"মিশরে প্রাচীন কবর খুঁড়ে পাওয়া গেল সোনার পাতে মোড়া মমি! মিশরে পুরাতত্ত্ববিদরা সাক্কারায় এমন একটি মমি খুঁজে পেয়েছেন যা সোনার পাত দিয়ে মোড়া এবং চার হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। একই স্থানে আরো তিনটি সমাধি পাওয়া যায়, যার একটি একজন গোপন রক্ষকের বলে দাবি করা হচ্ছে।" ২৭শে জানুয়ারি ২০২৩ সালের একটি বিবিসি নিউজ প্রতিবেদন দৃষ্টি আকর্ষণ করে জনপ্রিয় কন্টেন্ট নির্মাতা আনিস হাওয়ালাদারের। 'গোপন রক্ষক' উপাধির মাঝে রহস্যের গন্ধ খুঁজে পেলেন। পরদিন এ নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকলেন। ডাক পড়লো আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট শাখার দুজন কর্মকর্তা হিনা আহসান ও রেজওয়ানুল হাসান রবিউলের। বৈঠকে জানান, রহস্য উদঘাটনে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটকে যেতে হবে পিরামিড, মমি ও হায়ারোগ্লিফিক্সে ঘেরা দেশ মিশরে। মনিবের আদেশ! এড়ানো কি যায়? হিনা এবং রেজওয়ানের এই যাত্রায় সঙ্গী হলো হিনার ভাগ্নী। সাথে আছেন, সিফাত রহমান। মিশরের এই ভ্রমণ পর্বে পাওয়া যাবে, পাঁচ তারকা হোটেল লু মেরিডিয়েনের চাকচিক্য, মিশরীয় নানান খাবারের স্বাদ, ফারাও জোসারের ধাপ পিরামিড এবং...... সমাধির পর্দা ঠেলে হাজির পদ্মলোচন। হিনার সঙ্গে তার কীসের সখ্যতা? দুজনের ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না রেজওয়ান। কিন্তু কেন? মরুভূমির এই দেশে ঘটলো এক অঘটন। অঘটনের মধ্যেই আগমন এক রহস্যময়ী নারীর। মিতিন মাসি নয় শুধু মিতিন। তাহলে কি সূচিত্রা ভট্টাচার্যের সৃষ্টি বাস্তব হতে চলেছে? কী আছে তীক্ষ্ম চোখের মাঝে? কীসের পেছন দৌড়াচ্ছে উত্তরসূরিরা? সত্য নাকি ভ্রম? কে অপেক্ষা করছে বিষধর সাপের? এই গল্প সূর্যদেবতা রা-এর। এই গল্প মায়া ও মাতৃত্বের দেবী আইসিসের। এই গল্প পৌনে পাঁচ হাজার পূর্বের, এই গল্প গোপন রক্ষকের, এই গল্প তীক্ষ্ম চোখের আর.... সাক্কারার মায়াজালে আপনায় স্বাগত। আমন্ত্রণ গ্রহণে জানবেন ধন্যবাদ।
❛মিশরে পুরাতত্ত্ববিদরা সাক্কারায় এমন একটি মমি খুঁজে পেয়েছেন যা সোনার পাত দিয়ে মোড়া এবং চার হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো।❜
এমনই একটি সংবাদের উপর ভিত্তি করে জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা আনিস হাওলাদার দপ্তরে ডেকেছেন তার অধীনে কাজ করা হিনা এবং রেজওয়ানকে। খবরটা বেশ চমকপ্রদ। মিশরে মমি উদ্ধার করা কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু যে বিষয়টা তাকে ধাক্কা দিচ্ছে সেটা হলো সংবাদের একটা অংশ, ❛যে শবাধারে মমিটি রাখা ছিল তা গত ৪,৩০০ বছরে কখনো খোলা হয়নি। একই জায়গাটিতে আরো তিনটি সমাধি পাওয়া গেছে এবং তার মধ্যে একটি একজন ❛গোপন রক্ষকের❜ বলে বলা হচ্ছে।❜
❛গোপন রক্ষক❜ কথার মাঝেই কেমন সন্দেহ সন্দেহ টের পাচ্ছেন আনিস। সে উদ্দেশ্যেই আজকের আলোচনা। হিনা এবং রেজওয়ান দুজনকেই ইতিহাসের মাস্টার বলা যায়। দারুণ জ্ঞান রাখে ইতিহাস নিয়ে। বিশেষ করে পুরাণ নিয়ে তাদের আগ্রহ এবং জ্ঞানের তারিফ করতেই হয়। আনিস সাহেব তাই তার দলের দুজন কর্মঠ এবং গুনী সদস্যকে দায়িত্ব দিলেন মমি, পিরামিডের দেশ মিশরে গিয়ে ঘটনার অনুসন্ধান করে একটা তথ্যবহুল লেখা তৈরি করতে। প্রথমবার কাজের জন্য বৈদেশ ভ্রমণের কথা খুব রোমাঞ্চকর লাগলেও সঙ্গী হিসেবে ন্যাকা রেজওয়ানকে মেনে নিতে অপূর্ব চোখের অধিকারিণী হিনার আপত্তি আছে। লোকটা হুদাই তার সাথে প্রণয়চাতুর্য করতে চায়। কীসব নাম বলে ক্ষ্যাপায়। যাইহোক পছন্দ না হলেও যেতে হবে। তবে একা না গিয়ে সঙ্গী হিসেবে নিয়ে নিলো হিনার অবিকল ছোটরূপ ভাগ্নি আদিবাকে। শুরু হলো মিশরযাত্রা। মিশরে পৌঁছে টুকটাক কাজ সেরে মিশর দর্শনের নামে দুইজন তাদের উপর ন্যস্ত কাজ করতে থাকলো। ধাপ পিরামিড, সাক্কারা ভ্রমণ চলতে থাকলো। নিজেদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের মাঝে একটু ঘুরাঘুরি আর মিশরের খাবার চেখে দিন ভালোই গেলো। এরমাঝেই তথ্যের ভান্ডারে আরও রসদ নিতে দরকার পড়লো পিরামিডের খনন কার্যের আরেকটু গভীরে যাওয়ার। সেখানেই দেখা হয় আরেক প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্মলোচন আলতাইরের সাথে। রেজওয়ানের কাছে আলতাইরকে ঠিক সুবিধার মনে হলো না। আর তার উর্বশীর সাথে এই লোকের এত ঘনিষ্ঠতাও সে ভালো চোখে দেখেনি। যাইহোক দিন পর হয়ে গেলো। এরপরেই ঘটলো অঘটন। সকাল সকাল হিনা যে তার ভাগ্নিকে কী বলে বেরিয়ে গেলো আর আসার নাম নেই। তবে কী হলো হিনার? রেজওয়ানের মাথায় হাত! অচেনা দূরদেশে কী করে খুঁজে পাবে হিনাকে? এখানেই হাজির আমাদের মিতিন। না মিতিন মাসী না। মিশরের মহিলা গোয়েন্দা সাদিয়া জামান মিতিনের দায়িত্ব পড়লো নিখোঁজ হিনাকে খুঁজে বের করার। পারবে কী? লোকে হিনার চোখের মাঝে কী এক শক্তি খুঁজে পায়। কী জানি আছে তার চোখে। তবে এই চোখ ই কী কাল হয়ে দাঁড়াবে তার জন্য? মিশরের পিরামিডের গোপন রক্ষকের রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে হিনাই এক রহস্য হয়ে গেলো। কোনটার সমাধান আগে হবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝সাক্কারার মায়াজালে আপনার স্বাগত, আমন্ত্রণ গ্রহণে জানবেন ধন্যবাদ❞ মিশর পুরাণের ভিত্তিতে লেখা রেজওয়ানুল হাসান রবিউলের এক উপন্যাস। উপন্যাসের নাম পড়ার সময়েও জানতাম না। তাহলে স্টপ ওয়াচ নিয়ে বসতাম উপন্যাসের নাম আগে পড়া যায় না উপন্যাস। নামটা অনেক ক্ষুদ্র যে! মিশর পুরাণ নিয়ে আগ্রহ থাকার কারণে উপন্যাসটা বেশ আরাম অনুভূতি নিয়েই পড়েছি। পুরাণ ভিত্তিক উপন্যাস বলতেই ৪০০-৫০০ বা এরথেকেও বেশি পৃষ্ঠার দৈর্ঘ্য বলে মনে হলেও এই উপন্যাসটি সে অনুযায়ী একটু রেহাই দিয়েছে। খুব বেশি বড়ো নয় আবার একেবারে ছোটও নয়। তাই পড়তে মন্দ লাগেনি। মিশরের উদ্ধারকৃত নতুন এক সোনার মমি এবং ❛গোপন রক্ষকের❜ রহস্য উদঘাটন করতে যাত্রা করা হিনা এবং রেজওয়ানের কাহিনি দিয়েই এগোবে উপন্যাস। পরের সময় জানার আগ্রহ ছিল কে সেই গোপন রক্ষক বা কী তার ইতিহাস। তবে ইতিহাসের সাগরে ডুব দেয়ার আগে রহস্য এবং রোমাঞ্চের সাগরে ভাসতে হয়েছে। যার শুরু ছিল উপন্যাসের নায়িকা হিনার নিখোঁজের মাধ্যমে। উপন্যাসের সিংহভাগ সুন্দরী নায়িকাকে খুঁজতেই পার হয়েছে। এখানে এসে আমার আশার সাথে উপন্যাস মিলে নি। তাই বলে খারাপ লেগেছে এমন না। আসলে পুরাণ ভিত্তিক উপন্যাস মানেই সারাক্ষণ অতীতের পুরাণ এবং বর্তমানের সাথে সংযোগ আবার কোনক্ষেত্রে বর্তমানের চরিত্রদের মাঝেই অতীতের চরিত্রদের খুঁজে পাওয়া এমনটাই আশা করি। এইদিকে এই উপন্যাস কিছুটা ভিন্ন লেগেছে এবং সেটা অবশ্যই ভালো। ভালো লেগেছে উপন্যাসের শুরুর ভিতটাই বাস্তবের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে। শুরুতে দেয়া খবরটা ২৭ জানুয়ারি ২০২৩ এর সত্যি ঘটনার উপর ভিত্তি করেই লেখা। এছাড়াও মিশরের প্রাক্তন পর্যটন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক মন্ত্রী জাহি হাওয়াসকেও উপন্যাসে উপস্থিত করেছেন। বিধায় বাস্তবের সাথে কল্পনার মিশ্রণ ভালো লেগেছে। শেষটাও ভালো লেগেছে। মোট ২৮ টি অধ্যায়ে ভিন্ন শিরোনামে পুরো উপন্যাস সাজিয়েছেন। এবার আসি নিজের কিছু অনুধাবনে। উপন্যাসে প্রেম পিরিতির মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ আমার তেমন পছন্দ না। যদিও এই উপন্যাসে সেটা ছিল না। কিন্তু ন্যাকামি ছিল তাও ব্যাটা মানুষের মধ্যে। যেটা আমার অপছন্দের বিষয়। রেজওয়ানের মধ্যে শুরুতে বেশ ভালো পরিমাণে ন্যাকামি ছিল বলে শুরুতে পড়তে এবং হজম করতে আমার কষ্ট হচ্ছিলো। এটা আমার ক্ষেত্রে অপছন্দের দিক হলেও সবার তাই ঠেকবে এমন নয়। বইটা প্রকাশের আগেই যেহেতু পড়েছি সেহেতু পড়ার সময় কিছু সমস্যা এবং আমার চোখে পড়া ভুল উল্লেখ করেছিলাম। আশা করি মূল উপন্যাসে সেসব ঠিক করার ফুরসত হয়েছে। না হলেও তেমন কঠিন কিছু না। পুরো উপন্যাসে না পারতে এবং সংলাপের ভেতর ছাড়া কোথাও ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ ছিল না। ব্যাপারটা প্রশংসা করতেই হয়। তবে একইসাথে এমন কিছু শব্দের বাংলা ব্যবহার আমার কাছে লেখাকে কিছুটা কঠিন মনে করতে বাধ্য করেছে। এমন না সে শব্দগুলো সমার্থক সহজ ছিল না। লেখক কিছুটা কঠিন ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। সেটা না করলেও চলতো। শেষের দিকে হিনার নাম কেন ছিল সেই কাগজে এর সঠিক উত্তর পাইনি। পুরাণের ভিত্তিতে উপন্যাস থেকে একসময় এটাকে মিতিনের একটা তদন্ত সমাধানই মনে হচ্ছিলো। সব মিলে পাঠ অভিজ্ঞতা খারাপ না। চাইলে একবার উপন্যাসটা পড়ে নেয়াই যায়। সামনে আরো ভালো এবং উপভোগ্য লেখা পাবো আশা করি। ততক্ষণ মিশরের পিরামিডের ধাপে ধাপে আনাগোনা করি দেখি কোনো গুপ্তধন মিলে নাকি!
প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি পুরোনো এক মমি পাওয়া গেল মরুর দেশ মিশরে। যে খবর অনেক বেশি আগ্রহ জাগিয়েছে অনেক দূরে থাকা একটি দেশের এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরকে। আগ্রহের কারণ মমির সাথে আরও তিনটি সমাধি পাওয়া যায়। যার একটিকে গোপন রক্ষক হিসেবে অভিহিত করা হয়।
সোনার পাতে মোড়ানো এই মমি আর গোপন রক্ষক নিয়ে বাংলাদেশের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আনিস হাওলাদার বেশ রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে। আনিস দেশ সেরা কন্টেন্ট ক্রিয়েটির। বিভিন্ন তথ্য, উপাত্ত ও তার সদ্ব্যবহার ��রে দর্শকদের আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পারেন। এর আগে দেশের বাইরে কাজ না করলেও এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের বাইরের এই তথ্য মানুষকে জানানোর। কিন্তু সঠিক তথ্য জানানোর সবচেয়ে যোগ্যতম উপায় সেই জায়গাটিতেই যাওয়া, যেখানে ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।
এ কারণেই নিজের প্রতিষ্ঠানের দুই নির্ভরযোগ্য কর্মী, হিনা ও রিজওয়ানকে সুদূর মিশর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় আনিস। এর আগে দেশের বাইরে যায়নি ওরা। নতুন অভিযান, রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা।
কিন্তু হিনা যে একা কোথাও যেতে পারবে না। বাপ-মা ম রা মেয়েটা বোন আর বোন জামাইয়ের কাছে থাকে। একা এভাবে একজন পুরুষের সাথে অন্য দেশে পাঠানোর তাই ইচ্ছে নেই বোনের। ফলে ভাগ্নি আদিবাকে নিয়ে মিশরের পথে যাত্রা করছে ওরা। কিন্তু কে জানত, ওখানে এমন কিছু অপেক্ষা করছে যা কল্পনার বাইরে।
হিনা কেন জানি রিজওয়ানকে পছন্দ করে না। নিজে নিজে ক্রেডিট নিতে চায়। মিশরে আসার পর একজনের সাথে পরিচয়। যে মিশন নিয়ে তারা এসেছে তার তথ্য সেই ব্যক্তিটির কাছেই আছে। তাই রিজওয়ানকে না জানিয়ে, শুধু ভাগ্নিকে ‘কিছুক্ষণ পর আসছি’ বলে উধাও হওয়া হিনাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
অনেকক্ষণ পরও যখন হিনা আসছে না তখন ব্যাপারটা চিন্তা করার মতোই। এই ভিনদেশে রিজওয়ান কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কীভাবে খুঁজে পাবে হিনাকে? আনিস ভাইয়ের কথায় এক প্রাইভেট ডিটেকটিভ জড়িয়ে গেল এ রহস্যে। খুঁজতে খুঁজতে জানা গেল প্রাচীন ইতিহাস। মিথের এক অদ্ভুত মিশেল! মানুষ কতটা ক্ষমতালোভী হলে এমনটা করতে পারে। যুগে যুগে ক্ষমতার লোভ মানুষকে নিঃশেষ করেছে। দিন শেষে কি সত্যিই পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত বস্তু?
সাক্কারায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যেখানে প্রাচীন মিশরীয় পুরাণের একাংশের উন্মোচন হবে। যার সাথে মিশে থাকবে ক্ষমতালোভী মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নির্মমতা। আমন্ত্রণ গ্রহণে অবশ্যই ধন্যবাদ জানবেন…
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
“সাক্কারার মায়াজালে আপনাকে স্বাগত, আমন্ত্রণ গ্রহণ ধন্যবাদ জানবেন”
বাপরে বাপ! নামটা পড়তেই যে হয়রান লাগে। তার উপর বইয়ে রয়েছে মিশরীয় পুরাণের মতো জটিল সব বিষয়। প্লট অনুসারে বইটি দারুণ। লেখকের গল্প বলার ধরনও নেহাতই মন্দ নয়। তবে এক্সিকিউশনের দিক থেকে বেশ কিছু দুর্বলতা লক্ষ্য করেছি। আরও ভালো হয়তো হতে পারত।
মিশরের সাক্কারা নামক স্থানে একটি সোনার পাতে মোড়ানো মমি পাওয়া দিয়ে রহস্যের শুরু। এমন কিছু পাওয়া গেলে যারা ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করেন তাদের আগ্রহ জাগবে স্বাভাবিক। কিন্তু আমার প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। এমন এক রহস্য দর্শকদের সাথে তুলে ধরার জন্য সামান্য কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এত টাকা খরচ করে দুইজনকে মিশরে পাঠাবে, বিষয়টা আমার কাছে অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে। হয়তো লেখক চিন্তা করেছেন, বড় প্রতিষ্ঠান বা আর্কিওলজিস্ট দিয়ে এই রহস্য সমাধানের চেষ্টা করা প্রচলিত। এই দিক দিয়ে ভিন্ন কিছু দেখানোর চেষ্টা করেছেন। আমার ভালো লেগেছে, দর্শকদের কাছে তুলে ধরার জন্য সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর প্রয়াস।
লেখক মিশর, মিশরের ইতিহাস, মিথলজি, রিচুয়াল নিয়ে অনেক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিছু তথ্য প্রয়োজনীয় ছিল, আবার অতিরিক্ত তথ্য জানানোর কারণে কিছু অংশে বিরক্তিও লেগেছে। তবে সংবাদপত্রের লেখার মাধ্যমে তথ্য জানার ভিন্নধর্মী প্রচেষ্টা আকর্ষণীয় লেগেছে।
মিশরের মিথলজির সাথে ভারতীয় এক সুলতানের জুড়ে দেওয়ার বিষয়টা ইন্টারেস্টিং ছিল। তবে এই অংশে একটা সিনেমা নিয়ে অতিরিক্ত তথ্য দেওয়া পুরোটাই অপ্রয়োজনীয় ছিল। মূল গল্প এখানে ধীরগতির হয়ে গিয়েছে। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, কেন হিনাকে এই তালিকায় স্থান দেওয়া হলো, ব্যাখ্যা করা হয়নি। হিনাকে অপ হ র ণের কারণ বোধগম্য। কিন্তু হিনা-ই কেন? এই ব্যাখ্যাটা পাইনি। অপ্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার চেয়ে এই দিকে নজর দিলে ভালো হতো মনে হয়।
আরেকটি যে বিষয় আমার কাছে দৃষ্টিকটু লেগেছ, হিনা আর রেজওয়ানকে অনেক বেশি ইনফরম্যাটিভ হিসেবে উপস্থাপন। এটা ঠিক যে তারা ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছে, অনেক কিছুই জানতে পারে। কিন্তু যেভাবে সব তথ্য তারা গড়গড় করে বলে দিচ্ছিল, বিষয়টা স্বাভাবিকতার সাথে যায় না। একজন অর্কিওলজিস্টারই এভাবে সবকিছুর অগাথ জ্ঞান থাকা সম্ভব।
কিছু ছোটখাট জিনিসে লেখকের নজর দেওয়া উচিত ছিল। বড় ধরনের ভুল না হলেও, এগুলো লেখকের উদাসীনতার প্রদর্শন করে। যেমন জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মিতিনের বিষয়ে বলা হলো, সে টপস পরে আছে। যার কোণা দিয়ে চশমার গ্লাস মুছছে। তার কিছুক্ষণ পরই লেখক বলেছেন, মিশরের তাপমাত্রা ৪°। সবাই গরম কাপড় পড়ে আছে। ঘটনাক্রম সাংঘর্ষিক। আবার পরবর্তীতে দুই বা তিন দৃশ্য পরে রিজওয়ানকে টিশার্ট পরিয়ে দিয়েছেন লেখক। ৪° তাপমাত্রায় শুধু টিশার্ট পড়লে তো জমে যাওয়ার কথা।
তদন্ত প্রক্রিয়ার বিষয়টা ইন্টারেস্টিং লেগেছে। লেখক প্রথাগত তদন্তের দিকে না ঝুঁকে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছেন। যেখানে যাওয়া দরকার গিয়েছেন। তবে ঘটনা শেষ হওয়ার পর বর্ণনা ও আলোচনার মাধ্যমে ঘটনা ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ যেভাবে দরকার সেভাবেই ছিল। নার্ভের যুদ্ধ বেশ উপভোগ্য লেগেছে আমার কাছে।
কিন্তু শেষটা আমার কাছে বেশ নাটুকে আর অনেক দ্রুত মনে হয়েছে। আরেকটু সময়ক্ষেপণ আর রিয়েলিস্টিক করা যেত। আরেকটা বিষয়ে একটু হতাশ হয়েছি। লেখক যেহেতু পাঠককে বিদেশ থেকে ঘুরিয়ে এনেছেন, তখন সেই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি সম্পর্কে জানার একটা প্রত্যাশা থাকে। লেখক পুরোটা সময় গল্পের মধ্যে থাকতে গিয়ে সচেতনভাবে বিষয়টা এড়িয়ে গিয়েছেন। তাই কিছু একটা নেই, এমন এক অনুভূতি জেগেছে বইটা পড়ার সময়।
▪️চরিত্র :
এই দিকটা নিয়ে লেখক হতাশ করেছেন। হিনাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য চরিত্রগুলো তেমন জায়গা পায়নি। গল্পে ঠিকই ছিল কিন্তু পাঠকের সাথে সংযোগেটা কোথায় যেন অনুপস্থিত। এমনকি মূল চরিত্র রিজওয়ানও যেন ফুটে ওঠেনি। লেখক সম্ভবত নিজেকে সুপিরিয়র মনে করেন, তাই নিজেকে এই চরিত্রে স্থান দিয়েছেন। নিজেকে, নিজের ব্যক্তিগত বিষয়-আশয় এভাবে বইতে স্থান দিয়ে কেন যেন ভালো লাগে না। এই দিকে আশা করি লেখক খেয়াল রাখবেন। সেই সাথে পুরুষ মানুষের ন্যাকামির বিষয় একটু কম হলেই ভালো।
বইটিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিল। মিশরীয় ডিটেকটিভ মিতিন। কিন্তু একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের পুলিশের উপর ছড়ি ঘোরানো স্বাভাবিক নয়। মিতিন সেই কাজটি করেছে। অন্যদিকে খোল চরিত্রে থাকা আলতাইরকে ঠিকঠাক জায়গা দেওয়া হয়নি। মিতিন এবং আলতাইরকে ভাসাভাসাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। চরিত্রের আরেকটু গভীরে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। একই কথা রিজওয়ানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তবে বিরক্তির চরম পর্যায়ে গিয়েছিল আদিবা নামের মেয়েটি। ক্লাস সেভেনে পড়া এই ইচড়ে পাকা মেয়েটির কানের নিচে গরম করে দেওয়ার ইচ্ছা অনেক কষ্টে দমন করেছি। নিজের দ্বিগুণ বয়সী, খালার কলিগকে প্রথম দেখাতে ক্রাশ খেয়েছি বলার পর থেকেই এই মেয়েটিকে অপছন্দ লেগেছে। বেয়াদব মেয়েটি আবার সূর্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজের বয়স বাড়িয়ে রিজওয়ানের বয়স কমানোর চিন্তা করা ছিল এক ধরনের ফাত্রামি। বইয়ের ক্ষেত্রে এসব হজম হয় না।
আরেকটা বিষয় আমার কাকতালীয় লেগেছে। যে অপরাধী, যিনি গোয়েন্দা— দুইজনই বাংলা ভাষা পারেন। মিতিনের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা করা হলেও আলতাইর কীভাবে পারে বলা হয়নি।
এছাড়া চরিত্রগুলোকে লেখক যে ব্যক্তিত্বে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন, সেখানে বারবার ছন্দপতন হয়েছে। হয়তো পরিবেশের চাপে, পরিস্থিতির কারণে। তারপরও এই দিকগুলো একটু নজর দেওয়া জরুরি। প্রথম বই বলেই বলছি, পরের বইগুলো হয়তো আরেকটু সচেতনভাবে লেখা সম্ভব হবে।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
লেখকের ভাষাগত দিক বেশ ভালো লেগেছে। চেষ্টা করলে ভালো করবেন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে ইংরেজি পরিহার করে বাংলা শব্দের ব্যবহার। এই বিষয়টা আমি পছন্দ করি। তাই বলে সব ইংরেজি শব্দের ক্ষেত্রে এমন আসলে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রচলিত পারিভাষিক শব্দের ক্ষেত্রেই শ্রুতিমধুর মনে হয়। অপ্রচলিত শব্দ এখানে বিরক্তির উদ্রেক করে।
যেমন লিফট বা এলিভেটরকে উত্তোলন যন্ত্র কয়জন বলে, ইন্টারনেটকে অন্তর্জাল একবার কি দুইবার বলা যায়। একইভাবে মোবাইল ফোনকে মুঠোফোন। তবে বারবার হলে কেমন যে শ্রুতিমধুর মনে হয় না। চেয়ারকে চেয়ার শুনতেই ভালো লাগে, কেদারা না।
ভাষার দিকে এই সচেতনতা লেখকের লেখায় প্রভাব ফেলেছে। ফলে সংলাপের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে আবার অতিরিক্ত ইংরেজি শব্দ বিরক্ত ধরিয়ে দিয়েছে। কিছু ভাষা সংলাপের চেয়ে বর্ণনামূলক বেশি হয়ে গিয়েছিল।
কিছু বানানে লেখকের দুর্বলতা লক্ষ্য করেছি। যেহেতুকে সব জায়গায় যেহুতু লেখা ছিল। একবার দুইবার হলে ছাপার ভুল বলা যায়, বারবার হলে সেটা ত্রুটি ছাড়া কিছু না। এছাড়া আপনাকে লিখতে গিয়ে আপনায়, উনাকে লিখতে গিয়ে উনায় লেখকের ভুল, না ইচ্ছাকৃত জানি না।
কিছু ছাপার ভুল ছিল। যা চাইলে বইটই অ্যাপ ঠিকঠাক করতে পারত। দুয়েক জায়গায় যুক্তবর্ণ ভেঙে গিয়েছিল। অকারণে কোনো শব্দের শেষে ঋ-কার চলে এসেছিল।
▪️পরিশেষে, এই পৃথিবীতে অসংখ্য ধর্ম রয়েছে। কোনো ধর্মই মানুষের নির্মমতা সমর্থন করে না। তাও ধর্মের দোহাই দিয়ে, ক্ষমতা লাভের জন্য মানুষ নির্মম হয়। মনে করে এভাবেই ধর্ম তাকে শুদ্ধ করে তুলবে। কিন্তু সত্য কথা, এমন নির্মমতার কারণেই ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তা মুখ ফিরিয়ে নেয়। তখন করার কিছু থাকে না।