'কবি' নামে যে উপন্যাস আছে সেটা আমি সবার প্রথম জানতে পারি 'অজ্ঞাত' এক মেয়ের কাছ থেকে। ঠিক মনে নেই যে কার কাছ থেকে জেনেছি! তবে সেটা নাম পরিচয়হীন একটা মেয়ে হবে এতটুকু জানি আমি।
জানতাম তারাশঙ্করের 'কবি' আছে। পরে দেখি হুমায়ুন ও তার বুকের ভেতরের 'কবি' কে উপন্যাস লিখেছেন। আর গত ইসলামি বইমেলায় জানতে পারি বাপ্পা আজিজুল ও লিখেছেন 'বায়োনভেলা'– কবি। পড়ার কথা ছিলো তারাশঙ্করের 'কবি', কিন্তু ভাগ্যের রকমফেরে পরে পড়ে ফেললাম আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহা (রা.) কে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাস 'কবি'।
প্রথম কথা–
লেখকের ভাষায় যদিও এটা 'উপন্যাস'। কিন্তু আমার ভাষায় এটাকে ছোটখাটো একটা ইতিহাস ও সীরাত আশ্রিত গল্প বলা চলে। যেখানে ১৪০০ বছর পুরোনো এক কবির আলোচনা করা হয়েছে, তবে সেটা অবশ্যই গড়পড়তা ইতিহাসের মতো কাটখোট্টা করে নয়। বরং– সরলতম গল্পভাষ্যে।
দ্বিতীয় কথা–
বইয়ের শুরুতে আমার ধারণা ছিলো বইটা তে সম্ভবত শুধুমাত্র 'রওয়াহা (রা.)' কে কেন্দ্র করে গল্প বলা হবে। তবে আমি সামনে এগোতে থাকলে আশাহত হই। কারণ কাহিনিতে মুল চরিত্র থেকে সরে গিয়ে বাকি কবি সাহাবি বা 'শায়িরুল ইসলাম'– কবি হাসসান সাবিত (রা.) এর বলা কবিতা বা আলোচনা চলে আসছিলো। ৮৭ পৃষ্ঠার হিসেবে মুল চরিত্রর যতটুকু কথা আসার কথা ছিলো সেটা আসেনি। এদিক থেকে দেখলে- এটাকে উপন্যাস বলাটা হয়তো উপযুক্ত নাহ।
তৃতীয় কথা–
হ্যা, এটা সত্য যে মুল চরিত্র থেকে সরে গিয়ে বেশ অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে আবেগ, আগ্রহ, সম্মান, আদর্শ সবদিক থেকে বিবেচনা করলে বুঝতেও পারা যায় যে কেন বারবার, রাসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তার কবি সাহাবিদের কথা উঠে আসছিলো! উপন্যাস টা যাকে উপজীব্য করে লিখা, তার নামের সাথের উপাধিই ছিলো–
শায়ীরুর রাসুল বা রাসুলিল্লাহর কবি। সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
চতুর্থ কথা–
কে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহা (রা.)? আর ইসলামে কি সাহিত্য বা কবিতা চর্চার আদৌ কোনো জায়গা আছে? আরব মুসলমান সাহিত্য চর্চায় কতদূর অগ্রগামি ছিলেন? বইয়ের পরতে পরতে এসব প্রশ্নের আবছা তবে বেশ ভালো কিছু উত্তর মিলে।
পঞ্চম কথা–
মুজাহিদ রওয়াহা (রা.) ছিলেন ইসলামের বীর সিপাহসালারদের একজন। যার নসিবে আল্লাহর রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যতবাণী করা শহীদী মৃত্যু জুটেছিল 'মুতা' র যুদ্ধে। তিনি ছিলেন মদিনার খাজরাজ গোত্রের বাসিন্দা। আকাবার ২য় বায়আতে হাত রাখা সাহাবিদের একজন। রাদিআল্লাহু আনহুম।
তিনি, হাসসান ইবনে সাবিত, কাব ইবনে মালিক ছিলেন আল্লাহর রাসুলের কবি। যারা রাসুলের আদেশে কাফেরদের করা মিডিয়া সন ত্রাসের জবাব, মানহানি, দুর্নামের জবাব দিতেন। তারা প্রতিরোধে ময়দানেও থাকতেন আবার সাথে সাহিত্যের ময়দানে।
একপাক্ষিক ভাবে কাফের কবিদের দুর্গন্ধ ছড়াতে তারা দেননি। তার কবিতার জবাব কবিতা দিয়েই দিয়েছেন। আর এই কবিতাগুলোই কাফেরদের হৃদয়ে তীরের চেয়ে বেশি তীর্যক ভাবে আঘাত হেনেছে।
তাইতো নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন–
'এই তিন কবির কবিতা কুরাইশদের কাছে তিরের ফলার চেয়েও বেশি শক্তিশালী' (৬০)।
এভাবেই মানবতার মুক্তির দূত কোরাইশদের নাস্তানাবুদ করেছেন সর্বক্ষেত্রে। আল্লাহর সাহায্য ও তার সাহাবাদের সহযোগিতায়, পরামর্শে, বুদ্ধিতে।
ষষ্ঠ কথা–
ইসলামের সাথে সাহিত্যচর্চার কেমন সম্পর্ক আছে তার এক ছটাক উদাহরণ এই বইতে উঠে এসেছে। কবিতা দেখে অনেক মুসলিম ভাই ভাবেন– আমাদের কোনো মুসলমানও বুঝি কাব্যচর্চা করেছিলেন? ইসলামে কি এসব জায়েজ!
এসব প্রশ্ন চিরাচরিত কবিতার ধরণ দেখে মাথায় আসা অস্বাভাবিক নয়। তবে হ্যা, এখানে ই আমাদের জানার অভাব ফুটে উঠে মুলত। আমরা আমাদের পূর্বসূরীদের ইতিহাস জানিনা বলেই মনে এসব উদিত হয়। না জানাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাপ হিসেবে ধরা দেয়৷
শেষ কথা–
কাব্যচর্চা, সাহিত্য, সীরাত, ইতিহাস এসব নিয়ে এক বইয়ে, একবসায় শেষ করার মতো কোনো গল্প পড়তে চাইলে– আপনার জন্য 'কবি' হতে পারে ভালো পছন্দ । বাদবাকি আপনার মর্জির মালিক আপনি।
রিভিউ with সায়েম, ২৬-ই ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ০৮-ই রমজান, ১৪৪৭।