পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত এক গ্রামে সরকারের জমিতে হঠাৎ করেও উদ্ধার হয় একটা কঙ্কাল। কিন্তু সেই কঙ্কাল কার? চার বছর আগে খুনটাই বা করল কে! অদ্ভুতভাবে কঙ্কাল উদ্ধারের পর থেকেই নতুন করে খুন হতে থাকে একের পর এক মানুষ। গ্রামের লোকের ধারণা এই কাজ সেই কঙ্কালের আত্মার। পুলিশের ধারণা এই কাজ সেই খুনির। সত্যি কোনটা? কে আছে এই খুনগুলোর পিছনে? খুনি কি একজনই? নাকি আত্মার অস্তিত্ব আছে? তদন্ত করতে ডাক পড়ে সিআইডি অফিসারের। কিন্তু সবটাই কি এত সহজ? এই খুনগুলোর তদন্ত করতে করতেই তদন্তকারী অফিসাররা আরও অপরাধের হদিস পায়। ঠিক কী ঘটত চার বছর আগে পুরুলিয়ার ওই গ্রামে? এইসব কিছুর পিছনে কে-ই বা আছে? অপরাধ কি আরও আছে? অপরাধের অন্ধকার দুনিয়ার চেয়েও গাঢ় অন্ধকার যদি থাকে মানুষের মনে তাহলে?
রহস্য কি কেবল একটি ঘটনার পরিসমাপ্তি, নাকি এটি একটি অন্তহীন গোলকধাঁধা? যেখানে একটি জট খুললে বেরিয়ে আসে অজস্র ধামাচাপা দেওয়া সত্যের কঙ্কাল। লেখিকা অমৃতা কোনার ‘একটি তদন্তের নেপথ্যে’ উপন্যাসে এই দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নটিকেই অত্যন্ত নিপুণভাবে নির্মাণ করেছেন।
পুরুলিয়ার রুক্ষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ঘেরা বাঘমুণ্ডি থানার অন্তর্গত সিন্দিরী গ্রামের শান্ত নির্জনতায় যখন একটি নরকঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়, তখন থেকেই গল্পের বুনন এক রুদ্ধশ্বাস মোড় নেয়। সেই কঙ্কালের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে পরতে পরতে বেরিয়ে আসতে থাকে এক ভয়ংকর অপরাধচক্র। তিনটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং রহস্যজনকভাবে শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাপ্রবাহ গল্পটিকে সাধারণ থ্রিলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক গভীর সামাজিক সংকটের দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। তদন্তের দায়িত্ব পড়ে বাঘমুণ্ডি থানার তরুণ SI বিহান এবং প্রখর ধীসম্পন্ন গোয়েন্দা অফিসার অরুণাংশর ওপর। এই তদন্তের আবর্তে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়েন গ্রামের নবনিযুক্তা শিক্ষিকা কুহেলী। এনজিওর কাজে আসা ত্রিধার রহস্যময় পরিণতি এবং নিঁখোজ হওয়া বাচ্চাগুলোরর যে ভয়াবহ চিত্র লেখিকা দেখিয়েছেন, তা পাঠককে শিউরে উঠতে বাধ্য করে।
এই উপন্যাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো এর চরিত্রায়ন। এখানে গোয়েন্দারা কোনো ‘অতিমানবীয়’ সত্তা নন, বরং তাঁরা রক্ত মাংসের মানুষ, যাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা, আবেগ এবং পেশাগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। লেখিকা অপরাধীকে শনাক্ত করার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অপরাধপ্রবণতার নেপথ্য মনস্তত্ত্বকে। সমাজের অন্তরালে যে অন্ধকার ও কদর্য জগত বিরাজমান, তার বাস্তবসম্মত চিত্রায়ন এই বইটিকে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে। গল্পের ভাষা অত্যন্ত সাবলীল অথচ গুরুগম্ভীর। অহেতুক দীর্ঘ বর্ণনার ভারে গল্পের গতি মন্থর হয়নি। প্রতিটি পরিচ্ছেদ পাঠককে এক নতুন কৌতূহলের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিশেষ করে উপন্যাসের অন্তিম ভাগে যে চরম মুহূর্তের অবতারণা করা হয়েছে, তা অনবদ্য। সত্য জানার জন্য পাঠককে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
বাঙালি পাঠকের দীর্ঘদিনের ধ্রুপদী গোয়েন্দা সাহিত্যের যে তৃষ্ণা, অমৃতা কোনার সেখানে আধুনিকতার প্রলেপ দিয়েছেন। অপরাধের প্রেক্ষাপট ও মোটিভ যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার এক প্রামাণ্য দলিল এই বই। তবে পাঠকদের প্রাপ্তি কেবল এই একটি গল্পেই সীমাবদ্ধ নয়; অরুণাংশ-বিহান সিরিজের এই প্রথম পদক্ষেপ ভবিষ্যতের আরও বড় কোনো রহস্যের ইঙ্গিত দিয়ে যায়। থ্রিলার প্রেমীদের জন্য এই বইটি নিঃসন্দেহে এক অপরিহার্য সংগ্রহ।।