ভারতীয় ক্রিকেট দল চলেছে পাকিস্তান-সফরে। দুই দেশের প্রশাসন মরিয়া হয়ে উঠেছে সফরটিকে সন্ত্রাস এবং 'বেটিং' নামক ভয়ানক বিপদের হাত থেকে মুক্ত রাখার জন্য। তারই সঙ্গে কিছু দুর্ধর্ষ দুশমন এই সফরকে ব্যবহার করতে চাইছে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ককে চিরতরে বিষিয়ে দেওয়ার জন্য। তাদের মধ্যে রয়েছে 'এস্' সেকশনের প্রধান— অর্থাৎ মেজর এবং তার অতি-বিশ্বস্ত কয়েকজন। আর গত ষড়যন্ত্রের মাশুল গুনতে বাধ্য হওয়া মানুষদের তরফে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন অদিতি চৌহান। এই ভয়ানক ঘোলা জলে নিজস্ব মাছ ধরতে নেমেছে সি.আই.এ। আটের দশকে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া আফগান, সন্ত্রাসবাদী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে যোগসূত্র হয়ে কাজ করা মানুষজন, 'ডি' কোম্পানির মাথা, অবসরের মুখে দাঁড়ানো সি.বি.আই প্রধান— কে নেই সেই অদ্ভুত খেলার ময়দানে? কিন্তু শেষে কী হল? ভারতের সফর কি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হল? অদিতি কি পারলেন বদলা নিতে? 'শয়তানের মা' নামক দুর্ধর্ষ পলিটিক্যাল-কাম-স্পোর্টস্ থ্রিলারটি পড়ার পর আরও বহু পাঠকের মতো আমিও অপেক্ষায় ছিলাম তার পরের পর্বটির জন্য। এই বইটির কালগত তথা ভূ-রাজনৈতিক ব্যাপ্তি গত উপন্যাসের থেকেও বড়ো। এতে লেখককে বহু তথ্য, তত্ত্ব এবং ইতিহাস গুঁজে দিতে হয়েছে চরিত্রদের কার্যকলাপ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু গতিময় লেখনী এবং বিষয়বস্তুর আকর্ষণীয়তার কারণে এই অতিবৃহৎ পরিসরটিকেও মাথায় রেখে শুরু থেকে শেষ অবধি প্রায় ছুটে যেতে বাধ্য হন পাঠক। এখানেই এই বইয়ের সার্থকতা। তবে দুটি অনুযোগ থেকে গেল। প্রথমত, এই বইয়ের ক্রিকেট-বিষয়ক অংশটা, 'পরিশিষ্ট' অংশের ব্যাখ্যা সত্বেও, রীতিমতো অনাবশ্যক মনে হয়েছে। আমার মতে, স্পোর্টস্ থ্রিলারের বদলে পলিটিক্যাল থ্রিলার হিসেবেই এই বইয়ের মূল আবেদন ও সার্থকতা। দ্বিতীয়ত, এতে পর্ব-বিভাজন করে, অথচ অ-সরলরৈখিক কালানুক্রম অনুসরণ করে ব্যাপারটাকে কিঞ্চিৎ জটিল করে তোলা হয়েছে। প্রথম উপন্যাসটিতে এই ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হইনি। আর হ্যাঁ, এমন একটা বইয়ে ম্যাপ আর আরও বেশ কিছু অলংকরণ থাকা অত্যন্ত জরুরি ছিল বলেই আমার মনে হয়েছে। তবে এগুলো আমার ব্যক্তিগত অভিমত। পাঠানুভূতির সারাৎসার হিসেবে এটিই বলব, যদি রাজনীতি ও রোমাঞ্চ-মিশ্রিত টানটান উপন্যাস পড়তে চান, তাহলে এই বইটি আপনার ভালো লাগবে। অলমিতি।
◻️"এটা কোনও নীল নকশা নয়। এটা লাল নকশা। যে নকশা আঁকা হয়েছে রক্তে ভেজা তুলিতে। যে নকশা দু'দেশকে ডুবিয়ে দেবে রক্তের প্লাবনে!"
◻️এ বার রণাঙ্গন পাকিস্তান। ২০০১। ক্রিকেটের ম্যাচ গড়াপেটার তদন্তে নেমে সিবিআই জয়েন্ট ডিরেক্টর অদিতি চৌহান হদিশ পেয়েছিলেন এক ভয়ঙ্কর চক্রান্তের। ওয়াঘার ও-পারে জন্ম নেওয়া চক্রান্ত অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছিল তাঁর থেকে। প্রতিশোধের আগুনটা সে দিন থেকেই জ্বলছিল অদিতির মনে। ২০০৪। ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পরভেজ মুশারফ সিদ্ধান্ত নেন, ভারতীয় ক্রিকেট দল ঐতিহাসিক এক সিরিজ খেলতে যাবে পাকিস্তানে। ক্রিকেটের বাইরেও কী ঘটেছিল সেই সফরে? সফর শুরু হওয়ার মাস কয়েক আগে সিআইএ-র কাউন্টার টেররিজম সেন্টারে কেন একটা গোপন বৈঠক হয়েছিল ইসলামাবাদ স্টেশন চিফ আর ডেপুটি ডিরেক্টরের মধ্যে? কেন লাহোরের রাস্তায় দুই পাক যুবকের হত্যাকে কেন্দ্র করে ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় আইএসআই এবং সিআইএ-র? আফগানিস্তানের স্পিনগর পর্বতমালা থেকে পেশোয়ারের রাস্তা। জালালাবাদে মুজাহিদিনের ঘাঁটি থেকে লাহোরের গদ্দাফি ক্রিকেট স্টেডিয়াম। সিআইএ-র গোপন অপারেশন থেকে লস্কর-ই-তৈবার চক্রান্ত। স্পোর্টস থ্রিলার 'শিকারের সন্ধানে' পাঠকদের নিয়ে যাবে এক ভয়ঙ্কর গোলকধাঁধায়। যেখানে একা আটকে অদিতি চৌহান।
◻️'শয়তানের মা' স্পোর্টস থ্রিলার হিসেবে শুরু হলেও, এই দ্বিতীয় পর্বে কাহিনী পলিটিক্যাল-ক্রাইম- এস্পিওনাজ থ্রিলারের আঙিনায় বিস্তৃত। বইটির ভূ-রাজনৈতিক ব্যাপ্তিও প্রথম পর্বের থেকে বেশি। এতে লেখককে বহু তথ্য, তত্ত্ব এবং ইতিহাসের অবতারণা করতে হলেও গতিময় লেখনী এবং বিষয়বস্তুর আকর্ষণীয়তার কারণে কখনোই পাঠকের একঘেয়েমি মনে হয়না। অসাধারণ প্লট পয়েন্টিং এবং লেখনীর মাধ্যমে প্রত্যেকটা ঘটনা, প্রত্যেকটি চরিত্রের মোটিভেশন, প্রত্যেকটি অ্যাকশন সিকোয়েন্স অসাধারণ দক্ষতার সাথে পাঠকদের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন লেখক, পাঠককে খুব সহজেই এই দুঃসাহসিক অভিযানের অংশীদার করে ফেলতে পেরেছেন। শুধু একটা ছোট্টো কথা, এই পর্বের প্রচ্ছদটি হয়তো আরেকটু ভালো হতে পারতো। তবে হ্যাঁ, থ্রিলারপ্রেমী হিসেবে বর্তমান সময়ের আমার অন্যতম পছন্দের তালিকায় অবশ্যই এই বই ও অদিতি চৌহান থাকবে। আপনারা পড়ে দেখুন, হয়তো আপনাদের ক্ষেত্রেও তাই হলো।
শিকারের সন্ধানে ( শয়তানের মা দ্বিতীয় পর্ব) কৌশিক দাশ শপিজেন ৩২০ টাকা
থ্রিলার গল্প এখন অনেকেই লেখেন, কিন্তু স্পোর্টস থ্রিলার? বিশেষ করে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে লেখা এমন থ্রিলার আগে কোনওদিন পড়িনি। “শয়তানের মা” আর “শিকারের সন্ধানে” দুটো বই শেষ করে মনে হয়েছে, স্পোর্টস থ্রিলার, স্পাই স্টোরি, দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভারত-পাক রাজনীতি, আইএসআই আর ক্রিকেট বেটিং এই সবকিছুকে একসাথে এমনভাবে মিশিয়েছেন লেখক, যেন আলাদা আলাদা ঘরানা নয়, একটাই বড় ম্যাচের ভেতরে সব ফরম্যাট একসাথে চলছে। সৌরভ গাঙ্গুলী যেমন স্পিনারকে স্টেপ আউট করে ছয় মারতেন সেভাবেই অনেক জায়গায় লেখক লেখার মধ্যে টুইস্টে ছক্কা হাঁকিয়েছেন, আবার কোথাও রোহিত শর্মার পুল শটের মতো অনায়াসে, অথচ নিশ্চিত ছক্কা; আর প্রয়োজন হলে একেবারে রাহুল দ্রাবিড়ের মতো ধৈর্য ধরে উইকেটে পড়ে থেকে চরিত্র আর প্লটকে গড়ে তুলেছেন, যাতে পরের ঝড়টা আরও জোরে লাগে। ক্রিকেট বেটিংয়ের অন্ধকার জাল থেকে ভারতীয় ক্রিকেটকে বাঁচানো, তার পাশাপাশি আইএসআই এর কূটচাল বানচাল করে সম্ভাব্য জঙ্গিহানা রুখে দেওয়া, এই দুই লড়াই তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে সমান্তরালে টেনেছেন, যেখানে পাকিস্তানি এজেন্ট আর ভারতীয় এজেন্টদের টক্করটা ঠিক হাইভোল্টেজ ইন্ডিয়া পাক ম্যাচের মতো; প্রতি ওভারে নতুন কৌশল, নতুন ঝুঁকি, আর নতুন উত্তেজনা। মোল এই শব্দটা যে শুধু গল্প বা সিনেমার ভেতরেই আটকে নেই, বাস্তবেও তার অস্তিত্ব কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেই বোধটা এই গল্পে লেখক আবার নতুন করে ঝাঁকুনি দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন। দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় সীমান্ত পেরিয়ে আসেনা, দেশের ভেতরেই থাকে; ক্ষমতা, লোভ আর বিশ্বাসঘাতকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই মোলদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে দেয়, রাষ্ট্রের ভিতর থেকে রাষ্ট্রকে ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।। শেষ পাতা বন্ধ করেও মুখ্য চরিত্র অদিতি চৌহান আর তার টিমের চরিত্রগুলো মাথা থেকে সহজে সরে না। খবরের কাগজে ম্যাচ ফিক্সিং, সীমান্ত উত্তেজনা বা সন্ত্রাসের খবর দেখলেই এদের উপস্থিতি যেন বাস্তবের সঙ্গে মিশে যায়। গল্পের শেষে ভারতীয়দের জয় যে���ন তৃপ্তি দেয়, তেমনই একটা অস্বস্তিও রেখে যায়... এই জয় কতটা ভঙ্গুর, আর দেশের নিরাপত্তা, ক্রিকেটের সম্মান ও আমাদের স্বাভাবিক জীবন কতটা পাতলা সুতোয় ঝুলে আছে, সেটা নতুন করে ভাবায়। তাই বইটা শুধু একটা থ্রিলার হয়ে থামে না; পড়া শেষেও মনে হয়, শেষ বলটা জিতেছি ঠিকই, কিন্তু পরের ম্যাচের চাপ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।।
কিছুদিন আগে লেখকের অদিতি চৌহান সিরিজের প্রথম বইটি "শয়তানের মা" পড়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলাম। তখন থেকেই লেখকের প্রতি high expectations ছিল, এবং লেখক আশাহত করেননি। এটি অদিতি চৌহান ট্রিলজির দ্বিতীয় বই।
এই পর্বে শুরু থেকেই টানটান উত্তেজনা। কারণ এবার গল্পের পটভূমি পাকিস্তান ও আল-কায়দার শক্ত ঘাঁটি—জালালাবাদ। লড়াই এবার মূলত CIA-এর এক অংশ ও মেজরের মধ্যে, যদিও এটি ছিল এক ছায়াযুদ্ধ। CIA সরাসরি মেজরের মুখোমুখি হতে চায়নি, তাই কাজে লাগানো হয় অদিতিকে এবং আফগানিস্তানের এক অসাধারণ মহিলা যোদ্ধা—আসমান ঘিলজীকে।
গল্পটি শুধুমাত্র একটি স্পাই থ্রিলার হয়েই থেমে থাকেনি। লেখক আফগানিস্তানের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছেন, যা গল্পে অন্য মাত্রা যোগ করেছে। আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লেগেছে মাইকেল উড চরিত্রটি এবং তার twisted thought process।
লেখকের ভাষা সাবলীল। সত্যি বলতে, এটি একটি page-turner। তবে কিছু জায়গায় একটু পরিমার্জন করা যেত বলে মনে হয়েছে। যেমন: ১. লাল ডায়রি: মূল গল্পে নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেনি। অলংকরণের অংশ হিসেবে থাকলেও ক্ষতি হতো না। ২. ফ্ল্যাশব্যাক: কিছু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ জোড়া লাগানো হয়েছে, তবে সেগুলো সহজেই অনুমেয়। তাই আলাদা করে ব্যাখ্যা না দিয়ে পাঠকের উপর ছেড়ে দিলে আরও চমৎকার হতো।
প্রচ্ছদটি একটু সাধারণ মানের। হার্ডবাউন্ড। তবে ডাস্ট কভারটি আঠা দিয়ে লাগানো—খোলা যায় না। এবারের বইয়ে কিছু অলংকরণ যোগ করা হলেও ছবিগুলো অতী ও ব সাধারণ মানের। প্রিন্টিং ও কাগজের মান ভালো। বিশেষ প্রশংসনীয় হল—বইয়ের সঙ্গে দেওয়া কাস্টমাইজড বুকমার্ক। মুদ্রণপ্রমাদ চোখে পড়েনি।