যেকোনো দেশের কবিতা,সে ইংরেজিই হোক,সে ফরাসিই হোক,কিংবা বাংলাই হোক;- সে তার নিজস্ব পরিমণ্ডলের প্রভাবে প্রভাবিত হতে বাধ্য। একটি দেশের একটি বিরাট রকমের মানসিক লাবণ্যের স্মারকচিহ্ন হচ্ছে সেই দেশের সাহিত্য-শিল্প তথা কবিতাও। পরিবেশের প্রভাবে সেই কবিতা বারবার চেহারা বদল করে। কখনো বিপ্লব এসে তাকে বলীয়ান শব্দসম্ভার উপহার দিয়ে যায়। কখনো রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা তাকে ব্যথিত আঁধারের বর্ণমালা করে। কখনো দুর্ভিক্ষে সে দীন,প্লাবনে সে প্রলয়চিহ্নগত। কখনো আবার মহামারির মৌলিক জরার আঁচড়ে আচমকা কেঁপে ওঠে তার শরীর। এক একবার এক এক রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয় আর সেই পরিস্থিতির বীজ ভেঙে নতুন চারার মতো নতুন পাতা এবং শিকড় জড়িয়ে বেরিয়ে আসে নতুন ধরনের কবিতা। বাংলাদেশেও এই রকম সাতপাঁচ পরিস্থিতির হরহামেশা আবহাওয়ায় কবিতার স্বভাব থেকে শুরু করে তার ভাষা ব্যবহার,প্রকরণগত শৈলী এবং আঙ্গিক-প্রকরণও পাল্টে গেছে বারবার। কখনো সেই কবিতায় রাজনৈতিক শোষণ থেকে বেরিয়ে আসার বিদ্রোহী চিহ্ন পড়েছে। কখনো কম্পমান কৃষ্টির দুর্ভিক্ষ তাকে দীনতায় আচ্ছন্ন করার সঞ্চারে হয়েছে উজ্জীবিত।
কবি আবুল হাসান ছিলেন ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশের প্রধান কবিদের একজন।
১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার বর্ণিগ্রামে তাঁর জন্ম। এটি ছিল তাঁর মাতুলালয়। পৈতৃক নিবাস ছিল পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের ঝনঝনিয়া গ্রামে। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। নাম আলতাফ হোসেন মিয়া। আবুল হাসানের প্রকৃত নাম ছিল আবুল হোসেন মিয়া। কিন্তু আবুল হাসান নামেই তিনি লেখালেখি করতেন, আর এ নামেই স্মরণীয় হয়ে আছেন।
আবুল হাসান এসএসসি পাস করেন ১৯৬৩ সালে ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে। তারপর বরিশালের বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজিতে অনার্স পড়ছেন আর পাশাপাশি চলছে কবিতা লেখা, সাহিত্যসংগ্রাম।
এ সময়ই তাঁর সাহিত্য-চেতনা ও রাজনৈতিক-চেতনা বিকশিত হয়ে ওঠে। গণমানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেন তিনি। ছাত্র হিসেবে ছিলেন মেধাবী। কিন্তু অনার্স পরীক্ষা দেননি। ১৯৬৯ সালে যোগ দিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা বিভাগে। সাংবাদিকতায় মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর ছিলেন গণবাংলা (১৯৭২-৭৩) এবং দৈনিক জনপদের (১৯৭৩-৭৪) সহকারী সম্পাদক। মাত্র ২২ বছর বয়স থেকেই তিনি ছিলেন খ্যাতিমান কবি, ঢাকা শহরের আলোচিত তরুণ। ব্যক্তিজীবনেও স্বকীয়তায় ভাস্বর প্রেম, দ্রোহ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে। ১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম হন তিনি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ রাজা যায় রাজা আসে, ১৯৭৪-এ যে তুমি হরণ করো এবং ১৯৭৫-এ সব শেষে পৃথক পালঙ্ক।
কবিতায় বলিষ্ঠ মানুষটি শারীরিকভাবে ছিলেন কিছুটা দুর্বল। হৃদযন্ত্রের সমস্যা ছিল তাঁর। অসুস্থতা তাঁকে ক্রমেই নিয়ে যেতে থাকে মৃত্যুর দিকে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর কবিতা ও ভালোবাসা ছেড়ে তাঁর যাত্রা অনন্তলোকের দিকে।
তাঁর কাব্যনাট্য ওরা কয়েকজন (১৯৮৮) এবং আবুল হাসান গল্প সংগ্রহ (১৯৯০) প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর অনেক পর। কবিতার জন্য তিনি মরণোত্তর বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৫) এবং একুশে পদক (১৯৮২) পেয়েছেন। আবুল হাসানের কবিতা আধুনিক বাংলা কবিতায় নিয়ে এসেছিল নতুন সড়ক, নতুন আবহ। আধুনিক নাগরিক, মানুষের নিঃসঙ্গতা, যন্ত্রণা, মৃত্যু চেতনা, বিচ্ছিন্নতা তাঁর কলমে পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
কবি আবুল হাসান অনেক অবিস্মরণীয় কবিতার জনক। তিনি আজও জনপ্রিয়, বহুল পঠিত।
আবুল হাসান মূলত একজন কবি হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিত, পঠিতও বটে। তবে তিনি পেশা হিসেবে বেশ কয়েকবছর সাংবাদিকতা করেছেন।
সাংবাদিক জীবনে বিভিন্ন সময়ের লেখা প্রবন্ধ ও উপসম্পাদকীয় রচনার সংকলন হচ্ছে 'আপন ছায়া'।
খুব সম্ভবত ১৯৬৯ সালে দৈনিক 'ইত্তেফাক' পত্রিকায় বার্তা বিভাগ থেকে সাংবাদিকতা শুরু করেন। এছাড়াও ১৯৭২ সালে 'গণবাংলা' পত্রিকায় চাকরি করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক জনপদ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময়ে 'আপন ছায়া' এবং 'খোলাশব্দে কেনাকাটা' শিরোনামে দুটি উপসম্পাদীয় কলাম লিখতেন। ১৯৭৪ সালের জুনের শেষার্ধে তিনি আল মাহমুদ সম্পাদিত দৈনিক গণকণ্ঠে সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে নভেম্বর ১৯৭৪ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এই পত্রিকায় তিনি 'আড়ালে অন্তরালে' এবং 'বৈরী বর্তমান' শিরোনামে পৃথক দুটি উপসম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। সেই সঙ্গে লিখেছেন 'ফসল বিলাসী হাওয়ার জন্য কিছু ধান চাই' শীর্ষক একটি উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ। দৈনিক জনপদে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আরও চারটি প্রবন্ধ।
এই প্রবন্ধ ও উপসম্পাদকীয় রচনায় কবি আবুল হাসানের সাহিত্য-মানসের পাশাপাশি সমাজ-রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। খুব শক্তভাবেই দেশ, সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। কখনও প্রতিকারের উপায় বাতলে দিয়েছেন।