত্রিকায় স্বল্প দিনের সাংবাদিকতার পর ১৯৯৭ সালে যোগ দেন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসে। কর্মজীবনে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এবং কলকাতায় নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলেছেন। বর্তমানে কলকাতা পুলিশে অতিরিক্ত কমিশনার পদে কর্মরত। কর্মক্ষেত্রে প্রশংসনীয় দক্ষতার জন্য ২০১৫-য় সম্মানিত হয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল’-এ, ২০১৭-য় ভূষিত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রদত্ত বিশেষ সম্মানপদকে।পেশায় আই পি এস অফিসার, নেশায় আপাদমস্তক ক্রিকেটানুরাগী। লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই ‘গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার’।
সুপ্রতিম সরকারের আরও একবার গোয়েন্দাপীঠ বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা একটি চমৎকার গ্রন্থ। লেখকের অভিজ্ঞতা, বর্ণনার স্বচ্ছতা ও বিষয় উপস্থাপনের দক্ষতা সত্যিই প্রশংসনীয়।
বাস্তব ঘটনার উপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্সে কল্পকাহিনির মতো নাটকীয় অ্যাকশন বা অতিরঞ্জিত টুইস্ট নেই—কিন্তু সেটাই বরং বইটির সততা ও শক্তি। বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে গল্প বলার এই প্রয়াস বইটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
গোয়েন্দা ও বাস্তব অপরাধের সংমিশ্রণ যাঁদের ভালো লাগে, তাঁদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি উপভোগ্য পাঠ। লেখকের আরও লেখা পড়ার আগ্রহ জাগিয়ে দেয় এই বইটি।