যাঁহাদের জীবন ও দেশনা ভুবনবিদিত হইয়া রহিয়াছে, যাঁহারা সহস্র সহস্র মানুষের শান্তির আশ্রয়স্বরূপ, যাঁহারা ধ্যানগম্য ধ্যানগম্যা, যাঁহাদিগকে পিতামাতা বন্ধুসখা জ্ঞান করিয়া মানুষ নিজ নিজ জীবনের পথে চলার দিশা খুঁজিয়া পাইয়াছে, যাঁহাদের প্রভাব শিল্পে, সাহিত্যে, সমাজবিদ্যায়, ইতিহাসচর্চায় ও অন্যান্য বিদ্যাক্ষেত্রে পণ্ডিত ও মরমী সাধকদের দ্বারা ক্রমাগত আলোচিত হইয়াছে ও অধুনাতনকালে উত্তরোত্তর বাড়িয়া চলিতেছে, তাঁহাদেরই অনুপম সারল্যমাখা শৈশব-কৈশোর লইয়া আলোচনা করিতে কৃতসংকল্প হইয়াছি। ভুবনমঙ্গল শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিমলচরিতা শ্রীমা সারদাদেবীর শৈশব-কৈশোরের আখ্যানমঞ্জরীকে আশ্রয় করিয়া শৈশব-কৈশোরের আশ্চর্য কুহকরহস্যকে অনুধাবন করিবার মানসে ‘রুপোর পৈঁছে’ ও ‘অনন্তবাউটি’ নিবেদিত হইল। এ দুটি রচনা বস্তুত উপন্যাস, জীবনীগ্রন্থ নহে।
বইটা নিয়েছিলাম কারণ এটা রচিত হয়েছে রামকৃষ্ণ আর সারদাদেবীর জীবনীকে উপজীব্য করে। তবে তাঁদের জীবনের শুরুর দিকের অংশই এসেছে উপন্যাসদ্বয়ে। সন্মাত্রানন্দের লেখার ধাঁচ তাঁর অন্যান্য বইয়ের তুলনায় এই বইটিতে তুলনামূলক সহজ লাগল। পুজোর সময়ে পড়ার জন্য একটা পার্ফেক্ট বই।
বছরের শেষ দিনে খুব আপন একটি বইয়ের কথা লিখি। সন্মাত্রানন্দ রচিত 'রুপোর পৈঁছে – অনন্তবাউটি', দুটি ছোট উপন্যাস। দু মলাটের মধ্যে একসঙ্গে এই দুটি উপন্যাস ঘর করছে, কারণ এদের একটি সেই ঘরের গৃহকর্তাকে কেন্দ্র করে, আর অন্যটি গৃহকর্ত্রীকে নিয়ে। দুটিই অবশ্য তাঁদের বাল্যবেলা অবলম্বনে গড়ে উঠেছে।
একটি উপন্যাসের জলমাটির অনেকটা তৈরি হয়েছে কামারপুকুরে, আর অন্যটির ক্ষেত্রে জয়রামবাটী। গ্রামবাংলার সরল, মায়াময় যে লোকজীবনের ছবি এঁকেছেন সন্মাত্রানন্দ, তাতে শেষ অবধি এই বিশেষ দুটি নামের গ্রাম মিলিয়ে যায় দিগন্তবিস্তৃত ভারতাত্মার দৃশ্যপটে। মনে হতে থাকে, যে সব গ্রামের নাম কোনোদিন শুনিনি, আর এ জন্মে হয়তো শোনাও হবে না, তাদের সবার ঝাঁকিদর্শন হয়ে গেল এই ছবিগুলির মধ্য দিয়ে। শহরাঞ্চল হয়তো আজকের বিত্তবান সংখ্যালঘু দ্বারা প্রচারিত ভারতবর্ষের নবকলেবর, কিন্তু ভারতের স্নিগ্ধ, করুণাময়ী মুখটি আজও নামগোত্রহীন গ্রামে, মানুষের দরিদ্র সংসারে বিশেষ ভাবে প্রকট হয়।
শ্রীশ্রীঠাকুর আর শ্রীশ্রীমায়ের আবির্ভাব ও লীলাপ্রারম্ভের কাহিনী এই দুটি। কিন্তু কাহিনী তাঁদের হলে কী হবে, ভারি অদ্ভুতভাবে ক্যামেরা বসিয়েছেন লেখক। আখ্যানকেন্দ্রে গদাই আর সারু, কিন্তু তাঁদের আবির্ভাব যাঁদের আশ্রয় করে, তাঁদের নরলীলার শুরুর দিককার আলাপ যাঁদের হাত ধরে, যাঁরা গদাই ও সারুকে 'বেড় করিয়া আনন্দে গরগর মাতোয়ারা' (মাস্টারমশাইয়ের কথা ধার করলাম), ক্যামেরা বারবার ঘুরে যায় তাঁদের দিকে। এ গল্প দুটি যেন আসলে তাঁদের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ছিন্নপত্রাবলী'র একটি চিঠি বারবার মনে পড়ে যায় সন্মাত্রানন্দের এই লেখা পড়তে পড়তে। বিশেষভাবে যে অংশটি মনে পড়ে, তাতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন – "স্বর্গ আর কী দিত জানি নে, কিন্তু এমন কোমলতা দুর্বলতা -ময়, এমন সকরুণ আশঙ্কা -ভরা, অপরিণত এই মানুষগুলির মতো এমন আপনার ধন কোথা থেকে দিত! এই আমাদের মাটির মা, আমাদের এই আপনাদের পৃথিবী, এর সোনার শস্যক্ষেত্রে, এর স্নেহশালিনী নদীগুলির ধারে, এর সুখদুঃখময় ভালোবাসার লোকালয়ের মধ্যে এই সমস্ত দরিদ্র মর্ত হৃদয়ের অশ্রুর ধনগুলিকে কোলে করে এনে দিয়েছে। ... এই জন্যে স্বর্গের উপর আড়ি করে আমি আমার দরিদ্র মায়ের ঘর আরো বেশি ভালোবাসি – এত অসহায়, অসমর্থ, অসম্পূর্ণ, ভালোবাসার সহস্র আশঙ্কায় সর্বদা চিন্তাকাতর বলেই।"
সেই সরল মানুষের হৃদস্পন্দন শুনতে পাই 'রুপোর পৈঁছে – অনন্তবাউটি'র পাতায় পাতায়। দুই গল্পের কথক – চিনুশাঁখারি আর জয়গোপাল ঘোষাল, কেউই গদাই আর সারুর লীলা 'পোষ্টাই' হওয়া অবধি এই ধরাধামে থাকেন নি। তবু তাঁদের চোখ অসংখ্য দরিদ্র, হৃদয়বান, সরল মানুষের চোখ – যা দিয়ে আমাদের ধ্যানলোকে এই দেবমানব ও দেবমানবীর ছবি আমরা দেখতে পারি, চাইলে।
নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা বলি, তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি বলি, ধুলামাটির বাউল বলি – সবেই যেন সন্মাত্রানন্দের চরিত্ররা ভোরের শিশিরের মতো। কিছু ভাবের, কিছু আদর্শের ঘনীভূত রূপ। বেলা বাড়লে তাঁরা হয়তো মিলিয়ে যান, কিন্তু তাঁরা যে ছিলেন, এবং তাঁরা যে আবার ফিরে আসবেন – এই বার্তা বুঝে নিতে ভুল হয় না। 'রুপোর পৈঁছে – অনন্তবাউটি'ও তার ব্যতিক্রম নয়।
বিরাটের আভাস পেলে চোখে জল আসে। সে কি আত্মবিস্মৃত এই ক্ষুদ্রত্ব ও সঙ্কীর্ণতাকে অনুভব করে? নাকি সেই বিরাট কৃপা করে আমায় তাঁর আভাস দিলেন, এই কৃতজ্ঞতাবোধে? আজও বুঝতে পারি না। এই বইটিও আমার সেই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে পারল না।
"কালের সাম্পানে ভাসিয়া গিয়া মানিকরাজার সেই আমবাগানকে তাই আমি প্রশ্ন করি — 'হে ন্যগ্রোধবনবীথি! কী হেতু তোমার এই বিষন্নতা?' আমবাগান গম্ভীর স্বরে নড়িয়া নড়িয়া উত্তর দেয়, 'বিষাদের হেতু জানলে তো বিষাদ দূর করার প্রযত্ন করতাম!' আমি তথাপি পুনরায় প্রশ্ন করি, 'তবু কি কিছু আঁচ করতে পারছ না তুমি? এত মন-খারাপ কেন?' আমবাগান চুপ করিয়া থাকে কিছুক্ষণ। তাহার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলে, 'কেমন যেন প্রাণ নেই। শাখা প্রশাখার যতেক আন্দোলন, পাখিদের কত না কলতান, তবু কী যেন নেই। কে যেন আসেনি।' 'কেন, কেউ কি আসে না এখানে? ছেলেমেয়েরা আসে না আম কুড়োতে? বৃষ্টিতে ভিজতে? তোমার শাখা প্রশাখায় দোল খেতে?' আমবাগান মন্দ্র স্বরে উত্তর দেয়, 'আসে আসে। কিন্তু তারা আসে কেবল তাদের নিজেদের আনন্দের জন্যে। আমাকে তারা তাদের খেলায় নেয় না। আসে, খেলে, ঘরে চলে যায়। বড়ো হয়ে যায়, বুড়ো হয়ে যায়, আর আসে না, মরে যায়। আর কেউ তাদের মনে রাখে না। এমনই তো কত কত বৎসর ধরে দেখে আসছি।' আমি খানিক চিন্তা করিয়া প্রশ্ন করি, 'আচ্ছা, কী করলে তোমার মনে হবে যে, তারা তোমাকে তাদের খেলায় নিল?' আমবাগান উত্তর দেয়, 'যদি আমাকে তারা তাদের লীলানাটকের একটি চরিত্র করে তোলে। যদি শুধু নিজেদের মধ্যে না খেলে তারা আমার সঙ্গেও খেলে, তবেই হয়। তবেই তারা আমাকে তাদের খেলায় নিল, জানব। তেমন কেউ আসবে ভেবেই তো এই ঋতুবৈচিত্র্যের স্থির সাক্ষী হয়ে আমি এতকাল দাঁড়িয়ে রয়েছি অপেক্ষায়। আমার বিশ্বাস, সে আসবে, খুব শীঘ্রই আসবে। আমাকে তার খেলায় নেবে। বিরহভারাতুর মন নিয়ে আমি সেই অনাগত বালকেরই প্রতীক্ষা করে চলেছি।'" সম্মাত্রানন্দ মহারাজের লেখা বলতে যা বুঝি তা হলো একটা ক্লিন ম্যাজিক, যার মাদকতা রয়ে যায় বইগুলো পড়ে শেষ করার অনেকটা কাল পরেও। এমনই একটা মাদকতা ছুঁয়ে গেলো "রুপোর পৈঁছে অনন্তবাউটি" পড়ার সময় যার গন্ধ এখনও লেগে আছে ঠোঁটে... আঙুলে... মগজের কোনোও এক নিভৃতম গভীর কাননে। গদাইকে ঘিরে প্রস্ফুটিত 'রুপোর পৈঁছে'র সহচরীরূপে সারীকে জুড়ে যে কুঞ্জবন ফুটিয়েছেন মহারাজ জী তার নাম 'অনন্তবাউটি'। "মানুষের হাতে এমন কোনো যন্ত্রযান নাই, যাহাতে চড়িয়া বর্তমানের মানুষ অতীত কাল দেখিয়া ঘুরিয়ে আসিতে পারে।" — ধ্রুব সত্যই বটে। তারপরেও লেখক মাত্র ১৯২ পাতার ঘেরাও দিয়ে যে ঔপন্যাসিক পৃথিবী তৈরী করে আমাদের উপহার দিয়েছেন, সেটাও অতীত কাল ঘুরে দেখে আসার চেয়ে কম নয়! 'রুপোর পৈঁছে'র প্রধান কথকচরিত্র – চিনুশাঁখারির উল্লেখ আমরা সারদানন্দ জী মহারাজের ''লীলাপ্রসঙ্গ" এবং অক্ষয়কুমার সেনের "রামকৃষ্ণপুঁথি"তেও পেয়েছি। কিন্তু এখানে লেখক এই চরিত্রকে যেন আরও জীবন্ত, আরও সরস করে তুলেছেন। "অনন্তবাউটি"র কথকচরিত্রের নাম জয়গোপাল ঘোষাল, ঠিকানা - জিব্টা, জিলা বাঁকুড়া। ই��ি লেখকের সম্পূর্ণ কল্পনার ফসল হলেও যেন আমারই পড়ার টেবিলে হেলান দিয়ে বসে মা সারদার বাল্যলীলার মধুরস গ্লাসে গ্লাসে ঢেলে দিচ্ছিলেন, আর পাঠকরূপী আমি সেই মিষ্ট রসের স্বাদ আকন্ঠ ভরে পান করে তৃপ্ত হচ্ছিলাম – অন্তত আমার কাছে এমনটাই মনে হচ্ছিল। বেশিরভাগ লেখকেরই কল্পনার গরু গাছে ওঠে, ওখান থেকে আবার নদীতে লাফ দিয়ে সাঁতরে পেরিয়ে যায় পাতার পর পাতা! সম্মাত্রানন্দ মহারাজের গল্পের সুনয়না মৃগ দৌঁড়ে যাচ্ছিল এক পুরাতন বাংলার ভিটিতে, যেখানে ছড়িয়ে আছে তার সুরভীত কস্তুরীর আভা! পাঠকমাত্রেই সেই অনন্ত মাতোয়ারা ঘ্রাণের টানে পিছু নেবে অজান্তেই সেই অক্ষররুপী হরিণীর। এখানে অবশ্য হরিণীর শিকার কাম্য নয়, আকাঙ্ক্ষা শুধু সুরভিত কস্তুরীর অপ্রতীম আঘ্রাণের। এমনতর মহান দার্শনিক লেখকের পদরেণুতে আমার অনন্ত কোটি প্রণাম। আপনি দীর্ঘায়ু হোন, কলম হোক আপনার দীর্ঘজীবী – এই প্রার্থনা করি মহামহিম ঈশ্বরের কাছে। @ #নুভা_হংসি ১৩ বৈশাখ, ১৪৩২