পাশ্চাত্য দর্শনের দৈত্য বলা চলে সক্রেটিসকে। তিনি একাই এমন একটি স্থান দখল করে আছেন যে তাঁর পূর্ববর্তী দার্শনিকদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষ প্রায় কিছুই জানে না। অনেকের ধারণা, পাশ্চাত্য দর্শন শুরু হয়েছে সক্রেটিস থেকে। সত্য হলো, সক্রেটিসের আগেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ছিলেন। তাঁরা জানতে চেয়েছেন মহাবিশ্বের সৃষ্টি কীভাবে হলো, প্রাকৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পেছনে রহস্য কী; এমনকি প্রশ্ন তুলেছেন তৎকালীন প্রচলিত ধর্মমত এবং দেব—দেবী সম্পর্কেও। বলা চলে সক্রেটিস—প্লেটো—অ্যারিস্টটলের দর্শনের ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন তাঁরা। সেইসব দার্শনিকের জীবন এবং দর্শন নিয়ে এই বই।
মেহেদী হাসান মিলনের জন্ম ১৯৯০ সালে, পাবনায়। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে। বর্তমানে তিনি রাজশাহী কলেজে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত রয়েছেন।
সক্রেটিস পূর্ব দার্শনিকদের সম্পর্কে এরচেয়ে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় এর আগে বাংলায় কেউ এতো ভালো বই লিখে নাই। দর্শন সম্পর্কে আগ্রহ থাকলে এই বইটা দিয়ে আপনার দর্শন যাত্রা শুরু করতে পারেন। প্রতিটা পয়সা উসুল। কিছু মুদ্রন-প্রমাদ বাদ দিলে বইটা পারফেক্ট হতে পারতো। লেখকের আগামীর পথচলা সুগম হোক। পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।
মেহেদি হাসান মিলনের লেখা ‘দর্শনের আদিপুরুষগণ’ বইটিতে সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিকদের চিন্তা ও তত্ত্ব সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। সাধারণত দর্শন জটিল ও বোধগম্য নয় বলে মনে করা হয়, কিন্তু এই বইয়ের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এটি দর্শনের শুষ্কতা দূর করে কথোপকথন ও ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে পাঠককে আকৃষ্ট করবে।
দর্শন মূলত জ্ঞান, যুক্তি ও চিন্তার বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করে। এটি মানুষের অস্তিত্ব, ন্যায়-অন্যায়, মহাবিশ্বের প্রকৃতি, বাস্তবতা, চেতনা এবং নীতিশাস্ত্রের প্রশ্ন তোলে এবং উত্তর খোঁজে। সহজভাবে বললে, আমরা কে? আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী? সত্য আসলে কী? ন্যায়-অন্যায়ের প্রকৃত সংজ্ঞা কী? আমাদের চারপাশের বিশ্ব কীভাবে গঠিত? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই দর্শনের কাজ। দর্শন কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দেয় না, বরং চিন্তার নতুন পথ দেখায়, যুক্তিনির্ভর হতে শেখায় এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে সহায়তা করে।
একজন মানুষের দর্শন জানা প্রয়োজন কারণ এটি তাকে নিজেকে বোঝাতে, চারপাশের বিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে এবং জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে সাহায্য করে। দর্শন ছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, কারণ দর্শনই যুক্তি, নৈতিকতা ও বাস্তবতা যাচাইয়ের শক্তি দেয়।
বইটিতে মূলত সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিকদের চিন্তাভাবনা ও দর্শন আলোচনা করা হয়েছে, যাদের চিন্তা-চেতনা আধুনিক দর্শনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা কীভাবে প্রকৃতি, অস্তিত্ব ও জ্ঞানের উৎস নিয়ে ভেবেছিলেন, তাদের মূল তত্ত্বগুলো কী ছিল— এসব বিষয় অত্যন্ত সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি এমন এক সময়ের দার্শনিকদের গল্প বলে, যখন দর্শন নতুনভাবে জন্ম নিচ্ছিল এবং প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টা চলছিল।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা মহাবিশ্বের মূল উপাদান সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ দিয়েছেন। দর্শনের এই ধারা শুরু হয়েছিল এক মৌলিক প্রশ্ন দিয়ে—"এই মহাবিশ্বের মূল উপাদান কী?" এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দার্শনিকরা একের পর এক নতুন মতবাদ উপস্থাপন করেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় পরমাণু তত্ত্বে।
বইটি শুরু হয়েছে মাইলেটাস স্কুলের তিন দার্শনিক থেলিস, অ্যানাক্সিম্যান্ডার ও অ্যানাক্সিমিনিস দিয়ে, যারা একে অপরের গুরু-শিষ্য ছিলেন। তারা প্রকৃতির মূল উপাদান (আর্কে) নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন এবং একে অপরের চিন্তাকে পরিমার্জন করেছেন।
থেলিস, যিনি পশ্চিমা দর্শনের জনক হিসেবে পরিচিত, বিশ্বাস করতেন পানিই সমস্ত কিছুর মূল উপাদান। তাঁর যুক্তি ছিল, পানি বিভিন্ন অবস্থায় পরিবর্তিত হতে পারে—তরল, কঠিন ও বাষ্পে রূপান্তরিত হতে পারে এবং প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পানি অপরিহার্য।
অ্যানাক্সিম্যান্ডার তাঁর চিন্তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে বলেন, প্রকৃতির মূল উপাদান পানি নয়, বরং "অপরিমেয় কিছু" (Apeiron), যা নির্দিষ্ট কোনো উপাদান নয়, বরং এক অনির্দিষ্ট ও অসীম শক্তি। তাঁর মতে, সমস্ত সৃষ্টি এই অসীম শক্তি থেকে এসেছে এবং আবার সেটিতে ফিরে যাবে।
অ্যানাক্সিমিনিস তাঁর গুরুর তত্ত্বের বিপরীতে বলেন, প্রকৃতির মূল উপাদান পানি বা অসীম কিছু নয়, বরং "বায়ু"। তাঁর যুক্তি ছিল, বায়ু ঘনত্ব ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিভিন্ন উপাদানে রূপ নেয়—সংকুচিত হলে কঠিন হয়, সম্প্রসারিত হলে আগুন হয়।
এরপর পিথাগোরাস সংখ্যাকে প্রকৃতির মূল কাঠামো হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, সংখ্যাই প্রকৃতির ভাষা, এবং প্রতিটি বস্তু, ধ্বনি বা কাঠামো গাণিতিক অনুপাতে সাজানো।
পরবর্তী সময়ে এম্পিডোক্লিস বলেন, কোনো একক উপাদান নয়, বরং চারটি মৌলিক উপাদানের সংমিশ্রণ থেকেই জগতের সৃষ্টি হয়েছে—মাটি, পানি, বায়ু ও আগুন। তিনি মনে করতেন, ভালোবাসা ও বিরোধের শক্তি (Love and Strife) এই উপাদানগুলোর সংমিশ্রণ ও বিচ্ছেদ ঘটায়।
এরপর অ্যানাক্সাগোরাস তাঁর "নস (Nous) বা মহাজাগতিক চেতনা" তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, পৃথিবীর সব বস্তু ক্ষুদ্র কণার সমষ্টি, তবে এসব কণাকে গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করে এক মহাজাগতিক চেতনা। এই "Nous" বা মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তাই সমস্ত জগতকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করে।
সবশেষে ডেমোক্রিটাস বলেন, বিশ্বের মূল কাঠামো হচ্ছে "Atomos" বা পরমাণু। তাঁর মতে, সবকিছু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত, যা আর বিভক্ত করা যায় না। এই পরমাণুগুলো চিরকাল বিদ্যমান এবং শূন্যস্থানের (Void) মধ্যে চলাফেরা করে বিভিন্ন বস্তু তৈরি করে।
থেলিসের পানির তত্ত্ব থেকে শুরু করে ডেমোক্রিটাসের পরমাণু তত্ত্ব পর্যন্ত চিন্তার এই ধারাবাহিকতা দেখায়, কীভাবে মানুষের জ্ঞান ধাপে ধাপে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়েছে। প্রথমে মানুষ ভেবেছিল, পানি বা বায়ুর মতো সাধারণ উপাদান থেকেই সবকিছুর সৃষ্টি হয়েছে। এরপর তারা উপলব্ধি করল, একাধিক উপাদানের সংমিশ্রণ এবং নিয়ন্ত্রণকারী শক্তির (Nous) প্রয়োজন। অবশেষে, ডেমোক্রিটাস এসে বললেন, সবকিছু আসলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণু দিয়ে তৈরি, যা অবিভাজ্য এবং চিরন্তন। এই চিন্তাধারার বিবর্তনই আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
বইতে উল্লেখ করা হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত দর্শনের দুই দার্শনিক হেরাক্লিটাস ও পারমেনিদিজের গল্প। হেরাক্লিটাস বিশ্বাস করতেন, "সবকিছু পরিবর্তনশীল"। তাঁর মতে, বিশ্বজগতে এক মুহূর্তের জন্যও কোনো কিছু স্থির থাকে না। পরিবর্তনই হচ্ছে প্রকৃতির একমাত্র ধ্রুব সত্য। তিনি বিখ্যাতভাবে বলেন, "একই নদীতে কেউ দু’বার পা রাখতে পারে না," কারণ নদীর পানি প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। অন্যদিকে, পারমেনিদিজ বিশ্বাস করতেন, "পরিবর্তন একটি বিভ্রম"। তাঁর মতে, বাস্তবে কিছুই পরিবর্তন হয় না, কারণ যা কিছু আছে, তা চিরকাল একই থাকবে। পরিবর্তন দেখা দেয় আমাদের উপলব্ধির ভুলের কারণে। তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, যদি কিছু পরিবর্তিত হয়, তবে তা অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বে পরিণত হতে হবে, যা অসম্ভব। এই দুটি বিপরীত দর্শন পরবর্তীতে দার্শনিক বিতর্কের ভিত্তি তৈরি করে। হেরাক্লিটাসের ভাবনা আধুনিক প্রক্রিয়াবাদ ও পরিবর্তনশীল দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করে, অন্যদিকে পারমেনিদিজের ভাবনা স্থিতিশীল বাস্তবতা ও বিমূর্ত চিন্তার জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বইটিতে গল্পের ছলে বলা আছে বিখ্যাত এবং রহস্যময় গণিতবিদ পিথাগোরাসের সংখ্যা ও সংগীতের দর্শন। পিথাগোরাস জগতের মূল উপাদানকে বস্তুগত দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বললেন, সংখ্যাই প্রকৃতির মূল কাঠামো। সংখ্যাই হচ্ছে প্রকৃতির ভাষা এবং প্রতিটি বস্তু, ধ্বনি বা কাঠামো গাণিতিক অনুপাতে সাজানো। তাঁর চিন্তাধারার মূল বিষয়গুলো হলো— ১. সংখ্যা ও বাস্তবতার সম্পর্ক: প্রতিটি বস্তু বা ঘটনা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। যেমন, সংগীতের মধ্যে গাণিতিক হারমোনি বিদ্যমান। ২. গোলক তত্ত্ব: তিনি বিশ্বাস করতেন, গ্রহগুলো নির্দিষ্ট গাণিতিক অনুপাতে সূ��্যের চারপাশে ঘুরছে এবং প্রতিটি গ্রহের গতিবিধি একপ্রকার মহাজাগতিক সঙ্গীত তৈরি করে। 3. আত্মার স্থানান্তর (Metempsychosis): তিনি মনে করতেন, আত্মা এক দেহ থেকে আরেক দেহে স্থানান্তরিত হয় এবং আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটতে পারে। পিথাগোরাসের এই দর্শন শুধু গণিতেই নয়, পরবর্তী ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক দর্শনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
বইটির সবচাইতে আকর্ষনীয় দু’টি গল্পের (একান্ত ব্যক্তিগত বাছাই) প্রথমটি হচ্ছে যখন দর্শনের সন্ধানে থাকা তরুণ সক্রেটিস দেখা করেন পারমেনেদিজ এবং জিনোর সাথে। ক্রিটোও এই আলোচনার সাক্ষী ছিলেন। সক্রেটিস তখনো পরিপূর্ণ দার্শনিক হয়ে ওঠেননি, কিন্তু এই সাক্ষাৎ ও বিতর্ক তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। পারমেনেদিজ যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে পরিবর্তন আসলে এক বিভ্রম, কারণ যদি কিছু পরিবর্তিত হয়, তবে তা অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বে চলে যেতে হবে, যা অসম্ভব। তরুণ সক্রেটিস এই তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং জিনো একের পর এক প্যারাডক্স দিয়ে তাঁর গুরু পারমেনেদিজের যুক্তি প্রতিপাদন করেন। সক্রেটিসের যুক্তিভিত্তিক চিন্তাধারার ভিত্তি তৈরিতে এই আলোচনার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যা পরে তাঁর দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে প্রতিফলিত হয়।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে পিথাগোরাসের শিষ্য ফিলোলাইসের সাথে পারমেনেদিজের শিষ্য জিনোর বিতর্ক। জিনো মূলত তাঁর বিখ্যাত "জিনোর প্যারাডক্স" (Zeno's Paradoxes) এর জন্য পরিচিত, যা গাণিতিক ও দর্শনীয় চিন্তার জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে ফিলোলাইস প্রথম ব্যক্তিদের মধ্যে একজন, যিনি পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র বলে অস্বীকার করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে একটি "কেন্দ্রীয় অগ্নি" (Central Fire) মহাবিশ্বের কেন্দ্র। যদিও এটি আধুনিক সূর্যকেন্দ্রিক (Heliocentric) মডেলের মতো নয়, তবুও এটি বিশ্বজগতের কেন্দ্র হিসেবে পৃথিবীকে না রাখার প্রথম দার্শনিক প্রচেষ্টা ছিল।
বইটিতে লেখক শুধু দার্শনিকদের তত্ত্ব-ই তুলে ধরেনি, বরং দর্শনের বিকাশ এবং এর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও দেখিয়েছে। লেখক জটিল বিষয়গুলোকে গল্পের মতো করে বলেছেন, যা পাঠককে আকৃষ্ট করে এবং মানসিক অনুরণন সৃষ্টি করে। এটি দর্শন বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য একদম প্রাথমিক পাঠ হিসেবে চমৎকার, বিশেষ করে যদি কেউ একাডেমিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে সহজবোধ্য আলোচনায় দর্শন বুঝতে চান। বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভাষা ও বর্ণনারীতি, যা দর্শন নিয়ে আগ্রহী যে কোনো পাঠকের জন্য উপভোগ্য।