শহরের একপ্রান্তে নিজের বাড়ির নীচ তলায় খুন হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিক এবং তার শিক্ষিকা স্ত্রী। সেদিনের ঘটনার পর অদ্ভুতভাবে বেপাত্তা হয়ে যায় তাদের একমাত্র যুবতী মেয়ে। এটা কি নিছকই সিনিয়র সিটিজেনদের টার্গেট করে ডাকাতি করার জন্য খুন? শান্তশিষ্ট তিস্তা পাড়ের শহরে এই ভয়ংকর ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়ে শহরবাসী, নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ঘটনার পেছনে কি অন্তর্ঘাত, নাকি আধিকারিকের চাকরি জীবনের কোনো অজানা রহস্য। তদন্তে নেমে ডিএসপি রেশমি বসু কী কী জানতে পারবেন? রহস্যের জট খুলতে খুলতে কোথায় নিয়ে যাবেন তিনি, সে সবটাই জানা যাবে ‘রাত্রি নিশীথে’র শেষ দিকের পৃষ্ঠাগুলিতে।
বদমেজাজী অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিক অমরকান্তি সান্যাল হঠাৎ করেই এক অচেনা শহরে এসে আস্তানা গেড়ে বসেন তার স্ত্রী (পেশায় শিক্ষিকা) ও মেয়েকে নিয়ে। পরিচিতির গন্ডি বলতে অবসরপ্রাপ্ত হওয়ায় বাড়িতে টিউশনে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা। পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদভাব তো দূরের কথা মুখ দেখাদেখি না হলেই যেন মঙ্গল। এহেন বেশ কয়েকবারই সান্যাল বাড়ির কাজের লোক পালটে গেছে। যারাই ছেড়েছে সকলের মুখে একই কথা - বদমেজাজী, পান থেকে চুন খসলো কি অমনি উলটো পালটা কথাবার্তা। স্টুডেন্টরাও অমরকান্তির বদমেজাজকে সমীহ করে চলে নেহাতই উনি ভালো পড়ান তাই। এছাড়া কারোর সাথে পাঁচে থাকেন না সান্যাল বাড়ি। প্রথম প্রথম অনুষ্ঠান বাড়ি নেমতন্ন করলেও ওদিক থেকে সাড়া না পাওয়ায় পাড়া প্রতিবেশীও তেমন একটা ঘাঁটায় না। তাহলে এমন কি ঘটনা ঘটল যার জন্য খুন হতে হল মিস্টার এবং মিসেস সান্যালকে, তাও তাদের নিজের বাড়িতেই। বদমেজাজীর কারণে কি চাকরিসূত্রে কোন আক্রোশ — যার পরিণতি এই খুন? তদন্ত করতে নেমে ডি এস পি রেশমি বসু জানতে পারেন সান্যাল বাড়ির মেয়ে খুনের পর থেকেই নিরুদ্দেশ। খুনটা কি তবে সান্যাল বাবুর মেয়েই করলো? তদন্তেই উঠে আসে সান্যাল বাবুর এক ছেলে আছে, যাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন সান্যাল বাবু। নতুন শহরের কেউ-ই সে খবর জানত না। তবে কি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণেই তার ছেলের হাতেই শেষে প্রাণ দিতে হল? — উত্তর খুঁজতে পড়তে হবে রাত্রি নিশীথে।
যদিও বা রেশমি বসু সিরিজের এটি ৫ নম্বর সিরিজ, তবে রাত্রি নিশীথে-ই লেখিকার সাথে পরিচয়। এই অনভিজ্ঞ পাঠক মনের ভালো খারাপ লাগার মধ্যে কয়েকটি বিষয়গুলোই নোট করেছি।
১) সহজ, সরল ভাষায় গল্পের গতি নিজ ছন্দেই এগিয়ে চলেছে।
২) জোরালো বাঁধন আছে না বলে বাঁধন ভালোই আছে বলতে পারি।
৩) যখনই মনে হবে অপরাধী ধরা পড়ে গেছে তখনই নতুন টুইস্ট।
৪) ক্রাইম ডিটেকশনের পাশাপাশি টুকটাক কেমিস্ট্রিও রয়েছে তবে সেটা ক্রাইম থ্রিলারকে বিভ্রান্ত না করেই।
৫) এখন হাতে গুনেই বেশ কিছু গল্পে, গল্পের বিষয়বস্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চরিত্রগুলোর মধ্যে সমকামী চরিত্রগুলোরও ছোঁয়া থাকতে দেখা যাচ্ছে, কোনওরকম কুৎসিতকর বার্তা না দিয়েই। মান-হুঁশ যুক্ত মানুষেরা গ্রহণ করছে বলেই ধরে নেওয়া যাক। আশা করা যায় আগামীদিনে আরও ভালো কাজ হতে পারে।
৬) সবশেষে যেটা না বললেই নয় গল্পের মাঝে মাঝে অরিজিৎ গাঙ্গুলি মহাশয়ের চিত্রিত দৃশ্যপটগুলি আলাদাই মাত্রা যোগ করেছে।
হালকা মেজাজের ক্রাইম থ্রিলার ভালোবাসলে অবশ্যই পড়ে ফেলা দরকার।
😊 রেটিং : ৪/৫ 😊
( বিঃদ্রঃ - নিমিত্ত পাঠক মাত্র, জ্ঞানের পরিধি খুবই সীমিত। সীমিত জ্ঞানে যতটুকু বোধগম্য সেইটুকুই ভাষায় প্রকাশের চেষ্টা মাত্র। তাই সেই অর্থে রিভিউ বলে মনে করে থাকলে ভুল করবেন। ধন্যবাদ 😊🙏)
বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে তথাকথিত মগজাস্ত্রের লড়াই অনেক হয়েছে, কিন্তু খাকি উর্দির আড়ালে রক্ত মাংসের এক নারীর বাস্তবসম্মত পুলিশি তদন্ত বা 'Police Procedural' থ্রিলারের খরা দীর্ঘদিনের। সেই শূন্যস্থানে জলপাইগুড়ি জেলার ডিএসপি রেশমি বসু কেবল একটি চরিত্র হিসেবে নয়, বরং এক সতেজ বিপ্লব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। লেখিকা হিমি মিত্র রায়ের হাত ধরে আসা এই সিরিজটি প্রমাণ করে যে, অপরাধী শনাক্ত করা যতটা রোমাঞ্চকর, তার চেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ হলো অপরাধের নেপথ্যে থাকা সামাজিক ক্ষত এবং অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ।
আমার রেশমি বসু চর্চার শুরুটা হয়েছিল 'রাত্রি নিশীথে' দিয়ে। যেখানে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিক ও তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড এবং তাদের মেয়ের রহস্যময় নিখোঁজ হওয়া; তদন্তের প্রতিটি ধাপে পাঠককে এক গভীর অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সেই ঘোর থেকেই একে একে পড়ে নেওয়া 'আরক্ত ভৈরব', 'বজ্রকুহক' এবং 'তমসা কুহেলিকা'।
DSP রেশমি বসু অতিমানবী নন, এক লড়াকু প্রতিনিধি। রেশমি বসুর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বাস্তবতা। তিনি কোনো রূপকথার গোয়েন্দা নন যিনি তুড়ি মেরে রহস্য সমাধান করবেন। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক চৌকস অফিসার হিসেবে যার ক্লান্তি আছে, ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন আছে, আবার প্রশাসনিক জটিলতার সাথে লড়াইও আছে। এই হিউম্যান ফ্যাক্টরটিই তাঁকে পাঠকদের কাছে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
ফরেনসিক রিপোর্ট থেকে শুরু করে ময়নাতদন্তের সূক্ষ্ম ডিটেইলস প্রতিটি বইয়ে লেখিকার গবেষণার গভীরতা মুগ্ধ করার মতো। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ী কুয়াশাচ্ছন্ন গ্রাম থেকে শুরু করে মফস্বলের স্যাঁতসেঁতে গলির যে নিখুঁত বর্ণনা তিনি দেন, তাতে মনে হয় পাঠক কেবল দর্শক নন, বরং রেশমি বসুর গাড়ির পেছনের সিটে বসা এক নীরব সাক্ষী।
রেশমি বসুর কঠোর তদন্তের মাঝে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সংকল্পর সাথে তাঁর রসায়নটি ঠিক যেন ‘বাপুজী কেকের মোরাব্বা’র মতোই সুস্বাদু। এটি কেবল রোমান্স নয়, বরং দুটি বুদ্ধিজীবী চরিত্রের পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক অনন্য প্রতিফলন, যা গল্পের গতিকে একঘেয়ে হতে দেয় না।
সামাজিক বার্তা আর রহস্যের এক অনন্য মিশেলে হিমি মিত্র রায়ের এই সিরিজটি বাংলা কপ থ্রিলারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যারা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং যুক্তিগ্রাহ্য রহস্যের সন্ধানী, তাঁদের লাইব্রেরিতে ডিএসপি রেশমি বসু সিরিজ এক অপরিহার্য নাম।।