১৯ জন লেখকের নানা স্বাদের ১৯টা গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে আদী প্রকাশনের পাঠকপ্রিয় 'নিশুতি' সিরিজের গল্প সঙ্কলন 'নিশুতি ৫'। এই গল্পগুলোর কোনটা থ্রিলার তো কোনটা হরর। আবার কোন কোন গল্পে সাইফাই-এর ছোঁয়া আছে তো কোনটাতে আছে হিউম্যান সাইকোলজির নানা মারপ্যাঁচ। 'নিশুতি ৫'-এ বেশিরভাগই নতুন লেখকদের গল্প স্থান পেয়েছে। নিচে আমি কিছু গল্প নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করছি। সেই সাথে দিচ্ছি আমার ব্যক্তিগত মতামত। সবাইকে আমন্ত্রণ!
একজোড়া বালার গল্প - তানবীর আহমেদ: একজোড়া ভারী বালা। লোকে বলে বালাজোড়া অ'ভি'শ'প্ত। কোন এক সাধুর কাছ থেকে নাকি এই জিনিস পাওয়া। তারপর পরিবারে ঘটে যায় একের পর এক অস্বাভাবিক মৃ'ত্যু৷ বালাজোড়ার ব্যাপারে একটা কথা প্রচলিত আছে। এগুলো নাকি দূরে কোথাও রেখে এলে আবার জায়গামতো ফিরে আসে৷ তারপরই কারো না কারো মৃ'ত্যু ঘটে। এই যুগেও কি এসব গাঁজাখুরি কথা কেউ বিশ্বাস করে!
গল্পটা ইন্টারেস্টিং। বিশেষ করে এর শুরুটা আমার খুবই ভালো লেগেছে। লেখক তানবীর আহমেদের কোন লেখা এর আগে আমি পড়িনি। কিন্তু খেয়াল করলাম, তাঁর লেখার ধরণে পাঠককে আটকে রাখার একটা ব্যাপার আছে। 'একজোড়া বালা' খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে আমার। শেষদিকে একটু তাড়াহুড়া লক্ষ্য করেছি। গল্পটা আরেকটু লম্বা হলে মন্দ হতো না।
জালালপুর - রাতিকা খন্দকার: বাবা-মা'র সাথে শান্তা আর বিনু দুই বোন তাদের দাদাবাড়িতে বেড়াতে গেলো। জায়গাটা সিলেটের এক প্রত্যন্ত গ্রাম জালালপুর। শান্তাদের এই গ্রামের বাড়িটার পেছনে আছে বহু পুরোনো এক অজানা দেবীমূর্তি। এই মূর্তিটাকে নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে গ্রামে। শান্তাদের খামারে হঠাৎ ম'ড়'ক লাগলো কেন? মূক জিরাবু কি কিছু বলতে চায়? জালালপুরের আবহাওয়াই বা হঠাৎ করে বদলাচ্ছে কেন? একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করলো শান্তা আর বিনুকে ঘিরে। এসবের শেষ কোথায়?
অসাধারণ একটা গল্প পড়লাম। রাতিকা খন্দকারের গল্প বলার ধরণটা এতোই আকর্ষণীয় যে মুগ্ধ হয়ে পড়ে গেছি পুরোটা। এমন থিম নিয়ে যে আগে কখনও কিছু লেখা হয়নি এমন না। কিন্তু লেখিকার চমৎকার লেখার গুণে 'জালালপুর' সম্পূর্ণ অনবদ্য কিছু হয়ে উঠেছে। আমি জানি না রাতিকা খন্দকার নিয়মিত লেখেন কি-না। তবে আমার সাজেশন থাকবে তিনি যেন লেখালেখিতে নিয়মিত হন। অপার সম্ভাবনা আছে তাঁর ভেতরে।
শমন - কুদরতে জাহান: ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করা এক প্রাণোচ্ছল মানুষ হঠাৎ করেই অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলো। ইদানীং সে ভার্চুয়াল দুনিয়ার নানা জায়গায় একজন অনিন্দ্যসুন্দরী নারীকে দেখতে পায়। মেয়েটা যেন সবসময় তাকেই লক্ষ্য করে। একটা বাইক অ্যা'ক্সি'ডে'ন্ট থেকে শুরু এই গল্পের। মানুষটার কাছে কি চায় এই রহস্যময়ী?
আমার খুব প্রিয় একজন অনুবাদক কুদরতে জাহান। তাঁর অনুবাদ এর আগে পড়লেও মৌলিক কোন লেখা পড়ার সুযোগ হয়নি 'শমন' গল্পটা পড়ার আগে। ফ্যান্টাসি ধাঁচের এই গল্পটা কলেবরে ছোট হলেও বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে আমার কাছে। বিশেষ করে এর শেষটা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
হারিয়ে যাওয়া চিঠি - নাজিম রেজা: স্কলছাত্রী লাবনী হারিয়ে গিয়েছিলো পাঁচ বছর আগে। হঠাৎ-ই সে ফিরে এলো৷ এই পাঁচ বছরে তার ভেতরে কোন পরিবর্তন আসেনি৷ ফিরে আসার পর লাবনী তার স্কুল জীবনের বন্ধু ইফতিকে একটা অদ্ভুত গল্প শোনালো। যে গল্পের মাঝে আছে একটা স্টেশন, কিছু রহস্যময় চিঠি আর কিছু স্বপ্ন।
সায়েন্স ফিকশন ফ্যান্টাসি ধাঁচের এই গল্পের প্লটটা বেশ ইন্টারেস্টিং। কিন্তু নাজিম রেজা সেটাকে যথাযথভাবে এক্সিকিউট করতে পারেননি। গল্পটাকে বেশ কিছু ফাঁক আছে। সময় নিয়ে আরো ঘষামাজা করার প্রয়োজন ছিলো বলে মনে হয়েছে আমার। এই গল্পে বানান জনিত কিছু সমস্যাও লক্ষ্য করেছি। শুরুটা প্রমিসিং হলেও ওভারঅল ভালো লাগেনি 'হারিয়ে যাওয়া চিঠি'। সময়ের সাথে নাজিম রেজার লেখালেখির মান আরো উন্নত হবে আশা করি।
ব্রাত্যদের পরিণতি - কালী: পহেলা বৈশাখের উৎসবমুখর দিনে টিএসসি-তে গিয়েছিলো নববিবাহিত দম্পতি শান্তা ও সজল। সেখানে তাদের সাথে ঘটে যায় ভয়ানক ঘৃণ্য একটা ঘটনা। কয়েকজন ন'র'প'শুর দ্বারা শ্লী'ল'তা'হা'নির শিকার হয় শান্তা। আর এই জ'ঘ'ন্য ঘটনাটা ঘটে যায় একদম সজলের চোখের সামনেই। ইন্সপেক্টর লিয়াকত যখন এই ন্যা'ক্কা'র'জ'ন'ক ঘটনাটার তদন্ত করতে শুরু করে, তখন সজলের আচরণ অদ্ভুত ঠেকে তার কাছে।
কালী'র লেখা এই গল্পটার অনুপ্রেরণা ২০১৫ সালে টিএসসি-তে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা। রিভেঞ্জ থ্রিলার ঘরানার এই গল্পটা আমার কাছে মোটামুটি ভালোই লেগেছে। লেখার ধরণ বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। ভবিষ্যতেও কালী'র কোন লেখা সুযোগ পেলে পড়ার আগ্রহ থাকবে।
সমুদ্রের ডাক - মোস্তাহিদ প্রধান: রাতুল সমুদ্র ভয় পায়। সমুদ্রের গর্জন আর নির্জন সৈকতের প্রতি তার মনে একটা আলাদা অস্বস্তি কাজ করে। ইদানীং রাতুল অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নে সে সমুদ্রের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। স্বপ্নে সমুদ্র তাকে ডাকে। একটা সময় সে সমুদ্রের জলে তলিয়ে যায়। স্বপ্নটা রাতুলের স্বাভাবিক জীবনকে একেবারে দুর্বিষহ করে তুলছে। সমুদ্রের এই ডাক থেকে হয়তো তার আদৌ কোন মুক্তি নেই।
মোস্তাহিদ প্রধানের 'সমুদ্রে ডাক' গল্পটা অসহায়ত্বের। গল্পটার মধ্যে যেমন এক অন্যরকম ভয়ের আবহ পাওয়া যায়, তেমনি একটা অদ্ভুত মন খারাপ করা অনুভূতির উপস্থিতিও টের পাওয়া যায়। লেখকের শব্দচয়ন আর বর্ণনার ভঙ্গি বেশ ভালো লেগেছে। গল্পটাও মোটামুটি ভালোই লেগেছে আমার। তবে ঘটনাগুলো কেন ঘটছে সেগুলোর ব্যাপারে জানতে পারলে 'সমুদ্রের ডাক' হয়তো আরেকটু উপভোগ্য হতো।
চোর - কমল উদ্দিন: গ্রামের এক লোকের ভ্যানগাড়ি চুরি হয়েছে। সবাই মিলে সন্দেহ করলো লিটু চোরকে। তাকে ধরে পে'টা'নো শুরু করলো গ্রামবাসী। মা'র খেতে খেতে লিটু বারবার দাবী করতে লাগলো, সে নির্দোষ। বলতে লাগলো, সে আগে চুরি করলেও এখন চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে। লিটুর এসব কথায় কি চিড়ে ভিজলো?
চমৎকার একটা গল্প 'চোর'। গল্পটাতে রহস্যের প্রলেপ থাকলেও এর পুরোটা জুড়ে একটা মানবিক আবহ টের পাওয়া যায়। মানুষের ভেতরের অন্ধকার কিছু দিক বেশ দক্ষতার সাথে 'চোর' গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক কমল উদ্দিন। ভবিষ্যতেও তাঁর লেখা পড়তে চাই।
বলি - হামিদা বানু মৌসুমী: একরাতে শ্মশানের পাশে আড্ডা দিতে গিয়ে একটা কা'টা মা'থা আবিস্কার করে অখিল। মানুষের কা'টা মা'থা। এরপর থেকেই অখিলের চারপাশের সব কেমন বদলে যেতে থাকে। দিনে-রাতে বাড়িতে-অফিসে সবসময় সে কা'টা মা'থাটাকে দেখতে শুরু করে। ওটা অখিলকে কি যেন বলতে চায়।
গল্পটা মোটামুটি ভালোই লেগেছে। হামিদা বানু মৌসুমীর বর্ণনার ভঙ্গি বেশ সহজ ও সাবলীল। সিম্পল অথচ আকর্ষণীয় প্লটের একটা হরর গল্প 'বলি'। লেখিকার উচিত লেখালেখিতে নিয়মিত হওয়া।
মাস্টারপ্ল্যান - আদনান আহমেদ রিজন: একটা খু'ন করবে হাবিব। খু'নটা করার জন্য নিখুঁত এক মাস্টারপ্ল্যান সাজানো হয়ে গেছে তার। এখন শুধু প্ল্যানটা এক্সিকিউট করার অপেক্ষা। সেই মোতাবেক সবকিছুই এগোচ্ছিলো। শিকারী আর শিকারের মধ্যবর্তী দূরত্বটাও কমে আসছিলো। কিন্তু শেষটা কি আসলে ভালো হবে?
রিভেঞ্জ থ্রিলার ঘরানার গল্প 'মাস্টারপ্ল্যান'। গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে আমার। বিশেষ করে এর শেষটা আমাকে ভালো রকমের চমকৃত করেছে। আদনান আহমেদ রিজন তাঁর চমৎকার সব প্রচ্ছদ আর অনুবাদের জন্য সুপরিচিত নাম। মৌলিক থ্রিলারও তিনি ভালোই লেখেন।
উপরে যে গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করলাম এগুলো ছাড়াও এই সঙ্কলনে স্থান পেয়েছে হাসিন সাফওয়াত বারীর 'নিঃশব্দ পাখার প্রাণ', সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টির 'এক কাপ ভালো চায়ের জন্য মানুষ খু'ন করা যায়', অর্পিত চৌধুরীর 'মোলোক', মোহাম্মদ হাসিন ইশরাকের 'নৈরাত্রি', পার্থ মুখার্জীর 'সরীসৃপ', আরিফুল ইসলাম বাঁধনের 'পরিণীতা', বিনিয়ামীন পিয়াসের 'সংহার', বি. এম. পারভেজ রানা'র 'সাতাশ বছর আগে', অরূপ ঘোষের 'স্বপন পারের ডাক শুনেছি' ও উম্মে মোসলিমা জ্যোতির 'নিয়তি' গল্পগুলো। এগুলোর মধ্যে পার্থ মুখার্জীর 'সরীসৃপ', বিনিয়ামীন পিয়াসের 'সংহার' ও অরূপ ঘোষের 'স্বপন পারের ডাক শুনেছি' ভালো লেগেছে। দুর্বোধ্য লেগেছে আরিফুল ইসলাম বাঁধনের 'পরিণীতা'৷ শেষের দিকে এসে বুঝতে অসুবিধা হয়েছে বি. এম. পারভেজ রানা'র 'সাতাশ বছর আগে' গল্পটাও।
যেহেতু লেখকদের বেশিরভাগই নতুন তাই তাঁদের সবারই প্রচুর উন্নতির জায়গা আছে। লেখালেখির জগতে নিয়মিত হলে তাঁদের দ্বারা সেই উন্নতি আনা সম্ভব বলে মনে করি আমি। লেখকদের সবার জন্যই আমার শুভ কামনা থাকবে।
'নিশুতি ৫'-এর সম্পাদক হিসেবে নাম আছে ওয়াসি আহমেদের। 'নাম আছে' বলছি এই কারণে যে, গল্প সঙ্কলনটা প্রোপার কোন সম্পাদনার মধ্য দিয়ে গেছে বলে আমার মনে হয়নি। অনেক গল্পেই বেশ কিছু টাইপিং মিসটেক ও বাক্য গঠন জনিত সমস্যা লক্ষ্য করেছি। কিছু গল্প পড়ে সেগুলোর সিলেকশন নিয়েও আমার ভেতরে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি যেটা চোখে লেগেছে সেটা হলো বইয়ের শুরুতে কোন সম্পাদকীয় না থাকার ব্যাপারটা। কিছু সময় বের করে ওয়াসি আহমেদের উচিত ছিলো একটা সম্পাদকীয় লিখে সেটা বইয়ের শুরুতে সংযুক্ত করে দেয়া। একটা আদর্শ গল্প সঙ্কলনের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদী প্রকাশন কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে এই ব্যাপারগুলোর প্রতি নজর দেবেন আশা করি।
আদনান আহমেদ রিজনের করা প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। বইটার প্রোডাকশন আর কাগজের মান নিয়েও আমি সন্তুষ্ট।