স্টিফেন কিং, রোয়াল্ড ডাহল, হারলান এলিসন, লিসা টাটল, সি এম কর্নব্লাথ, জেরম বিক্সবি এবং রবার্ট ব্লখ; হরর এবং ফ্যান্টাসি ঘরানার আন্তর্জাতিক সপ্তরথী। এই সংকলনে রইল সেই সাতজন লেখকের সাতটি দীর্ঘ কাহিনির বঙ্গানুবাদ। মূল কাহিনিগুলির অসামান্য ভাষা, কাঁপিয়ে-দেওয়া প্লট এবং কল্পনার বিস্তারকে অনুবাদে ধরা খুব সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু সেই কঠিন কাজটিকেই সহজভাবে করেছেন শ্রীসৈকত মুখোপাধ্যায়। আমরা মনে করি তাঁর চেয়ে যোগ্য কেউ ছিলেনও না, কারণ, সৈকতের মৌলিক রচনার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা জানেন, বাংলাভাষায় তিনি ফুল ফোটাতে পারেন। উপরন্তু তিনি ইংরেজি সাহিত্যের কৃতী ছাত্র এবং জঁর-ফিকশনের তন্নিষ্ঠ পাঠক।
আশা করি এই সংকলনের লেখাগুলি পড়তে গেলে আপনার কখনও মনে হবে না অনুবাদ পড়ছি।
তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
মাস্টারস্ট্রোক: হরর-ফ্যান্টাসির অনুবাদে এক সাহসী অভিযান
রচনা ও অনুবাদ: সৈকত মুখোপাধ্যায় প্রকাশক: অরণ্যমন অলংকরণ: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য প্রচ্ছদ: কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল
বাংলা সাহিত্যে জঁর ফিকশন আর “অবসরের পাঠ্য” নয়—তা এখন হয়ে উঠেছে সাহিত্যের মূলস্রোতের এক সাহসী প্রবাহ: আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ, দার্শনিকভাবে পরিণত, এবং নান্দনিক অভিব্যক্তিতে ঋদ্ধ। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের অনূদিত সংকলন মাস্টারস্ট্রোক এই পরিবর্তনের এক অনবদ্য নিদর্শন—যেখানে কল্পবিজ্ঞান, হরর এবং ফ্যান্টাসির বিস্ময় বাংলা গদ্যের সুরে মিশে সৃষ্টি করেছে এক নতুন ভাষিক-সাংস্কৃতিক ভূগোল।
এই বই শুধু অনুবাদের সংকলন নয়—এটি সাহসিকতার এক প্রতিমা। সাতজন আন্তর্জাতিক জঁর-কথাশিল্পীর কাহিনি রূপান্তরের মাধ্যমে সৈকত মুখোপাধ্যায় যেমন নিপুণ অনুবাদক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি তাঁর ভাষাভাষ্যের অন্তরালে দেখা মেলে এক সাহিত্যিকের নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বর। প্রতিটি অনুবাদ যেন এক ধরণের linguistic alchemy, যেখানে উৎস ভাষার ধ্বনি-নির্যাস আর বাংলার ভাবনাসংস্কৃতির ঘনত্ব মিলেমিশে তৈরি করেছে আন্তঃসাংস্কৃতিক এক আশ্চর্য সংলাপ।
এই বই পড়া মানে কেবল অনুবাদের মুন্সিয়ানা উপভোগ করা নয়—এটি পাঠকের সামনে উন্মোচন করে সেই শিল্পপথ, যেখানে বাংলা ভাষা কেবল অনুবাদ করে না, বরং অধিকার করে ফেলে এক নতুন কল্পলোক।
"Genre fiction, when done right, doesn’t escape life—it reveals it." – Stephen King
এবং সেই দায়িত্ব এই বই পালন করে নিঃশব্দে, অথচ ধ্বনিময় তীক্ষ্ণতায়—যেন প্রতিটি পৃষ্ঠা নিজের মধ্যে বহন করে সৃজনশীল আত্মবিশ্বাসের নিটোল অভিঘাত।
‘মাস্টারস্ট্রোক’ নামটি কোনও শব্দচাতুর্য নয়—বরং এক রূপক, এক প্রতিশ্রুতি। প্রতিটি অনুবাদ যেন এক একটি নির্ভুল তুলি-ছোঁয়া—কখনও হাড়সঁপানো আতঙ্কের রেখায়, কখনও দার্শনিক ফ্যান্টাসির বিমূর্ত কল্পনায়, আবার কখনও সমাজের সাদা মুখোশের ওপরে কষানো ব্যঙ্গের স্পষ্ট আঁচড়ে।
এটি সেই বই, যেখানে অনুবাদ একটি কৌশল নয়—একটি ‘art of war’। শব্দ, শৈলী ও সাহস এখানে একসঙ্গে মিলে যে প্রহার করে, তা নিঃসন্দেহে এক মাস্টারস্ট্রোক।
গল্প নির্বাচনের মুন্সিয়ানা
এই সংকলনের গল্প-তালিকা নিছক কিছু অনুবাদ নয়—এ এক কিউরেটরের স্বাক্ষর। স্টিফেন কিংয়ের I Am the Doorway, হারলান এলিসনের On the Downhill Side, লিসা টাটলের Replacements, রোয়াল্ড ডাহলের Skin, রবার্ট ব্লখের Animal Fair, জেরোম বিক্সবির It’s a Good Life, এবং সি. এম. কর্নব্লাথের Mindworm—প্রতিটি গল্পই বিশ্ব সাহিত্যের স্পেকুলেটিভ ক্যাননের এক একটি আলোচ্য ‘ক্লাসিক’, যার ঘ্রাণে মিলে আতঙ্ক, মানবচরিত্রের কুয়াশা, আর কল্পনার নেশা।
সৈকত মুখোপাধ্যায় কেবল এই সাতটি শক্তিশালী গল্পকে বাংলায় রূপান্তর করেননি—তিনি যেন প্রতিটি গল্পের শিরা-উপশিরায় ঢুকে মূল ভাষার অনুভব, স্নায়বিক টানাপোড়েন এবং আখ্যানের কাঠামোকে এমনভাবে নিজের ভাষায় প্রতিস্থাপন করেছেন, যেন গল্পগুলো নিজেরাই বাংলায় জন্মেছে। অনুবাদ এখানে কেবল ‘translation’ নয়, বরং ‘transfusion’—যেখানে গল্পের আত্মা রক্তরেখার মতো নতুন ভাষায় সঞ্চালিত হয়েছে।
এই গল্পবাছাই শুধু সাহিত্যের শ্রদ্ধা নয়—এ এক দুর্দান্ত আভিজাত্যবোধের প্রকাশ, যেখানে পাঠক পায় আতঙ্ক, কৌতূহল, বেদনাবোধ এবং অন্তর্দৃষ্টির এক অনুপম মিশেল।
বিশেষ প্রশংসার দাবিদার দুটি অনুবাদ: ‘তার বদলে পেলে’ ও ‘ঢল নামার আগে’
নিশ্চয়ই! নিচে আমি *Replacements* এবং *On the Downhill Side*—এই দুই গল্পের বিষয়, শৈলী, রূপক, এবং সৈকত মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদকৌশল নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করছি। এ অংশটি আপনার রিভিউর প্রাণ হতে পারে—সংযম আর সৌন্দর্যের মিশেলে।
**দুই অনুবাদ, দুই প্রতিভা: *Replacements* ও *On the Downhill Side***
এই সংকলনের সাতটি অনুবাদিত গল্পের মধ্যে বিশেষভাবে আলাদা হয়ে ওঠে দুটি রত্ন—লিসা টাটলের *Replacements* এবং হারলান এলিসনের *On the Downhill Side*। এই দুই অনুবাদে সৈকত মুখোপাধ্যায় শুধু দক্ষ অনুবাদক নন, বরং হয়ে ওঠেন একজন সহ-লেখক—যিনি মূল ভাষার অনুভব, আবেশ ও ব্যঞ্জনাকে এমনভাবে আত্মস্থ করে ফেলেন, যেন গল্প দু’টি বাংলাতেই জন্মেছিল।
*Replacements*: লিসা টাটলের এই কাহিনি নিছক হরর নয়, এটি এক জটিল রূপকের গহ্বর। গল্পের কেন্দ্রে এক অদ্ভুত প্রাণী—ছোটখাটো, বাদুড়ের মতো, ভয়ানক এক দৃষ্টিতে তাকানো সে, যে শহরের নারীদের জীবনে হঠাৎ করে অনুপ্রবেশ করে এবং অদ্ভুতভাবে ‘মাতৃসুলভ’ আশ্রয় খোঁজে। পুরুষ চরিত্রটি ক্রমশ বুঝতে পারে যে এই প্রাণীগুলোর উপস্থিতি তার সঙ্গিনীকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, সম্পর্কের ভেতরে এক অদৃশ্য বাধা তৈরি করছে।
এই গল্পের আসল জাদু তার রূপকে। এই 'প্রাণী' আসলে কী? গর্ভজাত সন্তানের প্রতীক? নারীর আত্মনির্ভর অস্তিত্ব? পুরুষতান্ত্রিক শঙ্কার অদৃশ্য প্রতিবিম্ব? লিসা টাটলের লেখা এখানে সুনির্দিষ্ট উত্তর না দিয়ে পাঠককে বাধ্য করে ভাবতে, এবং সৈকতের অনুবাদ সেই 'না বলা' শূন্যস্থানগুলিকে এমন দক্ষতায় বহন করে যে বাংলা গদ্যও যেন নিজস্ব ভাষায় এই রূপককে নতুন প্রাণ দেয়।
সৈকতের অনুবাদে বিশেষ নজরকাড়া বিষয় হলো শব্দের ব্যবহারে ব্যঞ্জনার সূক্ষ্মতা। তিনি গল্পের হরর ও রূপককে ভারসাম্য রেখে প্রকাশ করেছেন—কোথাও বাড়তি নাটক নেই, আবার কোথাও ‘অলৌকিকতা’ চাপা পড়ে যায়নি। বরং এক ধরনের ‘literary stillness’ বজায় থাকে—যা পাঠককে আচ্ছন্ন করে।
*On the Downhill Side*: হারলান এলিসনের লেখা এই গল্প একটি অতিপ্রাকৃত প্রেমকাহিনি—কিন্তু সেটি কোনও সাধারণ ঘরানার প্রেম নয়। দুই প্রেতাত্মার গল্প এটি—যারা এক রাতে, এক শহরে, এক সম্মিলিত দুঃখবোধে জড়িয়ে পড়ে। প্রেম এখানে চিরন্তন নয়, বরং ভাঙনের প্রাক মুহূর্তে থমকে থাকা এক দীর্ঘশ্বাস। মূল কাহিনিতে ঘটনাস্থল নিউ অর্লিন্স—এক মায়াময় শহর যেখানে সুর, মৃত, ছায়া এবং নিঃসঙ্গতা একসাথে ঘুরে বেড়ায়।
সৈকত মুখোপাধ্যায় অনুবাদে সেই নিউ অর্লিন্সকে টেনে এনেছেন কলকাতার গভীর রাতে—রেসকোর্সের বাতাস, পার্ক স্ট্রিটের আলো, এলোমেলো পুরনো ব্যালকনি, ট্রামের টুংটাং শব্দ। এই স্থানান্তর কোনও জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নয়—বরং এক স্বাভাবিক বিবর্তন, যেন মূল লেখকই যদি বাংলায় লিখতেন, এমনই কিছু লিখতেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হল গল্পটির কাব্যময়তা। এলিসনের গদ্য ছিল মৃদু, অনুচ্চারিত—যেমন বিষাদে চুপ থাকা কোনও পুরনো প্রেমিকের মুখ। সৈকত সেই গদ্যরীতি অক্ষরে অক্ষরে অনুবাদ না করে বরং গদ্যের স্পন্দনটিকে বাংলা ভাষার ছন্দে রূপ দিয়েছেন। ফলে যে অনুভূতি আসে তা অনুবাদ নয়, একধরনের “transcreation”—মৌলিক রচনার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা।
এ গল্পটিতে একটি ইউনিকর্নের উপস্থিতি, একটি কবির মতো আলোড়ন তোলে। অস্তিত্বের আড়ালে থাকা ঐন্দ্রজালিকতা, এবং জীবনের শেষে ঠিক যতটা মায়া দরকার—সেটুকু নিঃশব্দ অনুবাদেই ধরা পড়েছে।
এই দুই অনুবাদ প্রমাণ করে—ভাষান্তর যদি হয় শিল্প, তবে সৈকত মুখোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে সেই শিল্পের অন্যতম কুশলী কারিগর।
এই বইয়ে প্রতিটি অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই দুটি—*Replacements* ও *On the Downhill Side*—একটি পাঠ-মানচিত্রে যেন আলাদা করে দাগ কেটে যায়। পাঠকের মনে তারা রেখে যায় হররের আতঙ্ক নয়, রূপকের দোলা আর কবিতার ���তো ক্ষীণ বিষণ্নতা।
Replacements: নারীর দেহ, মাতৃত্ব, আর ‘অপর’-এর মানসিক ভূগোল Lisa Tuttle-এর গল্পটি নিছকই এক রক্তচোষা অদ্ভুত প্রাণীর গল্প নয়—এ এক গা-চাপা, কণ্ঠরুদ্ধ প্রতিরোধের বয়ান, যেখানে নারীর শরীর ও চেতনা ক্রমশ স্বাধীনতার খোঁজে পুরুষতন্ত্রের ভাষ্য থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে।
গল্পের কেন্দ্রে থাকা অদ্ভুত প্রাণীটি (যা বাদুড়ের মতো, অথচ শিশুর মতো, আবার এক ভয়ংকর নির্ভরশীল সত্তা)—কোনও একটি নির্দিষ্ট জেনারিক সত্তা নয়। বরং এটি বহুমাত্রিক রূপকে দাঁড় করায়:
১) একটি সন্তানসুলভ অস্তিত্ব, যার প্রতি নারীর স্বাভাবিক টান আছে, কিন্তু যার জন্ম পুরুষের অস্বস্তি;
২) এক “অন্য নারী”, যে পুরুষের জায়গা দখল করে নারীর জীবনে—মাতৃত্ব ও নারীবন্ধনের মানসিক আকাঙ্ক্ষা পুরুষের প্রতি আকর্ষণকে প্রতিস্থাপন করে;
৩) বং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এক ভেতরের শত্রু, যে নারীর মধ্যেই বাসা বাঁধে, পুরুষতন্ত্রের চোখে ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘বিপজ্জনক’।
এই প্রাণীর ধীরে ধীরে নারীর জীবনে ঢুকে পড়া, পুরুষ চরিত্রটির ক্রমশ নিজেকে ‘অচল’ ও ‘অপ্রাসঙ্গিক’ মনে করা, তার বিভ্রান্তি, রাগ, আর অবসাদের রূপরেখা—সবই একধরনের symbolic gaslighting-এর চিত্রায়ণ।
থিম ও মোটিফগুলি:
১) মাতৃত্ব বনাম পুরুষ আধিপত্য: গল্পটি এক অর্থে নারীর গর্ভধারণ ও মাতৃত্বের সৌন্দর্য আর তার সঙ্গে আসা সামাজিক নিঃসঙ্গতা এবং পুরুষের অনভিপ্রেত নিস্তেজতার আখ্যান।
২) অপরীচয়ের প্রতীকী রূপ: প্রাণীটি যেন Freudian "uncanny" বা Das Unheimliche—যা চেনা আবার অচেনা, ঘরের মধ্যেই একটি আগন্তুকের মতো।
৩) পুরুষের হীনমন্যতা ও হারানোর ভয়: প্রেমিক বা সঙ্গীর চরিত্রটি ক্রমে এক ধরণের অব্যক্ত হিংসা ও ক্ষোভে পরিণত হয়, যে নারীকে 'ফিরিয়ে' পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা না পূরণ হওয়ায় নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায় ‘প্রতিরোধ’-এর মধ্যে।
৪) দেহের রাজনীতি: গল্পে দেহ যেন নিজেই এক যুদ্ধক্ষেত্র, নারীর শরীর যেখানে নতুন প্রাণ, মমতা এবং পুরুষ-বর্জনের যন্ত্রণা একসাথে জন্ম দেয়।
রূপক ও চিত্রকল্প: গল্পের প্রতিটি অনুচ্ছেদ যেন এক একটা বিভ্রান্তিমূলক ডায়েরির পৃষ্ঠা—বাইরের ঘটনাগুলোর পেছনে চালকের আসনে বসে আছে মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে এই layered ambiguity এমনভাবে ফুটে উঠেছে, যে পাঠকের মনে বারবার প্রশ্ন জাগে—"এটা হরর, না আত্মজৈবনিক কাব্য?"
অনুবাদ প্রসঙ্গে: সৈকতের অনুবাদে এই গল্পটি যেন আদ্যন্ত একটি বাংলা গল্প হয়ে ওঠে—যেখানে গদ্য শারীরিক ভাষা নয়, একধরনের psychological texture। তিনি চিত্রকল্প ও সংলাপের জটিল ব্যঞ্জনা অক্ষুণ্ণ রেখে এমনভাবে অনুবাদ করেছেন যে, মূল গল্পের বেদনার ছায়াগুলি বাংলার আলো-আঁধারিতে নতুনভাবে নড়েচড়ে ওঠে।
এই অনুবাদ একটাই কথা বলে—কখনও কখনও হরর মানে ভূতের গল্প নয়, বরং খুব কাছের মানুষের ক্রমাগত দূরে সরে যাওয়া, সম্পর্কের ভেতর নিঃশব্দভাবে জন্ম নেওয়া এক ‘অন্যের’।
On the Downhill Side: প্রেতাত্মা, প্রেম, এবং প্রলয়ের প্রাক্কালে কল্পনার রেসকোর্স
হারলান এলিসনের On the Downhill Side এমন এক গল্প, যেটির পাঠ-অভিজ্ঞতা কেবল ভাষার মধ্য দিয়ে হয় না—তা হয় হেমন্ত সন্ধ্যার কুয়াশা, কানের পেছনে ঠান্ডা হাওয়ার চাপ, আর চোখের পাতায় জমে থাকা অর্ধ-স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে। সৈকত মুখোপাধ্যায় এই গল্পটিকে অনুবাদ করেননি শুধু—তিনি যেন এ গল্পের medium, এক প্রেতাত্মার মতো, যিনি ইংরেজি থেকে বাংলায় হেঁটে আসেন কাব্যের ছায়া মেখে।
থিম ও মোটিফ:
১. প্রেমের প্রেতত্ব (Ghostliness of Love): গল্পের দু'টি চরিত্র—দুই বিদেহী আত্মা—তাঁদের প্রেমের অনিবার্যতা, অসম্পূর্ণতা, এবং অস্তিত্বহীনতা নিয়ে কথা বলে। প্রেম এখানে নিছক অনুভূতি নয়, বরং এক আত্মিক afterlife, যা শরীরের মৃত্যু মেনে নেয়, কিন্তু মন-স্মৃতি-আবেগের মৃত্যু মানে না।
২. শহর ও স্মৃতি: নিউ অর্লিন্স এখানে শুধু পটভূমি নয়—সে এক চরিত্র, এক ঘুমন্ত সঙ্গী, এক প্রেমিকের পুরোনো চিঠির মতো। সৈকতের অনুবাদে সেই নিউ অর্লিন্স যখন রূপান্তরিত হয় কলকাতায়, তখন তিলে তিলে তৈরি হয় এক phantasmagorical cityscape—রেসকোর্সের বাতাস, রেস্তোরাঁর অন্ধকার কোণা, রেলিং-ঘেরা ব্যালকনি, ফিকে হলুদ আলো, যা একই সঙ্গে মায়া আর স্মৃতির সঞ্চার করে। একেই বলে city as memory-palace।
৩. ইউনিকর্নের প্রতীক: ইউনিকর্ন, যাকে সাধারণত জাদুকরী, বিশুদ্ধ ও অধরা জীব বলে ধরা হয়, এখানে হয়ে ওঠে এক ফেটিশ অব ফেট—প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের মুহূর্তে হাজির থাকা সেই অলীক সত্তা, যা চূড়ান্ত পরিণতির আগে একটি "last chance" দেয়। ইউনিকর্ন এখানে সময়ের সীমানা পেরোনো এক "guardian of desire"—যার উপস্থিতি স্বপ্নকেও বাস্তবের মতো জ্যান্ত করে তোলে।
৪. পুনর্জন্ম বনাম বিনাশ: এই গল্পে প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের অতীতের ভুল, অনুশোচনা ও অসম্পূর্ণতার মধ্য দিয়ে এক ধরনের mythical absolution খোঁজেন। প্রেম যেন একটা পাপশোধনের প্রক্রিয়া—প্রতীকীভাবে এই রাত্রি তাদের purgatory, আর প্রভাত সেই সম্ভাব্য মুক্তি।
অনুবাদের কাব্যময়তা: সৈকতের গদ্যে এই গল্প যেন এক কবিতা হয়ে ওঠে। তাঁর অনুবাদে শব্দ শুধু ভাষান্তর নয়, তাপমাত্রা ও ছায়ার রূপ পায়। যেমন: “সে হেঁটে যাচ্ছিল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে, বাতাস তার পাশ দিয়ে ঠিক যে ভাবে বয়ে যায় কোনও প্রেমিকার দীর্ঘশ্বাস।” — এই ধরনের গদ্যে অনুবাদক হয়ে ওঠেন গল্পের সহলেখক।
এই গল্পটি বাংলা ভাষায় এমনভাবে মূর্ত হয়েছে যে মনে হয়, নিউ অর্লিন্সে নয়, গল্পটি জন্ম থেকেই কলকাতার গায়ে মায়ার আলপনা এঁকে রেখেছে। এটি সেই প্রেমের গল্প, যা কোনও মানুষ লেখেন না—লেখেন তাদের ছায়া। এবং সৈকত মুখোপাধ্যায় যেন সেই ছায়ার ভাষান্তরক।
এই দুটি অনুবাদ বাংলা ভাষায় কল্পগদ্যের এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়—যেখানে গদ্য হয়ে ওঠে গান, আর অনুবাদ এক ধরণের ভাষার পুনর্জন্ম।
ভূমিকা: এক সাহিত্যঘরানার উদ্বোধন, এক দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্জন্ম
এই সংকলনের সূচনায় সৈকত মুখোপাধ্যায়ের প্রায় পাঁচ পাতার লেখা ভূমিকা শুধু একটি প্রাককথন নয়—এটি যেন বাংলাভাষায় স্পেকুলেটিভ ফিকশনের ম্যানিফেস্টো। এই লেখায় তিনি অনুবাদের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার বাইরেও উঠে এসেছে আরও জরুরি এক প্রশ্ন: “কেন বাংলা সাহিত্যে এখনই সময় স্পেকুলেটিভ ফিকশনকে তার প্রাপ্য জায়গা দেওয়ার?”
সৈকতবাবুর এই ভূমিকা নিছক একটা সম্পাদকীয় নন, বরং একটি সাহসী সাহিত্য-ঘোষণাপত্র। তিনি ঠান্ডা মাথায়, কিন্তু রক্তগরম যুক্তিতে চিহ্নিত করেছেন—বাংলা সাহিত্যজগতে ‘উচ্চ’ বনাম ‘নিম্ন’, ‘গম্ভীর’ বনাম ‘চটুল’, এবং ‘ক্লাসিক্যাল’ বনাম ‘জঁর’—এই সব মিথ্যাচারী দ্বন্দ্বের অসারতা। তাঁর যুক্তির গদ্য এমন ধারালো, যেন পাঠকের কুসংস্কারের দেওয়াল কেটে দিয়ে তাকে অনন্ত সম্ভাবনার দিকে ঠেলে দেয়।
এখানে সৈকত নিজেকে শুধু অনুবাদক বা সাহিত্যিক হিসেবে উপস্থাপন করেননি—বরং এক চিন্তক, এক সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “স্পেকুলেটিভ ফিকশন কেবল পলায়ন নয়, বরং প্রতিস্পন্দন।” এবং এই প্রতিস্পন্দন বাংলা সাহিত্যেও নতুন প্রজ্ঞা আর দর্শনের স্থান করে নিতে পারে, যদি তাকে সেই মঞ্চ দেওয়া হয়।
এই ভূমিকা এক অর্থে পাঠকের জন্য নব্য-নবাবাদের জন্য গাইডবুক, লেখকদের জন্য আত্মবিশ্বাসের পুনরাবিষ্কার, আর বাংলা সাহিত্য জগতে স্পেকুলেটিভ ধারার জন্য ঐতিহাসিক দলিল।
সৈকতের এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং লেখনী যে শুধু প্রাজ্ঞ, তা-ই নয়—তা সাহসী, সুসংহত এবং এক কথায়, পথপ্রদর্শক।
অনুবাদের গুণ ও বিতর্ক
সৈকত মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে এমন এক সুনিপুণ ভঙ্গি আছে, যা পাঠকের মন থেকে প্রায় মুছে দেয় যে গল্পটি আদতে ইংরেজিতে লেখা। তার গদ্যের স্বচ্ছন্দতা, বাক্যবন্ধের ছন্দ, এবং ভাবানুবাদের দৃষ্টান্ত এতটাই নিখুঁত, যে অনেকক্ষেত্রেই মনে হয়—এ গল্প বাংলা ভাষাতেই জন্মেছিল।
তবে ঠিক এইখানেই জন্ম নেয় অনুবাদবিজ্ঞানের একটি চিরন্তন দ্বন্দ্ব: “Should a translation bring the reader to the text, or the text to the reader?” (Lawrence Venuti)
সৈকতের অনুবাদ অনেকটাই domestication কৌশলের দিকে ঝুঁকে—পাঠকের অনুভবের কাছে গল্পকে টেনে আনা, যাতে পাঠের অভিজ্ঞতা আরও প্রাঞ্জল হয়। কিন্তু তাতে কিছু জায়গায়, বিশেষত বাংলার আঞ্চলিক স্ল্যাং বা লোকজ রসায়নের উপস্থিতি, ইংরেজি প্রেক���ষিতের সঙ্গে খানিকটা সাংস্কৃতিক সংঘাত তৈরি করে। যেমন ধরুন, রবার্ট ব্লখের Animal Fair বা সি এম কর্নব্লাথের Mindworm—এইসব গল্পের আমেরিকান টোন বা সাংস্কৃতিক গভীরতা বাংলা কোলোকিয়ালিজমের সঙ্গে সব সময় সঙ্গতিপূর্ণ হয় না।
এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত অনুবাদ-চিন্তক Susan Bassnett বলেছিলেন— “Translation is not just the linguistic act of transferring meaning, but a negotiation between cultures.”
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সৈকতের অনুবাদ একটি দারুণ "negotiation"—যেখানে বাংলা পাঠকের জন্য দরজা খোলা, কিন্তু মাঝে মাঝে একটু হাওয়া বাইরে থেকেও ঢুকে পড়ে।
আসলে, এটি একটি বৃহত্তর আলোচনার অংশ। আফ্রিকান বা ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রেও ঠিক এই প্রশ্নই উঠেছে—পাঠকের আত্মীয়তা বনাম লেখকের প্রেক্ষিত।
আমাদের মতে, এই সংকলন অনুবাদ বিতর্কের এই সূক্ষ্ম দোলাচলকেও চমৎকারভাবে সামনে নিয়ে আসে, এবং এটিই সাহিত্যের জীবন্ত স্পন্দন।
এছাড়াও প্রতিটি গল্পের আগে সৌভিক চক্রবর্তীর লেখা লেখক পরিচিতি ও গল্পের সারাংশ কিছু ক্ষেত্রে গল্পের স্পয়লার করে ফেলেছে। বিশেষত দ্বিতীয় গল্পের (Replacements) সূচনাতেই লেখিকার মানসিক প্রেক্ষাপট জানিয়ে দেওয়াটা গল্পের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছনোর আগেই সব বলে দেয়। এমন তথ্যসমৃদ্ধ লেখাগুলি গল্পের পরে দিলে পাঠকের অভিজ্ঞতা আরও নিখুঁত হতো।
বইটির দৃষ্টিনন্দনতা:
একটি ভালো গল্প যেমন পাঠকের মনে ছায়া ফেলে, তেমনই একটি বইয়ের চিত্রভাষাও পাঠ-অভিজ্ঞতার ঘনত্ব বাড়িয়ে তোলে। মাস্টারস্ট্রোক-এর ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য। তাঁর অলংকরণ শুধু বইয়ের অভ্যন্তরীণ গঠনকে শোভিত করেনি, বরং প্রতিটি গল্পের আবহ, মুড ও স্পন্দনকে দৃশ্যমান করে তুলেছে—যেন প্রতিটি চিত্রই একেকটি ‘ভিজ্যুয়াল এক্সটেনশন’ গল্পের মর্মস্থলের।
বিশেষ করে Replacements বা On the Downhill Side গল্পের ছায়াতেই যেন প্রতিটি রেখা—প্রেত, প্রতীক, কিংবা প্রিয়ার আকুতি আঁকা হয়েছে পেন্সিলের ঘন শ্বাসে।
যদিও প্রচ্ছদ নিয়ে পাঠকমহলে মতবিরোধ থাকতে পারে—কৃষ্ণেন্দু মণ্ডলের নকশা কিছু চোখে পড়ে, কিছু চোখ এড়িয়ে যায়—তবু সামগ্রিক অভিজ্ঞতায় তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কারণ বইটি শুধুই পড়বার নয়, বইটি যেন এক ‘sensorial experience’—যেখানে চোখ ও মস্তিষ্ক, রেটিনা ও কল্পনা, পাশাপাশি কাজ করে।
**উপসংহার: মাস্টারস্ট্রোক না হয়ে পারে না
শেষ কথা—মাস্টারস্ট্রোক কেবল একটি অনুবাদ সংকলন নয়, এটি এক সাহিত্যিক অবস্থান। এটি বাংলা ভাষায় বিশ্বসাহিত্যের ফ্যান্টাসি-হরর ঘরানাকে ফিরিয়ে আনার এক ঘোষণাপত্র। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে পাঠক শুধু জঁর ফিকশনের শিহরণ বা কল্পনার বিস্তার খুঁজে পাবেন না, খুঁজে পাবেন সাহিত্যের গভীরতা, ভাবনার শাণিত তল, ও ভাষার অন্তর্লীন কারিগরি।
এই বই পড়া মানে শুধু গল্প পড়া নয়—এ এক ভূতের মতো আপনাকে জাপটে ধরা পাঠ, যেখান থেকে আর ফেরার উপায় নেই। প্রতিটি গল্প শেষেও রয়ে যায় এক অদৃশ্য ‘ডোরওয়ে’, এক ঝিরঝিরে অনুভূতি: “আমার মধ্যেও কি বাস করছে কোনো মগজখেকো?” বা “এই শহরের রাতগুলো এতটা নরম, নাকি ততটাই নিঃসঙ্গ?”
মাস্টারস্ট্রোক সেই পাঠ—যেখানে আতঙ্ক শিল্পে রূপ নেয়, আর অনুবাদ হয়ে ওঠে এক অন্তর্দৃষ্টি।
এটি এক সাহসী পদক্ষেপ, এক razor-sharp literary move। এবং আমরা, পাঠকরা, কেবল অপেক্ষা করতে পারি… আরও একটি দরজা খুলে যাওয়ার— আরও এক ঢল নামার— আরও একটি মাস্টারস্ট্রোক-এর।
Because once you open this book— you don’t just read the monsters. You become one.
বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে যে কজন খ্যাতনামা অনুবাদক আছেন তাঁদের মধ্যে সৈকত মুখোপাধ্যায়ের নাম অন্যতম। তবে শুধুমাত্র অনুবাদক হিসাবেই নয়, বর্তমান সময়ের একজন প্রতিভাবান লেখক হিসাবেও তার নাম উঠে আসে। হরর ও ফ্যান্টাসি ঘরানার সাতটি বিদেশী গল্পকে নিখুঁত অনুবাদের মাধ্যমে পাঠকের সামনে পরিবেশন করেছেন লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায়। এই সংকলনটিতে স্থান পেয়েছে স্টিফেন কিং, রোয়াল্ড ডাহল, হারলান এলিসন, লিসা টাটল, সি এম কর্নব্লাথ, জেরম বিক্সবি এবং রবার্ট ব্লখ-এর লেখা একটি করে হরর ফ্যান্টাসি ঘরানার কাহিনী। একটি কাহিনী অনুবাদ করা মানে শুধুমাত্র সেই লেখাটিকে হুবহু তুলে ধরা নয়; তার সাথে সেই কাহিনীর পরিবেশটিকেও এক চমৎকার লেখনীর মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। মূল কাহিনীর সেই আবহ ও থমথমে পরিবেশ অনুবাদে ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে লেখক অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের সাতটি কাহিনী বহন করেছে সাতটি আলাদা রকমের সময় আর পরিবেশের কথা। কাহিনীগুলি সবই হরর ও ফ্যান্টাসি ঘরানার, তাই পাঠকের কল্পনাশক্তি ও মস্তিষ্কের পুষ্টি জোগানোর যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে কাহিনী গুলিতে। এই সংকলন পাঠককে দেবে এক আলাদা ধরণের পাঠের অনুভূতি, যা অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি পাঠককে আরও আকৃষ্ট করে তুলবে।