Syed Shamsul Haque (Bangla: সৈয়দ শামসুল হক) was a Bangladeshi poet and writer. Haq lived alternately in Dhaka and London. He wrote poetry, fiction, plays - mostly in verse and essays. He, the youngest writer to be honored with Bangla Academy Award, achieved it at the age of 29. He was honored with Ekushey Podok in 1984.
(সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্মেছিলেন। বর্ণাঢ্য লেখকজীবনের অধিকারী সৈয়দ হক। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, কাব্যনাট্য, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, চলচ্চিত্রের গান – যা লিখেছেন সবকিছুতেই পেয়েছেন জনপ্রিয়তা, সাফল্য।
মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান সৈয়দ হক। এখন পর্যন্ত বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ লেখক তিনি।
সৈয়দ হকের লেখালেখির শুরু তাঁর শৈশবেই। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে লিখে ফেলেন দুই শতাধিক কবিতা। ১৯৫১ সালে ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায় ‘উদয়াস্ত’ নামে তাঁর একটি গল্প ছাপা হয়। সেটাই তার প্রথম ছাপা হওয়া লেখা।
সেই বছরই বাড়ি থেকে পালিয়ে বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) চলে গিয়েছিলেন তিনি। কাজ করেন পরিচালকের সহকারী হিসেবে। কয়েক বছর পর দেশে ফিরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও লেখাপড়া শেষ করেননি। পুরোপুরি মনোযোগ দেন লেখালেখিতে।
১৯৫০-এর দশকেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’। এ সময় চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন তিনি। তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে নির্মিত হয় ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’। তাঁর উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ অবলম্বনে ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়।
সৈয়দ শামসুল হক চিত্রনাট্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের জন্য প্রচুর গান লিখেছেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে’, ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস’।
তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘একদা এক রাজ্যে’, ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’, ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘অপর পুরুষ’, ‘অগ্নি ও জলের কবিতা’।
বিখ্যাত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’, ‘বারো দিনের জীবন’, ‘তুমি সেই তরবারী’, ‘কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন’, ‘নির্বাসিতা’।
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নুরলদীনের সারা জীবন’ তাঁর বিখ্যাত কাব্যনাট্য। এ ছাড়া অসংখ্য অনুবাদ এবং শিশুসাহিত্যে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সৈয়দ হক।)
"জলেশ্বরী এখন এক ভয়াবহ গোরস্তান ছাড়া আর কিছুই নয়।" প্রথমবার পড়ার প্রায় ৭ বছর পর; ৫ আগস্ট পরবর্তী বিচিত্র, অতিবিচিত্র, নাটকীয়, অতিনাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ যে বইটার কথা বিদ্যুৎচমকের মতো আমার মনে পড়ছিলো সেটা হচ্ছে সৈয়দ হকের "দ্বিতীয় দিনের কাহিনী।" যে উপন্যাস মাত্র একটি অবিচ্ছিন্ন দীর্ঘ অনুচ্ছেদে লেখা। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরের সেই অস্থির সময়ে, প্রায় মধ্যবয়সী তাহের এসে হাজির হয় জলেশ্বরীতে। এখানে সে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে এসেছে। যুদ্ধে তার স্ত্রী ধর্ষিত ও মৃত। তাহের এসেছে এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে, একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে ; তার নিরুপায় দেশের মতোই। কিন্তু জলেশ্বরীর কিছুই ঠিক নেই, যেমন ঠিক ছিলো না সমগ্র বাংলাদেশ।স্কুল, যেটি ছিলো পাক সেনাদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। মানুষের মধ্যে চাপা ভয়। দুর্বৃত্ত আখ্যা দিয়ে কাউকে মেরে ফেলা এখানে একেবারেই পান্তাভাত। রাতের বেলা অবাধে গোলাগুলি চলে, স্কুলে চরে বেড়ায় গরু ছাগল, মানুষ প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরে, একদিনের নায়ক পরেরদিন ভোল পালটে হয়ে যায় সন্ত্রাসী আর কেউ নিতান্তই কৌতূহল থেকে প্রশ্ন করে, "একথা কি সত্য যে, এদেশ এখন পার্শ্ববর্তী দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে?" যুদ্ধের পর জলেশ্বরীর মানুষ নির্বিকার, অসহনীয় রকমের নির্বিকার, "এরা কোনো কিছুতেই চমকিত নয়, দুঃখিতও নয়; বস্তুত, সমস্ত কিছুই এদের কাছে স্বাভাবিক।" তাহের চারদিকে মৃতের নিঃশ্বাস টের পায়, এখানে জীবনের চেয়ে মৃত্যুর সংবাদই বেশি স্বাভাবিক বলে বোধ হয়। তাহের পালাতে চায়, যেমন এখন পালাতে চাচ্ছি আমি। ট্রেন চলে যাওয়ার শব্দে তার মনে হয় যাত্রীদের মতো এই ট্রেনও জলেশ্বরী থেকে পালাতে চায়। অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগ ভরা প্রতিটা দিনেই হয়তো তাহেরের মনে পড়ে "বাহ, এই তবে স্বাধীনতা? এরই জন্যে স্বাধীনতা?" এমন হওয়ার কথা ছিলো না, কিন্তু এমনটাই ঘটে আর আমাদের পালানোর ইচ্ছা জাগে, তাহেরের মতো কাপুরুষ হতে ইচ্ছা করে, বিদেশ বিভূঁইয়ে অলীক কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। কিন্তু হেরে যাওয়া আমাদের সাজে না। তাহেরকে দাঁড়াতে হয়েছে, বোমা আর ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে এক নারী তার হাত ধরে স্পষ্টভাবে বুঝিয়েছে সে পালাবে না, স্থির -অকম্পিত গলায় উচ্চারণ করেছে "না।" ইতিহাস ঘুরে ঘুরে আসে। তাই ২০২৫ এ এসেও ১৯৭২ এর ঘটনা হয়ে ওঠে অতিশয় প্রাসঙ্গিক। আবার ফিরে আসে দুঃসময়, আবার দিতে হয় অগ্নিপরীক্ষা। আমার করোটিতে এখন হতাশা আর শূন্যতার বিরতিহীন উৎসব। অথচ তাহেরের মতো আমাকেও দাঁড়াতে হবে এখন, এখানেই। কীভাবে? শুধু সেই পথটুকুই জানা নেই।
সৈয়দ হক চমৎকার লেখক তা তো জানা কথাই ছিল। কিন্তু কেন তিনি 'সৈয়দ হক' তা বুঝতে পারলাম টানা গদ্যে লেখা তাঁর এই দুর্দান্ত উপন্যাস পড়ে। এই বই সবার জন্য অবশ্যপাঠ্য বলে বোধ করি।
এই উপন্যাসের সময়কাল ১৯৭২। যদিও ততদিনে স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে, মুক্তিযোদ্ধারা জমা দিয়ে দিয়েছে তাদের অস্ত্র; কিন্তু, এসবের পরেও, এই রচনাটি প্রচণ্ডভাবে মুক্তিযুদ্ধনির্ভর।
এক বন্ধ থাকা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের চাকরি নিয়ে আসা তাহের, যার জন্মই হয়েছিল এই জায়গাতে, স্কুল খোলার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এরই সাথে লেখক আমাদেরকে জানান মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনা, স্বাধীনতার পরের ঘটনা। কখনো সরাসরি ও কখনো আবছাভাবে, সেই সময়ের রাজনীতি।
মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরবর্তি সময়ের রেশটা ধরা হয়েছে দ্বিতীয় দিনের কাহিনীতে। স্বাধীনতা সাধারণ জনগণকে আসলেই ছুঁয়ে গেছে কিনা, গেলেও কতটা, জীবনের গুঢ় অর্থের প্রতি মানুষের আগ্রহই বা কতটুকু? পাতায় পাতায় এই জিজ্ঞাসার ছেঁড়া তারে লেখক যেন ছড়া ঘষে গেছেন। যুদ্ধ শেষেও জলেশ্বরীকে অস্ত্র হাতে পাহারা দিয়ে চলেছে একদল মুক্তিযোদ্ধা, তাদের কাছে যুদ্ধটা যেনবা শেষ হয়নি তাই তারা জমা দেয়নি অস্ত্র। মূল চরিত্র তাহের, যার স্ত্রী পাক হানাদের হাতে লাঞ্চিত ও মৃত, ফিরে এসেছে নিজের জন্মস্থানে। তার চোখ দিয়ে স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশের নিদারুণ হতাশার ছবি এঁকেছেন সৈয়দ শামসুল হক। প্রথম যখন হাতে উঠাই, টানা গদ্য দেখে একটু পিছিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পড়তে পড়তে আবিষ্কার করি, এমন গদ্যকে শুধু দারুণ বললে সুবিচার হচ্ছেনা। বলতে হবে ঋজু, সুখপাঠ্য, নিরাবেগ এবং পেজ টার্নার। তিনঘন্টার বেশি লাগেনি ১২০ পাতার বইটা শেষ করতে। পাঠান্তে বুকের ভিতর ফাঁকা ফাঁকা লাগবে, চোখে জল আসবে, এমন ইমোশনাল অরকেস্ট্রাও বাজেনা কোথাও। কিন্তু এ উপন্যাস শেষ করে যত সময় গড়াচ্ছে, বইয়ের বক্তব্য চেপে বসছে মগজে, যে বক্তব্য আজকের বাংলাদেশের জন্যেও সমান প্রাসঙ্গিক। সৈয়দ শামসুল হক, প্রণতি জানবেন মায়েস্ত্রো।
দ্বিতীয় দিনের কাহিনি (১৯৮৪)—সৈয়দ শামসুল হকের ক্ষীণদেহী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসটির প্রথমা সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭-এর অক্টোবরে। এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট যুদ্ধোত্তর জলেশ্বরী। জলেশ্বরী সৈয়দ শামসুল হক-সৃষ্ট কল্পশহর। আর কে নারায়ণের মালগুডি, উইলিয়াম ফকনারের ইয়াকনাপাতউফা, স্টিফেন কিংয়ের কাসল রক, কুর্ট ভনেগার্টের ইলুয়াম এবং জন গ্রিশামের ক্লান্টন মিসিসিপি শহরের মতো জলেশ্বরীও আজ সাহিত্য-মানচিত্রে ভীষণ বাস্তব। সৈয়দ হক এই কল্পনার ভূগোলজগৎটি তৈরি করা শুরু করেন ১৯৭৪ সালে, যখন তিনি আলোচ্য উপন্যাসটি লেখা শুরু করেছেন। এরপর তিনি জলেশ্বরীর প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়কে উপজীব্য করে লেখেন নিষিদ্ধ লোবান (১৯৯০) উপন্যাসটি।Ñঘটনার কালক্রমের দিক দিয়ে যাকে দ্বিতীয় দিনের কাহিনির প্রিক্যুয়াল হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। দুটি উপন্যাসে ঘটনাপ্রবাহ ও বর্ণনা-স্বরের দিক থেকেও বেশ কিছু অভিন্নতা চোখে পড়ে।
সৈয়দ হক অল্প কটি চরিত্র দ্বারা স্বল্পায়তনের এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নৈরাশ্যজনক চিত্র তুলে এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য উপন্যাসের সঙ্গে এর মূল পার্থক্যটা নির্মিতি অংশে। টানা গদ্যে গল্পটা বলে গেছেন সৈয়দ হক। কোথাও কোথাও চরিত্রের স্বগতোক্তির ভেতর দিয়ে এগিয়েছে কাহিনি। আপাত-একরৈখিক গল্পকে লেখক তাঁর প্রকাশভঙ্গি, বর্ণনা-ঢং আর শব্দচয়নের মধ্য দিয়ে করে তুলেছেন নাটকীয়। পুরো উপন্যাসে আছে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র সংলাপ। আবার উপন্যাস���র একটি বিরাট অংশজুড়ে আছে নীরবতা। অর্থাৎ অনুচ্চারিত স্বর থেকেই সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে। গোটা উপন্যাসটি স্থির দৃশ্যের মতো থমকে থাকে। আখ্যান যেন এক জায়গাতেই ঘুরপাক খায়। তৈরি হয় অস্ফুট এক অন্তর্বয়ান। সৈয়দ হকের এই শক্তিশালী-আবেশি গদ্যের নমুনা তাঁর শেষদিকের রচনায় তেমন একটা ধরা পড়েনি।
এর শুরুটা হয়েছে নিস্তব্ধতা দিয়ে। কেন্দ্রীয় চরিত্র তাহেরের মনে হয়, লোকজন ‘বাতি নিভিয়ে নিশ্বাস বন্ধ করে তারা পড়ে আছে অন্ধকারের ভেতরে গহ্বর সৃষ্টি করে।’ খুপরির ভেতর-বাইরের অন্ধকারকে গল্পকথক যেমন বলছেন, ‘যতিহীন বিহ্বলতার জন্ম হয় গোটা অস্তিত্ব জুড়ে’, কথাটি পুরো উপন্যাসের ক্ষেত্রেও খাটে। জলেশ্বরী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চাকরি নিয়ে শহরটিতে পা রাখে তাহের উদ্দিন খন্দকার। আলো-আঁধারির ভেতর থেকে সন্দেহের দৃষ্টি ধেয়ে আসে তার দিকে। মানুষগুলো মনে করে সে বিহারি; ছদ্মবেশে সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে এসেছে। এরপর তার পরিচয় উন্মোচিত হলে তারা তাকে অস্থায়ী একটা আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তাহের এগিয়ে যায় নিস্তব্ধতার ভয়াবহ শব্দের ভেতর দিয়ে।
যুদ্ধোত্তর বাস্তবতার স্থির-বয়ান শহরটিতে এই ভয়াবহ নিস্তব্ধতা ও অবিশ্বাসের দীর্ঘশ্বাস নেমে এসেছে ভয়ংকর এক যুদ্ধ থেকে। যুদ্ধ-পরবর্তীকালে এসে গোরস্থানের নগরী হয়ে ওঠে জলেশ্বরী। তাহের তার স্মৃতিতে যে জলেশ্বরীকে সম্বল করে আসে, সেই জলেশ্বরী একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সর্বস্বান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের সাক্ষী হয়ে। চারদিকে ক্ষয় আর মৃত্যুর চিহ্ন। একসময়ের নামহীন সড়কগুলো এখন হয়ে উঠেছে শহীদ বরকতউল্লাহ রোড, শহীদ আনোয়ার রোড, শহীদ গেদু মিয়া লেন, চাঁদবিবির পুকুর ও শহীদ সিরাজ আলী রোড। সাক্ষাতে শহরের লোকজন কেবল মৃতদের গল্প শোনায়।
অতীত থেকে বিযুক্ত হতে আসা তাহেরকে সবাই যেন আঙুল দিয়ে অতীতে পাকাপাকিভাবে আবাস গড়ে নিতে ইন্ধন জোগায়। ফলে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হলেও চরিত্রদের বক্তব্য ও জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে যুদ্ধসময়ের নিষ্ঠুর বয়ান অহরহ চলে আসে। যুদ্ধ মিশে যায় যুদ্ধোত্তর সময়ের সঙ্গে।
তাহের রাজধানীর অপেক্ষাকৃত ঝঞ্ঝাটমুক্ত জীবন ফেলে জলেশ্বরী এসেছে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু এখানে এসে সে নির্মিতির চেয়ে ভাঙনটা দেখতে পায় স্পষ্টভাবে। মুক্তিযুদ্ধের পর ব্যক্তি থেকে সমষ্টি গড়ে ওঠার পরিবর্তে এখানে ব্যক্তিবোধ আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে জলেশ্বরী সংস্কারে এসে নিজেকে প্রতারিত মনে হয় তাহেরের। তবে অন্যদিক থেকে তাকে শক্তি জোগায় ক্যাপ্টেন নামের পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা মজহার। মধ্যরাতে ক্যাপ্টেনের এ-এ-রে-এ-এ হাঁক তাহেরকে আশাবাদী করে তোলে। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে একাত্মবোধ করে সে। ক্যাপ্টেন আর তখন একক কোনো ব্যক্তি থাকে না, উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি হিসেবে।
উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পরিবর্তিত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্বস্ত বয়ানের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য এর নির্মাণশৈলীর অভিনবত্বের কারণেও। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন গদ্যের কারুকার্যময় শিল্পিত উপন্যাস খুব বেশি লেখা হয়নি। ফলে সমসাময়িক পাঠকদের জন্য উপন্যাসটির সঙ্গে বাড়তি গুরুত্ব যুক্ত হতে পারে এর সাহিত্যমূল্যের দিকটি। তাহের চিহ্নিত হতে পারে ‘আউটসাইডার-আর্কিটাইপ’ চরিত্র হিসেবে। আখ্যানভুক্ত সমাজের বাইরের মানুষ সে। তার চরিত্রের এই বহিরাগত পরিস্থিতি মারসোর (আলবেয়ার কামু রচিত আউটসাইডার উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র) মতো স্ব-আরোপকৃত নয়, সমাজকৃত আরোপ। আখ্যানের সঙ্গে নিজের অস্তিত্বের যৌক্তিকতার যে হেতু সে খুঁজে ফেরে, তা কালের অবক্ষয়ে মানবিকবোধ সম্পন্ন প্রতিটি আধুনিক মানুষের পরিণতি বলে চিহ্নিত হতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের অবস্থা নিয়ে রচিত 'দ্বিতীয় দিনের কাহিনী' উপন্যাস। যুদ্ধকালীন সামষ্টিক চেতনা থেকে মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক চেতনার মধ্য দিয়ে যে নৈরাশ্য হতাশার সময় পার করছিল সে চিত্র ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। সেই সাথে সেকালে রাজনৈতিকভাবে দেশীয় স্বার্থবাদী দোসরদের মাথা চাড়া দিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়া অপরদিকে দেশপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধাদের দুরাবস্থা কে তুলে ধরেছেন লেখক।
উপন্যাসে জলেশ্বরী গ্রাম মূলত পুরো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছে। আর ক্যাপ্টেন মজহারের মতো সামষ্টিক চেতনার সংগ্রামী মানুষরা যে দেশের জন্য লড়ে যাচ্ছিল সে বিষয়টি উঠে এসেছে প্রোটাগনিস্ট তাহের চরিত্রের চোখ দিয়ে। পাকিস্থান পরাশক্তির বিদায়েই যে বাংলাদেশ একেবারে স্বাধীন হয়ে ওঠেনি। সেই হতাশার কথা শোনা যায় ক্যাপ্টেনের মৃত্যুতে তার স্থী হাসনার কন্ঠে,
"এই তবে স্বাধীনতা? এরই জন্য স্বাধীনতা?"
যুদ্ধে বিজয় মানেই স্বাধীনতা নয় বরং দেশীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য যে লড়াই করে যেতে হবে আজীবন এবং এভাবেই স্বাধীনতার রক্ষা।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক পরিবেশের এক হতাশার চিত্রের স্মারক সৈয়দ শামসুল হকের 'দ্বিতীয় দিনের কাহিনী'
বইটা পড়ে আসলেই ঋদ্ধ হলাম। আর এ থেকেই বোঝা যায় মানুষ কেন আওয়ামীলীগের উপর বিরক্ত হয়েছিল; ২০২৫ এ যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের উপর বিরক্ত। History is cyclical! Taher is the protagonist who lost his wife during liberation war—she was gang ra*ed and committed suicide immediately after getting a scope. He comes to Jaleswari as a headmaster of a school which was an erstwhile Pakistani concentration camp where Bengali people were slaughtered. There was no law and order, a captain(epithet wasn't given by military but he gained it from layman villagers) who is running another judiciary system in his own. Captain's wife, who is a namesake of Taher's wife, comes here to bring her husband back to Dhaka where he will have a good gov. job. But captain refuses to go to Dhaka as he was totally and delusionally engrossed in running a collateral judiciary system here in Jaleswari, a border area. And he dies in a confrontation in the same night, while he trying to stop illegal transborder crossing of goods.
একদম অন্যরকম একটা লেখা। সৈয়দ শামসুল হক সব্যসাচী লেখক ছিলেন। সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তাঁর স্বচ্ছন্দ পদচারণা ছিলো। এমনকি ছিলো একেক উপন্যাসে একেক রকম স্টাইল ও। তাঁর নিষিদ্ধ লোবান বা খেলারাম খেলে যা এর স্টাইলের সাথে এই উপন্যাসের স্টাইলের অনেক তফাৎ। প্রতি লাইনে লাইনে কাব্য ছড়িয়ে আছে, অথচ বিষয়বস্তুকে ঠিক কাব্যিক বলা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সাধারণ মানুষের মানসিক অসহায়তা, দেশের অবস্থা উঠে এসেছে সুচারুরূপে। ছোট্ট উপন্যাস, কিন্তু ব্যঞ্জনাটা অনেক গভীর। মনে দাগ কেটে যায়।
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু এই উপন্যাসটি আপনাকে রাজনৈতিক ইতিহাসের ঝনঝনাঝির বাইরে তৃণমূলের মানুষের ওপর মুক্তিযুদ্ধ কী প্রভাব রেখেছিলো তাঁর সম্পর্কে অসামান্য অভিজ্ঞতার এক জার্নিতে নিমজ্জিত করবে তাতে সন্দেহ নেই।