নারীর হৃদয় গোপনীয়তার গভীর সমুদ্র। যে নারীকে সবচেয়ে বেশি জানেন বলে আপনি দাবি করেন, আসলে তার কতটুকু জানেন? অতি সামান্যই, কিন্তু তার জীবনের বেশ কিছু গোপন অধ্যায় জানেন আন্দালিব রাশদী। ফয়জুন্নেসা এবং কলেজের সেই স্যারের কথাই না হয় ধরুন: ‘স্যার দ্বিধা কাটিয়ে এগোচ্ছেন। বলতে পারতাম বিয়ের আগে ওসব নয়, প্লিজ স্যার, থামুন। বলিনি, আমিই চেয়েছি, হোক না। শরীরের আনন্দ যে এত তীব্র হতে পারে, আমি জানব কেমন করে! স্যার আমার বুকের ওপর হাঁপাচ্ছিলেন। তাঁর মাথাটা চেপে ধরে বলি, ‘স্যার!’ কাঁপা কণ্ঠে স্যার বললেন, ‘ছাব্বিশ বছর পর ফয়জুন, ছাব্বিশ বছর পর।’ ‘ছাব্বিশ বছর! আমার জন্মেরও সাত বছর আগে! আমার শরীরের ওপর থেকে ভার হঠাৎ নেমে গেল, স্যার পিছলে বিছানার ওপর পড়ে গেলেন। আমি দ্রুত উঠে কাপড় পরতে পরতে সুইচ অন করতেই ফ্লুরোসেন্ট লাইটের আলোতে ঘরটা ধবধবে হয়ে ওঠে। আঁতকে উঠি। স্যারের মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। আমি এখন কী করব? আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এখনই।’ এমন টানটান উত্তেজনায় পাঁচ নারীর গোপনীয়তার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেছেন এই কথাসাহিত্যিক।
"A woman's heart is a deep ocean of secrets. সব সিক্রেটস বলা যায় না, বলা উচিতও নয়। এটা আমেরিকা নয়, এটা বাংলাদেশ। তোমার একটা সত্য কথায় দশটা পরিবারে অসন্তোষ দেখা দেবে। সর্বনাশও ঘটে যেতে পারে। খুনোখুনিও হয়ে যেতে পারে।"
পাঁচজন নারী, পাঁচটি জীবন, পাঁচটি অপ্রকাশিত সত্য - যা কখনো দিনের আলোয় আসেনি, আসবেও না। কেউ তাদের নিয়ে আলোচনা করবে না, বিচার করবে না। তারা বেঁচে থাকে ছায়ার ভেতর, নীরবে, গোপনে। সিক্রেটস সেইসব ছায়ার গল্প বলে।
এখানে কোনো নারী পুরোপুরি নিষ্পাপ নয়, আবার কেউই পুরোপুরি অপরাধীও নয়। তারা শুধু মানুষ—জটিল, অসম্পূর্ণ এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা একেকটি সত্তা।
ফয়জুন্নেসা খানম—মিডিওকার ছাত্রী, লম্বা, রুক্ষ, আকর্ষণহীন, বিয়ের বাজারে অবাঞ্ছিত। কলেজে পড়তে গিয়ে বয়সে তিনগুণ বিপত্নীক অধ্যাপকের সাথে প্রেম হয়। কিন্তু ভালোবাসার প্রথম প্রহরেই বিধাতা যেন নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ করলেন—সেই শিক্ষক, তার প্রেমিক, মৃত্যু বরণ করলেন ঠিক তারই বাহুডোরে।
মার্গারিটা ফার্নান্দেজ— তুখোড় ইংরেজি বলা পূর্ব পাকিস্তানি এসকর্ট, যার কেবল শরীরই নয়, বুদ্ধিও সমান ধারালো। এক ষড়যন্ত্রের ভেতর জড়িয়ে পড়ল, কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে নিল নিজের ইচ্ছেমতো। পাকিস্তান, লন্ডন, বাংলাদেশ—তার জীবন এক আশ্চর্য যাত্রা। তার দ্বিতীয় স্বামী জন ফার্নান্দেজ কি জানে, সে কেবল মার্গারিটা নয়, সে এক আস্ত ইতিহাস?
শায়েস্তা- যে অবহেলিত এক প্রচারণাকর্মী থেকে হয়ে ওঠে ধনী এক বিধবা—কিন্তু তার এই উত্থানের পেছনে আছে রক্ত ও প্রতিশোধের গল্প।
লায়লা ইয়াসমিন আহমেদ—যার বাবা স্বপ্ন দেখেছিল মেয়েকে সামরিক অফিসারের সাথে বিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শ্বশুর হবে। কিন্তু যুদ্ধ এসে সব ওলটপালট করে দিল। প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, এবং শেষে এক ভণ্ডামির গল্প—যেখানে নিজের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তাকে ব্যবহার করা হলো রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে।
দিলবাহার—এক নর্তকীর মেয়ে, এক মাতালের সংসারে বড় হওয়া। ছোটবেলায় বিক্রি হয়ে যাওয়া এক বোন, বিয়ের পর পাওয়া এক নিষিদ্ধ প্রেম। এক সর্দারের স্ত্রী হয়ে, সন্তান জন্ম দিয়ে, এক গোপন সম্পর্কের ছায়ায় টিকে রইল। শেষ পর্যন্ত নিজের বাড়ি হলো, যেখানে পাঁচটা গল্প এসে মিশল, একসাথে এক সিক্রেটস লজ হয়ে দাঁড়াল। এই বাড়ির দেয়াল জানে, কে কাকে ভালোবেসেছিল, কে কার মৃত্যুর জন্য দায়ী, কে নিজের অতীতকে পুড়িয়ে নতুন পরিচয় গড়েছে। সমাজ বলে তারা শক্তিশালী নারী, ক্ষমতাধর নারী—কিন্তু তারা কি সত্যিই তাই, নাকি সবটাই একটা নিখুঁত অভিনয়?
টাইটানিক ডোবার কয়েকযুগ পরও তার সাথে ডুবে যাওয়া মহামূল্যবান রত্ন খুঁজতে অভিযান চলছে, অথচ সিনেমার শেষে বর্ষীয়ান নায়িকা পকেট থেকে সেই রত্নখচিত নেকলেস বের করে বলেছিলেন, "A woman's heart is a deep ocean of secrets", এমন সব সিক্রেট, যা জীবনভর লুকিয়েই রাখা হয়৷ সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই বইয়ের চরিত্ররা কেউ বলেছেন তাঁদের জীবনে এমন কোন গোপনীয় তথ্য নেই, আবার কেউ বলেছেন আছে তবে তা মানুষকে জানানোর দরকার নেই, কারণ " সব বলা যায় না, বলা উচিতও নয়"। তবে শেষমেশ সব চরিত্রই রাজি হয়েছেন তাঁদের গল্পগুলো জানাতে৷ জীবনযুদ্ধে প্রিয়জনদের খুইয়ে (বা পরিচিতজনদের থেকে পালিয়ে) শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়ানো পাঁচজন নারীর নিজেদের নিগূঢ় গোপনীয় গল্পগুলো নিয়ে এই বই।
চমৎকার আগ্রহোদ্দীপক প্রেমিস। লেখকের স্বভাবসুলভ সহজ সাবলীল লেখা আর হিউমারের উপস্থিতিতে একটানে পড়ে ফেলা গেছে। বেঁচে থাকতে হলে নারীকে কত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আসতে হয়, অভিজ্ঞতার ঝুলিতে কত কিছুই জমা হয়। তবে অভিযোগ, লেখক যেন সবার গল্পগুলো এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছেন৷ জীবনসংগ্রামে একা একা টিকে থাকা একজনের জীবনে রহস্যের ঘাটতি হওয়ার কথা না, তবে ঘুরে ফিরে পাঁচজনের সিক্রেট একটা বিষয়কে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। নিরেট লেখনশৈলীর আগ্রহভরেই বই পড়ে ফেলা গেলেও শেষ করার পর একটু আফসোস থেকেই গেলো।
যেন এক বর্ণিল মোজাইক—পাঁচজন নারীর জীবনের নানান রঙ সজ্জা গড়েছে 'সিক্রেটস লজ'-এ এসে। একা, অথবা একা হয়ে পড়া, নারী, জীবনে টিকে থাকতে আন-অর্থোডক্স পথাবলম্বনের চেপে রাখা গল্পগুলো মেলে দিয়েছে জীবন সায়াহ্নের এই আশ্রয়স্থলে। 'সিক্রেটস লজ', বৃদ্ধাশ্রম। রাশদী'র অসামান্য লেখনীতে, বিচিত্র প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা পাঁচ নারীর গল্প উপভোগ্য ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে... পাশাপাশি দেখলে সে পাঁচজনের সমাজবাস্ততবতার পার্থক্য যেমন লক্ষ্যণীয়, তা ছাপিয়ে আবার একা নারী হয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম এই পাঁচের কমন থিম।