MOHAMMAD NAZIM UDDIN (Bengali: মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন) is a writer and Translator of more than 26 novels..His original works are NEMESIS, CONTRACT, NEXUS, CONFESSION,JAAL, 1952: nichok kono number noy, KARACHI, RABINDRANATH EKHANE KOKHONO KHETE ASENNI and KEU KEU KATHA RAKHE. These six Thriller novels are highly acclaimed by the readers.
২০২৪ শেষ হলো ২৪ এর জুলাই দিয়ে। এই সংকলনের নাম দিয়েছি আমি স্মৃতিরসংকলন। বিভীষিকাময় এক সময় পার করে এসেছি আমরা যার ফলে দেশে নতুন সূর্য উঠেছে। সেই সূর্য উঠার আগে অন্ধকারে নিয়ে গিয়েছে অগণিত প্রাণ। ফ্যাসিবাদের আক্রোশ কেমন হতে পারে তা আমরা সবাই দেখেছি। সেই সব দৃশ্যগুলো সাজিয়ে তুলে ধরা হয়েছে 'জুলাইর গল্প' বইটায়। প্রত্যেকটা গল্প আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে এনেছে। নাজিম উদ্দিন ভাইয়ের গল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। সাশ্রয়ী দামে প্রডাকশনে নতুনত্ব এনেছে বাতিঘর। সাথে ১৬ পাতায় আছে উত্তাল সময়ের স্থিরচিত্র অনেকগুলো। স্মৃতিগুলো রাখতে নিতে পারেন বইটা।
ছোট থেকে সমাজ বইয়ে গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে পড়তে বড় হয়েছি। সবসময়ই ভাবতাম, ইস এমন বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনের অংশ যদি আমিও হইতে পারতাম! আফসোস হইত খুব। আর আল্লাহ সেই আফসোসটা পূরণ ও করে দেন। আমি একটা আন্দোলনের সাক্ষী হতে পেরেছি যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিহাস। তারাও হয়ত তাদের সমাজ কিংবা ইতিহাস বইয়ে ২৪এর আন্দোলনকে খুঁজে পাবে। ২৪ সারাজীবন মনে রাখার মতন একটা বছর। আমরা এক স্বৈরশাসককে দেশ থেকে ভাগাইছি পিছে লাথি মেরে, এর থেকে সেটিস্ফাইড ইভেন্ট আর কী হতে পারে? মানুষের মস্তিষ্ক অনেক জটিল, সময়ের বিবর্তনে মানব স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় পুরাতন অনেক স্মৃতি। ২৪ এর স্মৃতি যেন বাঙালির মন থেকে হারিয়ে না যায় সেজন্য, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন দারুণ এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বাতিঘর প্রকাশনীর অনেক নবীন লেখকদের একত্রিত করে তাদের স্মৃতি থেকে লেখা জুলাই কেন্দ্রিক গল্প গুলাকে দুই মলাটের মধ্যে আবদ্ধ করেন এবং নাম দেন "জুলাইয়ের গল্প"। বইটা পড়া শুরু করার পর, এখানের ঘটনা অধিকাংশই মনে হচ্ছিল আমার নিজের খুব পরিচিত। কারণ আন্দোলনের সময়টায় মর্মান্তিক যা যা ঘটেছে সবকিছুই বইয়ের গল্পের চরিত্রগুলা নিজেদের মতন করে তুলে ধরেছে। বইটা পড়তে গিয়ে একই সাথে খুব নস্টালজিক হয়ে যাচ্ছিলাম এবং পাশাপাশি তীব্র ঘৃণা জন্মাচ্ছিল স্বৈরাচারী হাসিনার প্রতি। কিছু কিছু গল্প পড়তে পড়তে মুখে থুথু এসে যাচ্ছিল ফ্যাসিস্টের নির্মমতা দেখে। বইটিতে সর্বমোট ১৫ টি গল্প রয়েছে। এত দারুণ করে লেখকরা পুরা সময়টার প্রেক্ষাপটকে কাগজের পাতায় আবদ্ধ করেছেন, এটাকে আমি গল্পগ্রন্থ না বলে টাইম মেশিন বলব কারণ প্রতিটা গল্পই বারবার আমাকে জুলাই-আগাস্টে নিয়ে যাচ্ছিল। ২৪ শেষ হয়ে গেলেও, ২৪ এর উত্তাপ চিরদিন জীবিত থাকবে এই বইয়ের মাঝে।
“জুলাইর গল্প” এই শহরে একদিন জুলাই এসেছিল। বিপ্লব এসেছিল দ্বিগুণ বিক্রমে। রক্তে রঞ্জিত গিয়েছিল রাজপথ। জুলাইকে করে তুলছিল অপ্রতিরোধ্য। যে জুলাই মাথা নত করার নয়, যে জুলাই মানুষের রক্তে ঢেউ তোলে। আলোড়ন ওঠে মনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা সাহসে। আর এই সাহসের জোয়ার যখন একবার শুরু হয়, তখন স্বৈরাচার হয়ে ওঠা প্রবল ক্ষমতাও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। একসময় পতন অনিবার্য।
“জুলাইর গল্প” মূলত এমন কিছু গল্পের সংকলন, যা সেই উত্তাল জুলাইকে ধরে রাখবে। মানুষের স্মৃতিশক্তি দূর্বল। একসময় এই স্মৃতির পাতায় মরচে পড়ে। ধূসর হয়ে যাওয়া স্মৃতিতে তখন আর আলোড়ন ওঠে না। তাই সময়টাকে ধরে রাখতে হয়। গল্পের ছলে জীবিত রাখতে হয় সেই উত্তাল মুহূর্তগুলোকে, যা বদলে দিয়েছিল পুরো একটি দেশের ভবিতব্য।
বইটিতে মোট পনেরোটি গল্প রয়েছে। প্রতিটি গল্প আপনাকে মনে করিয়ে দিবে সেই সময়টার কথা। এখানে রক্ত আছ, আছে সাহস। মানবিকতার গল্প এখানে মানুষ ও দানবের মধ্যে পার্থক্য গড়ে তোলে। বইটিতে ঠিক নতুনত্ব কিছু নেই। পড়তে গিয়ে বারবার মনে হবে, এসব গল্প তো আমি জানি। এই নিয়েই তো আমাদের জুলাই বিপ্লব। তাহলে এই বইটির বিশেষত কী?
বইটির মূল আকর্ষণ উপস্থাপনা। উপস্থাপনার উপর নির্ভর করে এক সাধারণ গল্পও অসাধারণ হয়ে ওঠে। জানা গল্প আরো বেশি ভালো লাগতে শুরু করে। বইটির প্রতিটি গল্পের সাথে তীব্র আবেগ জড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছিল যেন আবার সেই সময়টাতে ফিরে গিয়েছি। আবারও সেই ইন্টারনেটবিহীন দিনগুলিতে হাজারো উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা। মনের মধ্যে উথাল পাথাল ঢেউ। হিংস্রতা ও নির্মমতার যে প্রদর্শন সেই সময়টা দেখেছিল, তার সাথে কোনো কিছুর তুলনাও হয় না!
বইটির এতগুলো গল্পের মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে দুইটি গল্প। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের “রানী ইলিশ” আর তানিয়া সুলতানার “পথের খোঁজে”। হাসান ইনামের গল্পগুলো পড়ে মনে হয়েছে, তিনি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই গল্প দুটো লিখেছেন। তাছাড়া প্রতিটি লেখকের গল্পই যেন জুলাইয়ের সেই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি গল্পই যেন লেখকের ভাবগতিকে নিয়ে যায়, নিজেদের ভাবনার প্রতিফলন ঘটায়।
“রানী ইলিশ” গল্পটি আপনাকে মনে করিয়ে দিবে স্বৈরাচার এক সরকার প্রধানের হিংস্রতা। তার বর্বরতা অতীত, বর্তমান মিলিয়ে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। আবেদ আলী নামের এক সিএনজি চালকের দৃষ্টিতে উত্তাল জুলাইকে যেন লেখক ধরে রেখেছেন এক অমায়িক অনুভূতিতে। যেই অনুভূতির মাঝে রাগ আসে, ক্ষোভ থাকে। আক্ষেপ ঝরে পড়ে কিংবা মানুষকে সাহায্য করার আত্মতুষ্টি ঘিরে ধরে। কিন্তু দিন শেষে হারানোর বেদনা, সব হারিয়ে কিছু পাওয়ার তৃপ্তি। পুরো জুলাই বা তারও আগের পনেরো বছর ধরে যে অনাচার ঘটে চলেছিল, তারই প্রতিবিম্ব “রানী ইলিশ” গল্পটি।
অন্যদিকে “পথের খোঁজে” গল্পটি যেন বয়ান দেয় নতুন এক পথের। যে পথে মুক্তি মিলবে। প্রিয়জনকে হারিয়ে নিজেও সেই যুদ্ধে শামিল। এই জুলাইয়ে এমন অনেক মায়ের সন্তান রাস্তায় নেমে এসেছিল, যারা মায়ের আঁচলে বাঁধা থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে। কিন্তু মনের মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিতে পারে না। নাম না জানা অসংখ্য ভাইবোনের রক্ত তাদের রক্তকেও আন্দোলিত করে। ফলে ওরাও লুকিয়ে বের হয়ে পড়ে। তারপর বিপ্লব, নাহলে একদিন হারিয়ে যাওয়া। মায়েরাও তখন ছেলেমেয়েদের জন্য রাস্তায় নামে। সাহস বিষয়টা ছোঁয়াচে। একজন থেকে আরেকজন, এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার অলিগলি থেকে রাজপথে, শহর থেকে গ্রামে। উত্তাল হয়ে ওঠে সময়।
ওয়ালিদ প্রত্যয়ের “লুব্ধক” গল্পটিও ভালো লেগেছে। কী তীব্র আতঙ্কে কেটেছে প্রতিটি রাত! ঘুমানোর আগে মনে হতো, এই বুঝি ধরপাকড় হবে। আমিও এই তালিকা থাকতে পারি। নিজের ভিন্ন কারণে শরীরে আঘাতের চিহ্নকে আন্দোলনের সাথে মিলিয়ে অবমাননা, অসম্মান। মুখে ধর্মের যেকোনো কথাকেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা। ফোনে কিছু পেলেই অপমান, অপদস্ত করা দানব পুলিশের দল।
বইটিতে এসেছে আবু সাঈদ, ইয়ামিন, মীর মুগ্ধদের কথা। এসেছে হেলমেট বাহিনীর ভয়াবহতার গল্প। পুলিশের জনগণের বন্ধু হয়ে ওঠার পরিবর্তে শত্রু হয়ে ওঠার গল্পও এখানে অমূলক নয়। আছে জেলের গল্প, মানুষের আবেগ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। যা ৫ই আগষ্ট কিংবা ৩৬শে জুলাই সর্বাত্মকভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। এখানে আপনি গল্প পাবেন সেই নেতার, যে স্বৈরাচারের কথায় সব করলেও তাদের নেত্রী তাদেরকেই অকূল পাথারে ফেলে পগার পার। তাদের এই গল্পে তারা অবাঞ্ছিত। তারপরও বেঁচে থাকে জন্য দেশ ছাড়ার যে তোড়জোড��, সেখানে তাদের পক্ষে থাকার চেয়ে বিপক্ষে থাকার মানুষের সংখ্যাই বেশি।
এখানে আপনি পাবে ৩৬শে জুলাইয়ের পরের ঘটনাও। লাইলাতুল গুজবের রাত শুরুতে উৎকণ্ঠার হলেও, পরবর্তীতে যেন মানুষের আমোদের এক উপলক্ষে। ডাকাত ধরার মিশনে ডাকাত ধরতে গিয়ে কতজন মন ডাকাতি হয়ে গিয়েছে, কে জানে! বিপ্লব, আর প্রেম একে অপরের সাথে জড়িত। রক্তে বিপ্লব এলে মানুষ রাস্তায় নামে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। আর মনে বিপ্লব এলে? প্রেমের উপাখ্যান রচিত হয়।
বিপ্লব যেন রক্তের বিপ্লব। মানুষের লাশের মিছিল। কত প্রেমিকা হারিয়েছে তার প্রেমিককে। হয়তো মুখ ফুটে বলা হয়নি ভালোবাসি। কত মা হারিয়েছে তার সন্তানকে। কত বোন হারিয়েছে তার ভাইকে। পরিবারের কোনো এক সদস্যকে হারিয়ে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, তার ইয়াত্তা নেই। স্বাভাবিক জীবনের সব সাধ, আহ্লাদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবুও তো বাঁচতে হয়। যে কারণে প্রয়োজন জীবন হারিয়েছিল, সেই স্বাধীন জীবনে স্বাদ নিতে হবে না?
এই বইটিতে অনুভব করা যায়, এমন এক সময় যে ছাত্রদের আন্দোলন থেকে পুরো জাতির আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। সিএনজি চালক হোক বা রিকশা, সবাই যেন এক হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি মানুষের মনে একটাই দাবি উঠেছিল। আর সেই দাবির জোয়ার এতটাই প্রবল যে, এর সাথে টক্কর দেওয়া ভয়ংকর কোনো দানবের পক্ষেও সম্ভব ছিল না।
বইটির সম্পাদন করেছেন মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। বাতিঘর প্রকাশনীর সম্পাদন, বানান ভুল নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকে। তবে এই বইটির সম্পাদনা যে খুব যত্ন করে করা হয়েছে সেটা খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। যদিও কয়েকটা জায়গায় ছাপাখানার ভূতকে দূর করা সম্ভব হয়নি।
বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে অনেক মতামত থাকতেই পারে। তবে স্বয়ং মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের কাছ থেকে প্রচ্ছদের পেছনের কারণ জানার পর এরচেয়ে যথাযথ প্রচ্ছদ আর দেওয়া সম্ভব হতো না বলেই মনে হয়েছে। প্রোডাকশন কোয়ালিটি টপনচ। বাতিঘরের বইয়ে এমন দারুণ প্রোডাকশন আদৌ দেখেছি কি না মনে পড়ে না। ডাস্ট জ্যাকেট থেকে শুরু করে কাগজ বাঁধাই, সেটআপ সবকিছুতেই সেরা কাজ দেখানো হয়েছে।
সবচেয়ে দারুণ হয়েছে শেষ ষোলো পৃষ্ঠায় থাকা জুলাইয়ের ছবিগুলো। এগুলোই ইতিহাস, এগুলোই স্মৃতিতে জড়িয়ে থাকবে। আর জুলাইকে মনে করিয়ে দেবে বারবার।
পরিশেষে, জুলাই এসে আবার চলে গিয়েছে। কিন্তু রেখে গিয়েছে তার ছাপ। এখনো মানুষের আর্তনাদ হয়, প্রিয়জন হারানোর শোক জড়িয়ে রাখে। তবুও এই জুলাই আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, বিপ্লব চাইলেই সম্ভব। অন্যায়ের সীমানা যখন আর পেরোনো যায় না তখন সাধারণ মানুষকে প্রতিরোধ করতেই হোক। যতই ক্ষমতা থাকুক, প্রবল জনস্রোত যখন বয়ে চলে তখন— বিজয় অনিবার্য।
সহ্যসীমা অতিক্রম করে ফেললে কোনো কিছুকেই তখন পরোয়া করার মানসিকতা থাকে না। অধিক শোকে মানুষ যেমন পাথর হয়ে যায়, তেমন অধিক দমনে মানুষ হয়ে যায় অদমনীয়। এমনই দমন-নিপীড়নে বাংলার মানুষ অদমনীয় হয়ে উঠেছিল গত জুলাইতে। সামান্য একটা দাবি পরিণত হয়েছিল সরকার পতনের আ ন্দো লনে। সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল চাকরি প্রত্যাশী মানুষেরা। এরপর সরকারের একগুঁয়ে মনোভাব থেকে চরম মাত্রার নির্যা তন, হ ত্যা, গুম, ধরপাকড় মিলিয়ে বাংলার জনগণ সর্বস্তরে নেমে এসেছিল এই স্বৈ রাচারের পতন ঘটাতে। ১৬-১৮ বছরের এই বিশাল স্বৈ রাচারের পতন ঘটিয়ে মুক্তির স্বাদ এসেছিল। নয় দফা থেকে এক দফা দাবির মাধ্যমে পতন ঘটেছিল ভয়াবহ এক অধ্যায়ের। ইতিহাস বদলে যায়, ইতিহাসকে বদলে দেয়া হয়। রক্ষণাবেক্ষণ করতে হলে সেটা লিখে রাখতে হয়। তেমন ভাবেই এক জিইয়ে রাখতে হয় লেখকের কলমের আঁচরে, বইয়ের কালো অক্ষরে। ❝জুলাইর গল্প❞ সংকলনে চেষ্টা করা হয়েছে ভয়ানক সেই সময়ের কথাগুলো মানুষের মনে জীবিত রাখার। ১৫ টি গল্প মোট ১০ জন লেখকের লেখায় মলাটবদ্ধ হয়েছে এই বইতে।
রাস্তার মিছিলে, মোবাইলের স্ক্রিনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবাই সরব ছিল। যেমন ❛অভ্যুত্থানের শেষ স্লোগান❜ গল্পে যেমন ছিল রুমি। তার লেখা গল্প, আর মোবাইলের ছবির উসিলায় তাকে কা রাগারে থাকতে হয়েছিল।
❛আমি কে, তুমি কে রাজা কার, রাজা কার কে বলেছে, কে বলেছে স্বৈরা চার স্বৈরা চার❜ এমন স্লোগানের পর যখন ১৫ তারিখ ছাত্রদের গায়ে হেলমেট বাহিনী সহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সবাই হামলে পড়ল তখন মানুষ থেমে গেলো না। ঝাঁপিয়ে পড়ল দ্বিগুণ তেজে। আসছে ফাগুনে নয় তারা এই শ্রাবণেই দশগুণ হয়ে ফিরে আসে। ❛জিন্সপ্যান্ট❜ গল্পের শেষটা সুন্দর লেগেছে। শুধু আ ন্দো লনকারীদের দিক নয় যারা আন্দলোন রুখে দিচ্ছে তাদের ভাবমূর্তি নিয়েও এখানে বলা হয়েছে। ❛লুব্ধক❜ গল্পে আছে নির্যা তনের একটা গা শিরশিরে চিত্র। কোনো কিছুর সাথে যুক্ত না থেকেও কীভাবে মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তার ছমছমে বর্ণনা ছিল এই গল্পে। জুলাইয়ের শোককে ৩১ তারিখের পরেও বয়ে নিয়ে যেতে আমজনতা আগস্টকেও জুলাই হিসেবে গুনেছিল। সে হিসেবে ৩৭ শে জুলাই তথা স্বৈ রাচার পতনের পরের ঘটনাও গল্পকারে এসেছে এখানে। ৫ আগস্টের পর যখন একে একে লাইলাতুল গুজব নাযিল হচ্ছিল, সে সময় ভয়, আতঙ্ক আর হতাশা একসময় হাসি তামাশায় রূপ নেয়। মানুষ উপভোগ করতে শুরু করে সেসব। তার একটা অংশ নিয়েই আছে ❛ডাকাতিয়া❜ গল্পটা। ❛মা❜ গল্পটা এক মায়ের তার সন্তান হারানোর এবং শোককে পুঁজি করে সাহসী হওয়ার সুন্দর এক চিত্র ছিল। ❛পথ পথিকের সৃষ্টি করে না, পথিকই পথের সৃষ্টিকারী।❜ বাগধারাটা ছোটকালে পড়েছি। ❛পথের খোঁজে❜ গল্পটা সেই উক্তিকে আরেকবার প্রমাণ করে দিয়েছে। এক রেজিমের পতনের পর রাঘব বোয়ালরা তো পার পেলো। কিন্তু যারা পালাতে পারেনি তাদের আহাজারি আর বিপদে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কারি কারি টাকাও যে কাজে আসেনি, ধোঁকা খেতে হয়েছে সেই কাহিনি নিয়ে তৃপ্তির একটা ঘটনা ছিল ❛আদম❜ গল্পতে। ❛রাণী ইলিশ❜ গল্পে জুলাইয়ের ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছোটো করে ফ্ল্যাশব্যাক ছিল। প্রথমে এ নিয়ে জনসাধারণের বিরক্তি, এরপর সমর্থন, এরপর সাহস আর শেষে গণভবন দখলের ঘটনাগুলো এসেছিল দারুণভাবে। শেষটা খুব সুন্দর। জুলাই এসেছিল এ দেশের বুকে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন, তাহমিদুল, দীপ্তরা এদেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। দেড় যুগের অ ত্যাচা র, মুখ বন্ধ করে রাখা, একচ্ছত্র কাজ সবকিছুর ইরি ঘটিয়েছে এদেশের ছাত্রজনতা থেকে আপামর জনগণ। জুলাই থাকবে এদেশের মানুষের মনে। ক্ষতপূরণ হলেও দাগ থেকে যাবে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝জুলাইর গল্প❞ সম্পাদনা করেছেন মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। ১৫ টি গল্পে সংকলিত হয়েছে বইটি। ভূমিকায় সম্পাদক বলেছেন এই বইটির সাহিত্যমান বাদ দিলেও এর তাৎপর্য আছে। আসলেই তাই। ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীর দ্বারা। তবুও সে ইতিহাস বদলে যায়, লোকমুখে ভিন্নভাবে প্রচারিত হয়, আবার কখনো দলীয় স্বার্থে একপাক্ষিক ইতিহাস জেনে আসে মানুষ। দেড় যুগের মতো সময় ধরে এদেশের মানুষও একপাক্ষিক ইতিহাস জেনে এসেছিল। নতুন করে করা এক গণ অভ্যুত্থানের ইতিহাস যেন বদলে না যায় তাই সেই ইতিহাসকে ধরে রাখার দায়িত্ব এ যুগের লেখকদের। সেই দায়িত্বের কিছুটা পালন হিসেবেই এই বইটি রচিত। বইটি আমার বেশ লেগেছে। ১৫ টি গল্পই ভালো লেগেছে। তবে ভালো লাগার পরিমাণ কমবেশি এইটুক পার্থক্য। শেষের মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের লেখা ❛রাণী ইলিশ❜ গল্পটা এই বইয়ের মধ্যে সবথেকে সুন্দর গল্প তবে লেখক গল্পে একটা ভুল করে ফেলেছেন। আশা করি সেটা ছাপার ভুল। ৫মে এর ঘটনাকে ৫মার্চ হিসেবে লিখেছেন। আশা করি পরের এডিশন আসলে ঠিক করে নিবেন। ওয়ালিদ প্রত্যয়ের ❛লুব্ধক❜ সবথেকে শিরশিরে অনুভূতি দেয়া লেগেছে। সুন্দর কিন্তু করুণ লেগেছে নিমগ্ন দুপুরের লেখা ❛সেই জুলাইয়ে❜ গল্পটা। প্রথম গল্পের ভেতরে যে উপন্যাসের অবতারণা ছিল সেটা গল্পের থেকে বেশি ভালো লেগেছে। আ ন্দো লনের সময়গুলো আমার কাছে অনেক দীর্ঘ মনে হতো। আমি ভাবতাম আমরা এক মাসেরও কম সময়ে এমন অস্থির হয়ে যাচ্ছি, ভয় পাচ্ছি, একটা খবরের জন্য নিউজফিড হাজারবার রিফ্রেশ করছি। তবে আজ থেকে ৫২-৫৩ বছর আগে ৭১ এ মানুষ দীর্ঘ নয়টা মাস কী করে পার করেছে! ছোটকাল থেকে শুনে আসতাম আমরা সবথেকে কম সময়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। কিন্তু ২৪ এ এসে ওই নয় মাসকে কী দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। সেখানে আমাদের প্রায় একমাসের এই ভয়াবহ সময় যখন নিজে অতিক্রম করলাম তখন মনে হলো আমাদের এই অবস্থা ঐ সময় মানুষ কী করে কাটিয়েছে? এখন তো ইন্টারনেটের কল্যাণে আমরা জানতে পারছি সব। তখন একটা রেডিও ছাড়া আর উপায় ছিল না। আমরা তাদের থেকে ভালো অবস্থানে ছিলাম? বাসার সামনে নিয়ে সাইরেন বাজলেই বারান্দায় গিয়ে দেখতাম কী হচ্ছে? এই যারা রাজপথে ছিল তাদের কেমন সময় গিয়েছে? বুকে গু লি লাগার পর আবু সাঈদের চোখের ঐ অবিশ্বাসী অনুভূতির সাথে অন্য অনুভূতিকে তুলনা করা যায়? ❛আমার ছাওয়ালরে মা রলি কেনে?❜ এই কথাগুলো বারবার কানে বাজে। বাইরে যারা প্রাণ দিয়েছে, যারা আপনজন হারিয়েছে তাদের দুঃখের সাথে ভাগ হবে কোনো কিছুর। এই শব্দের মাধ্যমে তারা আগামী প্রজন্মে পৌঁছে যাবে। কত আবু সাঈদ, তাহমিদুল, ইয়ামিন কিংবা পলাশ মায়ের বুক খালি করে গেছে হিসাব নেই। কত সন্তান চিঠি লিখে তাদের শেষ স্পর্শ দিয়ে গেছে সেগুলো যেন ভবিষ্যত না ভুলে যায়। এইসব লেখার মাধ্যমে ইতিহাসকে মনে রাখতে হবে। এই বিষয়ে একটা উপন্যাস লিখতে গেলে সেটা সময়সাপেক্ষ। সে হিসেবে এই বিষয়কে উপজীব্য করে ছোটো গল্প দারুণ কাজ। এখানে লেখা প্রতিটা লেখকই জুলাই ম্যা সাকারে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। সে হিসেবে বইটি তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং আবেগ থেকে লেখা। তাই গল্পগুলোকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করলে এর আবেগটা যথাযথ মনে হবে।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইটির প্রচ্ছদ আমার ভালোই লেগেছে। অবাক হয়েছি বাতিঘরের সম্পাদনা আর পৃষ্ঠার বাঁধাইয়ের মান দেখে। তানিয়া সুলতানার একটা গল্পে বাক্যের একটু ঝামেলা লক্ষ্য করেছি। এছাড়া পুরো বইতে সম্পাদনা বেশ ভালো হয়েছে। বইটির বাঁধাই ও ভালো হয়েছে। বাতিঘরের অন্যতম একটা কাজ হিসেবে এই বইটির নাম আসবে। শেষে ষোলো পৃষ্ঠার রঙিন আ ন্দোলনের ছবিগুলো বইটিতে বাড়তি একটা মাত্রা যোগ করেছে। আমার কাছে বইটির মূল্যও একদম সামর্থ্যের মধ্যে মনে হয়েছে।
জুলাই থাকবে। জুলাই থাকবে মুক্তি না আসা পর্যন্ত। বাঙালি কাজের সময় যে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে জুলাই তার আরেকটা প্রমাণ।
❛তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইরে ফিরাইয়া দে❜ ভাই আর আসবে না, আসবে না ছাদে খেলতে থাকা ছোট্ট খুকিটাও। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তারা বারবার ফিরে আসবে। ভিন্ন নামে।
"আপা এইভাবে আমাগো ফালায়া পলায়া যাইতে পারলো?!কয়দিন আগেই না টিভিতে বড়গলায় কইছিল,শেখ হাসিনা কখনও পালায় না!"
WE MAY NOT LIVE IN JULY BUT JULY LIVES IN US!
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ১০জন লেখকের ১৫টা গল্প নিয়ে লেখা বই 'জুলাইর গল্প'।প্রশ্ন জাগতেই পারে, জুলাইয়ের অভ্যুথান এবং অভ্যুথান পরবর্তী সবই তো জানা,বইয়ের আবার কি দরকার!মানুষমাত্রই ভুলপ্রবণ।আমারমতে,গল্পগুলোকে বইয়ের পাতায় আবদ্ধ করে অভ্যুথানের স্মৃতি ধরে রাখার দারুন এক প্রয়াস 'জুলাইর গল্প'।সম্ভবত এবছর আমার পড়া বইগুলোর মধ্যে এই বইটা সবচেয়ে দ্রুত শেষ হইছে।কিন্ত রেশ এখনো কাটেনি ।একদম গণঅভ্যূথানের মতো।
রিভিউয়ে আসা যাক: 'জুলাইর গল্প' শুধু জুলাইতেই সীমাবদ্ধ ছিলনা।২০১৩'র শাপলাচত্বর ট্রাজেডি থেকে শুরু করে প্রতি নির্বাচনে হাসিনা'র ভোট জালিয়াতি, ৭১কে পুঁজি করে চালিয়ে যাওয়া অপকর্ম,গুম-খুন এসবই ছিল বইটিতে, যেন জুলাই অভ্যুথান হওয়ার পেছনের ইতিহাসকেও তুলে ধরা হয়েছে।ফুটে উঠেছে জুলাই অভ্যুথানের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি আর অভ্যুথান পরবর্তী দেশের অবস্থা, হাসিনা বাহিনীর পরিণতি,ডাকাত ধরা রাত।
প্রথম গল্প ছিল সামসুল ইসলাম রুমি ভাইয়ের লেখা 'অভ্যুথানের শেষ স্লোগান'।গল্প না বলে ঘটনা বলা বোধ করি শ্রেয়।উল্লেখ্য,বইয়ের যে কয়টা গল্পকে ঘটনা মনে হয়েছে এটা তার একটা।আন্দোলনে হাসিনার বিপক্ষে লেখালেখির দায়ে গ্রেফতার হওয়া পরবর্তী বিষয় নিয়ে এই লেখা।এই ঘটনা দিয়ে বই শুরু করার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই লেখকের শুরু করার ধরনের কারণে। মাঝে, পুরো লেখা জুড়েই একটু একটু করে শুকদারা নামের একটা কাল্পনিক দেশ এর গল্প ছিলো,যার অথনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের মতোই।মূলত বাংলাদেশের সিন্ডিকেট,চোরাচালানের ফলে তৈরী হওয়া অবস্থাকেই ওই গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন লেখক।একদম শেষে আকাশের করা প্রশ্নটা...
আন্দোলনে গ্রেফতার পরবর্তী জীবন নিয়ে আর ২টা গল্প আছে।হাসান ইনাম ভাই আর জুবায়ের ইবনে কামাল ভাইয়ের যথাক্রমে '৩৭শে জুলাই' আর 'অজ্ঞাত কয়েদি অথবা জোৎস্না'।জেল জীবনবিষয়ক ৩টাগল্পেই জেলের ভিতরের অবস্থা, সেখানকার দায়িত্বরত পুলিশ, জেল সুপারদের ব্যবহার আর জিজ্ঞাসাবাদের ধরন তুলে ধরা হয়েছে।তবে, '৩৭শেজুলাই' আর 'অজ্ঞাত কয়েদি অথবা জোৎস্না'তে কারাগারগুলোতে হাসিনা পালানোর পূর্ব আর পরবর্তী অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
ওয়ালিদ প্রত্যয় ভাইয়ের লেখা 'লুব্ধক' গল্প শুরু করার আগে প্রচুর লম্বা করা হইছে।১৬পৃষ্ঠা গল্পের প্রথম ৫পৃষ্টাই অতিরিক্ত লাগছে। এই গল্পতে তুলে ধরা হইছে,ছাত্র গ্রেফতার করার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশের করা জিজ্ঞাসাবাদের ধরণ।শরীরের যেকোনো আঘাতকে আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা, যেকোনো কথাকেই ভিন্নদিকে প্রবাহিত করা, ফোনে আন্দোলনে রিলেটেড কিছু পেলে অপমান করা ছিল তার মধ্যে অন্যতম।
নিমগ্ন দুপুরের লেখা 'সেই জুলাইয়ে' আর তানিয়া সুলতানা আপুর লেখা 'ডাকাতিয়া' কিছুটা ভিন্ন ধাচের গল্প।'সেই জুলাইয়ে' উঠে এসেছে এক শহীদের কথা,যিনি প্রিয়তমার চেয়ে নিজের দেশকে বেশি ভালোবেসেছিলেন।আর 'ডাকাতিয়া'তে লেখা হয়েছে আন্দোলন পরবর্তী ডাকাতের অপেক্ষায় থাকা রাতগুলোতে করা আনন্দ'র বিবরণী আর সেখান থেকে শুরু হওয়া একটা প্রেম কাহিনী।ছ���ট পরিসরে হলেও ভালমতো রাতগুলোর বর্ননা তুলে ধরতে পেরেছেন লেখিকা।
বইয়ে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন স্যারের লেখাগুলো ভিন্ন আকর্ষণের জায়গা ছিল।উনার লেখা 'আদম' এ হাসিনার আমলে মন্ত্রণালয়ের এক দালালের লুটপাট আর টাকা পাচারের বর্ননা আর আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তার অবস্থা আর পরিশেষে, করুণ পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে উনার লেখা 'রানী ইলিশ' বেশি ভালো লাগছে। বইয়ের শেষ গল্প হিসেবে ওটার প্লেসমেন্টও ভালো ছিল।গল্পটাতে ছিল গত ১৫বছরে হাসিনার করা অপকর্ম,বিশেষ করে ২০১৩'র শাপলাচত্বর ট্রাজেডি।পুরো আন্দোলনেরই তিনি একটু একটু করে বর্ননা দিয়েছেন গল্পজুড়ে।যার শেষ হয়েছে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের গণভবনে প্রবেশ করে তৈরী হওয়া কিছু উপলদ্ধির মাধ্যমে।
সবচেয়ে ইমোশনাল গল্প ছিল তানিয়া সুলতানা আপুর লেখা 'পথের খোঁজে'।যেখানে একজন ১৯ বছরের যুবক রয়েছে, যে নিজের মায়ের অবাধ্য হয়ে আন্দোলনে যেতে পারেনা।কিন্ত যখন তার ক্লাস টু পড়ুয়া ছাত্রী জানালার পাশে বসে মারা যায় তখন সে আর নিজেকে আন্দোলনে যাওয়া থেকে আটকে রাখতে পারেনা।তবে শেষটা গায়ের লোম দাঁড়ানোর মতো ছিল।
বইয়ের গল্প আর শেষ ১৬ পৃষ্ঠার ছবিগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে হাসিনা আর তার বাহিনীর বর্বরতা,একেকজনের সাথে করা পাশবিক নির্যাতনের আর তার বিপরীতে ছাত্র জনতার লড়াইয়ের বাস্তব চিত্র।এছাড়াও গুলি মারার পর শহীদদের লাশ গুম করার ধরন,নিজের ছেলেকে হারানো বাবা-মায়ের, ভাইকে হারানো বোনের শোকের বহিঃপ্রকাশ ছিল বইতে।লেখক-লেখিকারা দারুণভাবে গল্প-ঘটনাগুলো উপস্থাপন করেছেন।যখন পড়ছিলাম তখন মনে হচ্ছিলো ঘটনাগুলো আমার সামনে ঘটছে।আমিও ঘটনাগুলোর অংশ।
প্রোডাকশন: বাতিঘরের(থ্রিলার) প্রোডাকশনে এবার ভিন্নতা লক্ষ করেছি।উনাদের বইগুলোতে ডাস্ট কভার এটাচ অবস্থায় থাকলেও এবার সেটা ছিলো না।বইয়ের কিছু বর্ণ ভালোমতো প্রিন্ট হয়নি।তবে সেটা তেমন আহামরি না হওয়াই পড়ার সময় অসুবিধা হয়নি।
বানান: টাইপিং মিসটেক নগন্য ছিল।তবে,কিছু জায়গাই শব্দ আর বাক্যের পরপর রিপিট ছিল।যেটা ওই ব্যাখ্যার ধরন সম্পর্কে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরী করছে ।
- কিন্তু ছেলেটাকে আর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি, বোতল থেকে এক ঢোক পানি পান করার পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে তাকে ধরে রাখা যুবক। আবেদও সেই কান্নায় যোগ দেয়। আরেকটি তাজা প্রাণ চোখের সামনে মরতে দেখে দুচোখ ঠেলে বাণের তোড়ে বের হয়ে আসতে থাকে অশ্রুজল।
" চলেন, আপনের বন্ধুরে তার বাড়ি নিয়ে যাই," অবশেষে চোখ মুছে বলছিল।
জীবিত ছেলেটা অসহায়ের মতো ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। " ওর বাড়ি তো আমি চিনি না! "
" আপনের বন্ধু না ?!"
" না, আন্দোলনে পরিচয় , কই থাকে জানি না।"
অবাক হয় আবেদ । এখন যারা পথে আছে তারা কেউ কাউকে চেনে না অথচ সবাই সবাইকে জানে! যেন হাজার বছরের রক্তসম্পর্কীয় বন্ধনে আবদ্ধ সবাই।
~ রাণী ইলিশ
কথা বলছি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের সম্পাদিত " জুলাইয়ের গল্প" বইটি নিয়ে। এখানে ১০ জন লেখকের মোট ১৫ টি গল্প রয়েছে। এই গল্পগুলোতে উঠে এসেছে জুলাইয়ের চিত্র। উঠে এসেছে সন্তান হারানোর বেদনা, সাহসিকতার গল্প , মানবিকতার গল্প এবং একদল দানবের গল্প। এখানে শুধু জুলাইয়ের গল্পই নয় আরো আছে জুলাই পরবর্তী লাইলাতুল গুজবের রাতের গল্প এবং ২০১৩ এর শাপলাচত্বর ট্রাজেডি।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ ১৫ টি গল্পের মধ্যে কিছু গল্প কমবেশি ভালো লেগেছে। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন , হাসান ইনাম এবং তানিয়া সুলতানা এই ৩ জন লেখকের গল্প গুলো বেশি ভালো লেগেছে। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের ৩ টি গল্পই দারুণ লেগেছে । "পথের খোঁজে" (তানিয়া সুলতানা ) এবং " একটু যদি বাতাস হইতো" (হাসান ইনাম) এই দুটো গল্প আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। কেন জানি না এই দুটো গল্প পড়ার পর একধরনের কষ্ট অনুভূত হলো। কষ্টগুলো ধলা পাকিয়ে গলায় এসে বিঁধেছিল। বইটি পড়ে নিরাশ হবেন না। সংগ্রহ করে নিতে পারেন।
বইটা পড়ার সময়ে আবারও সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের প্রান্তরে উপস্থিত হয়েছিলাম। যেন জুলাই এখনো চলমান এবং জীবন্ত, এটি শেষ হওয়ার নয়। কি পরিমাণ অস্থিরতা আর সংকটময় মুহূর্ত পার হয়েছে, আমরা পার করেছি তা আমাদের সবারই জানা। কি ভয়াল রাত ছিল খুনী, স্বৈরাচারী হাসিনার বাহিনীর হাতে প্রতিনিয়ত ধরা পড়ার আতঙ্ক তবুও আমরা হার মানিনি, বুলেটের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে গেছি। মুখে উচ্চারিত হয়েছে "বুকের ভিতর ভীষণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর" আর হৃদয়ে আবৃত্তি করেছি সেই মহান বাণী "মাতৃভূমি কিংবা মৃত্যু"!