দার্জ্জিলিঙ্গের চূড়ায় জটিল মৃত্যু রহস্য কিংবা হংকং -এ ঘটে যাওয়া অদ্ভুত এক ঘটনা। কলকাতার বুকে নৃশংসভাবে খুন হওয়া সার্কাসের মালিক। যার খুনের অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই এক মৃতদেহ! অথবা খুন ও দেশদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত জাদুকর গণপতি। সে কি আসলেই দোষী? সকল রহস্যের প্যাঁচ খুলতে প্রস্তুত ডিটেকটিভ তারিণীচরণ। আপনারা পড়তে প্রস্তুত তো? সূচিপত্র: মৃগতৃষ্ণা ভস্মবহ্নি ইয়ান জি হং-এর মুক্তো (ভস্মবহ্নির পরিশিষ্ট) গোধূলীসন্ধি
জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KM5 এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা' (২০১৮),মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯),নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০) ও নীবারসপ্তক (২০২১) এই সব দিনরাত্রি (২০২২), ধন্য কলকেতা সহর (২০২২), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪), আরও একটি প্রবন্ধ সংকলন (২০২৫) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ম্যাসন সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ (২০২২, ২৩), মৃত্যুস্বপ্ন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪) । সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০) সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষে একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত(২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪) এবং কলিকাতার নুকোচুরি (২০২৫)
চারটি আখ্যানের মধ্যে "মৃগতৃষ্ণা" আর "ভস্মবহ্নি" মোটামুটি । "ইয়ান জি হং এর মুক্তো" আর "গোধূলিসন্ধি" পড়ে আনন্দ পেয়েছি। পরের অন্তত দুইটা কাহিনিতে মাখনলতার উপস্থিতি আরেকটু বেশি থাকতে পারতো। কৌশিক মজুমদারের বই পড়ার সুবিধা হচ্ছে, গল্প যেমনই হোক, পড়ার সময়টা বেশ ভালো কাটে। ( রহস্য গল্পের নাম বিমূর্ত বা অস্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।)
ভালো লেগেছে পড়তে। নতুন ধরনের ডিটেকটিভ তারিণীচরণ। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, ভস্মবহ্নি তারপর মৃগতৃষ্ণা। গোধূলী সন্ধি বেশি বড় লেগেছে, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল ঝুলে যাচ্ছে তবে শেষটুকু অন্যরকম সুন্দর লেগেছে।
বইটা দারুণ ছিল। চারটা গল্পেরই সম্ভাবনা ছিল। তিন নম্বর গল্প একদমই ছোট, তবে সুন্দর। আর চার নম্বর গল্পে স্বদেশ বিপ্লবের মারমার কাটকাট একটা চিত্র দেখব বলে আশা ছিল। রহস্য ছিল, লক রুম মার্ডারের উত্তেজনা ছিল, তবে এর মাঝেই শুরুর অধ্যায়ে আড়ম্বরপূর্ণ সেই বিল্পব এবং খুনের গল্প যেন হারিয়েই গেল। মাঝে অল্প বিস্তর উল্লেখ এবং শেষ পেইজে মাত্র দুই তিন লাইনে উপসংহার টানাটা ভালো লাগেনি।
সম্ভাবনার অপমৃত্যু? নাকি আমারই প্রত্যাশা বেশি ছিল? জানা নেই। একটু আশাহত তো হয়েছিই। সেই কারণে রেটিং ৪।
লেখকের লেখনী অনবদ্য। আমি উনার বইগুলো পড়ার জন্য মুখিয়েই থাকি। যা হোক, ২০২৫ এর প্রথম বই শেষ হলো।
This entire review has been hidden because of spoilers.
১৮৯২ এর ডিসেম্বরের সেই কনকনে শীতের কুয়াশার মাঝে চিনেপাড়ায় ভয়াবহ খুনের কথা মনে আছে আপনাদের?
তারিণীচরণের সাথে পরিচয় সেই চিনেপাড়ার খুন থেকে ; অর্থাৎ ম্যাসন সিরিজ থেকে। পুরো নাম শ্রী তারিণীচরণ রায়। আদি নিবাস চুঁচুড়া। প্রথম বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। সূর্যতামসী, নিবারসপ্তক এবং অগ্নিনিরয়ের পরে তারিণীচরণকে পেলাম আরো একবার। ম্যাসন সিরিজের ধারা বেয়ে ডিটেকটিভ তারিণীচরণের চারটি একেবারে নতুন কাহিনি- মৃগতৃষ্ণা, ভস্মবহ্নি, ইয়ান জি হং এর মুক্তো আর গোধুলীসন্ধি নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বইটি।
প্রথম উপন্যাস 'মৃগতৃষ্ণা' প্লেগের হাত থেকে বাঁচতে সদ্য বিবাহিত তারিণী সস্ত্রীক দার্জিলিং যায় হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে নতুন ঝামেলা হাজির। এক ইংরেজ নারী মারা গেছেন। কেস সমাধানে এগিয়ে আসে ডিটেকটিভ তারিণীচরণ।
প্রতিক্রিয়া : এটা মূলত একটা লকড্ রুম মিস্ট্রি। তবে সাথে আনুষঙ্গিক অনেকগুলো সাবপ্লট রয়েছে। ওভারল ভালো লেগেছে।
দ্বিতীয় উপন্যাস 'ভষ্মবহ্নি' কলকাতার বুকে হচ্ছে সার্কাস। সেই সার্কাসে বাঘের খেলা দেখাতে গিয়ে বাঘের হাতেই মৃত্যুবরণ করে সার্কাসের ই এক খেলোয়াড়। এরপর ক্যারাভানের ভেতরে রুদ্ধদ্বার অবস্থায় মারা যান সার্কাসের ম্যানেজার পান্নালাল বসাক। খুনের দায় খোদ একটা মৃতদেহের উপরে। কেননা ক্যারাভানের ভেতরে পান্নালাল এবং বাঘের হাতে মৃত্যুবরণ করা ছেলেটার মৃতদেহ ছাড়া আর কেউ ছিল না। আসল সত্যটা কী?
প্রতিক্রিয়া : এটাও লকড্ রুম মিস্ট্রি। এটা আরো বেশি ভালো লেগেছে। কৌশিক মজুমদারের বর্ণনাভঙ্গি চমৎকার এ কথা আমি ম্যাসন সিরিজের রিভিউতেই বলেছি। তার লেখা ঘন্টার পর ঘন্টা পড়লেও বিরক্তি আসেনা। তার গল্প বলার ভঙ্গিমা সত্যিই অসাধারণ।
তৃতীয় কাহিনিটি একটি ছোটগল্প। নাম 'ইয়ান জি হং-এর মুক্তো।' দু দুটো সিরিয়াস উপন্যাস পড়ার পরে আবহাওয়া একটু হালকা করতেই সম্ভবত এই গল্পটি যুক্ত করা হয়েছে। শেষে সুন্দর একটা টুইস্ট আছে। পড়ে একটু হেসেছি বটে।
সবশেষ উপন্যাসের নাম 'গোধূলীসন্ধি'। কলকাতা থেকে দূরে তামাটুলি নামক জায়গায় জাদুর শো দেখাতে এসে তারিণীর বন্ধু জাদুকর গণপতি জড়িয়ে পড়ে জোড়া খুনের মামলায়। গণপতিকে বাঁচাতে প্রিয়নাথ ও নিজের পরিবারের সঙ্গে তামাটুলিতে আসে তারিণীচরণ।
প্রতিক্রিয়া : বইটিতে কলেবরে সবথেকে বড় উপন্যাস এটা। আর এক কথায় বললে এটাকে বলবো ওস্তাদের মার শেষ রাতে! একদম ই পয়সা উসুল উপন্যাস। পুরোটা সময় উপভোগ করেছি। গল্পের বিল্ড আপ অসাধারণ। তার সাথে যুক্ত হয়েছে কৌশিকবাবুর জাদুর হাতের বর্ণনা। একদম গণপতির ভোজবাজি দেখার মত গোগ্রাসে পড়েছি উপন্যাসটি। এই উপন্যাসটিতে সেই ম্যাসন সিরিজের মত রহস্যের বুণন পেলাম। সব মিলিয়ে গোধূলীসন্ধি উপন্যাসটি একেবারে cherry on the top.
মোটামুটি এই ছিল বই নিয়ে আমার আলোচনা। এবার অল্প কিছু আনুষঙ্গিক আলাপ সারা যাক। প্রথম অভিযোগটা হল প্রচ্ছদে। প্রচ্ছদ এত হিজিবিজি না করে ভারতেরটার মত রাখলে বেশি সুন্দর লাগতো। এছাড়া প্রোডাকশন কোয়ালিটি ভালোই। তবে বাঁধাই অত্যন্ত শক্ত। মাঝখানের পৃষ্ঠাগুলো রীতিমত কসরত করে পড়তে হয়েছে। এখন এটা কি শুধু আমার কপির সমস্যা কিনা তা ঠিক বলতে পারবোনা। তবে পৃষ্ঠার মান বেশ ভালো। সবশেষে আফসার ব্রাদার্সকে শত কোটি কুর্নিশ। কৌশিক মজুমদার আমার সবথেকে প্রিয় তিনজন লেখকের একজন। ভারতীয় বইগুলো স্বাভাবিকভাবেই বেশি কনভার্সন রেটের কারণে কিনতে পারতাম না আগে। আফসার ব্রাদার্স এই সমস্যাটা সলভ্ করে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশে বসেই সুলভ মূল্যে প্রিয় ভারতীয় লেখকের বই পড়তে পারছি। এজন্য আফসার ব্রাদার্স অবশ্যই একটা ধন্যবাদ ডিজার্ভ করে।
এক নজরে, বই : ডিটেকটিভ তারিণীচরণ লেখক : কৌশিক মজুমদার প্রকাশনী : আফসার ব্রাদার্স পৃষ্ঠা : ২৮৮ মুদ্রিত মূল্য : ৬০০ টাকা
ডিটেক্টিভ তারিণীচরণ মূলত কৌশিক মজুমদারের ম্যাশন সিরিজের বই সূর্যতামসী, নিবারসপ্তক ও অগ্নিনিরয় বইয়ের সিকুয়াল বা স্পিন অফ বলা চলে। অগ্নিনিরয় এর পর তারিণী চরণ আরো যে কেসগুলো সলভ করেছেন তারই চারটি এইখানে লিপিবদ্ধ। গল্প গুলো হলো : মৃগতৃষ্ণা, ভস্মবহ্নি, ইয়ান জি হং এর মুক্ত ও গোধূলিসন্ধ্যা। সব গুলো গল্পর সময়কাল ১৮৯৭ থেকে ১৮৯৯/১৯০০ সালের মধ্যে এবং সব গল্পের মাঝে যেই জিনিস টি মিল খুঁজে পাওয়া যায় তা হলো সেই সময়কার বিউবণিক প্রেগ ও নিউমনিক প্রেগ। সত্য ঘটনার সাথে কল্পনার মিশ্রণে এতো সুন্দর রচনা যে সম্ভব তা অনেকটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর " সময় ত্রিলজি " এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
চারটি গল্পের মধ্যে তৃতীয় অর্থাৎ ইয়ান জি এর গল্পটি সব চেয়ে ক্ষুদ্র ও কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও বাকি 3টি গল্পই যাকে লালমোহন বাবুর ভাষায় বলে "জমজমাট "। শৈলশহর দার্জিলিং থেকে পূর্ব ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম তামাটুলি, ইংরেজ সাহেব থেকে স্বদেশী সব ধরণের চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায় গল্পে। প্রতিটি গল্পের স্থান, কাল, পাত্র এতো নিখুঁত ভাবে সাজানো যেন মনে হয় ইতিহাস বই পড়ছি। আমার নিজের সব থেকে প্রিয় গল্প যদি বলতে হয় তবে মৃগতৃষ্ণা ও গোধূলিসন্ধ্যা। অসম্ভব দুইটি কেস কে তারিণীচরণ নিজের তুখোড় বুদ্ধিমত্তা ও স্বল্প সূত্রের মাধ্যমে যেন জাদুবলে স���াধান করে ফেলেন। প্রতিটি গল্প ব্যাপারে আলাদা করে বলা নিষ্প্রয়োজন। যারা পড়েছেন তারা জানেন আর যারা পড়েন নি তাদের বলবো সামনের বইমেলার উইশলিস্টে অবশ্যই বই টি রাখতে পারেন। সাথে ম্যাশন সিরিজের বাকি বই গুলোও। গোয়েন্দা কাহিনী পছন্দ করা পাঠক এর জন্যে এই বই গুলো খুবই সুখপাঠ্য। লেখক কে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করি সামনে তারিণীচরণ চরিত্রের আরো বই প্রকাশিত হবে।