কাইমেরা। ভারতবর্ষের এলিট ইনটেলিজেন্স উইং, যেটি তৈরি হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলা করার জন্যে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রঞ্জিত গগৈ, প্রধানমন্ত্রী হরভজন সিং এবং রাষ্ট্রপতি অরুণ চ্যাটার্জি―এই তিনজনের বাইরে কাইমেরার খবর জানতেন আঙুলে গোনা কয়েকজন আমলা। একদম নতুন এই উইং-এর টিম লিডারের নাম প্রথমা লাহিড়ী।
ভারতের রাজনৈতিক পটভূমিতে পালাবদল হল। নতুন রাষ্ট্রপতি জিতু কেডিয়া এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী বীরেন্দ্র মেহতা আর ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ তত্ত্বে বিশ্বাসী নন। তাঁদের পছন্দ ‘মারের বদলা মার’ নীতি। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাইমেরা ভার্সন টু-র কার্যকলাপ একদম আলাদা।
ভারতবর্ষের পক্ষে বিপজ্জনক যে-কোনও ব্যক্তি, সংগঠন বা রাষ্ট্র থাকলে সেই ব্যক্তিকে অথবা সংগঠন বা রাষ্ট্রের প্রধানকে সরিয়ে দিতে হবে। সোজা কথায় প্রথমা ভারত সরকারের একজন পেশাদার খুনি বা মার্সেনারি। দেশ ও বিদেশে প্রাণঘাতী আক্রমণের মুখে জীবন বাজি রেখে প্রথমা বারবার জিতিয়ে দেয় ভারতবর্ষকে।
ইন্দ্রনীল সান্যালের জন্ম হাওড়ার বালিতে, ১৯৬৬ সালে। নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি বি এস। প্যাথলজিতে এম ডি, পিজি হাসপাতাল থেকে।সরকারি চাকরির সূত্রে কাজ করেছেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মহাকরণের ডিসপেনসারিতে, লালবাজার সেন্ট্রাল লকআপ থেকে গঙ্গাসাগর মেলার হেল্থ ক্যাম্পে।বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত।প্রথম প্রকাশিত গল্প ২০০৪ সালে ‘উনিশকুড়ি’ পত্রিকায়।শখ: বই পড়া, ফেসবুকে ফার্মভিল এবং হ্যাপি অ্যাকোয়ারিয়াম খেলা, সুদোকু সমাধান।
পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল লেখক মূলত লিখেছেন টিভি / ওয়েব সিরিজ বানানোর কথা ভেবে।ওমা পড়া শেষে ফ্ল্যাপে দেখলাম আসলেও তাই লেখকের আগের অনেক লেখা দিয়ে নাকি ওয়েব সিরিজ, ফিল্ম বানানো হয়েছে। জানি না আগের লেখা গুলো কেমন ছিলো তবে এই বই নিয়ে টিভি সিরিজ বানালেও জমবে না কারণ থ্রিলিংই নেই কোনো! বইটির মূল চরিত্র "প্রথমা" পেশায় গুপ্তঘাতক। দেশের শত্রুদের বধ করাই যার কাজ কিন্তু পড়তে পড়তে মনে হলো সে আসলে শত্রু নিধন করছে না, মনে হচ্ছে যেন বাদাম চিবোচ্ছে ফটাফট। একটার পর একটা খুন করে যাওয়া যে এত সোজা সেটা এই বই না পড়লে বুঝতামই না।যাই হোক দুই তারকা দিতে কোথায় যেন বাঁধছিলো, তাই তিন তারকা দিলাম। জীবনে অনেক চাপ,সেখানে চাপমুক্ত থ্রিলার বই পড়লাম এইটাই আসলে তিন তারকার মূল কারণ।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক রহস্যময় ও রোমাঞ্চকর পটভূমি, যেখানে অতীতের কোনো এক ঘটনা বা 'প্রথমা'র পর পর পর ঘটে যাওয়া দশটি সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি বা ঘটনাচক্র পুরো কাহিনীকে তাড়া করে বেড়ায়। লেখক প্রথম পাতা থেকেই এমন এক রহস্যের জাল বুনেছেন, যা পাঠককে অনবরত ভাবাতে বাধ্য করে—পরবর্তী নিশানা কে? আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন কিছু ঘটনার সুতো কীভাবে এক জায়গায় এসে মিলছে, তা নিয়েই এগিয়েছে এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের গল্প।
বইটিতে মূলত মানুষের প্রতিশোধস্পৃহা, অপরাধী মনস্তত্ত্ব এবং নিয়তির এক অদ্ভুত খেলা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।এই বইটা দশটা ছোট গল্প নিয়ে গঠিত। প্রতিটি গল্পে প্রথমা—যিনি ভারতের একটি গোপন গোয়েন্দা সংস্থার জন্য কাজ করেন—কোনো জাতীয় হুমকি মোকাবেলা করেন। কখনো বিদেশে, কখনো দেশে। গল্পগুলো তাঁর দক্ষতা, সাহস এবং সিস্টেমের অন্ধকার দিকটা তুলে ধরে।
যা দারুণ লেগেছে: লেখক যেভাবে প্রতিটি খুনের বা ঘটনার পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোকে সাজিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরের ঘটনার আগমন গল্পে এক ধরণের তীব্র উত্তেজনা ধরে রাখে।সান্যালের প্রধান শক্তি হল তিনি একটি মেধাবী, নিরাসক্ত প্রোটাগনিস্ট তৈরি করেছেন যে মানুষ অথবা পুতুল, সে বিভাজন করে না। প্রথমার মনোলোক অন্বেষণ ছাড়াই গল্পগুলো এগিয়ে যায়—এটা লেখকের নিয়ন্ত্রণের একটা চিহ্ন। আঞ্চলিক রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা কাজের বিস্তারিত বাস্তবসম্মত এবং গবেষণাভিত্তিক মনে হয়। প্রতিটি মিশনের জন্য প্রস্তুতি এবং সম্পাদনের ধারা তৈরি করে দ্রুত গতিশীল পাঠ।
যেখানে একটু খামতি মনে হতে পারে: দশটি ঘটনার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গিয়ে কিছু কিছু জায়গায় কাকতালীয় বিষয়ের ওপর একটু বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। তবে থ্রিলারের খাতিরে পাঠক হিসেবে সেটা মেনে নিতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। গল্পগুলোর মধ্যে একটি পুনরাবৃত্ত কাঠামো আছে: সমস্যা চিহ্নিত করা, পরিকল্পনা, মিশন সম্পন্ন করা। এই সিনেমাটিক সূত্র কার্যকর, কিন্তু দশটি গল্প জুড়ে উত্তেজনা কমে যায়। প্রথমার চরিত্র নিজেই স্থির—তার অভ্যন্তরীণ সংঘাত বা বৃদ্ধি নেই। আমরা জানি তিনি কী করেন, কিন্তু তিনি কে এটা আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পাই না। এবং হ্যাঁ, যেভাবে গল্পগুলো সমাপ্ত হয়—খুব সহজ, খুব পরিচ্ছন্ন—সেটা বাস্তবের অমেধা-পূর্ণতা হারিয়ে দেয়।
ইন্দ্রনীল বাবুর ভাষা অত্যন্ত সাবলীল এবং আধুনিক কলকাতার সমসাময়িক আবহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনো রকম জটিল বা গুরুগম্ভীর শব্দের ব্যবহার ছাড়াই তিনি চটজলদি দৃশ্যপট তৈরি করতে পারেন। বইটির গতি বেশ দ্রুত। লেখক পাঠককে খুব বেশি থিতু হওয়ার সুযোগ দেন না। একটার পর একটা মোড় বা 'টুইস্ট' কাহিনীর গতিকে ধরে রাখে, ফলে এক বসায় বইটি শেষ করে ফেলার মতো একটা তাড়না কাজ করে। কেন্দ্রীয় চরিত্র বা তদন্তকারীর মগজাস্ত্রের ব্যবহার এবং তাঁর নিজস্ব আবেগ-অনুভূতিকে বেশ বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। খলচরিত্র বা রহস্যের পেছনের মানুষটির মানসিক দ্বন্দ্বও বেশ স্পষ্ট। তবে কিছু পার্শ্বচরিত্রের গভীরতা আরও একটু বেশি হলে গল্পটি আরও নিটোল হতে পারত।
বাংলা থ্রিলার সাহিত্যে যারা একটু ভিন্ন ধাঁচের, ধারাবাহিক রহস্যের গল্প পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত উপভোগ্য বই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা এবং চমৎকার ক্লাইম্যাক্স বইটিকে একটি সফল থ্রিলারের মর্যাদা দেয়। সান্যালের বর্ণনা সরল এবং উদ্দেশ্যমূলক। কোনো শব্দের অপচয় নেই। এটা একটা পেশাদারের গল্পের জন্য যথাযথ—পরিষ্কার, কিন্তু আবেগজনক খোলাপনায় নিয়ন্ত্রিত। বেশিরভাগ পাঠক এটা দ্রুত শেষ করবেন, সম্ভবত একটি বসায়।
"খুঁজে খুঁজে খুন" একটি দক্ষতার সাথে তৈরি গল্পবহুল, কিন্তু এটা সীমানায় থাকে। এটি রোমাঞ্চকর মুহূর্ত দেয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করে না। যারা স্মার্ট অ্যাকশন থ্রিলার পছন্দ করেন, প্রতিফলনের দাবি ছাড়া, তাদের জন্য এটি কাজ করবে। অন্যদের জন্য—যারা নৈতিক অস্পষ্টতা বা চরিত্রের বিবর্তন খোঁজেন—এটি তাদের চাহিদা পূরণ করবে না।