ছোটোদের জন্য ছোটোদের মতো করে গল্পের আসর বসাতেন কুলদারঞ্জন রায়। পুরাণের বহু কাহিনিকেও তিনি সংক্ষিপ্ত আকারে পেশ করেছিলেন। এই বইয়ে রইল ব্রহ্মপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, পদ্মপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, শিবপুরাণ, মৎস্যপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ ও রামায়ণ থেকে সংকলিত বেশ কিছু কাহিনির সম্ভার। তার পাশাপাশি সকলের মনোরঞ্জনের জন্য রইল মূল বই থেকে পুনরুদ্ধার করা পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্ত্তীর পাতাজোড়া অলঙ্করণের সম্ভার।
একাধারে শিশুসাহিত্যিক, আলোকচিত্রশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ ও ক্রীড়াবিদ কুলদারঞ্জন রায় ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত ভারতের ময়মনসিংহ জেলার মসূয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সংস্কৃতিবান পিতা কালীনাথ রায়ের প্রেরণায় কুলদারঞ্জনের প্রতিভা, তাঁর অগ্রজ উপেন্দ্রকিশোরের মতোই, বহু বিচিত্র দিকে বিকশিত হয়েছিল। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কুলদারঞ্জন কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। চারুকলায় এই প্রথাগত তালিম তাঁর সাহিত্যকেও প্রভাবিত করেছিল। বর্ণিত কাহিনি দৃষ্ট, শ্রুত তথা অনুভূত হয়ে যেন জীবন্ত হয়ে উঠত তাঁর লেখার অমোঘ প্রসাদগুণে।
দাদা উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত সন্দেশ পত্রিকায় ১৯১৩ সালে কুলদারঞ্জনের লেখালেখির শুরু। পুরাণ, লোককথা এবং বিদেশি চিরায়ত সাহিত্যকে স্বাদু, সাবলীল ভাষায় শিশুদের উপযোগী করে তিনি অনুবাদ করতে থাকেন 'রবিনহুড' (১৯১৪), 'ওডিসিয়ুস' (১৯১৫), 'ছেলেদের বেতালপঞ্চবিংশতি' (১৯১৭), 'কথাসরিৎসাগর', 'পুরাণের গল্প', 'ছেলেদের পঞ্চতন্ত্র' প্রভৃতি গ্রন্থে। তাঁর অনুবাদে জুল ভের্নের 'The Mysterious Island' হয়ে ওঠে 'আশ্চর্য দ্বীপ'- বিজ্ঞান, রোমাঞ্চ ও কল্পনার মেলবন্ধন যেখানে তাঁর ভাষায় এমন অনবদ্যভাবে উপস্থাপিত যে, তা আর নিছক অনুবাদ থাকে না, হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম।
বাংলা ভাষায় হোমস কাহিনির প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের কৃতিত্বও কুলদারঞ্জনের। স্যার আর্থার কনান ডয়েলের 'The Hound of the Baskervilles' উপন্যাসটি তাঁর অনুবাদে 'বাস্কারভিল কুকুর' নামে প্রকাশিত হয়। সেই প্রথম শার্লক হোমস নামের ক্ষীণকায়, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন গোয়েন্দাপ্রবরের সঙ্গে বাঙালি পাঠকের নিবিড় পরিচয়। পরে, লেডি কনান ডয়েলের অনুমতি নিয়ে তিনি শার্লক হোমসের বিচিত্র কীর্ত্তি-কথা নামে আরও একটি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করেন। 'The Adventures of Sherlock Holmes' এর সম্পূর্ণ অনুবাদও তিনি নাকি করেছিলেন, যদিও তা বর্তমানে দুর্লভ।
সাহিত্যের পাশাপাশি চিত্রকলা, আলোকচিত্র ও সংগীতেও সমান দক্ষ কুলদারঞ্জন রায় ছিলেন একজন সফল ক্রীড়াবিদ। ক্রিকেট ও হকিতেও তাঁর নৈপুণ্য সমসময়ে প্রশংসিত হয়েছিল।
রায় পরিবারে সত্যজিৎ রায় এমনই এক সব্যসাচী মহীরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছেন যে, প্রায়শই আমরা ভুলে যাই এই পরিবার জন্ম দিয়েছে আরো অনেক ফলবান বৃক্ষের। সুকুমার রায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, লীলা রায় (পরে মজুমদার), প্রমোদারঞ্জন রায়, কুলদারঞ্জন রায়, প্রত্যেকেই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। আর এদের প্রত্যেকের লেখনীই এমন যে (লেখালেখি ছাড়াও এদের সবারই অন্যান্য গুণও এতটা ছিল যে, সেসব পরিচয়েও তারা স্বতন্ত্রভাবে পরিচিত!), সাধু ভাষা হোক বা প্রমিত বাংলা, পড়লে মনে হয় ঠিক এভাবেই গল্পগুলো বলতে হতো। কুলদারঞ্জনের 'পুরাণের গল্প'-ও তাই (খুঁজতে গিয়ে দেখছি উপেন্দ্রকিশোরও একই নামে বই লিখে গেছেন, পড়তে হবে)। অত্যন্ত সিরিয়াস জটিল কাহিনীকে একেবারেই কিশোরপাঠ্য করে লিখেছেন; নিয়ে বসলে ঘণ্টাখানেকের ভেতরেই শেষ। রায় পরিবারের লেখা পড়লে একটাই সমস্যা অবশ্য, এরপরে এই ধারার সব লেখাই পানসে লাগে। পরের লেখক প্রজন্মগুলোকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, সত্তর দশকের ব্রাজিল ফুটবল টিমের সাথে প্রতিযোগিতা করে দর্শকের মন পাওয়া আসলে সম্ভব না।