'যোদ্ধারা, মজলুমের কাণ্ডারিরা, অধিকার প্রত্যাশীরা, আজকে কোনো জয় পরাজয়ের হিসেব নেই–শুধুই যুদ্ধ। অধিকারের যুদ্ধ, হকের যুদ্ধ, জমিনের জন্য যুদ্ধ, মুক্ত বাতাসের জন্য যুদ্ধ, স্বাধীনতার যুদ্ধ, বাঁচা-মরার যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কোনো শেষ নেই। এই যুদ্ধ অনন্তকালের। জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে হারানোর কিছু নেই আমাদের–শুধুই প্রাপ্তি। তাই যুদ্ধ করো শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত। হয়ে উঠো স্বাধীনতার রক্তবীজ।' সারিবদ্ধ সৈন্যের সামনে ঘোড়া ছোটাতে ছোটাতে বললেন আমিরাত-ই-বাঙ্গালার রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর।
তিতুমীর নাম শুনেছি অনেক, পড়েছি সামান্যই। ওই স্কুলের বইয়ে পড়া ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, বাঁশের কেল্লা নির্মান করা এইটুকুই। তা আফ্রিকার খঞ্জরের লেখক যখন সেই তিতুমীরকে নিয়ে বই লেখার ঘোষণা দিলেন তখন আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করেছিলাম। কারন বিশ্বাস ছিল ব্যক্তি তিতুমীরকে ভালোভাবে জানা যাবে এই লেখকের মাধ্যমে।
আশা অনেকটাই পূরণ হয়েছে। তিতুমীরের শৈশব কৈশোর সহ অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। তবে যেভাবে জানব বলে ভেবেছি, ব্যাপারটা সেরকম হয়নি। ব্যাখ্যা করছি,
তথ্য ও ইতিহাস
মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের বাল্যকাল থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত বিশাল এক যাত্রা লেখক এই বইতে তুলে এনেছেন। একেবারে বাল্যকাল থেকে হাফেজ নেয়ামত উল্লাহ'র তত্ত্বাবধানে তিতুমীরের বেড়ে উঠা, শিক্ষা গ্রহণ করা, অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়া, কুস্তিতে জেতা, ধীরে ধীরে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়া এমন অনেক কিছুই উঠে এসেছে বইয়ে। অকুতোভয় তিতা মিয়া সবসময়েই ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নীলকরদের শোষণ আর জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই।
তিতুমীরের পাশাপাশি ওই সময়টায় আমাদের বাংলার কী অবস্থা ছিল সে সম্পর্কেও একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে বইটা পড়লে। জমিদারদের উচ্চ বংশীয় দাপটে মুসলমানরা তো বটেই, এমনকি নীচু জাতের হিন্দুরাও পশুর মতো জীবন যাপন করত। সে সময়ের মুসলিমরা ঈদ, কুরবানী উদযাপন, গরুর মাংস খাওয়া, এমনকি জুম্মার নামাজও আদায় করতে পারত না। কথায় কথায় এই অঞ্চলের মুসলিমদেরকে নেড়ে, ম্লেচ্ছ, যবন নাম ধরে গালি দেয়া হতো। একইরকম খারাপ পরিস্থিতি ছিল হিন্দুদেরও। তাদের তো এমনকি ঘরের মেয়েদেরকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হতো যখন ইচ্ছে তখন। খাজনা দিতে পারো নাই? তোমার বউ আজকে রাতের জন্য আমার। এই টাইপ অবস্থা ছিল। এক ব্রাহ্মণ ছাড়া আর সকল জাতের হিন্দুদের অবস্থা ছিল মুসলমানদের মতোই করুণ।
আর এগুলো থেকে এই অঞ্চলের মানুষদেরকে প্রথম মুক্তির দিশা দেখায় তিতুমীর। নীলকুঠি আক্রমণ করে জেলে যাওয়া, সেখান থেকে বের হয়ে হজ্জ্ব শেষে নিজ দেশে ফিরে আল্লাহ রাসূলের বানী ছড়িয়ে দেয়া, সমাজে প্রচলিত সকল শিরক, বেদআত আর কুসংস্কারকে দূর করার চেষ্টা করা, হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ দূর করে সকল মজলুমকে একত্রিত করা, ধীরে ধীরে নিজের অনুসারীদের নিয়ে যুদ্ধ শুরু করা এমন অনেক অনেক ঘটনাবহুল বিষয় নিয়ে তিতুমীরের গোটা জীবনটা জানা হয়ে যাবে বইটা পড়লে।
অতি স্বাভাবিকভাবেই বইয়ে উঠে এসেছে অসংখ্য চরিত্র। মূখ্য সবগুলো চরিত্রকে মোটামুটি ভালোভাবেই উপস্থাপন করতে পেরেছেন লেখক। তিতুমীরের স্ত্রী ময়মুনার চরিত্রটা আরো একবার প্রমাণ করে প্রতিটা সফল পুরুষের পিছনে একজন নারীর কত শখ, আহ্লাদ, সুখ বিসর্জন রয়েছে। ভালোবাসার আকাঙ্খা শুধু চোখের জলে ফেলেই পূরণ করতে হয়েছে বেচারিকে। ময়মুনার অংশ পড়তে গিয়ে আসলেই বেশ খারাপ লেগেছে।
জানার আনন্দ বনাম পড়ার আনন্দ!
এক্সপেক্টেশন জিনিসটা খুবই খারাপ। আফ্রিকার খঞ্জর বইতে যেভাবে গল্পে গল্পে তারিক বিন জিয়াদকে উপস্থাপন করেছেন লেখক, একই জিনিস আমি দেখতে চেয়েছি তিতুমীরের ক্ষেত্রেও। আর এখানে এসেই কিছুটা আশাহত হতে হয়েছে আমাকে। আফ্রিকার খঞ্জরে ইতিহাসের বর্ণনা, গল্পের নাটকীয়তা, যুদ্ধের কৌশল ও বর্ণনা, এবং চরিত্রায়ন সবকিছুর একটা স্বাদু মেলবন্ধন ছিল। ভাষণগুলো ছিল বুকে ধাক্কা দেয়ার মতো।
সে তুলনায় তিতুমীরের সংলাপ অনেকটাই একঘেয়ে, ঘুরেফিরে প্রায় কাছাকাছি ধরণের। গল্পে প্রয়োজনীয় চমকের অভাব ছিল লক্ষ্যনীয়। গল্পের কাহিনীতে খুব বেশি কিছু না ঘটিয়ে টানা পাতার পর পাতা স্রেফ ঘটনার বর্ণনা ক্ষেত্র বিশেষে বেশ ক্লান্তিকর লেগেছে। আবার কয়েক জায়গায় লেখক ক্লাইমেক্স আগে জানিয়ে, এরপর মূল ঘটনা ব্যাখ্যা করেছেন। এই ব্যাপারটা লেখায় চমকের জন্য আনলেও আমার মনে হয়েছে এতে করে ক্লাইম্যাক্সটা উলটা সাদামাটা হয়ে গেছে। বইতে এত পরিমাণ ইসলামী ধ্যান ধারণা ও জ্ঞান রয়েছে যে এটাকে অনায়াসে একটা ইসলামী বই বলে চালিয়ে দেয়া সম্ভব। ডোন্ট গেট মি রং, ইসলামী বই আমিও পড়ি। কিন্তু ইতিহাস আশ্রিত বই পড়তে গিয়ে আমি নিশ্চয়ই ইসলামের জ্ঞান চাইনি। হ্যা, তিতুমীরের চরিত্রের জন্য অবশ্যই দরকার ছিল ব্যাপারগুলো টানা। তবে তার বিস্তৃতি আরো কম হলেই ভালো হতো বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। আর কিছু সংলাপ এত নাটুকে ছিল যে রীতিমতো হাস্যকর হয়ে গিয়েছে। অবশ্য ভালো সংলাপও ছিল অনেক, যেগুলো পড়ার সময়ে বুকে একটু হলেও কাঁপন তৈরি হয়েছে। বইয়ে বেশকিছু বাক্য অনেকবার করে এসেছে, এই রিপিটেশন ভীষণ বিরক্তিকর ছিল। কাছাকাছি ধরণের বাক্য ঘুরেফিরে বারবার পড়তে কারোই ভালো লাগার কথা নয়। একশন দৃশ্যগুলোও একই ধাঁচের। নতুনত্ব নেই, ছিল না ভিন্নতাও। আফ্রিকার খঞ্জরের শেষ যুদ্ধের বর্ণনাটা এখনো আমার মনে আছে। অথচ এই বইতে সেটার ধারেকাছেও কিছু নেই। লেখকের গদ্যশৈলী আরো ভালো হতে পারত। বইয়ের ঘটনাপ্রবাহ আরো একটু গতিশীল হতে পারত।
মোদ্দাকথা বইটা থেকে জানার ক্ষুধা তো মিটেছে, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এন্টারটেইনমেন্টের জায়গায় ঘাটতি রয়ে গেছে। হয়তো অন্য অনেকের এগুলা নিয়ে তেমন সমস্যা হবে না। বললামই তো লেখকের ওই আফ্রিকার খঞ্জর আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে! এটাতে ওই বইটা খুঁজতে গিয়েই সব আউলে ফেলেছি! একই লেখকের সব বই একই রকম হবে এটা ভাবাটাও অনুচিত আসলে।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৬/১০ (আমার মনে হয়েছে বইটাকে আরো স্বল্প পরিসরে আনলেই ভালো হতো। সেক্ষেত্রে টেনে লম্বা করা হয়েছে টাইপ অনুভূতি হতো না, আর বইটাও হয়তো আরো উপভোগ্য হতো। তবে আমাদের একজন সূর্যসন্তান সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জানতে চাইলে বইটা অবশ্যই পড়ে দেখতে পারেন)
প্রোডাকশন: প্রোডাকশন নিয়ে এখন লিখি শুধু সমালোচনার জায়গা থাকলেই। এই বইতে আমার কাছে সমালোচনার জায়গা মনে হয়েছে সম্পাদনার ক্ষেত্রে। বানান নিয়ে সমস্যা নেই। তবে কিছু জায়গায় আমার মনে হয়েছে একটু কাঁচি চালালে ভালো হতো। যেমন জান অথবা জমিন ডায়ালগটা অনেকবার এসেছে, যুদ্ধ ঘোষণায় বা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপারটা মানানসই। কিন্তু যতবার তিতুমীরের রাগ উঠেছে, প্রতিবার একদম প্রতিটাবার"মনে হচ্ছে যেন শরীরের সমস্ত রক্ত এসে জমাট বেঁধেছে দুই চোখে" বাক্যটার ব্যবহার খুবই বিরক্তিকর লেগেছে। এছাড়া তিতুমীরের হজ্জ্বে যাওয়ার প্রাক্কালে কয়েক পেইজ আগেই বলা হয়েছে গোলাম মাসুমের সবে গোফের রেখা উঠতে শুরু করেছে। অথচ সপ্তাহান্তে হজ্জ্বে যাওয়ার সময় গোলাম মাসুমের বর্ণনায় বলা হচ্ছে, তার গোফের রেখা গাঢ় হয়েছে, শরীরের কলেবর বেড়েছে, হাতের মাংসপেশী ফুলে উঠেছে! এ সবকিছুই হয়ে গিয়েছে এক সপ্তাহের মাঝে!! এই ব্যাপারটা সম্পাদনার সময়ে খেয়াল করা উচিত ছিল।
❛স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।❜
স্বাধীনতা শব্দটা এই উপমহাদেশের কাছে বারংবার বেশ ভারী হয়ে এসেছে। এক মুঠো স্বাধীনতার আশায় কতগুলো শতাব্দী যে পার হলো। বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ডুবে গেলো ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে। শুধুমাত্র বিশ্বাসঘাতকতার জন্য পরদেশী সাদা চামড়ার কতগুলো কিট অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়েই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত করে দিলো। সেই থেকে শুরু হলো ইংরেজ নামক শোষকের ভয়াল শাসন। বাংলা তথা পুরো উপমহাদেশ হারালো তাদের স্বাধীনতা। পা চাটায় পরিণত হলো অনেকে। কী আছে ঐ সাদা চামড়ার সাহেবদের মধ্যে? যার জন্য নিজের ঐতিহ্য বিকিয়ে দিতে হলো?
জমিদার, জোতদাররাও একত্রে মিলে গেল ইংরেজদের সাথে। কর, খাজনা, নানা উছিলায় কর আদায়, নির্যাতন, নিপীড়ন চলতেই থাকল। মুঘল আমলে যেখানে মুসলিমরা রাজ্য চালিয়েছে আজ ইংরেজদের যাঁতাকলে তারাই সবথেকে বেশি নির্যাতিত, নিপীড়িত। একই রকম নিপীড়নের শিকার নিচু বর্ণের হিন্দুরাও। অস্থির একটা সময়।
১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি সৈয়দ মীর পরিবারে জন্ম নিলেন এক শিশু। নাম রাখা হলো সৈয়দ মীর নিসার আলী। এই পরিবার নিজেদের দাবি করে হযরত আলী (রাঃ) এর বংশধর হিসেবে। তবে নিসার আলী নামে আমজনতা তাকে কমই চেনে। ছোটকালে কী এক অসুখ হলো কোনোভাবেই সাড়ে না। কোনো ওষুধে ধরে না। সবাই প্রায় হাল ছেড়ে দিলো। কিন্তু দমে গেলেন না দাদি। কীভাবে কীভাবে জোগাড় করলেন লতা পাতা বেটে এক রস। ঐ রস জন্মের তিতা। কিন্তু অবাক ব্যাপার জনম তিতা সেই রস নিসার হাসিমুখেই খেয়ে ফেলছে। এরপর থেকে লোকে তাকে ❛তিতা মিয়া❜ বলে ডাকতে শুরু করল। সেই তিতা মিয়া থেকে তিতু আর তিতু থেকে সে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিলো ❛তিতুমীর❜ হিসেবে। তিতুমীর ছোটো থেকে পেয়েছে শিক্ষার দারুণ পরিবেশ। নিজেকে তৈরি করেছে। জীবনের শুরুতেই পেয়েছিল হাজী নেয়ামত উল্লাহর মতো গুরু। যিনি তাকে তার জ্ঞানের প্রতিটি বিন্দু দিয়েছেন। শিখিয়েছেন জীবনের লক্ষ্য। তার জীবনের মূল অনেক গভীর। এক কুস্তি প্রতিযোগিতায় অসম এক লড়াইতে সে জিতে যায়। এরপরই এলাকার লোকের সামনে তার নাম পরিচিত হয়ে যায়। সে প্রতিযোগিতায় জয়ীর পুরষ্কার গ্রহণ করতে হতো ঐ শাসকশ্রেণীর থেকে। অথচ তাদের মনেপ্রাণে ঘেন্না করে তিতুমীর। তবুও জমিদার মনোহর রায়ের কথায় নিমরাজি হয়ে গ্রহণ করে সে পুরস্কার। তার দিকে চোখ পড়ে আরেক জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের। প্রজা নিপীড়নে যার খ্যাতি আছে। এদিকে বিপরীত মনোহর রায়। মুসলিমদের ❛নেড়ের জাত❜ বলে কটাক্ষ করেন না। তিতুমীরের পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক। তিতুমীরের লক্ষ্য সে ভিন্ন কিছু করবে। তার মধ্যে বপন হবে আজাদীর গান। কিন্তু এরমধ্যেই বিয়ে নামক বন্ধনে সে আবদ্ধ হয় মায়মুনার সাথে। পরিবারের পিছুটান নিয়ে কী করে সে সামনে এগুবে? সময় এগিয়ে যায়। এরমধ্যেই অত্যাচারী ইংরেজদের অত্যাচার দুর্দিনের মাত্রা ছাড়ায়। নীল চাষের নাম করে জোর করে জমি দখল, চাষ করতে রাজি না হলে কুঠিতে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন চলতে থাকে। মানুষের ফসলের জায়গা খালি হতে থাকে, নীল চাষ করে জমি হয়ে যায় চাষের অযোগ্য। এহেন অবস্থায় তারা নিরুপায়। জমিদারেরা এতে আরো তাল দেয়। সময়মতো খাজনা আদায় করে, মাতাল হয়ে একেকদিন একেক ঘরের নারীর সম্ভ্রম নিয়ে খেলে। একদিন তিতুমীরের এক প্রতিবেশীকে একই নীল চাষ করতে রাজি না হওয়ায় ধরে নিয়ে যায়। পাড়ার সকলে একত্রে হয়। তাকে বাঁচাতে হবে, তিতুমীরের কথার জাদুতে তারা উদ্বুদ্ধ হয়। গোপনে চলে কুঠি আ ক্রমণের পরিকল্পনা। এরপর মাত্র ৩০ জন লোকের মাধ্যমে আক্র মণ করেন নীলকুঠি। ভাবনাতীত সাফল্য লাভ করেন। তবে রেহাই পান না ইংরেজদের কূটচাল থেকে। ডাকা তির মামলায় জেলে ঢুকতে হয় তাকে। এরপর সেখানে থেকে ফিরে অন্য এক লক্ষ্য নিয়ে। এরই মধ্যে স্বামী থেকে তিনি হন সন্তানের পিতা। তবে এবার এসেই আবার ঘর ছাড়েন মক্কার উদ্দেশ্যে। করবেন হজ। সেখানেই সান্নিধ্যে আসেন সৈয়দ আহমদ বেরলভীর। সেখানে কাটান চার বছর। শিক্ষা নেন ইসলামের মূল ধারার। নিজেকে আরও সৌম্যদীপ্ত করে ফিরে আসেন বাঙাল মুল্লুকে। নিজের পরিবারের কাছে। এবারে লক্ষ্য তার শরীয়তের আলোকে আন্দোলন। মানুষকে কুসংস্কার মুক্ত করতে না পারলে পরাধীনতার এই গ্লানি ঘুচবে না। শুরু করলেন ❛তরিকায়ে মোহাম্মদিয়া❜ নামের প্রচার। বাঙালি ইসলামের মূল ধারা থেকে সরে গেছে। তারা এখনো ওলা ওঠা রোগে ওলা বিবির সাহায্য চায়, বৃষ্টির জন্য গাজী কালুর কাছে দোয়া করে, বিয়ের জন্য আচার করে কলা গাছে। আল্লাহর নবী (সঃ) এর প্রচার করা দ্বীন এমন ছিল না। মাজারপূজারী, পীর ফকিরের ভন্ডামি, জাতপাতের এই বিভেদ সবই মানুষের তৈরি। সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস এবং আপন ধর্ম পালনের কথা সেটা হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সহানুভূতির কথা বলেন। লোকে তার কথায় সত্যতা খুঁজে পায়। বিশ্বাস আনে হিন্দু মুসলিম উভয়েই। অনুসারীর সংখ্যা বাড়ে। সেই সাথে বাড়ে শাসকদের মাথা ব্যথা। জমিদার, ইংরেজরা তিতুমীরের এই জনপ্রিয়তাকে হুমকি হিসেবে দেখেন। সেই সাথে তার বিপক্ষে যায় ধর্ম ব্যবসায়ীরাও। কিন্তু তিতুমীর নিজ কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। তিতুমীরকে রুখতে জমিদারেরা করের নতুন নিয়ম চালু করে। দাড়ি রাখার কর, মসজিদ বানানোর কর, নাম পরিবর্তনের কর, পূজার কর সহ নানাবিধ উপায় কোণঠাসা করতে চায়। প্রচার করে সে ওয়াহাবী মতবাদ প্রচার করছে।
এসব মিথ্যাচারের জন্য সে চিঠি লিখে সেসময়ের জমিদার কৃষ্ণদেবের কাছে। দূত হিসেবে সেই চিঠি নিয়ে যায় আমানউল্লাহ। সেই দূতকেও হ ত্যা করেন তিনি। মসজিদ নির্মাণের সময় হাম লা চালায় সেখানে। পুড়িয়ে দেন মসজিদ। সেখানে তুমুল সংঘর্ষ হয়। কোনোমতে জান নিয়ে পালান জমিদার। নির্জলা সত্যের মতো এই ঘটনা প্রমাণ হয়না আদালতে। সাদা চামড়ার লোকেরা নাকি ন্যায় বিচারের অবতার। এই ছিল তাদের বিচারের নমুনা। তিতুমীর এই ল ড়াইতে একা নয়। আছে তার পুত্র, ভাগ্নি, বন্ধু, ফকির মিসকিন শাহ, সাজন গাজি, শফি কারিগর, গোকুল, রশীদ, তারা উকিলের মতো সঙ্গী। এদের কেউ রণে প্রাণ দিয়েছে, কেউ সঙ্গে আছে। বিপক্ষ দলে মন্ত্রণা দিতে আছে জমিদার কালীপ্রসন্ন, ভূদেব বাবু , দেবনাথ রায় সহ অনেকেই। সেই সাথে পালের গোদা হিসেবে ইংরেজ তো রয়েছেই। অনুসারীদের নিয়ে এবং মনোহরের সহযোগিতায় কৃষ্ণদেব রায়ের সাথে যু দ্ধে নামে তিতুমীর। বলাই বাহুল্য সে যুদ্ধে বীরদর্পে জিতে যায় তারা। অবসান হয় এক অ ত্যাচারী জমিদারের।
এরমধ্যে একদিন চিঠি পাঠায় তার স্ত্রী। সেই চিঠির বাহক তার মেঝ পুত্র গওহর। আরেক পুত্রকেও জননী উৎসর্গ করে দিয়েছেন স্বাধীকার প্রতিষ্ঠায়। স্বামীকে বলেছেন স্বাধীন হয়ে ফিরতে। যুগে যুগে পুরুষের সাথে নারীর এই সাহচর্যের ফলেই পুরুষ জয় করেছে, বাঁধা পেরিয়েছে অনেক অসম্ভবের। ক্রমেই ইংরেজদের ভয়ের কারণ হয়ে যায় সে। দেবনাথ রায়ের সাথেও যুদ্ধে জিতে যায় সে। বারাসাতের যু দ্ধে তার দলের নিপুণতার প্রমাণ দেখে লোকে। নির্মম ভাবে প্রাণ হারায় দেবনাথ, ডেভিস সহ অনেক ইংরেজ যো দ্ধা। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তারা গোপনে নারিকেলবাড়িয়ায় তৈরি করে এক দুর্গ। নিজের অর্থের যোগান নেই, সাহায্য নেই তারপরেও ফকির মিসকিন শাহের নকশায় তারা বাঁশ এবং করা দিয়ে তৈরি করে অপূর্ব সুন্দর এক দুর্গ। যাকে আমরা সবাই ❛বাঁশের কেল্লা❜ নামে চিনি। এই কেল্লা দেখে আসন্ন সংঘর্ষের আগে ইংরেজ ক্যাপ্টেন বলেছিলেন মুগ্ধ হয়ে গেছিলেন। যু দ্ধ জয় করে কয়েকটা এলাকা সহ তিতুমীর ঘোষণা করেছিলেন স্বাধীন রাষ্ট্র যার নাম ❛আমিরাত-ই-বাঙ্গালাহ❜। যার প্রধান হন তিতুমীর। গোলাম মাসুম, মইজুদ্দীন থাকেন তার সাথে। সেনাপতি, প্রধানমন্ত্রীর পদে। দেহরক্ষী হিসেবে থাকেন সাজন গাজী। নিরাপত্তা প্রধান হোন মিসকিন শাহ।
এরপর অবশেষে ১৮৩১ সালের ১৪ নভেম্ভর এলো। দুই পক্ষ অবস্থান নিলো। যেখানে ইংরেজ আধিক্য বেশি। তাদের আধুনিক অস্ত্র বেশি। আছে কামান, যার একটা গোলার আঘাতেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে বাঁশের কেল্লা নামক ���ুর্গ। শহীদ হওয়ার লক্ষ্যেই যেন সবাই একত্রে বলে উঠলো, ❛জান অথবা জমিন❜। তিতুমীর বলেছিলেন তাকে ভেদ না করে তার সৈন্যদের কেউ আঘাত করতে পারবে না। এরপর কী হলো? ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্ভর তারিখটা ভুলে যাওয়ার মতো কি?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসে তিতুমীর নামটা ভুলে যাওয়ার মতো নয়। বাঁশের কেল্লা নির্মাণ, প্রাণপণে সেখানে জানবাজি করার ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে। তিতুমীর নিয়ে দুঃখজনক হলেও সত্য আমার জানার পরিধি সীমিত ছিল। ঐ স্কুল জীবনে পড়া সমাজ বইয়ের মধ্যে না লেখা ছিল তাই জানতাম।
এবারের মেলায় তিতুমীরের জীবন নিয়ে উপন্যাস আসবে জেনে আগ্রহী ছিলাম বেশ। আল আমিন সরলের লেখা ❝তিতুমীর- জান অথবা জমিন❞ উপন্যাসটি শহীদ তিতুমীরের জীবনকাহিনি আশ্রিত।
তিতুমীরের জন্ম থেকে শুরু করে তার ঘটনাবহুল জীবনের নানা ঘটনা সাজিয়েছেন লেখক। ঐতিহাসিক চরিত্রের কথা বা জীবনকাহিনি পড়তে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রবন্ধ আকারের লাগে। কষযুক্ত বর্ণনা, তেমন কোনো আগ্রহ উদ্দীপনা ছাড়াই পড়তে গেলে একঘেঁয়েমি এসে যায়।
লেখক এই উপন্যাস সাজিয়েছেন ৫০টি অধ্যায়ে। সেখানে পড়তে গিয়ে খেয়াল করেছি ঘটনা সাজিয়েছেন আগে ঘটনার পরের অবস্থা তথা আফটার ইফেক্ট এসেছে। কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরের অবস্থা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছেন। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়েছেন উক্ত ঘটনা কেন ঘটলো বা এর আগের পরিকল্পনায়। সংলাপের আশ্রয় নিয়েছেন। ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে গদবাধা বর্ণনায় সীমাবদ্ধ না রেখে সংলাপনির্ভর করেছেন। করেছেন কিছুটা ভাষণ নির্ভরও। আবেগের কিছুটা আতিশয্যও লক্ষ্য করা গেছে কিছু বর্ণনায়। গদ্যশৈলী আমার একটু কঠিন লেগেছে। বা বলা যায় সাবলীলতা কম ছিল। অতীতের ঘটনার সাথে বর্তমানের মিলবন্ধন করেছেন। তিতুমীরের ঘটনাবহুল জীবনের সবটাই এনেছেন লেখক। উপন্যাস হিসেবে কল্পনার আশ্রয় ছিল তবে সেটা বাস্তব ঘটনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে। সংলাপ আমার কাছে মনে হচ্ছিল কিছু জায়গায় একটু বেশি হয়ে গেছে। তিতুমীর কথা বলতেন কম। তবে তার কথায় জাদু ছিল। মানুষ তার কথায় অনুপ্রাণিত হতেন। কিছু বর্ণনা আমার কাছে মনে হয়েছে বাড়তি। সেখানে গাম্ভীর্য বজায় রেখেও দেয়া যেত। টানা এগুলো পড়ে কিছুটা একঘেঁয়ে লেগেছে। ঘটনার পরের অবস্থা আগে আসায় কী হলো, কখন হলো এমন একটা জিজ্ঞাসা কাজ করছিল পড়ার সময়। লেখক ধীরে ধীরে সে বর্ণনায় নিয়ে গেছেন। পড়তে ভালো লেগেছে সেগুলো। তিতুমীর তার এই স্বাধীনতার আন্দোলন করেছেন সেখানে যেমন সহযোগিতা পেয়েছিলেন আপামর জনসাধারণের, তেমন তার পাশে ছিল পরিবার। কবি নজরুল বলেছিলেন, ❛বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।❜
তার স্ত্রী মায়মুনার সহযোগিতা, সমর্থন ছাড়াও হয়তো তিতুমীর এত দূর আসতে পারতেন না। যেতে পারতেন না হয়তো মক্কায়। আমূল সেই পরিবর্তন হতো না মক্কা সফর না হলে। মায়মুনার চিঠিতে যে আবেগ, ভালোবাসা আর নিজের দুঃখ গোপন করে স্বামী, সন্তানকে সঁপে দেয়ার কথা ছিল সেটা একমাত্র পারে বীর নারী। এই চিঠিটা আমার দারুণ লেগেছিল। মায়মুনার শুরু থেকে জমানো অভিমান প্রতিবারই স্বামীর মুখদর্শনে মিলিয়ে যাওয়ার, তাকে সমর্থন করার এবং স্বামী এখন শুধু তার একার নয় পুরো দেশের এই মনোভাব নিয়ে নিজের কষ্ট চেপে রাখার কথাগুলো দারুণভাবে উঠে এসেছে।
শেষটা কেমন হয়েছিল ইতিহাস সবার জানা। তবে সেই শেষটা হয়তো নতুন কোনো সূচনা ছিল। যার ফলাফল হিসেবে দেশভাগ, এরপর বাংলার নতুন জন্ম হয়েছিল।
বইটা পড়ার পর আমি তিতুমীর নিয়ে আরেকটু জানার চেষ্টায় অনালাইনে সার্চ করেছিলাম। ইতিহাস এবং মতবাদ অনুযায়ী তিতুমীরকে নিয়ে আছে তর্ক। কেউ বলতেন তিতুমীর মক্কা থেকে নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছেন। ওয়াহাবী মতবাদ প্রচার করেছেন। তবে এমনটা যে নয় সেটা প্রমাণ মিলে জমিদার কৃষ্ণদেব রায়কে দেয়া তার চিঠিতে। এমন প্রচারণার কাজ যে ঐ শোষকগোষ্ঠীর ছিল এবং তাতে সায় ছিল ধর্ম ব্যবসায়ীদের সেটা ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। এছাড়াও তাকে হিন্দু বিদ্বেষী বলা হয়েছে। তবে তার আন্দোলনের দিকে দেখলে দেখা যায় তিতুমীরের এই আন্দোলনে হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে অংশ নিয়েছিল। হিন্দুদের সাহায্য ছাড়াও তিতুমীর তার আন্দোলনে যে সফলতা পেয়েছিলেন সেটা সম্ভব ছিল না। সুপ্রকাশ রায় তিতুমীরের এই আন্দোলনকে জমিদার, নীলকর ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক শ্রেণীর এক আন্দোলন বলেছেন। লেখক বইতে বেশ ভালো তথ্য যোগ করেছেন। তবুও ঐ নেট ঘাটার দরুন নাম নিয়ে একটু দোটানায় ভুগছি। মইজুদ্দিন নামটা উল্লেখ ছিল উপন্যাসে। তবে বেশিরভাগ জায়গায় আমি নামটা পেয়েছি মঈনউদ্দিন। দুইজন একই ব্যক্তি কি? নামের ত্রুটি রয়ে গেছে হয়তো। চিঠি নিয়ে যে দূত গেছিল তার নামেও ভিন্নতা ছিল। তবে সেটা তেমন ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। একইরকম ছিল তার স্ত্রীর নামেও। লেখার ধরন আরেকটু সোজা হতে পারত। এতে পড়ার গতি ভালো হতো। কিছু জায়গায় আমার কঠিন লেগেছে। উপন্যাসটা পড়ার সময় বেশ অনেক জায়গায় ❛জান অথবা জমিন❜ কথাটার উল্লেখ ছিল। এটা পড়তে গিয়ে বারবার সদ্য কয়েকদিন আগের ❛মাতৃভূমি অথবা মৃ ত্যু❜ এই উক্তিটা মনে পড়ছিল। তিতুমীর যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন সেই আগুন শত শত বছর পেরিয়ে আজো মানুষের বুকে আছে। প্রয়োজনে সে আগুন জ্বলে ওঠে। একেই কি লিগ্যাসী বলে?
❛তিতুমীর নামের শেষ নেই। তারা সকল কালের। স্বাধীনতা রক্ষায়, অধিকার রক্ষায় তেজোদীপ্ত হয়ে যুগে যুগে তারা ফিরে আসে। হয়তো অন্যনামে। অন্য পরিচয়ে। কিন্তু বুকের তেজ অভিন্ন।❜
বইয়ের নাম: তিতুমীর-জান অথবা জমিন লেখক: আল আমিন সরল প্রকাশনী: শিরোনাম প্রকাশন প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ ব্যাক্তিগত রেটিং: ৪.৪/৫
"মারবে?মেরে ফেলো।জ্বালিয়ে দেবে?জ্বালিয়ে দাও।তবে মনে রেখো,তিতুমীরকে শেষ করা যায় না।যেখানেই হবে অন্যায়,যেখানেই হবে অবিচার,অনাচার হবে যেখানে,চেপে বসবে পরাধীনতার শৃঙ্খল,সেখানেই জন্ম নিবে তিতুমীর।অন্য নামে,অন্য পরিচয়ে।"
ক্লাস ফাইভে যখন তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা বানিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার খন্ডাংশ পড়েছিলাম,তখন থেকেই তার ব্যাপারে জানার আগ্রহ তৈরি হয়।তারপর থেকেই যেখানেই তার ব্যাপারে কোনো লেখা(হোক সেটা সৃজনশীল প্রশ্নের উদ্দীপক)পেয়েছি পড়েছি।সেই আগ্রহ থেকেই এই বই কেনা।
লেখনী: তিতুমীর,বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম বীর।যিনি বিশেষভাবে পরিচিত তার বাঁশের কেল্লার জন্য।প্রকৃত নাম মীর নিসার আলী হলেও খুব তেতো খেতে পারতেন বলে সবাই তিতুমীর বলে ডাকতো এবং একসময় সেই তিনিই শোষক জমিদার,ইংরেজদের জীবন তেতো করেছিলেন।
তিতুমীরের জন্ম থেকে শুরু করে শেষ সময় পর্যন্ত নানান ঘটনাবহুল বিষয়ের সমন্বয়ে মোট ৫২টি অধ্যায়ে বইটি সাজিয়েছেন লেখক।ইতিহাস জনরার বই পড়তে আমার সাধারণত একঘেয়েমি আসে।এই বইতে সেটা কিছুটা হলেও কম লেগেছে লেখার ও ঘটনাগুলোকে সাজানোর ধরনের কারণে।অতীতের সাথে বর্তমানের ঘটনার সংযোগ ভালোভাবেই ঘটিয়েছেন লেখক আল আমিন সরল ভাই।সম্ভবত তিতুমীরের জীবনের উল্লেখযোগ্য সব ঘটনারই বর্ণনা দেওয়ার জন্য এমন লেখনী।তবে কিছু ঘটনার খন্ডাংশ আগে বর্ণনা করে কিছু সময় ধোয়াশা রেখে তারপর পুরো ঘটনাই গেছেন।ইতিহাস জনরায় এই বিষয়টা ইউনিক লেগেছে।
তিতুমীরের ভাষণ এর বর্ণণা সেরা ছিলো।পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো আমি স্বশরীরে সেখানে উপস্থিত আছি।
কাহিনীতে অনেকগুলো চরিত্র ছিলো।কিন্ত অধিকাংশ সময় আড়ালে থাকলেও তিতুমীরের স্ত্রী মায়মুনার উপস্থিতি অনুভব করেছি।কথায় আছে,প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনে একজন নারীর অবদান থাকে।মায়মুনার সুখ,আহ্লাদের বিসর্জন তা প্রমাণ করেছে।তার লেখা চিঠি ��ড়ার সময় কিছুটা ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম।তার অভিমান,কষ্ট চেপে রেখে সন্তানদের যুদ্ধের ময়দানে সঁপে দেওয়া,স্বামীকে সমর্থন দেওয়া;সব মিলিয়ে অনন্য।
মুদ্রার ওপর পিঠ: বইতে বেশকিছু কথা বারবার এসেছে।এই যেমন 'দেহের সমস্ত রক্ত যেন চোখে এসে জমা হয়েছে',সাজন গাজীর ক্ষেত্রে 'তার মুখ গম্ভীর।সতর্ক চোখ'।এগুলোর পরিমাণ কম হলেই পড়াতে আরো বেশি স্বাচ্ছন্দ্য কাজ করতো বলে মনে করি।'জান অথবা জমিন' কথাটার রিপিটেশন এ বিরক্তি আসেনি,কারণ এটা স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।রিপিটেশন হবেই।বরং,যুদ্ধের অনুভূতি জাগিয়েছে।
বইতে অনেক জায়গাতেই ইসলামি কথাবার্তা ছিলো।কথাবার্তাগুলো মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।তবে কাহিনীর সাথে সম্পর্কিত হলেও কিছু জায়গাই অতিরিক্ত মনে হয়েছে।ইসলামি বই আমি পড়ি;ওটা আমার অন্যতম প্রিয় জনরা।কিন্ত এই বইতে বর্ণনার পরিমাণ বেশিই মনে হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে ঘটনা,সংলাপকে টেনে লম্বা করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।সেগুলো না থাকলে ঘটনাপ্রবাহ আরো গতিশীল হতে পারতো।
তবে,দুর্বলতাগুলোকে ছাপিয়ে বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম বীর তিতুমীর সম্পর্কে জানতে হলে,তার জীবনী, সহযোদ্ধা সম্পর্কে জানতে হলে বইটা পড়তে হবে বলে আমি মনে করি।
বানান: সাধারণ পর্যায়ের টাইপিং মিসটেকগুলো পড়ায় অসুবিধা তৈরি না করলেও কিছু ক্ষেত্রে শব্দ মিসিং ছিলো।ওগুলো একটু আধটু ভুগিয়েছে।
'তিতুমীর কেন পড়তে চাই?' এ লিখেছিলাম আফ্রিকার খঞ্জরের আল আমিন সরলকে সম্ভবত তিতুমীর দিয়ে ফিরে পাব। আফ্রিকার খঞ্জর পড়ে মুগ্ধ হওয়ার পর উনার লেখা ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল পড়েছিলাম। সত্যি বলতে একটু গোলমেলেই লেগেছিল। তবে আশা ছিল তিনি ফিরবেন।
আল আমিন সরল, ইজ দ্যা কিং অব হিস্টোরিক্যাল ফিকশন। এন্ড হি ইজ ব্যাক উইথ ব্যাঙ। ব্যাক উইথ মাস্টার ব্লাস্টার তিতুমীর।
বৃহস্পতিবার সারাদিন ট্রেনিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে আর রাতের অর্ধেকটা মিলিয়ে গরম গরম পড়ে শেষ করলাম আল আমিন সরলের তিতুমীর: জান অথবা জমিন। এক কথায় যদি রিভিউ দিতে বলা হয়, তাহলে বলব মাস্টার ব্লাস্টার।
‘আমার প্রিয় মানুষেরা, আমার প্রিয় ভাইয়েরা, আমার প্রিয় বন্ধুরা, আপনারা শুনুন, আপনারা জানেন আমরা অন্যায়, অত্যাচার, অনাচার ও জলুমের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে একটি ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। যদিও সেটা খুব কম সময়ের জন্য। তবুও পেরেছিলাম, তাগুতের শক্তিকে হটিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে। অল্পদিনের জন্য হলেও পরাধীনতার শৃঙ্খল খুলে আমারা শ্বাস নিয়েছিলাম মুক্ত বাতাসে। আমাদের সবকিছু আমরা আমাদের করে পেয়েছিলাম। আপনারা দেখেছেন, আমাদের সামনে শত্রুরা সংখ্যায় বড়ো, অস্ত্রে-শস্ত্রে শক্তিশালী। কিন্তু মনে রাখবেন, তাদের আছে কামানের গোলা, বন্দুকের নল, অজেয় যুদ্ধ কৌশল; আর আমাদের শক্তিশালী ইমান, সাহস আর এই স্বাধীন মাটির জন্য বুকভরা ভালোবাসা। ভালোবাসার কাছে বারুদের আগুন নস্যি। তারা চায় আমাদের শাসন করতে, আমাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে, আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে─বিপরীতে আমরা শুধু একটা জিনিসই চাই : মানুষ হিসেবে মানুষের অধিকার, কৃষক হিসেবে জমিনের অধিকার। মানুষেরা শুনুন, আপনারা যারা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তারা কেবল সৈনিক নন, কেবল সংস্কার আন্দোলনের অনুসারী নন, আপনারা আমার ভাই, আমার পরিবার। আমরা একে অপরের জন্য এই সংগ্রামে এসেছি। আমরা এক সাথে পায়ে পা মিলিয়ে পাড়ি দিয়েছি বহু পথ। প্রাণ দিয়েছি, অকাতরে ঢেলে দিয়েছি রক্ত। আমাদের রক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এই জমিনের বুকে। আমি বিশ্বাস করি, আজও আমরা পিছপা হবো না, একজন আরেকজনকে ছেড়ে যাব না। আমরা মাথা নত করব না। বুক টান করে দাঁড়াব বন্দুকের নলের সামনে, কামানের গোলার সামনে। আমি শপথ করে বলছি, যুদ্ধ ময়দানে আপনারা আমাকেই সবার আগে পাবেন। আমাকে ভেদ না করে একটা কামানের গোলাও আপনাদের স্পর্শ করতে পারবে না।’
এমন একটা ভাষণ শোনার পর কার শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটবে না? আমার ফুটেছে। মনে হয়েছে, এখনই ঝাঁপিয়ে পড়ি সংগ্রামে। ছিনিয়ে আনি স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য।
‘ভাইয়েরা, আমাদের দেশের মাটি হিন্দু-মুসলিম উভয়ের জন্য সমান। আমরা একসাথে থাকি, একসাথে কাজ করি, একই জলে গলা ভেজাই, একই বাতাসে শ্বাস নেই, সূর্যের তাপে দগ্ধ হই, একই চাঁদের আলোয় দেখি প্রিয়তমার মুখ। আমরা এই মাটির সন্তান, এই মাটিতেই আমাদের একসাথে বাঁচতে হবে। হিন্দু-মুসলিম একে অপরের ভাই। কেউ আমাদের মাঝে কোনো ফাটল ধরাতে পারবে না। আমাদের পয়গম্বরে মোহাম্মদ মুস্তফা (সা.) তার বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন, কোনো মুসলমানের দ্বারা যেন কোনো অমুসলিমের ক্ষতি না হয়। নিজের ধর্ম পালন করতে গিয়ে অন্যের ধর্মকে যেন কটাক্ষ না করা হয়। তাই কেউ যদি আমাদের মধ্যে ফাটল ধরাতে চায়, বপন করতে চায় সাম্প্রদায়িকতার বীজ, আমরা সম্মিলিতভাবে তা রুখে দিবো। প্রয়োজনে জান দিয়ে দেবো, তবুও ভাই হয়ে ভাইয়ের জান নেবো না, করব না সামান্য পরিমাণ ক্ষতিও।'
একজন নেতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কী? সবাইকে একত্র করা। আমরা ৫ আগস্টের পর যেই ইনক্লুসিভ বাংলাদেশের কথা বলছি, তিতুমীর সেই কথা বলেন গেছেন চারশো বছর আগেই। শুধু বলেই ক্ষান্ত হোননি। করে দেখিয়েছেন। এক বইয়ে পড়েছিলাম, তিতুমীরের আন্দোলন ছিল সত্যিকারের কৃষক আন্দোলন। এই আন্দোলনে প্রায় ৮৫ হাজার কৃষক অংশ নিয়েছিল।
আল আমিন সরলের আফ্রিকার খঞ্জর পড়েছিলাম বইয়ের গ্রুপে রেন্ডম এক রিভিউ দেখে। অসাধারণ লেগেছিল। ঐতিহাসিক বয়ানে কীভাবে নিরপেক্ষ থেকেও মূল গল্প বলা যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আফ্রিকার খঞ্জর। সেই আশাতেই তিতুমীর পড়া৷ তিতুমীর পড়ে বলতেই হয়, আমার আশাভঙ্গ হয়নি। উল্টো মনে হয়েছে, লেখক এখন পপরিপূর্ণ। তার কলমের মাথা থেকে যা-ই বের হবে, তাই জেম টাইপের হবে। আফ্রিকার খঞ্জর ছিল ট্রেইলার। তিতুমীর পূর্ণাঙ্গ সিনেমা। দ্যা এবসুলেট সিনেমা।
তিতুমীরের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে, তিতুমীরের কন্ঠে বলানো বিভিন্ন সময়ের ভাষণ। ভাষণ গুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, আমি তিতুমীরের পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি তার অভিব্যক্তি। তার প্রতিটি শব্দ চয়ন। হৃদয় নিংড়ে বের হওয়া প্রতিটি বাক্য। শুধু ভাষণগুলো এক মলাটে বন্দী করতে পারলেও দারুণ এক বই হয়ে যাবে।
আরও একটা দিক হল যুদ্ধের বর্ণনা। এমন নিপুণ করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে উপন্যাস জুড়ে, যেন সামনে থেকে দেখছি সব। চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে সব। আমার হাতের তলোয়ার। আমিই ঘোড়ার পিঠে। আমার তলোয়ারের আঘাতেই একে একে ধরাশায়ী হচ্ছে একটার পর একটা প্রতিপক্ষ সৈন্য।
তিতুমীর নিয়ে আমার একটা ভয় ছিল। একটা বইয়ে পড়েছিলাম, তিতুমীর ভীষণ সাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। আমি দেখতে চেয়েছিলাম আল আমিন সরল এটাকে কীভাবে ডিল করেন। আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি সাম্প্রদায়িকতার যে অভিযোগ ছিল তা লেখক তার সুন্দর বর্ণনা ও মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়ে উৎরে গেছেন লেটার মার্ক পেয়েছে। অন্ততঃ আমার কাছে তাই মনে হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্লটে লেখা উপন্যাসে যেমনটা হয়, তিতুমীরেও তাই হয়েছে। শুরুটা একটু স্লো। তবে অসাধারণ বর্ণনাশৈলীর কারণে তাল কেটে যাওয়ার মতো নয়। ক্যারেক্টার বিল্ডাপ করতে এই স্লোনেসের দরকার ছিল বলেও আমি মনে করি।
মোদ্দাকথা তিতুমীর: জান অথবা জমিন বাংলা সাহিত্যে অমর সৃষ্টি হয়ে থাকবে। লেখকের ভাষ্যমতে, তিতুমীরকে নিয়ে এমন কাজ আর হয়নি কখনও। লেখকের কথা সত্যি। এমন কাজ আসলেই হয়নি। অন্ততঃ আমার চোখে পড়েনি।
মেজর জানতেন, তিতুমীর শুধু কোনো ব্যক্তি-মানুষ নয়। সে হচ্ছে একটি আদর্শ। ব্যক্তি হত্যা করা যায়, কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করা যায় না। তবে জনসমক্ষে তার করুণ পরাজয় ও নির্মম মৃত্যু, সেই আদর্শকে মানুষের অন্তর থেকে ভুলিয়ে রাখে দীর্ঘকাল। কখনো সখনো শতাব্দিও পার হয়ে যায়।
উপন্যাস- তিতুমীর: জান অথবা জমিন ঔপন্যাসিক- আল আমিন সরল প্রকাশনী- ���িরোনাম প্রকাশন মুদ্রিত মুল্য- ৫৫০৳ পৃষ্ঠা- ৩২২ রেটিং: ৪.৯/৫
সতর্কতা: ধর্ম নিয়ে যাদের বাড়াবাড়ি আছে। তারা বিরুপ পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।
বইয়ের ট্যাগ লাইন হিসেবে 'জান অথবা জমিন' পুরোপুরি সার্থক। পাঠক বইয়ের যত গভীরে যাবে ততই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠবে এর সার্থকতা।
হাইস্কুলের ইতিহাস বইয়ে পড়েছি বাঁশের কেল্লার প্রতিষ্ঠা তিতুমীর কীভাবে ইংরেজ ও দেশীয় জমিদার জোতদারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। কীভাবে ঢাল তলোয়ার নিয়ে কামানের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। এইটুকু আমাদের প্রায় সবারই জানা। এর বাইরে তিতুমীর সম্পর্কে আমাদের বিশেষ করে আমার জানাশোনা একদমই কম। একেবারে নাই বললেও অত্যুক্তি হয় না।
আল আমিন সরল যখন তিতুমীর লেখার ঘোষণা দিলেন, তখন ভেবেছিলাম কী আর লিখবে নতুন করে? ইতিহাসে কতটুকুই বা লেখা আছে তিতুমীরকে নিয়ে। লেখকের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রেই জানি, তিতুমীর সম্পর্কে এ অঞ্চলের ইতিহাসবিদরা যা কিছু লিখেছেন, তার বেশীর ভাগই ব্রিটিশ নথী থেকে পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে।
আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, শত্রুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হিরোকে জাস্টিফাইড করা যাবে কিনা? লেখক উত্তরে বলেছিলেন, দেখা যাক না, কী হয়। পড়তে থাকি।
এরপর লেখক সাহেবের সাথে বিভিন্ন সময় কথা বলেছি জেনেছি তিতুমীরকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই একের পর এক পড়ে চলছেন তিনি। আর নোট করছেন তার নীল মলাটের নোটবুকে।
অবশেষে সব পরিশ্রম সার্থক করে এবার বইমেলায় প্রকাশ পেল তিতুমীর: জান অথবা জমিন।
আমি তিতুমীর নিয়ে রিভিউ লিখবো না। বায়াসড হওয়ার সম্ভবনা আছে। কারণ তিতুমীর ও লেখক দু'জনেই আমার কাছে আবেগের চেয়েও বেশীকিছু।
আমি শুধু তিতুমীর উপন্যাসে, তিতুমীরের স্ত্রী মায়মুনার চিঠি নিয়ে অল্প কথায় কিছু একটা লিখব।
'পত্রের শুরুতেই একটা বিষয় ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে, আপনার সেই অসীম সাহসিকতা কি আজও পাহাড়ের মতোই অবিচল আছে? কণ্ঠের সুললিতা, শীতল চোখের গভীর দৃষ্টি, বুকের ভেতর বয়ে চলা শান্ত নদী কি আগের মতোই আছে? নাকি আপনার কণ্ঠে এখন আগুন বর্ষণ হয়, শীতল ও গভীর চোখে জমা হয় টকটকে লাল রক্ত? নাকি বুকের শান্ত নদীতে উঠে উথাল-পাতাল ঝড়, ঝড়ের মধ্যে উঁকি দেয় দ্রোহ আর দ্রোহ? কেন এগুলো জিজ্ঞেস করছি জানেন? আমি কদিন থেকেই স্বপ্নে দেখি, আপনি বৈঠকখানার পাশে বড়ো আম গাছটার নিচে বাঁশের চরাটে বসে আছেন। আপনার কণ্ঠ থেকে কথার বদলে ঝরে পড়ছে আগুন। সমুদ্র-গভীর চোখ দুটো রক্ত লাল, যেন পুরো শরীরের সমস্ত রক্ত এসে দুই চোখে জমা হয়েছে। আপনার লোমশ বুকে মাথা রাখলে নাকে লাগে দ্রোহের ঘ্রাণ। এই ঘ্রাণ এতই মাদকতাপূর্ণ, আপনার কাছে ভালোবাসার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় আপনার গমগমে গলার সাথে গলা মিলিয়ে গর্জে উঠে বলি, ‘জান অথবা জমিন।’
এই পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর ও চির কল্যাণকর অর্ধের তার করিয়াছে, অর্ধেক তার নর। এই কথার বাস্তব প্রতিফলন চিঠির ঐ অংশটুকু। স্বামীর লোমশ বুকে মাথা রেখে যে নারী দ্রোহের ঘ্রাণ পায়, তার স্বামীর পক্ষে শুধু বাংলা কেন দুনিয়া জয় করে ফেলা সম্ভব। একজন নারী কতটা স্বাধীনচেতা ও স্বদেশপ্রাণ হলে স্বামীর কন্ঠে সুললিত প্রেমের কথা শোনার চেয়ে বজ্রকন্ঠ শোনার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করতে পারে। আমার মনে হয়েছে তিতুমীর তিতুমীর হয়ে উঠার পিছনে মায়মুনার অবদান সবচেয়ে বেশী। আমরা নারীরা জানি, স্বামীকে যদি বেঁধে রাখতে চাই৷ তাহলে দুনিয়ার কোন শক্তি নেই বাঁধন ছিঁড়ে তাকে মুক্তি দেয়। মায়মুনা মুক্ত করে দিয়েছিল বলেই তিতুমীর মুক্তি সংগ্রামের নায়ক হতে পেরেছিল।
লেখক চিঠিটা এতো আবেগ আর যত্ন করে লিখেছেন যে মনে হয়, আমাদের দেখা অদেখা সকল বিপ্লবীর স্ত্রী অথবা প্রেমিকার হৃদয় মন্থন করে শব্দ খুঁজে খুঁজে সাজিয়েছেন চিঠির প্রতিটা বাক্য।
'বিপ্লবীর সহধর্মিণী হওয়া যে কতটা কঠিন, আপনি তা জানেন? প্রতিটি মুহূর্তে মনের সাথে সমঝোতা করে চলতে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বুঝি মৃত্যু সংবাদ এলো! এই বুঝি সংবাদ এলো বুকের উপর জখম নিয়ে পানি পানি বলে চিৎকার করে চলছেন আপনি! আবার পরক্ষণেই মনে হয়, না মৃত্যু আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না, তলোয়ারের ফলা আপনার দেহ পর্যন্ত আসবে না, আপনার বুকে এসে ভীষণ বেগে এসে আছড়ে পড়বে না কামানের গোলা। এসব শরীরে নেওয়ার জন্য জন্ম হয়নি আপনার! আপনার জন্মই হয়েছে কপালে বিজয় তিলক পরার জন্য, বলিষ্ঠ হাতে বিজয়ের পতাকা উড়ানোর জন্য, ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার।'
বিপ্লব একদিনে মহিরুহ হয় না। শুরু হয় ঘর থেকে। ঘর মানেই নিজের আপন নারী। আমি বিশ্বাস করি, কোন নারী যদি কোন পুরুষের কাঁধে হাত রেখে বলে, যাও আকাশ থেকে নামিয়ে আনো লাল সূর্য। পুরুষটি দ্বিতীয়বার ভাববে না। সূর্য নামিয়ে আনা সম্ভব কি সম্ভব নয়, ভাববে না। শুধু ভাবতে আমার কাছে আছে সাহসী এক হাত। সেই হাতের স্পর্শে যেমন আছে বলিষ্ঠতা, তেমনি আছে অসীম মায়া আর ভরসা।
'জওহর কেমন আছে? সে কি আপনার চেয়েও সাহসী? আপনার চেয়েও তেজোদ্দীপ্ত? যুদ্ধের ময়দানে সে কি আপনার ছায়ার নিচে থাকে, নাকি আপনি তার? যুদ্ধের ময়দানে পুত্র হয়ে পিতার আশ্রয়ে থাকাটা লজ্জার─আমি আমার পুত্রকে লজ্জায় দেখতে চাই না। আপনার হৃদয়ের ধনকে সেই লজ্জা আপনি দেবেন না, এই অনুরোধ।'
একজন বীরে মা কেমন হয় আমি নিজ চোখে দেখেছি জুলাই আন্দোলনে। তিতুমীর পড়তে গিয়ে অনুভূতি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম। নিজের সন্তান দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আর তাকে লজ্জায় পড়তে দেখা যেকোনো মায়ের জন্যই লজ্জার। এই জায়গাটুকু পড়তে গিয়ে আমার গলা কেঁপে উঠেছে।।চোখের পাতা ভিজে গেছে। কতটা ত্যাগের বিনিময়ে আসে স্বাধীনতা।
'আপনার অপেক্ষায় থাকব। ফিরে আসুন, হয় গাজী নয়তো শহিদ; তবে স্বাধীনতা ছাড়া ফিরবেন না। আমার স্বামীর খালি হাত আমার সইবে না। ‘জান অথবা জমিন।’
প্রাণপ্রিয় স্বামীর চেয়েও যে স্বাধীনতার মূল্য বেশী তা মায়মুনার এই বাক্যে স্পষ্ট। লেখককে ধন্যবাদ আমাকে স্বাধীনতার মূল্য বোঝানোর জন্য। একজন নারীর দৃষ্টিতে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
আমি মনে করি, শুধুমাত্র এই এক চিঠির জন্যই তিতুমীর সংগ্রহে থাকা উচিত। কাল্পনিক চিঠি যে এমন আলোড়ন তুলতে পারে হৃদয়জুড়ে, গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে শ্বাস-প্রশ্বাস আগে জানতাম না। এর পুরো কৃতিত্ব লেখকের।
সবশেষে বলতে চাই, জানিনা তিতুমীর:জান অথবা জমিনের ভাগ্যে কি আছে। কতখানি পাঠকের মধ্যে আলোড়ন তুলতে পারবে। তবে যতটুকুই পারুক, তিতুমীরকে আমি বাংলা সাহিত্যের জীবনিভিত্তিক গ্রন্থে অনন্য সংযোজন হিসেবেই উল্লেখ করবো।