বেঙ্গল রেজিমেন্টের পথিকৃৎ অফিসারদের একজন হিসেবে মেজর জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমান পাকিস্তান সেনাদলে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন উচ্চপদে। দীর্ঘকাল সেনাবাহিনীতে কর্মকালে পাকবাহিনীর ভেতর কাঠামোর ঘনিষ্ঠ পরিচয় তিনি লাভ করেছিলেন। অবিভক্ত বাংলার প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় তখন এক ব্যতিক্রমী সত্তার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। পাকবাহিনীতে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে স্টাফ কলেজের শিক্ষা সমাপন করেন, বাঙালি অফিসার হিসেবে বৈষম্যের শিকার হলেও সামরিক রণনীতি নির্ধারণে চিন্তাশীলতার প্রয়োগ তাঁর দক্ষতা ব্যবহার না করে সেনাবাহিনীর গত্যন্তর ছিল না। তাই তিনি বিগ্রেডিয়ার হিসেবে যুদ্ধ-পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে যুক্ত থেকেছেন এবং কাছে থেকে দেখেছেন পদস্থ পাকিস্তানি জেনারেলদের। ১৯৭১ সালে রাওয়ালপিন্ডি আর্মি সদর দপ্তরে এহেন দায়িত্বে নিয়োজিত বাঙালি অফিসারকে কার্যত দাপ্তরিক কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয় এবং পরে আটক করা হয় বন্দিশিবিরে। পাকিস্তানি সেনা-গহ্বরে অতিবাহিত দিনগুলির কথা এই প্রথমবারের মতো ব্যক্ত করলেন তিনি এবং সেই সূত্রে একাত্তরের পাকবাহিনীর ভেতরমহলের অজানা বিভিন্ন দিক এখানে উদঘাটিত হয়েছে। কেবল সামরিক ইতিহাস বিবেচনায় নয়, পাকিস্তান যুগ এবং তৎকালীন সামরিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক উপাদান মিলবে এই গ্রন্থে। ইতিহাস নিয়ে যাঁরা চিন্তাভাবনা করেন, সমরশক্তির গঠন ও মনস্তত্ত্ব যাঁদের বিবেচ্য তাঁদের বারবার ফিরতে হবে এই গ্রন্থের কাছে।
একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বিপুলসংখ্যক বাঙালি সেনাকর্তা ও সৈনিক কার্যত আটকা পড়েন। বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হওয়ার পর বন্দী তিরানব্বই হাজার পাকি সৈনিকের সাথে বিনিময়ের জন্যে এ বাঙালি সৈনিকরা অবরুদ্ধ ও বন্দী হন। এদের একাংশের জীবন কেমন কেটেছে, সে সম্পর্কে আবছা ধারণা পাওয়া যায় এ বইটি পড়ে। বইটা পড়ে কিছুটা হতাশ হয়েছি, কারণ কিছু কথা (যেমন তৎকালীন সপ্তম বেঙ্গলের অধিনায়ক এরশাদের কার্যকলাপ) লেখক চেপে গেছেন বলে মনে হয়েছে। তবে আগ্রহোদ্দীপক অনেক ঘটনার বর্ণনা আছে, যা আগে জানতাম না।
একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, মেজর/লেফটেন্যান্ট কমাণ্ডার/স্কোয়াড্রন লিডার পদের ওপরে কেউ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি। সংসারের ভার আর নজরদারিকে লেখক (তখন ব্রিগেডিয়ার পদে) এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনা পড়ে মনে হয়েছে, বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত না হলে উচ্চপদস্থ বাঙালি সেনাকর্তারা বড় কোনো অসুবিধার মুখে পড়তেন না। কয়েকজন মেজর ও তার নিম্নপদস্থ সংসারী কর্তারাও নজরদারি টপকে ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
মুক্তিযোদ্ধা বা অবরুদ্ধ দেশের মানুষের কষ্টের কথা আগে পড়েছি । কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ছাড়াও যে শুধু বাঙালি হওয়ার কারনে কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, এই বই না পড়লে, হয়তো জানা হতো না । সাথে বাঙ্গালীদের প্রতি পাকিস্তানীদের আসল মনোভাব বা বিভিন্ন সামরিক পরিকল্পনার তথ্য। ব্যতিক্রমধর্মী এই বই অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে থাকবে ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকে পড়া এক উচ্চপদস্থ বাঙালি সেনা কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা। লেখক ব্রিগেডিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ শেষে তাঁরা প্রায় দুই বছর পাকিস্তানি হেফাজতে বন্দী ছিলেন। সিমলা চুক্তি সাক্ষর হবার পর তাঁদের মুক্তি দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। সে সময়কার পশ্চিম পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মনোভাব, আর আটকে পড়া বাঙালিদের মানসিক অবস্থা লেখকের বর্ণনায় এসেছে। পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য দেখানো বাঙালি কর্মকর্তারা অনেকে পরবর্তীতে দেশে এসে উঁচু পদ বাগিয়েছেন- লেখকের এই হতাশা স্পর্শ করে। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে রাষ্ট্রক্ষমতার হাতবদল সেনানিবাসে থেকে লেখক সরাসরি দেখেছেন- এই সময়ের বর্ণনাটা বেশ মজার। পাকিস্তানি হেফাজতে বন্দী হিসেবে দুই বছর কাটানোর অংশটুকু আবার বেশ কষ্টের। সব মিলিয়ে, মুক্তিযুদ্ধকে অন্য একটা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার জন্য বইটা পড়া কাজে দেবে মনে হয়।