ছোটোদের রূপকথা-সে তো জানা কথাই! কিন্তু এমন কোনো রূপকথা কি লেখা যায়, যা কেবল বড়োদের জন্যই? জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ পড়তে পড়তে কখনও মনে হয়, এ কবিতাগুলি যেন পাঠকের মনোলোকে চিত্রকল্পের চিন্ময় প্রবাহ রচনা করে চলেছে। হারিয়ে যাওয়া সেই বাংলার নিসর্গপ্রকৃতির ঐশ্বর্য, সাধারণ মানুষ ও ঐতিহ্যবাহিত চরিত্রগুলি যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। অধিকন্তু, ‘রূপসী বাংলা’-র এই স্তবনম্র ভুবনে যেন একটি আখ্যানশরীরের মৃদুল আভাস ধীরে ধীরে ধরা পড়তে থাকে। মনে হয়, এই তো সেই সত্যিকারের আখ্যান, সত্যিকারের রূপকথা, যার কাছে এসে জীবনযুদ্ধে শ্রান্ত পরিণতবয়স্ক মানুষও ‘দু-দণ্ড শান্তি’ পেতে পারেন, স্বস্তি পেতে পারেন। ‘ভ্রমরাক্ষী’ উপন্যাস এই একান্ত অনুভবেরই দলিল, বড়োদের জন্য লেখা এক আশ্চর্য অপরূপকথা।
আমরা যাইনি ম'রে আজো- তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়... এই উপন্যাসের আপ্তবাক্য জীবনানন্দের জীবন। কিন্তু গৎবাঁধা জীবনী নয়, বরং লেখক জীবনানন্দের কবিতায় আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা চরিত্র আর দৃশ্য নিয়ে এমন এক অনুপম চিত্রকল্পের জন্ম দিয়েছেন, আক্ষরিক অর্থেই যাকে বলে 'ঘোর'। অরণ্যের সোনার কলমের আঁকিবুঁকিতে একা তাপ্তিই কেবল ঘোরে আচ্ছন্ন হয় না, হই আমরাও, পাঠকেরাও। এক অদ্ভুত জগতে বিচরণ করতে শুরু করি। সে জগতটায় তিন ধরনের মানুষের বাস। যারা কল্পনায় থাকে, যারা মৃত তারা সকলে একাকার হয়ে এক বাস্তব অবাস্তবের বিভ্রান্তিমূলক জগতে বসবাস করে। সেই জগতে তাপ্তি হয়ে ওঠে ভ্রমরাক্ষী, ভ্রমরাক্ষীর সঙ্গী হয় জীবনানন্দের মনিয়া। আবার মুকুন্দরামের কলম কী করে লেখে, আর দক্ষিণারঞ্জনের জাদুর কাঠিতে কী করে রাজকন্যা জেগে ওঠে আর ঘুমোয় তাও আমরা অবলোকন করি স্বাচ্ছন্দ্যে। সে জগতে কেবলই নির্ভারতা আর শান্তি। সবুজ এক জনপদ, শান্তি আর স্বস্তি ছড়িয়ে রয়েছে সবখানে। অসংখ্য গাছ-লতা-পাতা, জলে ভেসে থাকে শালুক আর পদ্ম, সাদা হাঁস ঘুরে বেড়ায় তার ফাঁকে ফাঁকে, মাটির দাওয়ায় শীতলপাটি বিছিয়ে বসে গল্প করে কল্পলোকের বাসিন্দারা, মাটির দেয়াল ছেয়ে থাকে সবুজ লতাপাতায়, টিলায় গাছের নিচে ঘোড়সওয়ারি সৈনিক অপেক্ষা করে। কী সত্যি, কী কল্পনা তা আলাদা করে বোঝা যায় না সে জগতে কারণ সে জগতটা আমাদের মনের মধ্যে সৃষ্ট এক রূপকথা। সন্মাত্রানন্দ এক আশ্চর্য উপন্যাসের ভাবনা ভেবেছেন। জীবনানন্দীয় বাস্তবতার এক চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে এই লেখাটাতে৷ কেবল এই ভাবনার জন্য বইটিকে পাঁচ তারা দিতে পারি। বাকি কাহিনি, শব্দচয়ন, দৃশ্যকল্প এগুলো সব উপরিপাওনা। অনেক অনেক দিন পর এমন কিছু পড়লাম যেটা আমাকে আরো অনেক দিন 'পাঠক' এই পরিচয়ে গর্বিত হওয়ার রসদ জোগাবে।
১৪৩১ এর শারদীয় অন্তরীপে ছাপা হয়েছিল "ভ্রমরাক্ষী"। তখন পড়িনি। এখন আবার নব কলেবরে একক উপন্যাসে 'ধানসিড়ি'র আলপথ বেয়ে নেমে এলো Sanmatrananda Sovon মহারাজের লেখা "ভ্রমরাক্ষী" উপন্যাস। এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র – তাপ্তি ও অরণ্যকে আমরা মহারাজের "হাওয়ার মতন, নেশার মতন" উপন্যাসেও পেয়েছি। তবে ওই গল্পের সাথে এই রূপকথার কোনোও সম্পর্ক নেই, তাই যাঁরা আগের উপন্যাসটি পড়েননি, তাঁরাও নির্দ্বিধায় এই রূপকথা পড়তে পারেন। এই বইয়ের পর্যায়ক্রমটা আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগলো। লেখক বইটাকে অনামিকা, মধ্যমা এবং অঙ্গুষ্ঠ – এই তিনটি পর্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। ভূমিকাতে তার একটা উচিত ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। ভারতীয় নৃত্যকলার "মৃগমুদ্রা" থেকেই নেওয়া এই নামগুলো। মৃগ মানে হরিণ। লেখকের মতে, "সাধারণতঃ আমাদের মন এই হরিণের মতই চঞ্চল। হরিণসম চঞ্চল মনকে মৃগমুদ্রার সহায়ে শান্ত ও একাগ্র করা হয়। আর সেই উদ্দেশ্যেই অনামিকা, মধ্যমা ও অঙ্গুষ্ঠের অগ্রভাগকে এক বিন্দুতে যুক্ত করা হয় এই মুদ্রায়। এই উপন্যাসেরও উদ্দেশ্য পাঠকের অস্থির মনকে সুশান্ত করা, সুসমাহিত করা।" এবার মূল কথায় আসি – কিছু কিছু কবিতা আছে যেসব পড়লে মনে হয় যেন কবিতা নয়, কোনোও জীবন্ত ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে ডুবছি ভাসছি সেই চিত্রকরের রং-তুলির ওঠা-নামায়; আবার বিপরীতটাও ঘটে প্রায়ই। যেমন কোনোও গল্প, উপন্যাস বা রূপকথা পড়লে মনে হয় যেন এগুলো গদ্য নয়, খুব স্নিগ্ধ শান্ত সৌম্য অথচ মন কেমনের কবিতা। "ভ্রমরাক্ষী" পড়েও যেন মনে হলো এ এক সুধাময়ী কবিতার গুঞ্জন, যা অক্ষররূপী ভ্রমরের মতো গুনগুন করে উড়ে বেড়াচ্ছে স্মৃতির উত্তলে এবং অবতলে।
এই স্মৃতি রোমন্থনের যাত্রায় আপনি একা নন। যেমনি আছেন বল্লাল সেনের সৈনিক প্রদ্যুম্ন মাণ্ডলিক, তেমনি আবার রয়েছেন কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীও। শুধু ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরই নয়, আছেন বেহুলা, লখাই এবং চাঁদ সদাগরও। আছে ছোট্টবেলার পৌষের রাতে কাথামুড়ো দিয়ে ঠাকুরমার বলা রূপকথার রাজকুমারী, সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি! আছে "রূপসী বাংলা"র গ্রামদেশ, নদী, মাঠ, আকাশ, মাটি, মানুষ সবই। তবে অবশেষে যাঁকে পেলাম, তাঁকে পেয়ে যেন মনে হচ্ছিল 'হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে' তাঁরই অপেক্ষায়! সাধারণ ধুতি আর শার্ট পরা মাঝবয়সী একজন মানুষ, যাঁর 'বড়ো বড়ো চোখ দুটো কী যে স্বচ্ছ, কী যে উজ্জ্বল!' সেই আমাদের মিলুদা! আর মিলুদার মনিয়া তো ছিল সারাটা রূপকথা জুড়েই। সেই মনিয়াই কখনও বনলতা সেন, কখনও অরুণিমা সান্যাল, কখনও আবার শেফালিকা বোস, সুচেতনা, সুদর্শনা, শ্যামলী কিংবা সুরঞ্জনা বা শঙ্খমালা হয়ে এসেছে বারবার – "কড়ির মতাে শাদা মুখ তার, দুইখানা হাত তার হিম; চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম চিতা জ্বলে– দখিন শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায় সে আগুনে হায়। চোখে তার যেন শত-শতাব্দীর নীল অন্ধকার! স্তন তার করুণ শঙ্খের মতাে—দুধে আর্দ্র—কবেকার শঙ্খিনীমালার! এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।"
এভাবেই "ভ্রমরাক্ষী" শেষ হলো। কিন্তু সত্যিই কি শেষ হয়েছে বইটা? হয়তো হয়নি। ওই যে কবি বলেছিলেন, 'অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে, শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। "ভ্রমরাক্ষী"র শেষটাও ঠিক তেমনি – একটা প্রাগৈতিহাসিক যাত্রা! আর যাত্রা কখনও ফুরোয় না, ফুরিয়ে যায় যাত্রিক।
বই - ভ্রমরাক্ষী লেখক - সন্মাত্রানন্দ প্রকাশক - ধানসিঁড়ি প্রচ্ছদ - সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম প্রকাশ - জুন, ২০২৫ পৃষ্ঠা সংখ্যা - ১৪৪ মুদ্রিত মূল্য - ২৭৫ টাকা।
কিছু কাহিনী এমন হয় যার পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে বসে মনে হয় এই পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার যোগ্যতাই আমার নেই। আমার এই লেখার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানানো অনেকটাই প্রহসনের সমতুল্য। কতটুকুই বা আমি বুঝি, বা জানি। কতটুকু আমার জ্ঞানের পরিধি। এই স্বল্প পরিসর জ্ঞানে এরকম একটা কাহিনীর পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখাটা নিতান্তই বাতুলতা বই অন্য কিছু নয়। তবু সন্মাত্রানন্দের " ভ্রমরাক্ষী" উপন্যাস পড়ে মনের ভাব ব্যক্ত করতে বসেছি। এটা উপন্যাস না বলে উপন্যাসিকা বলা ভালো। কাহিনী খুব বেশি দীর্ঘ নয়। লেখক চিরকালই সময়যাত্রা, জন্মান্তর ইত্যাদি বিষয়কে অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপিত করতে পারেন তা আমরা ওনার পূর্বের কিছু উপন্যাসেও দেখেছি। তার সাথে যুক্ত হয় লেখকের অনিন্দ্যসুন্দর ভাষাশৈলী। দুইয়ের মেলবন্ধনে লেখকের হাত ধরে আমরা পৌঁছে যাই অপার্থিব সুন্দর এক জগতে। পড়তে পড়তে বারংবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "দেবযান" উপন্যাসটির কথা মনে আসছিল। দেখলাম বইটির এক জায়গাতেও লেখক "দেবযান" উপন্যাসটির উল্লেখ্ করেছেন ।
"তোমার মনে পড়েছিল বিভূতিভূষণের "দেবযান "। সেখানে তো পরলোকে যতীন ও তার পূর্বপ্রেমিকা পুষ্প পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পেরেছিল। এই নদীতীরবর্তী অদ্ভুত ভুবনটি অবশ্যই অবশ্যই অবশ্যই পরলোক নয়। তাহলেও এই রূপান্তরিত চেতনার ভূমিতে প্রেমাস্পদ পুরুষ কেন প্রেমাস্পদা নারীকে চিনতে পারেনা? তবে কি এটাই সত্যি? শুধু এ জায়গার জন্যেই নয়, পরলোক বলে যদি কিছু থেকেও থাকে, তবে সেখানকার জন্যেও এটাই আসল সত্যি? কেউ কাউক��� চিনতে পারবে না আর? বিভূতিভূষণ সম্ভবত জীবনের বৃত্তাকার পরিণতিতে বিশ্বাস করতেন, হয়তো এই সংসারের বা এই জীবনের একটা সুষ্ঠু পরিনামবাদে তাঁর প্রবল আসক্তি ছিল, আস্থা ছিল - তাই বোধহয় কল্পনার পরলোকে যতীন আর পুষ্পের দেখা করিয়েছেন। আসলে কারও সঙ্গে কারো হয়তো দেখাই হয়না আর। কিংবা দেখা হলেও চিনতেই পারেনা। এক নির্মম জীবনস্রোত মানুষকে তার চেতনার এক ভূমি থেকে অন্য ভূমিতে নিয়ে যায়। সেখানে কেউ কারো নয়। "
লেখকের এই কথাগুলি মনে গভীর রেখাপাত করে। কিছুক্ষণ ভাবতে বাধ্য করে। ব্যক্তিগতভাবে জন্মান্তরবাদে আমি বিশ্বাসী এবং এর অস্তিত্ব সম্পর্কে ভাবতেও ভালো লাগে। তথাকথিত মানুষজন এখানেও হয়তো আমার শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন কিন্তু আমার ভালো লাগে বিষয়টি কি করা যাবে। বিভিন্ন ধরনের বই পড়েছি এই বিষয়ক। মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা তবু আমার কাছে এবং আমার মনে হয় সবার কাছেই এক অপার রহস্য এবং প্রশ্ন চিহ্ন। অন্তরে সেই টান সেই ভালোবাসা সেই স্নেহ যদি থাকে, মৃত্যুর পরেও নিজের সেই আপনজনকে মানুষ ঠিক চিনে নেবে এটা ভাবতেই ভালো লাগে। হয়তো বা এটাই সত্যি। সেটাই বা কে বলতে পারে?
লেখক এমন এক গ্রামের ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন যেখানে পরতে পরতে পাঠকেরা জীবনানন্দ দাশকে খুঁজে পাবেন। যেন উনি আছেন কিন্তু উনি নেই। ওনার সৃষ্টিগুলি সেখানে জীবন্ত। চতুর্দিকে উনি আবার কোথাও ই নেই। সুগভীর এক মৃত্যুচেতনা সর্বক্ষণ যেন খেলা করে যায়।কিন্তু তার মধ্যে কোনো প্রথাগত পরিতাপ, ভয় বা উৎকণ্ঠা নেই। সর্বত্রই " হেমন্তের বিকেলের মেদুর কুয়াশার মতন অনাবৃত শান্তির আবহ নেমে আসে" প্রকৃতিতে। এই যে মনিয়া, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, বেহুলা, যশোদা, প্রদ্যুম্ন মান্ডলিক - এইসব চরিত্রগুলো মৃত্যুকে পেরিয়ে গিয়েও যেন আছে নিবিড় গভীর সুপ্তির ভিতর - এইরকম একটা চিন্তা মনে জায়গা করে নেয়। মনিয়া চরিত্রটি যেন বনলতা সেন, অরুণিমা স্যান্যাল , শেফালিকা বোস হয়ে বারবার জন্ম নিয়ে ফিরে এসেছে বিভিন্ন রূপে জীবনানন্দের কবিতায়। জীবনানন্দ এই লেখায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। যেহেতু কাহিনী বেশি দীর্ঘ নয় তাই অধিক উপমা দিলে হয়তো পাঠকদের কাছে স্পয়লার দেওয়া হয়ে যেতে পারে। তবু এই লেখা পড়তে পড়তে হারিয়ে যাওয়া সেই বাংলার নৈসর্গিক প্রকৃতিতে বিলীন হয়ে যেতে হবে বারবার। এ যেন সত্যি এক জীবনের রূপকথা , যা এক পরিণতমনস্ক মানুষকে কিছু মুহূর্তের শান্তি ও স্বস্তি এনে দেয়। প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততা, জীবনযুদ্ধের মাঝে অবসরে যে কাল্পনিক স্বস্তির জগৎ আমরা খুঁজি, সেই জগতের সন্ধান দেয় এই আখ্যান। এই সামান্য কিন্তু অসামান্য তাৎপর্যে উজ্জ্বল কল্পনাগুলোই হয়তো আমাদের বেঁচে থাকার প্রকৃত রসদ। শুধু পরিশেষে এটুকুই বলার যে সবকিছুর অর্থ না খুঁজতে যাওয়াই হয়তো ভালো। নাহলে চারপাশে যে রহস্যময় জিনিসগুলো ঘটে যায় সেগুলো আর কখনই ঘটবে না, সেই আনন্দটাও নষ্ট হয়ে যাবে। লেখকেরও প্রায় একই অভিমত।