গল্পকথনের প্রথাগত আঙ্গিক ভেঙে লেখক এই উপন্যাসে উন্মোচন করেছেন এক সাহসী ও পরীক্ষামূলক আখ্যানরীতি। কোনো একক কাহিনির ক্রমবিবর্তন এই উপন্যাসের আধার নয়। সরলরৈখিক ন্যারেটিভে এগোয় না এই লেখা। বরং প্রথম থেকে শেষ অবধি পাঠক যেন এক বন্ধুর যাত্রাপথে এগিয়ে চলেন অচেনা এক রহস্যময় জলাশয়ের দিকে।
কালোদিঘি।
বাস্তব জীবন থেকে মুখ-ফেরানো মানুষেরা কোনো এক জাদুমন্ত্রে নিজেদের পালটে নিয়ে সেই দিঘির ধারে গাছ হয়ে জেগে ওঠেন। উদ্ভিন্ন এইসব অতিলৌকিক জীবনের দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন, স্মৃতি ও পিছুটানের আলেখ্যগুলি অনন্য মুনশিয়ানায় সাজিয়েছেন লেখক।
"উজানযাত্রা"য় কালোদিঘি ছিলো পার্শ্বচরিত্র। এখানে সেই দিঘিই মূল ক্রীড়নক, কেন্দ্রীয় ঘটনাস্থল। দুই উপন্যাসে দিঘি সূত্রধর হলেও কাহিনি আলাদা। লেখার কিছু জায়গায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ছাপ পাওয়া যায়। এখানে ঘটনার ঘনঘটা না থাকলেও বেশ দ্রুত এগিয়েছে গল্প। রাখাল, হরিপদ,মালতী, স্যমন্তক, সমীরণ, জীবন ঘোষাল, স্মৃতিকণা, নবমিতাকে নিয়ে রচিত আখ্যানে ঘুরেফিরে আসে কালোদিঘি। পলায়নপরতা, নিঃসঙ্গতা, যাপিত জীবনের গ্লানি বহন করতে করতে আবার বেঁচে থাকার সুতীব্র বাসনা লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন চরিত্রগুলোর কার্যক্রমের মাধ্যমে। আমাদের আশেপাশেই লুকিয়ে আছে ম্যাজিক, শুধু সেটা দেখার চোখ থাকতে হবে - এ তত্ত্ব সবসময় মানতে না পারলেও ভাবতে ভালো লাগে যে ম্যাজিক আছে। সেই ম্যাজিকে ঘরে ফেরার রাস্তার গন্ধ পাবো আবার।আবার শান্তিতে ঘুম দিতে পারবো।
ব্যস্ত, ক্লান্ত, বিরক্তিকর জীবন থেকে নির্বাসন নিয়ে শান্তির খোঁজে কোথাও চলে যাওয়ার ইচ্ছাটা যারা পোষণ করেন তাদের সংখ্যাটা নেহাতই কম না, বরং দিনদিন সেটা বাড়ছেই। লেখকের প্রথম উপন্যাস 'উজানযাত্রা'য় দেখা যায় এমনই শান্তির খোঁজে নিরিবিলি কালোদিঘি'র পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো গাছ যারা একসময় মানুষ ছিল। যারা কথা বলে নিজেদের সাথে।
উজানযাত্রার কালোদিঘি এবার প্রধান চরিত্র এবং আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। স্বেচ্ছায় হারিয়ে যাওয়া মানুষের আবারো ঘরে ফেরার ইচ্ছা এবং সেই ইচ্ছা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটা বিশেষ ভালো লাগেনি। কিছু জিনিস অব্যাখ্যাত থাকাই ভালো। লেখকের গদ্য চমৎকার, পড়তে আরাম লাগে।